ম্যাম
ম্যাম
"নাহ!!কোয়েড কলেজে পড়া হবে না।হয় মেয়েদের কলেজে ভর্তি হও নাহলে আর পড়তে হবে না"...একথাই বলেছিলেন তানিয়ার বাবা রথীনবাবু।তাই শেষমেস মেয়েদের কলেজেই ভর্তি হতে হয়েছিল তানিয়াকে।ও ভালই জানত যে বি.এ টা পাশ করলেই ওর বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে।বিয়ের বাজারে দর বাড়ানোর জন্যই ওকে কলেজে পাঠানো।
তানিয়া পড়াশুনোয় মোটামুটি।জাস্ট পাশ করার জন্যই পড়াশুনো করেছে।বাকী সময়টা স্কুলে বান্ধবীদের সাথে গল্প করেই কাটিয়ে দিত।যাই হোক হিস্ট্রি অনার্স নিয়ে মেয়েদের কলেজেই ভর্তি হল তানিয়া।
ক্লাসের প্রথম দিন এক ব্যক্তিত্বময়ী অধ্যাপিকা নজর কেড়েছিলেন তানিয়ার।শুধু তানিয়া নয় ক্লাসের সমস্ত ছাত্রীদেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন তিনি।নাম সুবর্না রয়।সুন্দরী এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন নারী। দেখে মনে হচ্ছিল বয়স পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ হবে। পরনে শাড়ির সাথে ম্যাচিং টেরাকোটার সেট।অপূর্ব সুন্দর ওনার কথাবার্তা।প্রথমদিনই আলাদা করে নাম ডেকে ডেকে সকলের সাথে পরিচয় করলেন।বিষয় নিয়ে লেকচার দেওয়ার পর নিজের কিছু ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। ওনার কথায় জানা গেল যে ওনার একটি ছেলে আছে যে এখন লন্ডনে পড়াশুনো করতে গেছে।ওনার এত বড় ছেলে আছে শুনে সকলে বেশ অবাক হয়ে গেল।তারা জিজ্ঞাসা করল,"ম্যাম আপনার এজ কত ম্যাম।আপনার এত বড় ছেলে?"..ম্যাম হেসে জিজ্ঞাসা করলেন,"কত বলে মনে হয়?".কেউ উত্তরে বলল পঁয়ত্রিশ কেউ আটত্রিশ।..ম্যাম হেসে উত্তর দিলেন,"আমার বয়স এখন পঁয়তাল্লিশ "...।কিন্তু সত্যিই বিশ্বাস করা কষ্টসাধ্য ছিল যে ওনার এত বয়স।...যাই হোক এই অধ্যাপিকা এবং তার লেকচার দাগ কেটেছিল তানিয়ার মনে।ওনার ইতিহাসের লেকচার শুনে মনে হচ্ছিল যেন সত্যিই কোনো ঐতিহাসিক স্থানে তানিয়া এখন অবস্থান করছে।
সেদিন বাড়ি ফিরে পাশ করার উদ্দেশ্যে নয় ইতিহাসকে জানার উদ্দেশ্যে বই খুলে বসল তানিয়া।দিন যেতে লাগলো।প্রতিদিনই ম্যামের টেবিল ছাত্রীদের দেওয়া গোলাপ ফুল, পেন ইত্যাদিতে ভরে যায়,সেই উপহার দাতাদের মধ্যে তানিয়াও থাকে।জানা গেল যে শুধু ফার্স্ট ইয়ার নয় সেকেন্ড ইয়ার এবং থার্ড ইয়ারের ছাত্রীদের কাছেও সুবর্ণা ম্যাম খুব পপুলার।
সময় কাটতে লাগলো ইতিহাসের গভীরে চলে যেতে লাগলো তানিয়া,শুধু সুবর্না ম্যামের পেপার নয় আজকাল পুরো ইতিহাস বিষয়টাকেই ভালোবাসতে শুরু করেছে তানিয়া।ফার্স্ট ইয়ারের রেজাল্ট বের হল,তানিয়া ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট।....এই জীবনে প্রথম স্ট্যান্ড করা।আজ তানিয়া আনন্দে আত্মহারা। এভাবে সেকেন্ড ইয়ার আর থার্ড ইয়ার কাটলো।ফাইনালেও তানিয়া কলেজে ফার্স্ট আর ইউনিভার্সিটিতে পঞ্চম স্থানাধিকারিনী।
"আমি এম.এ পড়ব বাবা".. জোর গলায় বাবা রথীনবাবুর সামনে দাঁড়িয়ে বলল তানিয়া...আজ তার জোর আছে, রেজাল্টের জোর।নাহ!!রথীনবাবু বাধা দেন নি।এম.এ তে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পর কলেজে সুবর্না ম্যামের সাথে দেখা করতে এসেছিল তানিয়া কিন্তু ম্যামের দেখা পেল না।জানা গেল ম্যাম দিল্লীর এক ইউনিভার্সিটিতে ট্রান্সফার হয়ে গেছেন।মনে অনেক দু:খ নিয়ে ফিরে এল তানিয়া।
চার বছর কেটে গেছে।এস.এস.সি পাশ করে আজ তানিয়া স্কুল শিক্ষিকা।এবার প্রফেসর হবে বলে সি.এস.সি-এর জন্য তৈরি হচ্ছে।এদিকে বাবা মা তো ওর বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন।আর তানিয়ারও জেদ, ও এখন বিয়ে করবে না।...এর মধ্যে ছোটপিসি একটা ভালো সম্বন্ধ নিয়ে এসেছে ছেলে ইঞ্জিনিয়ার বাইরে চাকরী করে।তানিয়ার ইচ্ছে নেই বিয়ে করার। ও ঠিক করেছে যে ওকে যদি পছন্দও করে তাহলেও ও আলাদা দেখা করে না বলে দেবে।এখনই বিয়ে করবেনা তানিয়া কারণ ও দেখেছে বিয়ে করে ওর বান্ধবীদের কি অবস্থা।ওদের শাশুড়িরা ওদের সব নাজেহাল করে রেখেছেন।বাইরে চাকরী করেও শান্তি নেই।ঘরে বাইরে দুদিকে কাজ করতে হয়।।"...যাই হোক মায়ের অনুরোধে অনিচ্ছা সত্বেও সম্বন্ধ দেখাতে গিয়ে বসল তানিয়া।কিন্তু গিয়ে অবাক!!!, "সুবর্ণা ম্যাম না!!"...ম্যাম ওকে চিনতে পেরে হাহা করে হেসে পাশে পাত্রকে দেখিয়ে বললেন,"এই আমার ছেলে।"..নাহ!!এত ভালো সম্বন্ধটা হাত ছাড়া করা যাবে না।এই শাশুড়ি তো তানিয়ার শত্রু হতে পারেনই না কারণ ইনিই তো ওর রোল মডেল।এক গাল হাসি হেসে উঠলো তানিয়া।
