সার্থক মাতৃত্ব
সার্থক মাতৃত্ব
সমীর দোকানের ঝাপটা ফেলেছিলই । এমন সময় নদীর দিক থেকে একটা হইচই কানে গেল। আরও চার পাঁচ টি লোক ওইদিকে ছুটছিল। সে ও ছুটলো অদুরবর্তি নদীর পারে যেখানে প্রচুর লোক জমা হয়ে গেলেও কেউই জলে নেমে মহিলাকে তোলার চেষ্টা করছে না। সমীর জুতো জোড়া খুলে মোবাইল টা রেখে ঝাঁপিয়ে পড়ল জলে।টেনে নিয়ে এলো মৃতপ্রায় মহিলাকে। পাড়ে তুলতে অর্ধেক জনতা হাওয়া হয়ে গেল পুলিশি ঝামেলার ভয়ে ,আর বাকিরা রইল কেউ উপদেশ দেওয়ার জন্য বা মহিলাটিকে চিনে তার কৃতকর্মের কার্যকারণ অনুসন্ধান করে রহস্য উপন্যাস রচনা হেতু ।
সমীর এই এলাকায় দোকান খুলেছে বছর পাঁচেক যাবৎ। প্রথম প্রথম সমীরকে দেখে অনেকেই কানাঘুষো টক মিষ্টি গল্প ফাঁদলেও ইদানীং ব্যস্ত জীবনের কর্মসূচিতে অন্যান্য গল্পের সংযোজন হওয়ায় সমীরের গল্প বর্তমান জনজীবনে গল্পকারদের পিছনের পাতায় চলে গেছে। ভিড়ের মধ্যে কেউ পুলিশে ফোন করে ছিলেন বোধহয়, তাই পুলিশ এসে পড়ল কিছুক্ষণের মধ্যেই।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই জ্ঞান ফিরল মহিলার। বছর পঁচিশের সম্ভ্রান্ত সুশ্রী মার্জিতা । নার্স হাসিমুখে সমীরকে বললেন নিন জ্ঞান ফিরেছে আপনার স্ত্রীর । মহিলা চমকে উঠলে সমীর চোখের ইশারায় চুপ থাকার নির্দেশ দিলো। পুলিশি ঝামেলা এড়াতে এই ব্যবস্থা বুঝতে পেরে মহিলা চুপ করে রইলেন । পরের দিন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর শুরু হল পুলিশি জেরা । সমীর নির্বিকার চিত্তে গৃহবিবাদ স্বামী-স্ত্রীর কলহ ইত্যাদি গল্প ফেঁদে মনীষাকে ছাড়িয়ে নিয়ে এলো । পথ যেখানে দ্বিধা বিভক্ত হয়েছে সেখানে এসে সমীর মনীষারর কাছে বিদায় নিয়ে যে যার পথে হাঁটা দিলো। সমীরের এরূপ নির্লিপ্ত ব্যাবহারে মনীষা আশ্চর্য হয়ে পিছু ডাকলো। শুনুন....লম্বা সুঠাম দেহের অধিকারী সমীর ফিরে তাকালো। আমার কাছে টাকা নেই বাড়ি যাওয়ার মতো, আর আমি বাড়ি যেতে চাইও না। আপনি কি আমাকে একদিনের জন্য আশ্রয় দেবেন ?
