Mousumi Chatterjee

Inspirational


4.5  

Mousumi Chatterjee

Inspirational


শিখরের কাছাকাছি

শিখরের কাছাকাছি

5 mins 558 5 mins 558

 মুচুছিশ পাহাড়চূড়ার শেষ কয়েক ফুট নীচে স্লিপিং ব্যাগে রাতটুকু কাটার অপেক্ষায় আছে এঞ্জেলা৷ সে জানে না তারপর কি আছে তার কপালে৷ শুধু ভালটুকুর জন্য আশা করতে পারে৷ 

   আজ অনেকদিন পর তার মনে পড়েছিল ভুলে যেতে বসা গ্রামের বাড়ি, মায়ের আবছা হওয়া মুখ, বাবার রাগী চিৎকার —সব—সব৷

   দুটো মেয়েরও পর যখন আবার অঞ্জলি জন্মালো তখন বাপ ঠাকুরদার না কি মায়ের মুখ আর দেখতে ইচ্ছে যায় নি৷ দু মাস কেটে গেলেও ছোট্ট অঞ্জলিকে যখন তারা মামাবাড়ি থেকে নিতে এল না তখন মা দিদিদের জন্য কাঁদতে থাকায় ও আরও নানা আশঙ্কায় দিন মজুর মামা কাজ কামাই করে চার গ্রাম পেড়িয়ে ওদের গ্রামে মা মেয়েকে রেখে আসে ঠাকুরদার হাত পায়ে ধরে৷

   জ্ঞান হওয়া ইস্তক এ আক্ষেপের কথা বহুবার মায়ের কাছে শুনেছে৷ 

   মা মীন ধরতো নদীতে—খালে—খাঁড়িতে৷ ঠাকুরদা সে বার দক্ষিণরায়ের কবল থেকে ফেরা ইস্তক ঘর বসা হয়ে গেছিল৷ বাবা মধু ভাঙার কাজ ছেড়ে একদিন বেশি রোজগারের আশায় পশ্চিমের দেশে পাড়ি দিলে এতগুলো পেট সামলাতে মা হিমসিম৷ সংসার সামলাতো ততটাও বড় না হওয়া বড়দি৷ আর ছোড়দিকে মা অনেকদিন সাথে করে নিয়ে যেত৷

   অভাবের সংসারে দুধটুকুও জোটে না৷ খিদের সময় খাবার চাইলে রেগেমেগে দিদিও এক ঘা দিয়ে দেয়৷ তারও যে খিদে পায়! ঠাকুরদাকে অঞ্জলিকে মেয়ে হবার অপরাধেই উঠতে বসতে খোঁটা দেয়৷ পান থেকে চুন খসলেই হল৷

   কিন্তু সে দিনের ঘটনাটা আজ এই একলা অজানায়, অনির্দিষ্টের আশে বসে থাকা এঞ্জেলার স্পষ্ট ছায়াছবির মত চোখের সামনে ভেসে উঠলো৷ 

   বড়দির ক'দিন ধরেই জ্বর ছিল৷ ঘুসঘুসে জ্বর৷ সারা শরীরে ব্যথা৷ অঞ্জলি নরম অপটু হাতে মাথা টিপে দিচ্ছিল৷ বৃষ্টি হয়েছিল ক'দিন ধরেই৷ কাঠকুটো থেকে ভেজা সেঁতানো গন্ধ আসছিল৷ 

   ঠাকুরদা ঘরে উঁকি দিয়ে বলেছিল —"ভাত দে বড়খুকি৷ খিদে পেয়েছে৷"

   বড়দি বলেছিল কাতরে —"চালভাজা দুটো খাও না দাদু৷ এখনও ভাত হয়নি৷"

   কর্কশ বাজে গলায় গালমন্দ করে ঠাকুরদা ধুপধাপ আওয়াজ করে সরে গেছিল কোথাও৷ 

   বড়দি কোন ক্রমে উনুনে কাঠপাতার আঁচ দিয়ে অঞ্জলিকে কেমন করে ভাত বসাতে হবে বলেই শুয়ে পড়ল৷ ও সত্যিই পারছিল না৷ অঞ্জলি অপটু হাতে ভাত, কচুসেদ্ধ বসিয়ে ছোট্ট দুটো ছাগলছানাকে তাড়াতে তাড়াতে বাইরে নিয়ে গিয়ে ছোটাছুটি শুরু করে ভাতের কথা ভুলেই গেছিল৷ 

