রহস্যের রাজবাড়ী
রহস্যের রাজবাড়ী
কলকাতার ব্যস্ত শহরের একটি বিশাল বহুতল ভবনের উপরের তলায় ছিল “গাঙ্গুলী গ্রুপ অফ কোম্পানিজ”-এর প্রধান কার্যালয়। সেই সংস্থার মালিক ও প্রধান কর্ণধার ছিল সাহেত। ছোট বয়সেই নিজের যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সে ব্যবসার জগতে নিজের একটা শক্ত জায়গা তৈরি করে নিয়েছিল।
কিন্তু সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে তার জীবনে এসেছিল প্রচণ্ড ব্যস্ততা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মিটিং, ব্যবসার বিভিন্ন কাজ, কর্মীদের সমস্যা এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে সাহেত প্রায় হাঁপিয়ে উঠেছিল।
একদিন সন্ধ্যায় নিজের কেবিনে বসে জানালার বাইরে কলকাতার আলো ঝলমলে শহরের দিকে তাকিয়ে ছিল সাহেত। বিশাল শহরটা তার কাছে সেদিন কেমন যেন ক্লান্তিকর মনে হচ্ছিল।
ঠিক সেই সময় তার ব্যক্তিগত সহকারী এবং বান্ধবী প্রজ্ঞা কেবিনে ঢুকল।
প্রজ্ঞা সাহেতের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, সে খুব ক্লান্ত।
সে বলল,
— “সাহেত, তোমাকে কয়েকদিনের জন্য সব কাজ থেকে দূরে থাকা দরকার। চলো না, আমার গ্রামের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। সেখানে গেলে তোমার মনটা ভালো হয়ে যাবে।”
সাহেত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
— “হয়তো তুই ঠিকই বলছিস। শহরের এই ব্যস্ততা থেকে কয়েকদিন দূরে থাকলে সত্যিই ভালো লাগতে পারে।”
পরদিনই তারা গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
গ্রামে পৌঁছানোর পর সাহেতের মনে হলো, সে যেন সম্পূর্ণ অন্য একটা জগতে চলে এসেছে। চারদিকে সবুজ গাছপালা, পুকুর, খোলা মাঠ, পাখির ডাক আর মাটির গন্ধ—সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের শান্তি।
প্রজ্ঞার পরিবারের সবাই তাদের খুব আনন্দের সঙ্গে স্বাগত জানাল।
সাহেতও বেশ আনন্দ নিয়ে গ্রামের পরিবেশ উপভোগ করতে লাগল। শহরের ব্যস্ত জীবনের তুলনায় এই শান্ত পরিবেশ তার কাছে একেবারেই অন্যরকম লাগছিল।
কিন্তু গ্রামের এই শান্ত পরিবেশের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক অদ্ভুত রহস্য।
একদিন বিকেলে সাহেত প্রজ্ঞার সঙ্গে হাঁটতে বেরিয়ে দূরে একটি বিশাল পুরনো রাজবাড়ি দেখতে পেল।
বাড়িটির চারপাশে আগাছা আর বড় বড় গাছপালা। বহু বছর ধরে সেখানে কেউ থাকে না—দেখলেই বোঝা যায়।
সাহেত কৌতূহলী হয়ে প্রজ্ঞাকে জিজ্ঞেস করল,
— “ওই বাড়িটা কী?”
প্রজ্ঞা একটু থেমে বলল,
— “ওটা চৌধুরী রাজবাড়ি। অনেক বছর ধরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে।”
সাহেত অবাক হয়ে বলল,
— “এত বড় বাড়ি অথচ কেউ থাকে না কেন?”
প্রজ্ঞা কিছু বলার আগেই তার দাদু সেখানে এসে উপস্থিত হলেন।
তিনি গম্ভীর মুখে বললেন,
— “ও বাড়ির ব্যাপারে বেশি কৌতূহল দেখাস না। ওখানে যাস না।”
সাহেত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “কেন দাদু?”
দাদু ধীরে ধীরে বললেন,
— “ও বাড়িটাকে ঘিরে অনেক অদ্ভুত ঘটনা আছে। রাত হলেই ওখান থেকে নূপুরের শব্দ শোনা যায়। কখনও আবার কারও কান্নার আওয়াজ আসে। গ্রামের অনেকেই ওই বাড়ির আশেপাশে অদ্ভুত ছায়া দেখেছে।”
কথাগুলো শুনে সাহেতের ভয় পাওয়ার বদলে কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।
সত্যিই কি ওই রাজবাড়িতে ভূত আছে?
নাকি এর পিছনে অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে?
সেই রহস্যের উত্তর জানার জন্যই এক রাতে সাহেত ও প্রজ্ঞা চুপিচুপি রাজবাড়ির দিকে রওনা দিল।
রাজবাড়ির পুরনো দরজা ঠেলে তারা ভিতরে প্রবেশ করল।
চারপাশ নিস্তব্ধ। পুরনো দেওয়াল, ধুলো জমে থাকা আসবাবপত্র আর অন্ধকার ঘর—সব মিলিয়ে জায়গাটা সত্যিই ভয়ংকর লাগছিল।
হঠাৎ তারা শুনতে পেল—
ঝুম... ঝুম...
নূপুরের শব্দ!
প্রজ্ঞা ভয় পেয়ে সাহেতের দিকে তাকাল।
তারপর আবার সেই শব্দ শোনা গেল।
কিছুক্ষণ পর কোথা থেকে যেন ভেসে এল একজন মহিলার কান্নার আওয়াজ।
প্রজ্ঞা ফিসফিস করে বলল,
— “সাহেত, চলো এখান থেকে বেরিয়ে যাই।”
কিন্তু সাহেত চারপাশ ভালোভাবে লক্ষ্য করতে লাগল।
হঠাৎ একটি পুরনো আয়নার দিকে তার চোখ পড়ল।
আয়নায় তাদের পিছনে যেন কারও ছায়া দেখা গেল!