পথে যেতে যেতে সমীর জিজ্ঞেস করল আপনি গর্ভবতী অবস্থায় আত্মহত্যা করতে গেছিলেন কেন? আপনার গর্ভের সন্তানকি অবৈধ? মনীষা চোখ নামিয়ে নিল। শুষ্ক চোখের তপ্ত নিঃশ্বাসে সমীরের প্রশ্নের উত্তর পাওয়া হয়ে গেল । কপর্দকশূন্য মানসিকভাবে বিধ্বস্ত মনীষাকে সমীর নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়াই স্থির করল।
উদ্বিগ্ন চিন্তিত দুর্গাদেবী সমীরের অপেক্ষায় সকাল থেকে ঘর বার করছিলেন।এক কামরার ভারাবাড়িতে নিম্ন মধ্য বিত্ত সংসার দূর্গাদেবীর। ঘরে ঢুকে মনসাকে বসতে বলে মাকে কিছু খাবার বাড়ার নির্দেশ দিয়ে স্নান গেল সমীর। ফোনে সমস্ত ঘটনা- জানলেও মনীষাকে দুর্গা পুনরায় প্রশ্ন করলেন মনীষা দুর্ঘটনার সব কথা কারণ খুলে বলল । সমীরকে খাইয়ে দোকানে পাঠিয়ে দূর্গাদেবী, নিজের কাজে মন দিলেন।
দুপুরে মনীষার ভাত বেড়ে নিজে ভাত নিয়ে মনসার মুখোমুখি বসলেন দুর্গা দেবী ।খেতে খেতে বললেন তোমার সমস্যা তোমার বিপদ অবশ্যই তোমার কাছে বড়ো। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কোন সমস্যা নেই যার সমাধান হয়না । নিজের উপর বিশ্বাস রাখো। অজন্মা শিশুটি নির্দোষ । তুমি ওকে গর্ভে ধারণ করেছে তাই ও তোমার সন্তান কিন্তু তুমি ওর জীবন-মৃত্যুর নির্ধারক নও। তুমি ওর ' মা 'ওকে রক্ষা করা প্রতিপালিত করা তোমার করাই কর্তব্য হত্যা করা নয় । মায়ের কোনো কলঙ্ক নেই , হতেই পারে না । তোমার সমস্ত নির্মমতা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো উচিত । তোমার সন্তান তোমার পাপ নয় ,তোমার স্নেহ-মমতার জোরে আলোকবর্তিকা হয়ে উঠুক। লড়াই করো , হার মেনো না। আজ থেকে 30 বছর আগে আমি যে লড়াইটা করেছিলাম ; আজ থেকে তুমি শুরু করো সেই যুদ্ধ। আমরা আছি তোমার সাথে।
মনীষা দু চোখে প্রশ্ন নিয়ে দুর্গাদেবীর দিকে তাকাল। দুর্গাদেবী মনীষাকে উজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে নিজের জীবনের অসাধারণ লড়াইয়ের গল্প শুরু করলেন।
সমীর আমার তৃতীয় সন্তান জন্মানোর সাথে সাথে শ্বাশুড়ীর ইচ্ছে ছিল সমীর কে মেরে ফেলার। ও নিজের বাবার দয়ায় সে যাত্রায় বেঁচে গেলেও পরবর্তীকালে ওর বাবা ই হয়ে দাঁড়ায় ওর প্রধান শত্রু। বিনা দোষে ও ভাই বোন ঠাকুমার কাছে প্রতারিত হত । ওর যখন বছর তিনেক বয়স ও তখন স্বাভাবিক শিশুদের থেকে বেশ লম্বা হয়ে ওঠে। আর ধীরে ধীরে ওর হিংস্র প্রবৃত্তি প্রকাশ পায় । বাড়িতে, পারায় পরিচিত মহলে ঐ তিন চার বছরের শিশুটির প্রতি পাল্লা দিয়ে চলছিল অপমানজনক কথাবার্তা এবং যৌননিগ্রহ। আমি কিছু অভিযোগ করলে শুনতে হতো ওই রকম অস্বাভাবিক শিশুর সাথে সবাই ইয়ার্কি মারবে এটাই স্বাভাবিক । আমাদের অনেক আগেই ওকে ওইসব জায়গায় রেখে আসা উচিত ছিল।সর্বক্ষণ পোষাকে ঢেকে রাখা সত্ত্বেও মিলতো না রেহাই। সমবয়সী বাচ্চাদের কথা তো ছেড়েই দাও বয়োজ্যেষ্ঠরাও ওর গায়ের পোশাক টেনে খুলে ওর খুঁত নিয়ে মস্করা করতে পিছপা হতো না। ওর সাথে আমিও হলাম কলঙ্কিনী । সমীরের বাবার সাথে সাাথে আমার নিজের গর্ভের সন্তান রাও মানতে চাইতোনা যে সমীর ওর বাবারই ঔরসজাত সন্তান । মানসিক অত্যাচারের সাথে শারীরিক নিগ্রহও কম জুটতো না আমাদের। এভাবেই একদিন সমীরের সামনেই ওর বাবা আমার গায়ে হাত তোলে, তখন ওর বছর সাতেক বয়স। সামনে ছাতাটা পেয়ে সেটা দিয়ে