রক্ত পিপাসা
রক্ত পিপাসা
রক্ত পিপাসা
এই পৃথিবীতে সদাশয়তা যেমন বিরাজমান, তেমনি বিরাজমান অন্ধকারও।
বিজ্ঞান মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, অসংখ্য রহস্যের জট খুলেছে, কিন্তু আজও এমন কিছু ঘটনা ঘটে যার ব্যাখ্যা বিজ্ঞান দিতে পারে না।
মানুষ অনেক কিছু দেখেছে।
অনেক কিছু আবিষ্কার করেছে।
কিন্তু পৃথিবীর প্রতিটি অন্ধকার কোণের সত্য এখনও তার জানা হয়নি।
কারণ কিছু কিছু রহস্য আলো পছন্দ করে না।
তারা লুকিয়ে থাকে।
অপেক্ষা করে।
আর যখন সময় আসে...
তখন তারা নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয়।
কখনও একটি ছায়ার মাধ্যমে।
কখনও একটি গর্জনের মাধ্যমে।
আবার কখনও...
একটি মৃতদেহের মাধ্যমে।
---
পাহাড়ের বুক জুড়ে তখন গভীর রাত।
শীতের শেষ দিক।
চারদিক কুয়াশায় ঢাকা।
পাইন গাছের মাথাগুলো বাতাসে দুলছে।
দূরে কোথাও একটা পেঁচার ডাক ভেসে আসছে।
পাহাড়ি রাস্তা ধরে দ্রুত হাঁটছিল একজন মানুষ।
তার নাম অর্জুন।
বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি।
পাশের গ্রামের বাসিন্দা।
সেদিন একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল কাজ শেষ করতে।
তাই বাড়ি ফেরার সময় রাত নেমে এসেছিল।
তার হাতে একটি টর্চ ছিল।
টর্চের আলো ছাড়া চারপাশে আর কোনো আলো নেই।
হঠাৎ...
কোথাও যেন একটা ডাল ভাঙার শব্দ হলো।
কটাস!
অর্জুন থেমে গেল।
মাথা ঘুরিয়ে চারপাশে তাকাল।
কেউ নেই।
শুধু কুয়াশা।
আর অন্ধকার।
সে আবার হাঁটতে শুরু করল।
কিন্তু কয়েক কদম যাওয়ার পর আবার শব্দ।
এবার একটু কাছে।
মনে হলো কেউ যেন তার পেছনে হাঁটছে।
অর্জুন দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল।
টর্চের আলো ফেলল।
কেউ নেই।
তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ধকধক করতে লাগল।
সে নিজেকে বোঝাল—
"ভয় পাওয়ার কিছু নেই।"
কিন্তু তার নিজের গলাতেই আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল।
সে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।
ঠিক তখনই...
দূরের পাহাড় থেকে ভেসে এল এক অদ্ভুত ডাক।
না কুকুর।
না শেয়াল।
না কোনো পরিচিত প্রাণী।
ডাকটা শুনে অর্জুনের শরীরের সমস্ত লোম খাড়া হয়ে গেল।
তারপর...
নিঃশব্দতা।
অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা।
যেন পুরো জঙ্গল এক মুহূর্তে চুপ করে গেছে।
বাতাস পর্যন্ত থেমে গেছে।
অর্জুনের মনে হলো কেউ তাকে দেখছে।
কাছ থেকে।
খুব কাছ থেকে।
সে দ্রুত পা চালাল।
কিন্তু তখনই কুয়াশার ভেতর এক ঝলকের জন্য কিছু একটা নড়ে উঠল।
একটা বিশাল ছায়া।
অস্বাভাবিক বড়।
মানুষ?
না।
প্রাণী?
হয়তো।
সে ঠিক বুঝে ওঠার আগেই ছায়াটা মিলিয়ে গেল।
অর্জুন ভয়ে দৌড়ে উঠল।
আর ঠিক তখনই পাহাড়ি রাতের নিস্তব্ধতা চিরে তার আতঙ্কিত চিৎকার ভেসে উঠল।
তারপর...
সব চুপ।
সম্পূর্ণ চুপ।
---
পরদিন সকাল।
শহর থেকে অনেক দূরে সমতলের এক ছোট্ট বাড়ি।
বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে কাপড় শুকোচ্ছিল মেঘলা।
বয়স বাইশ।
সাধারণ পরিবারের মেয়ে।
গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা।
চোখ দুটো বড় বড়।
মুখে এক ধরনের শান্ত ভাব।
তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক।
কয়েক বছর আগে স্ট্রোক হওয়ার পর আর ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না।
মা সেলাই করে সংসারে সাহায্য করেন।
অভাব তাদের নিত্যসঙ্গী।
মেঘলা কলেজ শেষ করলেও ভালো চাকরি পায়নি।
বাড়ির অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছিল।
ঠিক তখনই তাদের এক আত্মীয় খবর নিয়ে আসে।
পাহাড়ি এলাকার এক ধনী পরিবারের বাড়িতে একজন বাচ্চার দেখাশোনার জন্য মেয়ে দরকার।
বেতনও বেশ ভালো।
প্রথমে রাজি হয়নি মেঘলা।
এত দূরে একা যাবে?