দুজনেই সঙ্গে সঙ্গে পিছনে ফিরে তাকাল।
কিন্তু সেখানে কেউ নেই।
সাহেতের মনে সন্দেহ তৈরি হলো।
সে খেয়াল করল, নূপুরের শব্দগুলো প্রায় প্রতি দশ সেকেন্ড পরপর একইভাবে ফিরে আসছে।
এটা কি সত্যিই কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনা?
নাকি কেউ ইচ্ছা করে এই শব্দ তৈরি করছে?
এরপর সাহেত আরও একটি অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করল।
ঘরের মধ্যে পোড়া তারের মতো একটা গন্ধ।
সাহেত ধীরে ধীরে বলল,
— “প্রজ্ঞা, আমার মনে হচ্ছে এখানে যা ঘটছে, তার পিছনে অন্য কোনো রহস্য আছে।”
দুজন আরও এগিয়ে গেল।
হঠাৎ মাটিতে সাহেতের চোখ পড়ল।
সেখানে দেখা গেল কিছু জুতোর ছাপ।
কিন্তু সেই ছাপ কোনো পুরনো বা অদ্ভুত জুতোর নয়—একেবারে আধুনিক জুতোর!
সাহেত এবার প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেল, এই রাজবাড়ির রহস্যের সঙ্গে মানুষের যোগ রয়েছে।
তারা আরও খুঁজতে শুরু করল।
একসময় তারা একটি গোপন পথের সন্ধান পেল।
সেই পথ ধরে নিচে নামতেই তারা পৌঁছে গেল একটি ভূগর্ভস্থ ঘরে।
আর সেখানে গিয়ে তারা যা দেখল, তাতে দুজনেই অবাক হয়ে গেল।
ঘরের মধ্যে কয়েকজন লোক বসে আছে। চারপাশে বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি, স্পিকার এবং প্রজেক্টর রাখা।
সাহেত তখন পুরো বিষয়টা বুঝতে পারল।
এই রাজবাড়িতে কোনো ভূত নেই।
কিছু চোরাকারবারি ও দুষ্কৃতী এই রাজবাড়িকে নিজেদের গোপন আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছে।
গ্রামের মানুষ যাতে ভয় পেয়ে রাজবাড়ির কাছেও না আসে, সেই জন্য তারা পরিকল্পনা করে নূপুরের শব্দ, কান্নার আওয়াজ এবং ছায়ার মতো বিভিন্ন ভৌতিক দৃশ্য তৈরি করত।
আর সেই সুযোগে তারা রাজবাড়ি ও তার আশেপাশে থাকা মূল্যবান প্রাচীন জিনিসপত্র চুরি করে পাচার করছিল।
সাহেত ও প্রজ্ঞা বিষয়টির প্রমাণ সংগ্রহ করার জন্য মোবাইলে ছবি ও ভিডিও করতে শুরু করল।
কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, খুব তাড়াতাড়িই তাদের উপস্থিতি ধরা পড়ে যাবে।
হঠাৎ—
ঠাস!
একটি কাঁচের জিনিস মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল।
শব্দ শুনে দুষ্কৃতীরা ছুটে এল।
সাহেত বুঝতে পারল, আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকা নিরাপদ নয়।
সাহেত একজন বড় কোম্পানির মালিক হওয়ায় পুলিশের সঙ্গে তার ভালো যোগাযোগ ছিল। তাই সে জানত, পুলিশকে খবর দিলে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ব্যবস্থা নিতে পারবে।
সে প্রজ্ঞাকে বলল,
— “তুই এখান থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গিয়ে পুলিশকে খবর দে।”
প্রজ্ঞা দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
সাহেতও দুষ্কৃতীদের কিছুটা সময় আটকে রেখে সুযোগ বুঝে সেখান থেকে বেরিয়ে এল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ রাজবাড়িতে এসে পৌঁছাল।
পুলিশ পুরো জায়গাটি ঘিরে ফেলল এবং একে একে সমস্ত চোরাকারবারিদের গ্রেফতার করল।
ভূগর্ভস্থ ঘর থেকে উদ্ধার হলো বহু মূল্যবান প্রাচীন সামগ্রী, মূর্তি, রূপোর জিনিসপত্র এবং অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ।
গ্রামের মানুষ এতদিন যে রাজবাড়িকে ভূতের বাড়ি বলে ভয় পেত, অবশেষে জানা গেল সেই ভয়ংকর রহস্যের আসল সত্য।
ভূতের ভয় দেখিয়ে আসলে মানুষেরাই এতদিন নিজেদের অপরাধ লুকিয়ে রেখেছিল।
প্রজ্ঞার দাদু সাহেত ও প্রজ্ঞার সাহসিকতার প্রশংসা করলেন।
সাহেতের মনে তখন এক অদ্ভুত শান্তি।
কয়েকদিন আগে যে ছেলেটি শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে একটু শান্তি পাওয়ার জন্য গ্রামে এসেছিল, সে ফিরে পেল শুধু শান্তিই নয়—একটি রহস্যের সমাধানও।
কয়েকদিন পর সাহেত ও প্রজ্ঞা আবার কলকাতায় ফিরে গেল।
কিন্তু চৌধুরী রাজবাড়ির সেই রহস্যময় রাত, নূপুরের শব্দ, অন্ধকার ঘর আর ভূগর্ভস্থ সেই গোপন আস্তানার কথা সাহেত কোনোদিন ভুলতে পারল না।
— সমাপ্ত —