প্রথমে বাবাকে তার পরে দাদাকে প্রচন্ড মারে । সাত বছরের ছেলের সে কি বীভৎস রূপ । পারার লোক জুটে যায় ওর ঠাকুমার তৎপরতায়। মেরেই ফেলতো ওরা পিটিয়ে সেদিন আমার এই ছেলেটাকে। কোনওরকমে ওদের হাত থেকে বাঁচিয়ে ছেলের হাত ধরে ছুটতে ছুটতে এসে উঠি ট্রেনে। চলে যেতে হবে ওখান থেকে দূর বহুদূর। তারপর দুজনে মিলে চলে আসি এই গ্রামে। আমি অল্প শিক্ষিত গ্রাম্য গৃহবধূ। কাজ কি কেউ দেয়? গায়ের দু একটা যা গয়না ছিল তাই বিক্রি করে একটা ভারা ঘর যোগার করি। বহু কষ্টে ব্যাগের কারখানায় কর্মচারীর কাজ জুটিয়ে নি। আর প্রাণপণ চেষ্টা করি সমীরকে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার । কিন্তু বিধি বাম। সমীরকে শিক্ষিত করবার সমস্ত চেষ্টা আমার ব্যর্থ হয়। সমীর অত্যন্ত হীন বুদ্ধি । কিছুতেই পড়া মনে রাখতে পারত না । এখানে কিন্তু সমীরের সম্বন্ধে সন্দেহ সমালোচনার কথা পিছনে বললেও ,মুখে ভদ্র আচরণ করতো লোকেরা । ধীরে ধীরে সমীর শান্ত ভদ্র হয়ে গেল । আমার শিক্ষায় ও হয়ে উঠল একটি সামাজিক সভ্য ভদ্র ছেলে। না হতে পারুক উচ্চশিক্ষিত। কিন্তু মানবিক গুণে ভরপুর মানুষ তো হয়েছে।
তারপরের গল্প আমরা আর জানিনা। শুধু কিছুদিন পরে একদিন দেখলাম একটি সুখী দাম্পত্য। যেখানে একটি 7 বছরের শিশু ক্লাসে ফার্স্ট প্রাইজ নিয়ে বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লে , ঠাকুমা বলল কই দেখি তো দাদু কোন বিষয়ে কত নম্বর পেয়েছ দেখি ...
আর মনীষা কল কল করে চা পকোড়ি মিষ্টি নিয়ে এসে সবাইকে বলে নাও নাও সবাই খেয়ে নাও। আজ আমার বাবু ক্লাসে প্রথম হয়েছে বলে আমি নিজে হাতে মিষ্টি বানিয়েছি।সবাই খেয়ে বলতো কেমন হয়েছে ?সমীর হই হই করে উঠলো"চল বেটা" তোর মায়ের হাতের মিষ্টি. ....
"টুট পড়ো" । দূর্গা দেবী বললেন চাকরি বাকরি সামলে সংসারের খুটিনাটি করে এসব আবার বানাও কখন? ধন্য তুমি...
ভালোবাসার সঠিক শিক্ষা, উপযুক্ত পরিবেশ ,হাজার প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে একটা মানুষকে মানুষের মতো করে তুলতে সাহায্য করে । ভেদাভেদ ; লিঙ্গ জাতি ভিত্তিক নয়; গুন ভিত্তিক হোক! আমরা যেন
ঘৃণা , অসুস্থ অস্বাভাবিক শারীরিক গঠন কে নয় অসুস্থ মানসিকতা কে করি।
দিনে দিনে মাস যায়,বছর ঘোরে। মনীষা সমীরের ছেলে সার্থক, আজকাল প্রাইমারী স্কুলের গন্ডি ছাড়িয়ে হাই স্কুলে উঠেছে।শক্ত সামর্থ্য দূর্গার্দেবী বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন।মনীষার রেলের চাকরীতে পদোন্নতি হয়েছে সমীরের দোকানও রমরমিয়ে চলছে। জীবন চলেছে ছন্দে। কিন্তু ইদানীং সার্থকের স্বভাবে আমূল পরিবর্তন মনীষার চোখ এড়ায়নি। শাশুড়ির সাথে এ ব্যাপারে আলোচনাও হয়েছে। উনি বলেছেন এসব বয়ঃসন্ধির সমস্যা । এ নিয়ে বেশি বকাঝকা কোরো না । সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু অর্ধ-বার্ষিকীর রেজাল্ট দেখে তো মনীষার মাথায় হাত । একি!যে ছেলে ক্লাস এইট পর্যন্ত 90 প্রতিশত নম্বর নিয়ে প্রথম হয়ে ক্লাসে উঠেছে এতদিন,সে কিনা দু বিষয়ে ফেল? তাও আবার অংকে? সমীর বাড়ি ফিরেই ছেলেকে বকাবকি শুরু করল । এই মারে কি সেই মারে ! চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ঘরে ঢুকে দুর্গাদেবী নাতিকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন । সমীরের রাগ মনীষা সামাল দিল।
