STORYMIRROR

মোঃ সবুর মিয়া

Tragedy

4  

মোঃ সবুর মিয়া

Tragedy

এক বৃদ্ধা

এক বৃদ্ধা

6 mins
2

এক বৃদ্ধা 

মোঃ সবুর মিয়া


এই ছুটকা তুমি কি বলতে পারো শ্যাম বাবুদের বাড়ি কোথায়। সেই কবে যে এসেছি এই গাঁয়ে আর মনে নেই। কহিল বুড়ি - এই অনেক বছরের আগের কথা৷ আগে গাঁয়ে এত পথঘাট ছিল না। কাঁচা রাস্তা কৃষকের গরুর গাড়ি করে পাড় হতে হয়। তখন তো জমিতে হাল চাষ গরু আর লাঙ্গল দিয়েই করা হতো। রৌদ্রের মধ্যে জমির আইলে বসে খাওয়ার মজাটাই ভিন্ন। সেই কথা মনে হলেই জিভে পানি এসে পড়ে। 


আচ্ছা বাছা এবার বলতো আমায় শ্যাম বাবুদের বাড়ি কোন দিকে। 

কিশোর বয়সি ছেলে। বয়স ১৫ কিংবা ১৬ হবে। বৃদ্ধাকে দেখে তার মনে মায়া জাগলো৷ বৃদ্ধার চেহারা জীর্ণশীর্ণ৷ পড়নের কাপড়টি দেখে মনে হলো অনেকদিন ধরে গোসল করে না৷ বৃদ্ধার গায়ের চামড়া লুস হয়ে গেছে৷ 

ছেলেটি অনুমান করেছে শ্যাম বাবু অনেক প্রভাবশালী৷ উনার কাছে কোন সাহায্যের জন্য এসেছে এই বৃদ্ধা৷ 


কিশোর ছেলেটি কহিল-  ও ঠাকুরমা আপনার চেহারা এত মলিন কেন?  আপনার ছেলে মেয়ে কেউ নাই?  আর শ্যামবাবুর কাছেই কি কাজে যাবেন?  


বৃদ্ধা মহিলা এসব প্রশ্ন শুনে একটু চুপ হয়ে গেল।  তাহার আঁখি বেয়ে অশ্রু ঝড়ছে৷ কান্না মুখে কহিল শুন হে পুত্রা আমারও আছে দুই ছেলে, এক মেয়ে৷  তারা অনেক ভালো আছে। কিন্তু জন্মদাত্রী মায়ের মুখে দু'মুটো অন্ন দিতেই বউয়ের সাথে  ঝগড়া৷ মা হয়ে ছেলের সংসারে ঝগড়া দেখার শক্তি ছিল না৷ 


আমার মনে পড়ে সেই দিনগুলির কথা - এক রাতে আমাদের গাঁয়ে প্রচন্ড ঝড় হয়, ঝড়ের মাত্রা এতই বেশি ছিল মনের মাঝে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়৷ তখন আমার দুই ছেলেকে দুই কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমাদের ছনের ঘরে আর আমার স্বামী বাঁশ দিয়ে ছাউনির ঠেলা দিয়ে রাখছে৷ আমার এই দুই ছেলে বিদ্যুৎ চমকালেই চিৎকার করে ওঠে৷ আমি দুজনকে বুকে আগলে রাখি৷ সারারাত বৃষ্টি - একটুও ঘুম নেই চোখে৷ তবুও ছেলেদের বুকে নিয়েই দাঁড়িয়ে ছিলাম৷ 


কিশোর ছেলেটির চোখ দিয়ে পানি ঝরছে বৃদ্ধার কথা শুনে৷ 

এবার ছেলেটি কহিল - আপন সুত বাহির করে জন্মদাত্রীকে ৷ কিবা তুমি চুপ রয়েছো ও আমার প্রভু৷ যাহার অন্ন মাতার জন্য নেই৷ তাহার ঘরে অন্ন কেন আসে৷ এই বৃদ্ধার ম্লান চেহারায় কি আকুতি, আর্তনাদ, অসহায়ত্ব পড়ে না! 


এবার বৃদ্ধা কিশোর ছেলেটির সাথে শ্যাম বাবুর বাড়ির দিকে রওনা হল৷ 

প্রায় একঘন্টা হাঁটলো কোন গাড়ি নেই,  গ্রামের রাস্তায় গাড়ি না আসারই কথা৷ এক পথিক মাথায় করে কিছু আনছে বোঝা যাচ্ছে৷ শিশুর ছেলেটি পথিক কে ডাক দিল - ও বাবুজি মাথায় করে কি নিচ্ছেন ? 

