অপ্রাপ্তি মায়া
অপ্রাপ্তি মায়া
### গল্প: ** অপ্রাপ্তির মায়া**
রনি ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম আর দুঃখের মধ্যে বড় হয়েছে। তার পরিবার ছিল দরিদ্র, সীমাহীন অভাব আর কষ্টের জালে বাঁধা। বাবা-মা রনিকেআদর-ভালোবাসায় বড় করার চেষ্টা করলেও, জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে সবসময়েই তাড়িয়ে বেড়াতো। পরিবারের অভাব পূরণ করতে করতে তারবাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন, আর মা ছিলেন গৃহিণী। রনি বুঝে গিয়েছিল যে, তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হলো পরিবারের দারিদ্র্যের অবসান ঘটানো।
দারিদ্র্যের সঙ্গে এই লড়াইয়ের মাঝেই, রনি কলেজে ভর্তি হলো। প্রথম বর্ষের প্রথম দিনেই তার পরিচয় হলো সাজুর সঙ্গে। সাজু ছিল মধ্যবিত্তপরিবারের মেয়ে, স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের অধিকারিণী। সাজু যেমন শান্ত-শিষ্ট, তেমনি মনের দিক থেকেও ছিল একজন চরিত্রবান মেয়ে। রনি প্রথম দিনথেকেই সাজুকে দেখে মুগ্ধ হলো, মনে হলো যেন এই মেয়েটিই তার জীবনের আলো।
কিন্তু রনি নিজেকে খুবই সংকোচ বোধ করত। সে জানত, তার জীবন অসহায়ের জীবন, তার কোনো যোগ্যতা নেই, আর শারীরিক সৌন্দর্যও খুব বেশিভালো নয়। রনি দেখতে ছিল কালো, কুতসিত, এবং তার আত্মবিশ্বাস ছিল তলানিতে। সেই ভাবনাগুলো তাকে সাজুর সামনে প্রকাশ করতে বারবারবাধা দিত। এমনকি, সাজুর সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়া সত্ত্বেও রনি তার ভালোবাসার কথা গোপন রাখল। সে সবসময় ভাবতো যদি ভালোবাসা প্রকাশ করলেতাকে আপমানিত করে। যদি ভালোবসা প্রকাশের করানে বন্ধুত্বের সম্পর্কে আঘাত হানে।
পরিচয়ের ছয় মাস পর, সাজু নিজে থেকে রনিকে তার সোশ্যাল মিডিয়াতে যোগ করল।যদি উদ্দেশ্য ছিলো শুধু কলেজের খোজ নেয়ার জন্য। কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের মাঝে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। রাতের পর রাত তারা চ্যাট করত, দিনের পর দিন একে অপরের সঙ্গ উপভোগ করত। রনি বুঝতে পারল, সেএকমাত্র সাজুকেই ভালোবাসে। কিন্তু তার মনের গভীর অপ্রকাশিত ভালোবাসা তাকে দিন দিন আরও ক্লান্ত করতে লাগল।
একদিন, সাজু হঠাৎ রনিকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার জীবনে প্রিয় কেউ আছে? তোমার মনের মানুষ কে?” রনি প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত হলো। সে সাজুকেবলতে ভয় পেল, যদি সাজু রাগ করে তাদের বন্ধুত্বও শেষ করে দেয়? কিন্তু সাজু যখন বারবার জিজ্ঞাসা করল, তখন রনি তার ভালোবাসার কথা খুলেবলতেই বাধ্য হলো, “তুমি... তুমি আমার প্রিয়। আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
রনির কথা শুনে সাজু রাগ করল না। বরং সে বলল, “আমি তোমাকে অপছন্দ করি না। কিন্তু আমার পরিবার কীভাবে মানবে? তুমি যদি তাদের মনেরমধ্যে জায়গা করে নিতে পার, তবে আমি আপত্তি করব না।”
