বউ বিসিএস পরিক্ষায় পাশ
বউ বিসিএস পরিক্ষায় পাশ
আমার বউ বিসিএস পরিক্ষায় পাশ করার পর থেকে রাস্তাঘাটে চলাচল করা আমার জন্য দায় হয়ে গিয়ছে।সারাদিন কাজ করার পর রিক্সাটা নিয়ে সবে বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছি।এমন সময় এলাকার এক বড় ভাই আমাকে ডেকে বললেন,
--"কিরে সুমন সারা জিবন কষ্ট করে রিক্সা চালিয়ে বউকে বিসিএস ক্যাডার বানিয়ে ফল কি অন্য কাউকে খাওয়াবি না কি?তোর বউ তো তোকে রেখে চলে গেল বলে। আমাদের কথা মিলিয়ে দেখিস। "
সারাদিন রোদের ভিতর রিক্সা চালিয়ে এখন শরীরে বিন্দু মাত্র বল শক্তি নেই।তাই কারো সাথে তর্ক করতে গেলাম না। মুচকি হেসে বললাম," আমাকে রেখে চলে গেলে আর কি করবো ভাই বলেন। আমি না হয় আর একজন কে বিয়ে করে সুখে থাকবো। "
কথাগুলো বলে সোজা বাড়ির রাস্তা ধরলাম। আজ সারাদিন অনেক পরিশ্রম করছি।আজ উর্মি প্রথম চাকরিতে যোগদান করছে।অভাবের সংসার কখনো ওর সখ আল্লাদ পূরন করতে পারিনি।তাই আজ অনেক কষ্টে বেশকিছু টাকা রোজগার করছি।আজ উর্মির সবচেয়ে বড় ইচ্ছাটা পূরন হয়েছে।আজ ওর ছোট ছোট ইচ্ছা গুরো আমি পূরন করে দিবো। বাজার থেকে বেলিফুলের মালা আর ৬ টা গোলাপ কিনে এনেছি।আর সাথে দুই পেকেট বিরিয়ানি।সব মিলে প্রায় ২ হাজার টাকা লেগেছে।গত কয়েক সপ্তাহ্ ধরে দুপুরের খাওয়ার টাকা টা জমিয়ে এসব কিনতে পেরেছি। আজকাল একদিনে এত টাকা রোজগার করা প্রায় অসম্ভব। খুব খুশি মনেই ঘরে ফিরছিলাম কিন্তু মাঝ পথে মন টা বিষিয়ে গেল। মনের ভিতর না চাইলেই নানান প্রশ্ন উকি দিচ্ছে। আচ্ছা উর্মি চাকরি করতে গিয়ে বদলে যাবে না তো? তখস কি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।আমাদের এই ৮ বছরের সংসার জিবন কি ভুলে যাবে.? না-না এসব আমি কি ভাবছি! উর্মি আমাকে খুব ভালোবাসে। আমার জন্য কত শখ-আল্লাদ মাটিতে পুতে ফেলেছে তা আমার অজানা নয়।এসব কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে বাড়ির সীমানায় চলে এসেছি নিজই বুঝতে পারিনি।রিক্সা টা জায়গা মতো রেখে, উপহার গুলো হাতে নিয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলাম।উর্মি এসব দেখলে কতটা খুশি হবে ভাবতেই খুব আনন্দ লাগছে।আমাদের বাড়িটা টিনের তৈরী,উপরে টিনের চাল।বাড়িতে বৃদ্ধ মা-বাবা আছে, আব্বা অনেক কষ্ট করে বাড়িটা তৈরী করছে,তাই থাকার কোনো অসুবিধা হয় না। ঘড়ে ঢুকে দেখলাম উর্মি ঘুমাচ্ছে।আগে পরে কখনো উর্মি, আমি বাড়িতে না আসলে ঘুমাতো না।তা হরে আজ হঠাৎ! ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম মাত্র ৮ টা বাজে।হয়তো অফিসে গিয়েছিলো তাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।