পথিক কহিল- পাকা আম গঞ্জে যাবো বিক্রির জন্যে৷ কিশোর কহিল - এক ঘন্টা হেঁটে এসেছি এই বৃদ্ধাকে নিয়ে শ্যাম বাবুর বাড়ি যাবো বলে৷ ভীষণ তৃষ্ণা আর খিদা লেগেছে আমাদের কিছু আম দেবে কি ! 


পথিক বৃদ্ধার মলিন মুখ দেখে আর না করতে পারেনি৷ দুইটা আম দিয়ে চলে গেল৷ আম দু'টো তারা আবার রওনা হলো৷ বিকেল হয়ে গেছে শ্যাম বাবুর বাড়ি আসতে৷ গিয়ে দেখে শ্যাম বাবু বাগানে বসে আছে একটি কদম গাছের নিচে৷ বিকেলে  বাগানের সৌন্দর্য যেন অনেকটা বৃদ্ধি পেল৷ স্নিগ্ধ বাতাসে শ্যাম বাবু ঘুমের দেশে হারিয়ে গেল৷ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর উনার ঘুম ভাঙ্গে৷ শ্যাম বাবু বৃদ্ধাকে দেখেই চিনে ফেলে৷ 


"এক সন্ধ্যায় শ্যামবাবু গঞ্জ থেকে বাড়ি ফেরার সময় মধ্য রাস্তায় ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে৷ তখনই এই বৃদ্ধা উনাকে দেখতে পেরে নিজ কুঠিরে নিয়ে যাই এবং সারারাত সেবা যত্নে উনাকে সুস্থ করে তুলে৷ তখনই শ্যামবাবু এই বৃদ্ধাকে বলে আসে যখনি প্রয়োজন হবে আমার কাছে চলে আসবেন৷ "

শ্যাম বাবু বৃদ্ধাকে বসতে দিলেন এবং অনেক যত্ন করলেন৷ 


জীর্ণশীর্ণ পড়নের কাপড়৷ ম্লান চেহারায় করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বৃদ্ধা৷ মাথার চুল গুলোও জট বেঁধে গেছে৷ শরীরের চামড়া লুস হয়ে গেছে৷ দেখে মনে হচ্ছে অনেকদিন যাবৎ খাওয়া হয় না৷ এত অপলক দৃষ্টিতে দেখিয়ে শ্যাম বাবুর মনটা পুষ্পের অভিরূপ কোমল হয়ে যায়৷ বৃদ্ধা কে অনেক যত্ন নিচ্ছে এবং তার মনের শতশত ব্যথা শোনার জন্য অধিক আগ্রহে বসে আছে শ্যামবাবু ৷ 


বৃদ্ধা কান্না স্বরে কহিল - যেথায় আপন সুত ঠেলে দেয় পথে, সেথায় আর কি প্রকাশ করিব৷ যে অন্ন মাতার নহে তা কিবা তাহার সহে৷ খোদার দরবারে বৃদ্ধার অন্ন কেনো নহে? 


কত গেলুম দোয়ারে দোয়ারে,  মসজিদ, মন্দির ও গীর্জাতে৷ সবে যে দিলো ঠেলে। এই করুন চাহনি তাহাদের মনে কি ছুঁইতে নাহি পারে ! যারা মানব মন বুঝিতে অক্ষম তাহারা কিবা হয় ধর্মশালার রক্ষক৷ সদা তিরস্কার জানাই তাহাদের বিবেকের ঘাটে৷ 


বৃদ্ধার মনের করুন কাহিনী শ্যাম বাবুর নয়নে অশ্রু আনিতে সক্ষম৷ 

সেম বাবু কহিল আমি নয় ধর্মশালার রক্ষক। তব মানবের কথা মোর হৃদয়ে আঘাত করেছে যে৷ 

জননী হারা কতই না বেদনার, যাহার আছে ঘরে মা তাহারা কিবা বুঝিবে৷ আপন ঘরে মা থাকাই যে জান্নাতের বাগান সামনে থাকা সমান উপমা৷ যদি দু'মুঠো ভাত মায়ের অধিকার নাহি থাকে, তব কেন আপন সুত পেট ভরে আহার ! 