রনির মনে আশার আলো ফুটল। সে ভাবল, “আমি পারব! আমি অবশ্যই তার পরিবারকে রাজি করাব।” এভাবে তারা একে অপরের প্রতি আরওনিবেদিত হয়ে পড়ল। দুই বছরের মধ্যে তাদের ভালোবাসা আরও গভীর হলো। রনি সাজুর জন্য পাগল ছিল। সে সবসময় চেষ্টা করত সাজুকে খুশিরাখতে, আর সাজুও তাকে সম্মান করত। রনি সাজুকে কিছুই ভাবতে পারত না। রনি আর সাজুর প্রেমের শুরুটা ছিল অদ্ভুত রোমাঞ্চকর। কলেজেরপ্রথম দিন থেকেই তাদের মধ্যে একটি বিশেষ টান অনুভূত হয়। রনি যখন সাজুকে দেখেতো, তখন মনে মনে ভাবতে শুরু করে, “এত সুন্দর তার হাসিযেন আমার জীবনের অন্ধকারকে আলোকিত করে দিচ্ছে। আমি কল্পনা করতে শুরু করেছি, একদিন আমরা একসাথে একটি সুখী সংসার গড়ব, যেখানে হাসি আর ভালোবাসা থাকবে।”
সাজুর জন্য রনির অনুভূতি ছিল গভীর। সে প্রতিদিন সাজুকে নিয়ে স্বপ্ন দেখত, কীভাবে তারা একসাথে সুখে কাটাবে। রনি ভাবত, যখন তাদের বিয়েহবে ' রনি যখন কাজ থেকে বাড়ি ফিরবে, তখন তার সামনে সাজুর মুখে লেগে থাকবে সেই প্রশান্তির হাসি। এসব স্বপ্ন রনি সব সময় দেখতো যেখানেছিলো শুধু সাজুকে নিয়ে সুখে থাকার গল্প।
দুজনেই একই এলাকার বাসিন্দা হওয়ার কারণে কলেজের পড়া শেষে তারা প্রায় একসাথে আসতো একটু সময় কাটাত। তাদের আড্ডায় থাকত হাসি-ঠাট্টা, কিছু মজার গল্প আর কলেজের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা। রনি তখন মনে মনে ভাবতো, “আমার সাজু আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”
বেলপুরির কথা উঠলে সাজুর চোখগুলো চকচক করে উঠতো। সে বলত, “রনি, চল, আজকে বেলপুরি খেতে যাই!” রনি সাজু আর সাজু কলেজবান্ধবী মনি একসাথে বেলপুরি খাওয়ার সময় তাদের মাঝে চলতো দুষ্টুমির মেজাজ। হাসি-মজা আর একে অপরের সঙ্গে ঠাট্টা করতে করতে তারা পুরোসময়টাই উপভোগ করতো।
রনির মনে হত, যদি এই সুখের মুহূর্তগুলো চিরকাল স্থায়ী হতো!
প্রতি সন্ধ্যায় যখন তারা চ্যাট, করতো। তখন সাজু বলতো, “রনি, আমি স্বপ্ন দেখি, আমাদের একটি সুন্দর বাড়ি হবে, যেখানে আমরা একসঙ্গে সুখেথাকতে পারব। সেখানে আমাদের বিয়ের পর ছেলে আসলে দুনিয়া তাকে হাফেজ বানবে। বিয়ের পর সমার্থ হলে হজ করবো।” রনি বলতো, “অবশ্যই, সাজু! আমরা একসাথে আমাদের সব ছোট ছোট স্বপ্ন পূরণ করব। আমি তোমার জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত।”
এভাবে দিন কাটতে থাকে। তারা দুজনের মধ্যকার প্রেম আর বন্ধুত্ব একে অপরকে শক্তিশালী করে তুলছিল। কিন্তু তাদের এই প্রেমের গল্পে যে অন্ধকারসূর্য ওঠে, সে দিকে নজর দেওয়া হয়নি। যদিও রনি জানত, প্রেমের পথে বাধা আসবে, কিন্তু সেই সময় তারা একে অপরের পাশে ছিল, সুখের জালেনিজেদের নিয়ে স্বপ্ন দেখছিল।
কিন্তু সেই সুখের দিনগুলো দীর্ঘস্থায়ী হলো না। একদিন সাজুর পরিবার তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসতে শুরু করল। সাজু তখনও রনির কথাকাউকে বলেনি। কিন্তু যখন তার মা পাত্র দেখা শুরু করল, তখন সাজু বাধ্য হয়ে মাকে বলল, “রনি আমাকে ভালোবাসে। ছেলেটা ভালো, আমাকে ওপছন্দ করে।”
সাজুর মা রনির কথা শুনে, তার অবস্থা জানার চেষ্টা করল। কিন্তু যখন জানতে পারল যে রনি বেকার, গরিব, এবং কোনো স্থিতিশীলতা নেই তারজীবনে, তখন কোনোভাবেই তারা এই সম্পর্ক মেনে নিতে চাইল না। সাজুর মা স্পষ্ট জানিয়ে দিল, “তোমার ভবিষ্যৎ ধ্বংস হতে দেব না। ওর সঙ্গেতোমার কোনো সম্পর্ক চলবে না।”
সাজু তখন হতাশ হয়ে রনির কাছে গেল, সব কথা বলল।এবং সাজু সব শেষ করে সরে যাইতে চাইলো। রনি এসব শুনে ভেঙে পড়ল। কিন্তু হাল ছাড়লনা। সে প্রতিজ্ঞা করল যে, সে চাকরি পেয়ে সাজুর পরিবারকে বোঝাবে। কিন্তু তার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা তখনও শেষ হয়নি। পরীক্ষা, চাকরি, প্রেম—সব একসঙ্গে মিলে রনির জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলল। সে প্রতিদিন চাকরি খুঁজতে শুরু করল।
