STORYMIRROR

Aprna Ss

Horror

4.0  

Aprna Ss

Horror

শেষ রাতের ট্রেন

শেষ রাতের ট্রেন

5 mins
10

আমার বাড়ি কলকাতার নিকটবর্তী আলিমগড় নামক একটি স্থানে। আমার মামা বাড়ি সুন্দরবনের একটি ছোট্ট গ্রামে, নাম তার বাঘেরকুন্ড। এটি বঙ্গোপসাগরের একেবারে তীরবর্তী। আমার মামা দাদুর মুখে শুনেছি এক কালে এখানে নাকি অনেক বাঘের আস্তানা ছিল। পরে এটি লোকালয়ে পরিণত হতে থাকে, বাঘের সংখ্যা কমছে থাকে। এখন বাঘ প্রায় নেই বললেই চলে। তবে মাঝেমধ্যে বাঘের হানার কথাও শোনা যায়।
          তা যাই হোক, একবার আমার মামাদাদুর হঠাৎ শরীর খারাপ করে। তাই মা-বাবা সকালে ট্রেনেই বেড়িয়ে পড়ে। আমি তখন স্কুলেতে। মা আমাদের স্কুলের একটি স্যারকে ফোন করে বলে দিল যাতে আমি তাড়াতাড়ি স্কুল থেকে ঘর গিয়ে মামাবাড়ি যাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়ি। এর সঙ্গে আমাকে সতর্ক করে দিলেন আমি যেন সূর্যাস্তের পরে বাঘেরকুন্ড যাওয়ার ট্রেনে না চাপি। কিন্তু, আমি স্কুল-টিউশন শেষ করে বাড়ি পৌছালাম যখন, তখন প্রায় ৫:৫৬ বাজে। এরপর খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমি যখন স্টেশনে যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। আমি মায়ের কথাটা একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম।  
           আমাদের ট্রেন ৭:৪৫ এর সময় দু'নম্বর প্ল্যাটফর্মে এলো। আমিও চেপে পরলাম কোন কিছু না ভেবে। ট্রেনের কামরায় জায়গায় জায়গায় ধুলো ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল যেন ট্রেনটি বহু বছরের পুরনো এবং ব্যবহার করা হয়নি। আমি ভাবলাম ট্রেনের কামরাটি হয়তো বহুদিন ব্যবহার করা হয়নি আর ভালো করে পরিষ্কার করা হয়নি। আমি তখন ভুল করেও বুঝতে পারিনি যে আমার সামনে এত বড় একটা বিপদ অপেক্ষা করছিল। কিছুক্ষণ বাদে ট্রেনটি চলতে আরম্ভ করেছিল আমার চোখ দুটো আস্তে আস্তে জুড়িয়ে আসছিল।হঠাৎ ট্রেনের হুইসেলে আমার ঘুম ভাঙলো। চোখ মিলে দেখলাম আমরা তখন ট্রেনে ২জন আছি। ট্রেনটি যখন জঙ্গলে প্রবেশ করল তখন চারপাশ থেকে কি সব অদ্ভুত আওয়াজ কানে আসতে লাগলো। আমি প্রথমে একটু ভয় পেলেও পরে নিজেকে সামলে নিলাম। অপ্রাসঙ্গিক নয় যে, আমি সবসময় একটি চাকু, নিজের কাছে রাখি। আমি সেটাকে হাতে চেপে ধরে রাখলাম। মনে হচ্ছিল যেন ট্রেনের ছাদে কেউ হাঁটছে। পায়ের শব্দ শুনে আমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। ভয়কে বুকের মধ্যে চেপে রেখে আমি চুপ করে বসে রইলাম। আমার সারা শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। বাইরের পরিবেশটাও হঠাৎ বদলে গেল, আকাশ থেকে বিদ্যুৎ তীব্র বেগে ট্রেনের অদুরেই ভূমির উপর আছরে পরতে লাগলো। তার সঙ্গে তুমুল বায়ুপ্রবাহ। গাছে গাছে ঘর্ষণ লেগে বনের মধ্যে আগুন ধরেছে বলে মনে হতে লাগলো। 