বৃদ্ধার সাথে শ্যাম বাবু ও কিশোরের কথোপকথন হওয়ার মধ্যেই হাসিম মিয়া হাজির হয় নদীর মাছ নিয়ে৷ হাসিম মিয়া মাছ বিক্রি করে সংসার চালায়৷ উনি কোন ভাবে পরিবার এর ভরণপোষণ করাতে সক্ষম৷ তবুও তাহার মা ওদের সাথেই থাকে ৷ নিজে শত কষ্ট করে হলেও মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে৷ 

এদিকে বৃদ্ধার আপন দুই তনয় স্বচ্ছল হয়েও তাহাদের ঘরে মায়ের জন্য খাবার নেই৷ 

বৃদ্ধার জীবনের করুন কাহিনী হাসিম মিয়া শুনে কহিল- যে ঘরে মায়ের ভাত নেই, সে ঘরে তালা  দাও প্রভু ৷ অমন সন্তান আর কারো ঘরে না যেনো আসে৷ 


গোধূলি লগ্ন ঘনিয়ে এসেছে৷ হাসিম মিয়া এবং কিশোর ছেলেটি বিদায় নিল৷ বৃদ্ধা করুন চাহনিতে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে৷ আসলে পর মানুষের মন কাঁদে বৃদ্ধাকে দেখে কিন্তু আপন সুত ঠেলে দেয় ঘর থেকে৷ 


চারিদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে৷ শ্যাম বাবুর মেয়ে পিংকী কিশোর পেরিয়ে ওঠেছে ৷ দেখতে ভারী মিষ্টি৷ চোখ সরানো যায় না৷ শুধু রূপেই নহে গুণেও তাহার সুনাম আছে বটে ৷ বৃদ্ধাকে দেখে পিংকী নিজেই এগিয়ে আসে এবং নানা রকমের গল্প গুজব করে৷ এত অল্প সময়ে শ্যাম বাবুর পরিবার বৃদ্ধাকে আপন করে নেবে ভাবতেই পারেনি৷ পিংকীর সাথে বৃদ্ধা প্রতিদিন আগেকার দিনের ঘটনা বলতে থাকে এবং পিংকীও তা শুনার আগ্রহে থাকে ৷


একদা বৃদ্ধা বলে " এ এক করুন ইতিহাস। সময়টা ছিলো ১৯৫২ সাল৷ এ দেশের মানুষ শুধু মায়ের মুখের ভাষা রক্ষার জন্য প্রাণ দিতে পিছপা হয়নি৷ শত জোয়ান যুবক দিল প্রাণ মুখে হাসি নিয়ে তব মাতৃভাষা ছাড়বেনা ৷ " 

এই ইতিহাস মনে হলে চোখের অশ্রু আর থামেনা ৷ 

এই বাংলা একদিনে আসেনি৷ এর পেছনে রয়েছে হাজারও যুবকের বুকের তাজা রক্তের ইতিহাস ৷ 

দেশের এই অস্থিতিশীল অবস্থায় আমার দুই ছেলেকে বুকে আগলে রেখেছি ৷ আজ তারাই আমাকে ঘর থেকে বের করে দিল৷ 


বৃদ্ধের কথা শুনে পিংকী স্তব্ধ হয়ে বসে আছে আর অজান্তেই আঁখি মেলে অশ্রু ঝরছে ৷ পিংকী করুন স্বরে কহিল " যে ঘর মায়ের নয়,  সে ঘরে মানুষ কিবা রহে। পশুর আবাস হবে যে তাই । "

পিংকী বৃদ্ধাকে বলে এখন থেকে আমাদের ঘর নিজের মনে করিও। আর চোখের জল ফেলো না ৷ হয়তো প্রভু তোমাকে আমাদের ঘরের নেয়ামত হিসেবেই পাঠিয়েছেন ৷ 


পিংকীর এত আবেগঘন কথা শুনে বৃদ্ধা তাকে জড়িয়ে ধরে এবং বলে এবার থেকে তুই আমার আপনজন ৷ যাহারা ছিল সবই যে গত৷ আর কাউকে আপন মনে করি না৷ 


এভাবেই বৃদ্ধার জীবনের দুঃখের দিন শেষে সুখের দিন শুরু হল ৷ 

এদিকে বৃদ্ধার ছেলেরা মায়ের অভাবে এবং খোদার বিচারে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথে পথে ঘুরে ও অশ্রু জলে ভাসে ৷ 



____________সমাপ্ত ____________

তারিখ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ খ্রিঃ৷ 





এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Tragedy