কিছুদিন পর রনি একটি ছোট চাকরি পেল—বিকাশের মার্কেটিং ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে। এই সামান্য চাকরির নিয়ে সে সাজুর মাকে বোঝাতে গেল, কিন্তুতার মা আরও কঠোরভাবে জানিয়ে দিল, “এই চাকরির কোনো ভবিষ্যত নেই। আমরা মেয়েকে তোমার হাতে দিতে পারব না।”
রনি তখনও আশার শেষ চেষ্টা করল। সে ভাবল, আরেকটু ধৈর্য ধরলে হয়তো কিছু একটা হতে পারে। কিন্তু এসবের পর সাজু নিজেও বুঝতে পারল, তাদের সম্পর্ক আর টিকবে না। সাজুর পরিবারে চাপ আসতে থাকল, আর রনির উপরেও এই সম্পর্কের বোঝা আরও ভারী হয়ে গেল। রনি সব সময়সাজুকে বলতো যাতে সহস করে তার হাত ধরে। কিন্তু এসবে কিছু হতো নাহ হতো শুধু ঝামেলা।এর মাঝে পরীক্ষা এসে গেল, এত কিছুর চাপ নিতেপারে নাই এবং রনি ব্যর্থ হলো। সে পরীক্ষায় ফেল করল, আর সাজু পাশ করে এগিয়ে গেল।
এই ঘটনার পর, সাজুর মনে আর কোনো আশা রইল না। সে বুঝতে পারল, রনির সঙ্গে থাকা তার পক্ষে আর সম্ভব নয়। সে ধীরে ধীরে রনির থেকেসরে যেতে থাকল। রনি তখনও শেষ মুহূর্তের চেষ্টা করল, সাজু পায়ে পড়া বাকি ছিল। কিন্তু সাজু আর ফিরে এলো না।সব কিছু শেষ করে রনিকেঅপরাধী করে দিলো।যদিও দোষ রনির ছিলো ওর পাদে পা দিয়ে দোষী হলো। রনি ভেঙে পড়ল। তার ভালোবাসা আর আশা একসঙ্গে ভেঙে গেল। সেএকবার বিষ খেয়ে নিজের জীবন শেষ করার চেষ্টা করল, কিন্তু বন্ধুর কারণে বেঁচে গেল।
রনি বেঁচে গেলেও, সে মানসিকভাবে মৃত হয়ে গেল। সে দিনের পর দিন নেশায় ডুবে থাকল, সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজেকে হারিয়ে ফেলল। রাতের পররাত সে সাজুর কথা ভেবে কান্নায় ভেঙে পড়ত। তার শরীর ভেঙে পড়ল, নানা রোগে আক্রান্ত হলো। ডাক্তার জানাল, তার শরীরে মরণব্যাধি বাসাবেঁধেছে। অথচ বাইরে থেকে কিছু বোঝার উপায় নেই।
এখন রনি শুধু একটি বিষয়েই ভাবত—সাজু সুখে আছে। তার জীবনের সুখই রনির জন্য শেষ শান্তি। সাজু হয়তো তার জীবনে নতুন পথে হাঁটছে, কিন্তু রনি কখনো তাকে ভুলতে পারেনি। আজও রনি প্রতি রাতে জেগে থাকে, সাজুর জন্য চোখের জল ফেলে। একসময় সে সাজুর ভাইয়ের কাছেগিয়ে সাজুকে ফিরে পেতে আকুতি করেছিল। কিন্তু তসর ভাই রনিকে তীব্রভাবে অপমান করে বের করে দিয়েছিল।
আজও রনির জীবন এক অপূর্ণ ভালোবাসার কষ্টে ভরা। তার দিনগুলো কাটে স্মৃতির ভিতরে হারিয়ে গিয়ে, আর প্রতিটা রাত শেষ হয় অশ্রুতে। তবেরনি একটাই বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকে—সাজু যদি সুখে থাকে, তাহলে তার সব কষ্ট স্বার্থক। রনি আজ জানে শুরু টা যেমন সুন্দর হয় শেষ তার চেয়েওবেশি কুতসিত। আলো একদিন পুরায় যায় পৃথিবী আন্ধার হয়। কিন্তু চাদে কি ক্ষতি হয়। রনির এখন দিন কাটছে শেষ দিনের অপেক্ষায় আর সাজুনতুন দিনের। ভালোতো দুইজন বাসলে তবে সব কষ্ট কেন একা রনি ফেলো আজও রনি এই উওর খুঁজে পায় নাহ। খুঁজে পায় কেমন আছে প্রিয়তমাসেই খবর। কেমন আছে স্বপ্নের রাজকন্যা। আজ কি তার মনে রনি নাকি নতুন কেউ। সৃষ্টিকৃতা চাইলে শেষটা অনেক সুন্দর হতো। হয়তো তাদেরমাঝে কেউ একজন চায় নি তাই সৃষ্টিকর্তা ও আর এক করে নাই। ভালো থাকুক প্রিয়তমরা বেচে থাকুক প্রেম ' মরে থাক রনিরা।
---