         আমি যখন পিছনে তাকালাম তখন দেখলাম আমাদের কামরার শেষ সিটে বসে আছে একটি অশরীরি।আমি মোবাইলে মা-বাবাকে ফোন করার অনেক চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু আমার ফোনে নেটওয়ার্ক আসছিল না। এরপর সেই অশরীরিটি নিজের সিট থেকে উঠে আমার দিকে আস্তে আস্তে করে আসতে থাকে। ৩-৪ মিনিটের জন্য বাগ্ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমার একবার ভূত দেখার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু এমন সুন্দর ভাবে আমার সামনে উপস্থিত হবে বলে ভাবতেও পারিনি।
         আমার পাশ দিয়ে আস্তে আস্তে চলে গেল আমাদের কামরার অপরদিকে শেষে বসে থাকা একটি ট্রেন লোকো পাইলটের দিকে। ১-২ সেকেন্ড বাদে শোনা গেল সেই লোকটির আর্তনাত ভরা কণ্ঠস্বর "বাঁচাও, বাঁচাও..।" আমার তখন পিছনে ঘুরে দেখবার মতো অবস্থা ছিল না। তৎক্ষণাৎ , ট্রেনের ছাদ থেকে কোন মহিলার অট্টহাসি। কিছুক্ষণের মধ্যেই চারিদিকের পরিবেশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আর ট্রেনের জানালা দিয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো একটি উষ্ণ রক্ত স্রোত। ট্রেনটিও জঙ্গলের মধ্য থেকে বার হয়ে বেড়িয়ে এলো। ক্ষণিকের মধ্যেই পরিবেশ বদলে গিয়ে সূর্যের স্নিগ্ধ আলো দেখা দিল। 
          ট্রেনটিও বাঘেরকুন্ড স্টেশনে এসে পৌঁছালো। আমিও ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম। ঘড়িতে দেখি তখন বাজছে 6:10। ঘড়ি দেখেই তো আমি অবাক। হাঁটতে হাঁটতে মামাঘরে এসে পৌঁছালাম। আমি সারা পথ শুধু কালকের ঘটনায় ভাবতে ভাবতে আসছিলাম। মা ও বাবা ইতিমধ্যেই উঠে পড়েছে। বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করতেই আমাকে একের পর এক প্রশ্নবাণে করা হতে লাগলো। যেমন,"সারা রাত তুই কোথায় ছিলিস?","তোর আসতে কোন অসুবিধা হয়নি তো?"ইত্যাদি, ইত্যাদি। আমি সবাইকে বললাম,"না,না কোন অসুবিধা হয়নি।" কিন্তু আমার মনে কালকে রাত্রের সেই ঘটনাটা ঘুরতে লাগলো। আমি মাকে বলবো বলে একবার ভাবলাম কিন্তু বলবার সময় হলো না। তারপর মনে পরল আমার ছোট মামা রেলওয়েতে চাকরি করেন। সৌভাগ্যক্রমে আজকে ছোট মামা দাদুকে দেখতে আসবে।
             ছোট মামা দুপুর দুপুর করে এসে পৌঁছালো। আমরা সবাই একসঙ্গে খেতে বসলাম। খাওয়া শেষ করে মামা তার ঘরে চলে এলো। আমিও মামার পিছন পিছন তার ঘরে গেলাম। কথা প্রসঙ্গে আমি জিজ্ঞাসাটা করেই ফেললাম যে ট্রেন নং ৩৪৮৯৬১ কলকাতা-বাঘেরকুণ্ড এক্সপ্রেসের আসল ব্যাপারটা কী? মামা মজার সুরে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো- -কেন তুই এলি নাকি ওই ট্রেনেতে?
-হ্যাঁ, আমি ট্রেন নং ৩৪৮৯৬১ কলকাতা-বাঘেরকুন্ড এক্সপ্রেসেই এলাম।
        মামা কেমন যেন একটু অবাক হয়ে গেল। 
-তুই, পাগল হয়ে গেছিস নাকি?
-কেন? 
-যে ট্রেনটা আজ ১০ বছর হল চলছে না, সেই ট্রেনটাই তুই এলি কি করে? আমার সঙ্গে মজা করছিস! 
-না গোও, আমি ওই ট্রেনটা করেই এলাম।
-ট্রেনের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু তোর নজরে পরেনি।