   শুয়ে শুয়ে গন্ধ পেয়ে উঠে বড়দি যখন দাওয়ায় এল তখন ভাত কালো হয়ে গেছে৷ পোড়া গন্ধে হাজির হয়ে গেছিল বুড়োও৷ তারপর ঘটনা আঁচ করে ফলসা গাছের তলা থেকে ওকে টেনে এনে কাঁধ থেকে ছাগলছানাকে টেনে ফেলে দিয়ে খেজুরের বাখড়া দিয়ে শুরু করেছিল মার৷

বেলা শেষে ঘরে ফিরে রক্তাক্ত অঞ্জলিকে বুকে জড়িয়ে মা প্রথমে কেঁদেছিল খুব৷ দুই দিদিও৷ পেটের খিদে কান্নাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল সবার৷ কৌটো থেকে মেয়েদের তিলের নাড়ু খেতে দিয়ে মা আবার অঞ্জলিকে কোলে নিয়ে বেড়িয়েছিল৷ ভেজা বুনো পথ ভেঙে এক সময় এসে পৌঁছেছিল নদীর গা ঘেঁসে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো গীর্জায়৷

   ফাদার খুব ব্যস্ত ছিলেন মনে হয় নানা অচেনা মানুষদের নিয়ে৷ আসলে অনেক বিদেশী সেদিন প্রাচীন গীর্জাটা দেখতে এসেছিলেন৷ তবু অঞ্জলি আর চন্দ্রমণিকে দেখে ফাদার এগিয়ে এলেন৷ মায়ের যেমন খুব ভরসা ছিল ফাদারের ওপর বয়স্ক ফাদারও তেমনি মাকে খুব স্নেহ করতেন৷ গাঁ ঘরের লোকের বাড়িতে ওষুধপত্রের বালাই না থাকলেও ফাদারের কাছে থাকে৷ ক্ষত পরিস্কার করে ওষুধ দিয়ে দিচ্ছিলেন ফাদার৷ তখনই স্যামুয়েল হপম্যানের চোখ পড়ে ছোট মেয়েটির ওপর৷ স্যামুয়েল একটা পর্যটক দলের নেতা হিসাবে

এসেছিল অষ্ট্রেলিয়া থেকে৷ 

   ফাদার চিন্তামণির কাছ থেকে খবর নিচ্ছিলেন ওর স্বামী টাকা পাঠাচ্ছে কি না, মীন ধরে রোজগার কেমন চলছে এসব৷ অঞ্জলির অবস্হা দেখে স্যামুয়েল ফাদারের কাছে জানতে চাইলে ফাদার ওদের দুঃখের কথা বিস্তারিত জানালেন৷ "এই অঞ্চলের গরীব মানুষগুলোর অবস্হা এরকমই৷ শিক্ষা নেই, ওষুধ নেই, আর কিছু না পাওয়ার জন্য রাগ দেখাবার জায়গা ঘরের মেয়েরা৷"

   স্যামুয়েল ঘোমটা দিয়ে সঙ্কুচিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের হাতদুটো খপ করে ধরে ফেলে অজানা ভাষায় কিছু বলেছিল৷ মায়ের অবাক ভাব কাটিয়ে ফাদার বুঝিয়ে বলেছিলেন, "তোমার মেয়েকে ও নিয়ে যেতে চাইছে ওর দেশে৷ ও মানুষ করবে৷ দেবে ওকে?" 

   তা কি হয়? মা ফিরে এসেছিল অঞ্জলিকে নিয়ে৷ কিন্তু তারপর মাদুরে শুয়ে সারারাত ভেবে ছিল মেয়েকে জড়িয়ে৷ তারপর আঁধার থাকতে থাকতে কেউ চোখ খোলার আগে আবার ছুটে গেল গীর্জায় সব ভয় উপেক্ষা করে৷ মায়ের উদ্বেগটুকু এখনও কানে বাজে এঞ্জেলার—"মেয়েটার কোনো ক্ষতি হবে না তো ফাদার?"

