STORYMIRROR

Basudeb Rajak

Tragedy Fantasy Thriller

3  

Basudeb Rajak

Tragedy Fantasy Thriller

ময়ূরাক্ষ অধ্যায়ঃ ১

ময়ূরাক্ষ অধ্যায়ঃ ১

5 mins
171

বিকেলের সময় সূর্য সবেমাত্র রাজ্যকে বিদায় জানিয়ে দিয়ে যাবার উপক্রম এবং চাঁদ তার স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে দেবার জন্য হাজির , ঠিক সেই সময় প্রহরীরা এক নিতান্ত উনিশ বছরের ছেলেকে রাজ্যের সদর দরজা থেকে ধাক্কা দিয়ে রাজ্য থেকে বার করে দিল।

একটি প্রহরী দেখতে একটু দয়ালু বলেই মনে হলো, হাস্যকর ভঙ্গিতেই বলল ,"এই ছেলে শোনো, এত রাত ঘনিয়ে এসেছে আগে বিশাল বড় বন কোথাও না গিয়ে দরজার আশেপাশেই থাকো না হলে কাল সকালের সূর্য আর দেখার মতো চোখ দুটি থাকবে না।"

ছেলেটা একটা কথাও বললো না যেন কোথাকার দুঃখ কাঁধে করে বয়ে নিয়ে আসছে কোনো এক অজানা অন্তপুরী থেকে।ছেলেটির গলায় একটি দামি মালা জড়ানো , দেখতে না রোগা না পাতলা, চেহারা দেখে মনে হয় যেন কোনো বছরের পর বছর একনিষ্ঠ থাকতে অল্প মাত্রও দ্বিধা নেই, চোখ দুটি যেমন খুশীর অল্প ছোঁয়ার জন্যে কাতর, তবু উজ্জ্বল মুখ যেন কোনো বীরত্বের প্রমান দেয়। 

এসবের মধ্যেই রাস্তায় বসে থাকা একটি ছেড়া কাঁথা-কম্বল জড়ানো স্তূপের মধ্যে থেকে একটি গলা শোনা গেল ," তা বুঝি কার খুন করে এসেছো?, না কি কারো ঘরে ঢুকে গয়নার ভাণ্ডারে হাত দিয়ে আসছ , কি হে বুঝি ঘর ছাড়া হয়ে ভালই লাগছে তো ?"

ছেলেটি করুণ অথচ গম্ভীর স্বরে বললো দেখুন আমাকে ..., আমাকে একা ছেড়ে দিন , না আমি আপনাকে চিনি না আপনি আমাকে তাই অযথা বাক্য বেয় করবেন না। লোকটি বলল ," বাব্বা ! চোরের কথা তো শোনো , আমি তাঁকে চিনি তুমি আমাকে চিনো বাব্বা তুমি তো দেখছি ভদ্দর পুরুষ যে ,কি হেঃ।

বলেই লোকটা জোরে জোরে অট্টহাসি শুরু করলো।

হে হেহে হে হে '

ছেলেটি বললো" আচ্ছা আপনি কি পাগল টাগল নাকি"

লোকটি আবার বললো ," তাও অনেকে বলে "

বলে আবার অট্টহাস্য জুড়ে দিলো ।

লোকটি বলল আচ্ছা ছেলে রাতটা কি এখানেই কাটাবে বলে ভাবছো , কি বলো বলো ?

ছেলেটি বললো দেখুন আমি কিছুই জানি না ,থেকে যাবো এই গভীর বনে কোথাও।

লোকটি বলল ,

যখন নেকড়ে এতই পছন্দ তখন আছো কেন এখানে ?

ছেলেটি বলল ,মানে?