সমীর দোকানে চলে যেতেই দুর্গাদেবী মনীষাকে বললেন ছেলেকে খাইয়ে দাও । ও ঘুমিয়ে পড়লে আমার কাছে এসো জরুরী কথা আছে । সার্থক দুপুরের খাওয়া খেয়ে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা দিল। রেজাল্ট খারাপ হওয়া নিয়ে যেন মাত্রাতিরিক্ত উদাসীন । মনীষা চিন্তিত মুখে বলল দেখেছ; কেমন বেয়ারা হয়েছে ছেলেটা ? দুর্গাদেবী মুখেও চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। মুখে বললেন ও এখন বাল্যকাল থেকে কৈশোরে পা দিচ্ছে এই বয়সের বাচ্চাদের বিশাল মানসিক পরিবর্তন হয়। স্বাভাবিক ঘরে প্রতিপালিত হওয়া শিশুদের নিয়েও মা বাবারা এই বয়সে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয় । আর সার্থকের জন্য তো সমাজের কাছে গল্প আছেই । আমাদের এখনই ওকে ওর জন্ম বৃত্তান্ত ইত্যাদি জানিয়ে দেওয়া উচিত। মনীষা উৎকন্ঠিত হয়ে উঠল। কিন্তু এসব লজ্জাকর কথা এই বয়সে....
দুর্গাদেবী একটু হেসে বললেন শরীরের বয়স দিয়ে মনের বয়স মাপা যায়না। পাঁচ লোকের বিভিন্ন রকম গল্প শুনে কল্পনার পাঁকে ডুবে যাওয়ার আগে নির্মম সত্য সম্বন্ধে অবগত হয়ে সঠিক পথে চলার জন্য আলো দেখানোই মঙ্গল। তারপর সময় বলবান।
রাতে খাওয়ার টেবিলে দুর্গাদেবী গল্পের ছলে শুরু করলেন সমীরের শৈশবের কথা । তাতে যোগ দিলো সমীরও। সার্থক বেশ কিছুক্ষণ পরে মুখ খুলল ঠাম্মা আমাকে স্কুলের ছেলেরা বলে তোর বাবা খোঁজা ,ছক্কা তুই অবৈধ সন্তান । তোর মা কুলটা!!!!এসব কি সত্যি ঠাম্মা? স্তব্ধ হয়ে গেল সমীর আর মনীষা ।
দুর্গাদেবী মুচকি হাসলেন ওদের কথাগুলো বিশেষণ । বিশেষ্য কে ঠিক ভাবে না জেনে বিশেষণের প্রয়োগ করে ওরা। তুমি মূল বিষয়টি জানো, তারপর বিশেষণ অলংকার প্রয়োগ করার স্বাধীনতা তোমার। তাহলে বলি শোনো -
তোমার বাবা একজন তৃতীয় লিঙ্গের লোক ; অর্থাৎ পুরুষ বা নারী লিঙ্গের ব্যতিক্রমী দশা। এটি শরীরের কোষের ক্রোমোজোমের নির্ধারিত সংখার (৪৬)থেকে বেশি বা কম হলে হয়। সমীর একজন মেল এক্স এক্স ওয়াই হিজড়া এ ধরনের মানুষকে স্বাভাবিকভাবে পুরুষ মনে হলেও লৈঙ্গিক ত্রুটির কারণে ওরা পুরুষ নয় । তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের 6 টি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রত্যেক শ্রেণীর হিজড়ারা ভিন্ন ভিন্ন রকমের ত্রুটি নিয়ে জন্মায় এবং এদের বর্হিলক্ষণও বিভিন্ন হয় ।যেমন তোমার বাবার ক্ষেত্রে ওর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং শারীরিক শক্তি, অল্প বুদ্ধি এবং অপরিমিত রাগ। অসন্তুলিত হরমোনের কারণে এদের চারিত্রিক বিকাশ ব্যাহত হয় । সেই সাথে সামাজিক অবহেলা তাদের সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় । আর অমানুষে পরিণত করে। সঠিক শিক্ষা , কিছু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আর যোগার দ্বারা এদেরকে সমাজের মূল স্রোতে রেখে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন-যাপনে সাহায্য করা যায়। আমি পেরেছি। শারীরিক ত্রুটির ঊর্ধ্বে উঠে আজ সমীর সম্পূর্ণ মানুষ। যে তোমার মাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাচিয়েঁছে এবং তোমাকে একটি সুস্থ স্বাভাবিক জীবন দিয়েছে। সামর্থ্য অবাক হয়ে বলল মানে?