-কেন? যেটা আমি কালকে ট্রেনেতে দেখেছি বা আমার সাথে যে ঘটনাটা কালকে ঘটেছে তা কি প্রায়শই হয় অন্য ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তিদের সঙ্গে। 
-তুই যখন কথাটা তুললিস্ তবে শোন, আজ থেকে ১১ বছর আগে ১৯৯৬ সালে যখন ট্রেনটি প্রথম এ রাস্তায় চলতে শুরু করে, তখন আর সব ট্রেনের মতো স্বাভাবিকই ছিল। হঠাৎ, এর ৬মাস বাদে কার কুদৃষ্টি পড়ল আর সবকিছু বদলে গেল এক রাত্রের মধ্যে। ট্রেনটিতে লোকো পাইলট হিসেবে নন্দিনী রায়, সহ লোকো পাইলট হিসাবে অজয় ঘোষ চাকরি করতেন। নন্দিনী রায় একদিন রাত্রেবেলা তার ডিউটি শেষ করে মায়ের অসুখের জন্য নিজের জমানো দুই মাসের স্যালারি একটি ব্যাগ নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন তখন কেউ যেন তাকে পিছন থেকে গোলা টিপে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। আগে থেকেই আভাস তীব্র বেগে দৌড়াতে আরম্ভ করেছিলেন। কিন্তু খুনি তোমার পিঠে চাকু চালায় এবং তিনি তৎক্ষণাৎ সেই স্থানে মারা যান। তাঁর কাছে থাকা সমস্ত টাকা লুট করে পালিয়ে যায় খুনি।তারপরের দিন গ্রামবাসীরা তাকে একটি পুকুরের ধারে মৃত অবস্থায় পাই। সেদিন থেকে আবার অজয় ঘোষ নিখোঁজ রয়েছে। নন্দিনীর শোকে তার অসুস্থ মাও মারা গেলেন। কয়েক মাস পর থেকে এইসব অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে। কিছুকাল পড়ে ট্রেনটিতে লোকেরা ভয়ে চাপা বন্ধ করে দেয়। ট্রেনে লোক না উঠায় সরকার ট্রেনটিকে পুরোপুরি ভাবে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ট্রেনটি এখনো মাঝ রাত্রে মাঝেমধ্যে রেলের ট্রাকে চলতে দেখা গেছে। যারা ভুল করেও ট্রেনেতে চেপেছে তাদের শুধু মৃত অচেতন লাশ পাওয়া গেছে। সেই নন্দিনী আত্মা সেই ট্রেনি ঘোরাঘুরি করে বলে অনেকে মনে করেন।
  -কিন্তু, মামা সবাইকে যে মেরে দেয়। সে আমাকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেল? 
-হয়তো, ও যার জন্য সেই নিরিহ মানুষগুলোকে এতদিন মেরে গেছে সেই খুনি ব্যক্তিটাকে পেয়ে গেছে তোদের ট্রেনের কামরায়। 
-হ্যাঁ, একটা লোকের গোলা ধরে উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল ছাদের উপরে। 
-ঠিক আছে, ঠিক আছে এখন শুয়ে পড়,বিকালে উঠে আমরা ছয়জনে একটু ঘুরতে যাব। 
        তাহলে আমার সঙ্গে যে ‌লোকটা ছিল সেই কি খুনি অজয় ঘোষ? আমরা সন্ধ্যাবেলায় গ্রামটা ঘুরে বাড়ি ফিরতেই মা বলল,"কাল আমার বিদ্যালয়ের পরীক্ষার রেজাল্ট বের হবে। তাই আমরা সকালবেলায় বেরিয়ে যাব।"আমি আর কি করি একপ্রকার বাধ্য হয়েই চলে যেতে হল।
    এরপর থেকে ওই ট্রেনটির সম্বন্ধে আর কোন অবাস্তব ঘটনা শোনা যায়নি। সরকারও আবার ট্রেনটিকে নিজের ট্রাকে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করেছেন বলে শোনা গেল। আমার মনে হয়,যদি ট্রেনটিকে ফিরিয়ে আনাও হয় তারপরও সাধারণ মানুষে ওই ট্রেনটিতে চাপতে একবার হলেও দ্বিধাগ্রস্ত হবেন। 


এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Horror