কিন্তু বাড়ি ফিরেছে সেই বিকালে এখনো ঘুমিয়ে আছে তাহলে তো অনেক ঘুমিয়েছে। উপহার গুলো সাথে সাথে দিতে না পারলে কি উপহার দেয়া মজা থাকে নাকি!. আমি আসতে করে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম, উর্মি অনেক ঘুমিয়েছো তো," এখন ওঠো।উর্মি চোখ বদ্ধ রেখেই বলল," কথায় অনেক ঘুমিয়েছি? মাত্রই শুয়ে পড়লাম.! তুমি খেয়ে নিও।
খুব কষ্ট পেলাম ও-র কথা-গুলো শুনে। আগে পরে কখনো এমন ব্যবহার করেনি তাই মানতে একটু কষ্ট হচ্ছে। তবু ও নিজেকে সংযত করে বললাম," দেখো আমি তোমার জন্য নীর শাড়ি, বেলিফুলের মালা, গোলাপ এনেছি।এ গুরো দেখে তার পর ঘুমাও..।
উর্মি বেশ বিরক্ত হয়ে বললো," দেখ এমন হাজার হাজর নীল শাড়ি, সস্তা ফুল কিনতে পারবো আমি এখন। তুমি আমাকে বিরক্ত করো না তো। চাকরি তো কখনো করোনি তাই জানো না ঠিক কতটা কষ্ট করতে হয়। "
উর্মির কথার উত্তর দেয়ার মতো কোনো ভাষা জানা নেই আমার। ওর সাথে ঝগড়া করতে ভালো লাগে না আমার, তাি চুপচাপ জিনিস গুলো টেবিলের উপরে রেখে দিলাম। এতো সময় ক্ষুধায় পেট চো চো করলেও এখন যেনো তা বাতাসে মিলিয়ে গেছে। যে মেয়ে, ৮ বছর বিবাহিত জীবনে কখনো আমাকে রেখে খাবার খায় নি,সে আজ এতো সকালে আমাকে রেখে খাবার খেয়ে নিলো। কি জানি হয়তো ক্ষুধা লেগেছিলো অনেক।ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলাম।কিন্তু মাথায় বারবার কি সব উল্টা পাল্টা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। এক গ্লাস পানি খেয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে এলাম। ঘরের সামনে আমাদের টঙ্গে।এই খানে বসে দুজনে কত গল্প করছি। সেই সময় উর্মির পরিক্ষার ফি দিতে হবে আর বই কিনতে হবে,, ৫ হাজার টাকার দরকার ছিলো।কিন্তু কিছুতেই টাকা জোগার করতে পারছিলাম না।অবশেষে এক লোকের জিনিস এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে পৌছে দিলে, ১ হাজার টাকা দিবে বললো,,অনেক দুরের পথ ছিলো। তখন রাত ১০ টা বাজে।বাড়িতে ফিরে আসবো বলে,সব গুছিয়ে রাখছি। কিন্তু ওর পরিক্ষার ফি দিতে হবে বলে রাজি হয়ে গেলাম।।সে দিন রাতে বাড়ি ফিরতে প্রায় তিনটা বেজে গেলো, সেদিন উর্মি এই টঙ্গে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো। আমি বাড়ি আসলেই আমাকে জড়িয়ে ধরলো, সে কি কান্না। কাদঁতে কাদঁতে শুধু বলছিলো," আমি আর পড়বো না তুমি ঠিক সময়ে বাড়ি চলে আসবা এর পর থেকে।আমার খুব ভয় হয় তোমাকে হাড়ানোর।"
অতিতের কথা মনে করতে করতে কখন যে চোখের পানি গড়িয়ে পড়েছে,বুঝতেই পারিনি।হাত দিয়ে চোখ আর কপাল মুছে নিলাম। হয়তো আমি বেশি ভাবছি। এটাই তো হতে পারে।