    তারপর নানা ঝক্কির পর স্যামুয়েলের দলের সাথে এ দেশ ও দেশ ঘুরে একদিন যে বাড়িটায় পৌঁছেছিল অঞ্জলি, স্যামুয়েল বলেছিল ওটা না কি ওর নিজেরই বাড়ি৷ ততদিনে ওদের ভাষাটাও অনেকটা বোধগম্য হয়ে গেছে সবার এঞ্জেলা হয়ে যাওয়া অঞ্জলির৷ ওর কান্না তো থেমে ছিল কিন্তু মন জুড়ে ছিল অভিমান৷ মায়ের ওপর, ঠাকুরদার ওপর, দায়িত্বহীন বাবার ওপর আর বোনেদের জন্য ছিল সাথী হারানোর বেদনা৷ সব ধীরে ধীরে প্রশমিত হল স্যামুয়েল আর মাইকার ভালবাসায়৷

    স্যামুয়েলের খামখেয়ালী বোন মাইকাকে তার খুব পছন্দ হল৷ মাইকা তাকে আর এক নেশায় বেঁধে ফেলল৷ পাহাড়ে চড়ার নেশা৷ পড়াশুনোর সাথে সাথে মাইকার উৎসাহে এঞ্জেলা ছোটখাট পাহাড় সব চড়ে ফেলল৷ মেয়ে হয়ে জন্মানোর জন্য হেনস্হার কথা মনে ভেসে উঠলেই, কোনো বাধাই ওর কাছে বাধা মনে হত না৷

   অবশেষে এল এই সুযোগটা৷ পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু শৃঙ্গকে অনেকবার অনেক বীর জয় করে ফেলেছে৷ কিন্তু এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কিছু না চড়া পাহাড়চূড়া৷ তারই একটি হল মুচু ছিশ৷ কারাকোরাম পর্বতমালায়৷ বড় দুর্গম রাস্তা৷ বড় কঠিন লড়াই৷ এর আগের সমস্ত অভিযানই ব্যর্থ হয়েছে৷ স্যামুয়েল আর মাইকা জানে এঞ্জেলা পিছতে জানে না৷ কিন্তু এমন দুর্গমে ওকে ছাড়তে মন চাইছিল না৷ কিন্তু অভিযাত্রীদল ওকে ছাড়তে চায় না৷ ওর জেদ আর মনোবল অভিযাত্রীরা সম্মান করে৷

   অবশেষে এঞ্জেলা আজ এই শৃঙ্গের প্রায় কাছাকাছি৷ খারাপ আবহাওয়া আর দুর্গম রাস্তার কারণে দলের বাকিরা হাল ছেড়ে বসে আছে ক্যাম্পের আশ্রয়ে৷—বেশ কয়েক শ' ফুট নীচে৷ এঞ্জেলা হাল ছাড়ে নি৷ মনে মনে প্রতিজ্ঞা আরও দৃঢ় করেছে৷ ফ্রস্ট বাইট আর অক্সিজেনর অপ্রতুলতার সাথে লড়ে এখনও জীবিত—এখনও আশান্বিত৷ 

    যদি শিখরে পৌঁছতে পারে তবে সে খুশি হবে শুধু এই কথা ভেবে যে রেকর্ড বইয়ে প্রথম হিসাবে লেখা থাকবে একটা মেয়ের নাম৷ তারপর শতবারও সে শৃঙ্গে যদি মানুষের পদচিহ্ন পড়ে তবে বদলাবে না সেটা৷ এটা একটা প্রমাণ যে মেয়েরা ফেলনা নয়, মেয়ে বলেই কেউ বাতিল হয়ে যেতে পারে না৷ 

   আধো ঘুমে আধো জাগরণে আধো স্বপ্নে শেষ হওয়া রাতের পর এঞ্জেলা ওরফে অঞ্জলির চোখে আজ নতুন দিনের আলো খেলছে৷ ধীরে ধীরে সে উঠে চলেছে আরও ওপরে৷

   আর লড়াইএর প্রতিটা মুহূর্তে মন বলেছে—"যদি শিখর ছুঁতে পারি—একবার —বহু বছর পর একটিবার ফিরব গ্রামের বাড়ির উঠোনটাতে, শুধু প্রমাণ দেখাতে —আমার মেয়ে জন্মটা ব্যর্থ হয়ে যায়নি৷"


Rate this content
Log in