এবার মনীষা মুখ খুলল। আমি ছিলাম ভট্টচার্য ব্রাহ্মণের মেয়ে। আমার বাবা বাড়ি বাড়ি আর মন্দিরে পুজো করে আমাদের সংসার চালাতেন। আমাদের সংসার অর্থাৎ মা-বাবা ঠাকুমা আর আমাদের দু বোন। আমি ছিলাম বড় । মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করে বাড়ি থেকে অনেক দূরে এক কলেজে সাইন্স নিয়ে ভর্তি হই ।
বাল্যকালে পাড়ায় অনেক ছেলেমেয়েরাই একসাথে খেলাধুলা করে বড় হয়েছি। কিন্তু বড় হতে হতে তারা সবাই মানুষের মত মানুষ হলো না । তাদের মধ্যে বিশুদা বিশ্বনাথ চৌধুরী ছিল একজন। অল্প বয়সেই নেশা ভাং রাজনৈতিক পার্টির হয়ে অনেক অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল । সবাই সামনে বিশুদা কে তোয়াজ করে চললেও পেছনে থুথু দিতো। তো সেই বিশুদার নজর পড়লো আমার ওপর । প্রথম প্রথম কথা বলার চেষ্টা করত সামনাসামনি । পরে কোথা থেকে ফোন নম্বর জোগাড় করে ফোন করে উত্যক্ত করতো। আমি বাড়িতে একথা জানালে মা-বাবার কাছে, শুনতে হতো এড়িয়ে যাও । একদিন ঝড় বাদলের বিকেলে কলেজ থেকে ফেরার পথে বিশু একটা নির্মীয়মান বহুতল বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আমার সর্বনাশ করে। পরদিন সকালে গাড়ি করে বাড়ি দিয়ে যায় বিশুদা ই। রাতভর বাড়ী না এসে সকালে বিশুদার গাড়ি থেকে নামতে দেখে, পারার লোকে দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে নেয় । সারা দুনিয়া এমনকি নিজের মা-বাবাকে পর্যন্ত বিশ্বাস করাতে পারিনি যে আমি নির্দোষ। অনেক অনুনয় বিনয় করা সত্বেও লোকলজ্জার ভয়ে মা-বাবা আমাকে ডাক্তারের কাছে পর্যন্ত নিয়ে যায়নি। এভাবে কেটে যায় দুই মাস। বিশুদা একদিন লোক মারফৎ বিবাহের প্রস্তাব পাঠান । আমি কলঙ্কিনী, আমার পাপস্খলন না হলেও বিশুদা মহান হয়ে যায়। ক্রোধে ঘৃনায় আমার সারা শরীর জ্বলে ওঠে। আমি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করি । সমস্ত গ্রাম ছিঃছিঃ করে আমার উপর । এমনকি আমার মা-বাবাও বিশুদার সাথে বিয়ে দিতে রাজি করানোর জন্য উঠেপড়ে লাগে। কিন্তু আমি আমার প্রানের চেয়েও দামী আাত্মসন্মানকে রক্ষা করার অন্য কোনো উপায়ান্তর না দেখে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে নদীতে ঝাঁপ দেই। প্রচুর পুরুষ পাড়ে দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখছিল সেদিন। কিন্তু যাকে সমাজ পুরুষ বলে না সেই আমাকে বাঁচায় এবং শুধু বাঁচায় না ; আমাকে নবজীবন দেয়। দু'ফোটা তপ্ত অশ্রু গাল বেয়ে নেমে আসে মনীষার। সার্থক মায়ের চোখের জল মুছিয়ে পায়ে হাত দিয়ে বলে আমাকে আমার আচরণের জন্য ক্ষমা করে দাও মা। আমার বাল্যকাল অনেক স্বাভাবিক ছেলে মেয়েদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ । সমীর ছেলেকে বুকে টেনে নিল। দূর্গাদেবীর মুখে স্মিত হাসি চোখে জল। সার্থকের মধ্যে দিয়ে সার্থক তাঁর মাতৃত্ব ।