লোকটি বলল ,"মানে বনে রাতে প্রবেশ করা মানে নেকরেদের ভোজনের ব্যবস্থা করা"।

ছেলেটি আর কিছু না বলে লোকটি কে অনুসরণ করে গেল। তাদের পা এসে থামল রাজ্যের প্রাচীর এর বাইরের দিকের এক খোলস যা মেরামতের অভাবে বর্তমানে গুহার রূপ ধরেছে।

আর সেমনি বার্তালাপ না করে লোকটি নিজের কাজ করতে থাকলো এবং ছেলেটি চুপ করে সব পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। লোকটি কয়েকটি শুকনো ডাল পলায় আগুন ধরিয়ে আজ রাত কাটাবার যথাসম্ভব ব্যবস্থা করতে লাগলো। চাঁদের আলো সেই খোলসের অর্ধাংশ আলোকিত করে রেখেছে তাতে একটু সুবিধে হলেও আগুন না জ্বালালে রেহাই নেই। ক্রমে দুজনেই আগুনকে ঘিরে বসলো।

লোকটি বলল "একদিন আমিও এই নগরের একজন ছিলাম,আমারও পরিবার ছিল তারপর নতুন রাজার আসার পর আমাকে ঘর ছাড়া হতে হয় ,কে জানে কি হয়েছে আমার ছেলে আমার বউয়ের।কখনো কখনো মনে পড়ে ঠিক তখনই আমার নিজেকে মেরে ফেলার মন করে তানাহলে আমাকে এই ভিকারীর জীবন কোনো রকম কষ্ট দেয় না। বরঞ্চ এই জীবন বেশি প্রিয় আমার কোনো রকম দায় দায়িত্ব নেই ,না আছে ভবিষ্যতের চিন্তা না কিছু পাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা। কিন্ত......ু তোমার কিসের আকাংখা এই দুটি চোখে হ্ ?

ছেলেটি কিছু বলতেই যাচ্ছিল কি লোকটি বলে উঠলো ,

আরে ব্বাস তোমার তো নামটাই জানা হয়নি ,কি নাম তোমার ?

ছেলেটি যেন একটু অন্য মনস্ক হয়েই বললো ,"ময়ূরাক্ষ', ময়ূরাক্ষ আমার নাম"

ময়ূরাক্ষ না জিজ্ঞেস করলেও লোকটি বলে উঠলো আমার নামটা একটু ভালোই, ভানুসিংহ ।

মযুরাক্ষ বলেই উঠলো ,"হুম তা তো বোঝাই যায় ।"

বলে দুজনেই হাসতে লাগলো ।

চাঁদ তখন সবে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে ,পাশের ময়ূরাক্ষী নদীর ধারার অনবরত আওয়াজ -ঝিঝি পোকার আওয়াজের তালমেল তখন যেকোন বাদ্যযন্ত্র কেও হার মানায় । গুহার মশাল ক্রমে নিভে যাওয়ার উপক্রম ।

এমন সময় এক উজ্জ্বল কোনো জিনিসের ঝিলিক ভানুসিংয়ের চোখে প্রবল ভাবে পড়ে,তার ঘুম ভাঙিয়ে তোলে। সে দেখে ঝিলিকটা সেই ছেলেটির গলার এক বিশেষ ধরনের মালা থেকে আসছে। মালা দেখতেই সে ময়ূরাক্ষের উপর আঘাত হানে ,তার দুটো হাত চেপে ধরে পিটের দিক থেকে ছেলেটির দুটি হাত , হাত দুটিকে টেনে হাঁটুর ভর করে ধরাশায়ী করে দেয় সবেমাত্র বেড়ে উঠা ছেলেটিকে। আরকোনো পথ নেই ছেলের কাছে শুধু মাত্র একটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ছাড়া।

ভানুসিংহ গম্ভীর মুখে চিৎকার করে ওঠে ,"কোথায় পেলি এই অমূল্য মালা? ,বল হতচ্ছাড়া বল !

ছেলেটি বন্ধন খোলার অপার চেষ্টার সহিত বলে উঠে ,মা দিয়েছে, আমার মা দিয়েছে আমাকে ।

বলেই চোখ যেন তার জলে ভরে আসে ,বুকের সব ব্যথা যেন এই কথার সাথে বয়ে চলে আসে তার ।

ভানুসিংহ গম্ভীর স্বরে বলে , কে তোর মা ?