অচেনা জায়গা।
অচেনা মানুষ।
কিন্তু সংসারের কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত রাজি হতে হয়।
---
তিন দিন পর।
একটি বাস ধীরে ধীরে পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে উপরে উঠছিল।
জানলার পাশে বসে ছিল মেঘলা।
সে বিস্মিত চোখে বাইরের দৃশ্য দেখছিল।
একদিকে গভীর খাদ।
অন্যদিকে উঁচু পাহাড়।
চারপাশে ঘন বন।
আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘ যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়।
সৌন্দর্য ছিল।
কিন্তু কোথাও যেন একটা অদ্ভুত নির্জনতা।
যেন পাহাড়গুলো কোনো গোপন কথা লুকিয়ে রেখেছে।
---
বিকেলের দিকে মেঘলা পৌঁছাল তার গন্তব্যে।
বাড়িটা দেখে সে অবাক হয়ে গেল।
এটা বাড়ি নয়।
প্রায় প্রাসাদ।
তিনতলা বিশাল অট্টালিকা।
চারদিকে লোহার উঁচু গেট।
সুন্দর বাগান।
অসংখ্য কর্মচারী।
তবুও...
কী যেন একটা অস্বস্তি।
যেন এই বাড়ির দেয়ালের মধ্যে হাসির চেয়ে নীরবতা বেশি বাস করে।
---
বাড়ির মালিক অনিরুদ্ধ রায়।
চল্লিশের শেষ দিকে বয়স।
ভদ্র মানুষ।
কথাবার্তায় বিনয়ী।
তার একমাত্র ছেলে—
নয় বছরের অয়ন।
চুপচাপ স্বভাবের।
অন্য বাচ্চাদের মতো নয়।
মেঘলা লক্ষ্য করল, ছেলেটা খুব কম কথা বলে।
সবসময় যেন কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত।
সন্ধ্যার পর প্রথমবার নিজের ঘরে ঢুকে ব্যাগ খুলছিল মেঘলা।
ঠিক তখন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অয়ন হঠাৎ বলল—
"তুমি রাতে জানলা খুলবে না।"
মেঘলা অবাক হয়ে তাকাল।
"কেন?"
অয়ন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর ফিসফিস করে বলল—
"কারণ সে দেখতে পাবে।"
মেঘলার ভ্রু কুঁচকে গেল।
"সে কে?"
অয়ন উত্তর দিল না।
চুপচাপ চলে গেল।
---
রাত।
ঘড়িতে প্রায় বারোটা।
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
মেঘলাও শুয়ে ছিল।
হঠাৎ তার ঘুম ভেঙে গেল।
কেন ভাঙল বুঝতে পারল না।
ঘর অন্ধকার।
চারপাশ নিস্তব্ধ।
ঠিক তখনই...
টক...
টক...
টক...
জানলার কাঁচে যেন কেউ ধীরে ধীরে আঙুল ঠুকছে।
মেঘলা উঠে বসল।
হয়তো ডালপালা।
নিজেকে সেটাই বোঝাল।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আবার—
টক...
টক...
টক...
এবার শব্দটা আরও স্পষ্ট।
মেঘলা ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠল।
জানলার দিকে এগোল।
তার বুকের ভেতর অকারণে ধুকপুক করছে।
সে পর্দাটা একটু সরাল।
বাইরে শুধু কুয়াশা।
ঘন সাদা কুয়াশা।
কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
সে জানলা থেকে সরে আসতে যাচ্ছিল।
ঠিক তখন...
কুয়াশার ভেতর দুই সেকেন্ডের জন্য যেন কিছু একটা জ্বলে উঠল।
দুটি লাল বিন্দু।
দুটি চোখের মতো।
মেঘলা স্থির হয়ে গেল।
পরের মুহূর্তেই সেগুলো অদৃশ্য।
আর দূরের পাহাড়ি বন থেকে ভেসে এল এক দীর্ঘ, অস্বাভাবিক গর্জন।
যে গর্জন শুনে তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।
সেই রাতেই পাহাড়ের অন্য প্রান্তে মানুষজন আরেকটি ভয়ংকর খবর পেতে চলেছিল...
কিন্তু সেটা তখনও কেউ জানত না।