উত্তরে এলো, আমার মা ,কল্যানিদেবী।

সাথে সাথে যেন সব বন্ধন খুলে গেল ,চোখ যেন এ কথা বিশ্বাস করতে চাই না, ভানুসিংহ মাটিতে বসে পড়লো । ময়ূরাক্ষ দুটি হাত মাটিতে রেখে হাপাতে হাপাতে তার পিঠের ঝোলা নিয়ে বাইরের দিকে অগ্রসর হতেই যাচ্ছিল কি ভানুসিংহ বলে উঠলো "এই এই ! কোথায় ,কোথায় যাচ্ছ তুমি হেঃ? কোথায় যাচ্ছ ? " দাড়াও দাড়াও ।জাপটে গিয়ে ধরে নিয়ে আসে ।

তুমি কি সত্যি বলছো বলো বলো তুমি কি সত্যই বলছো ,?

ছেলেটি একটু বিরক্তির সাথেই তার হাত সরিয়ে গুহা থেকে বের হয়ে গভীর বনে প্রবেশ করে । ভানুসিংহরও পা আর থেমে থাকে না ,তার পিছনে তাকে অনুসরণ করে দৌড়াতে থাকে, ছেলেটিও চোখের জল মুছতে মুছতে এগিয়ে যায় ।

ভানুসিংহের মুখে শুধু একটাই শব্দ রাজকুমার, রাজকুমার ,দয়া করে থামুন । ময়ূরাক্ষ অজান্তে বনের অনেক গভীরে প্রবেশ করে গেছে । অনেকটা এগিয়ে সে মাটিতে হাটু তে ভর করে বসে পড়ে এবং চেঁচাই,যেন বুকের সব ভার সে বার করে দিতে চাই এই মুহূর্তে।ভানুসিংহও তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে "রাজকুমার আপনি এখনও বেঁচে আছেন, মহারানী কোথায় ? কোথায় তিনি ?"

ময়ূরাক্ষ চেঁচিয়ে ওঠে আমি চিনি না আপনাকে ,চলে যান এখান থেকে ,আপনি কে, কে আপনি ?

ভানুসিংহ বলে ওঠে ," আমি আপনার ভানু কাকা , চিনতে পারবেন না আমাকে আপনি !, মহারানী কি বেঁচে আছেন ?

ময়ীরাক্ষ বলে ওঠে আমি চিনতাম না আপনাকে ,এতটুকু জনি যে আপনি আমার বাবার সভার একজন ছিলেন এবং যুদ্ধে আপনি মারা গেছেন।

আর আমার মা ,আমার মা আর বেঁচে নেই ভানুকাকা। আর বেঁচে নেই আমার মা।"

ভানুককা কি বলতেই যাচ্ছিলেন কি ,তারা দুজনেই অনেক গুলা তীব্র ক্ষুধার্ত আওয়াজ শুনলো 'ঘর্ঘ্র, ঘর্ঘর, ঘরক' । ময়ূরাক্ষ কিছু বলার আগেই থেমে গেলো তারা দুজনেই বুঝতে পেরেছেন যে তারা অজান্তে বনের খুব গভীরে চলে এসেছেন। দেখতে দেখতেই গোটাপঞ্চাশ হিংস্র নেকড়ের দল তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে দলে দলে ,গাছপালা মাড়িয়ে তারা এগিয়ে আসছে এই অন্তহীন জঙ্গলের দুটি নিরীহ প্রাণীর দিকে । ভানুসিংহ প্রাণ বাঁচাবার কোনো পথ দেখতে না পেয়ে, রাজকুমার কে নিয়ে ঝাঁপ দিতে অগ্রসর হয় পাশের ময়ূরক্ষীর গভীর ধারায় ,কিন্তু হায়! সে সাধ্যে কোথায় ততক্ষনে নেকড়ের দল ধরে ফেলে ভানুসিংহ কে ,ভানুসিংহ চেঁচিয়ে ওঠে "ঝাঁপ দিন রাজকুমার ঝাঁপ দিন ঝাঁপ দিন" । ময়ূরাক্ষ প্রানপনে ঝাঁপ দেয় ময়ূরক্ষীর ধারার অতল তলে। ভানুসিংহের শেষ আর্তনাদ শোনা যায় । নেকড়ের দল টেনে নিয়ে যায় তাকে ঘন কালো বনের মধ্যে ।।

* ---------------------*



এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Tragedy