অন্ধকারের ভেতর নাম নেই
অন্ধকারের ভেতর নাম নেই
শহরটা রাত হলে আরও নিঃশব্দ হয়ে যায়। দিনের বেলার কোলাহল, যানজট, মানুষের হাঁকডাক—সবকিছু যেন এক সময়ের গল্প হয়ে দূরে সরে যায়। কিন্তু এই শহরের কিছু অলিগলি আছে, যেখানে রাত কখনোই পুরোপুরি শান্ত হয় না। সেখানেই লুকিয়ে থাকে অজানা ভয়, অদেখা অপরাধ, আর এমন কিছু সত্যি, যা দিনের আলোয় আসতে চায় না।
সেই শহরেরই এক পুরনো এলাকায় থাকত আরিফ। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। চেহারায় সাধারণ, কথায় কম, চোখে এক ধরনের ক্লান্তি। সে একটা ছোট প্রাইভেট অফিসে হিসাবের কাজ করত। লোকজন তাকে নিরীহ বলেই জানত। কেউ কখনো ভাবত না, এই ভদ্র, শান্ত মানুষটার জীবনে একটা রাত এমনভাবে ঢুকে পড়বে, যার পর আর কিছু আগের মতো থাকবে না।
সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। অফিস থেকে বের হতে হতে রাত দশটা ছুঁই ছুঁই। বৃষ্টি হয়ে থেমেছে, রাস্তার ভেজা পিচে আলো পড়ে ঝিকিমিকি করছিল। আরিফ বাসার দিকে হাঁটছিল। হঠাৎ তার ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে কল এলো। সে ধরতেই ওপাশ থেকে খুব নিচু গলায় একজন বলল, “তুমি কি এখনও বেঁচে আছ?”
আরিফ থমকে দাঁড়াল। “কে বলছেন?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর শুধু একটা শব্দ—“পিছনে তাকাও।”
আরিফ ধীরে ধীরে পিছনে তাকাল। রাস্তার অপর পারে একটা কালো ছাতা ধরা লোক দাঁড়িয়ে। মুখ দেখা যাচ্ছে না। শুধু ছাতার নিচে একটা অদ্ভুত স্থিরতা, যেন সে অনেকক্ষণ ধরে আরিফকেই দেখছিল। আরিফ কিছু বলার আগেই কল কেটে গেল। সে আবার ফোনে কল ব্যাক করল, কিন্তু নম্বরটা বন্ধ পাওয়া গেল।
সে একবার ভাবল, হয়তো ভুল নম্বর, হয়তো কারও প্রাঙ্ক। কিন্তু তার ভেতরের অস্বস্তিটা একটুও কমল না। সে দ্রুত হাঁটা শুরু করল। বাসার গলির মুখে পৌঁছাতেই দেখল, তার বাড়ির সামনের পুরনো আমগাছটার নিচে একটা সাদা খাম পড়ে আছে। চারপাশে কেউ নেই। আরিফ ভয়ে-ভয়ে খামটা তুলল। ভেতরে একটা চিরকুট।
চিরকুটে লেখা ছিল—
“রাত ১১টার আগে বাসায় যেও না। দরজার পেছনে যা আছে, সেটা দেখো।”
আরিফের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। দরজার পেছনে? তার বাসার চাবি, টাকা, মোবাইল—সব ঠিক আছে তো? কে এই চিরকুট রেখে গেল? আর সবচেয়ে বড় কথা, তার বাড়ির দরজার পেছনে কী থাকতে পারে?
সে গলির ভেতর ঢুকল। বাসার সামনে এসে দেখল, বাইরে থেকে দরজা ঠিকই বন্ধ। কিন্তু দরজার নিচে মাটিতে একটা ছোট্ট ভেজা দাগ, যেন কেউ সদ্য কিছু সরে গেছে। আরিফ কাঁপা হাতে দরজা খুলল। ভেতরে ঢুকতেই তার চোখ গেল পেছনের দরজার দিকটায়। সেখানে, ঠিক দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে রাখা একটা পুরনো লাল ব্যাগ। এটা তার নয়।
ব্যাগটা খুলতেই সে নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলল।
ভেতরে একটা পিস্তল, কিছু নোটের বান্ডিল, আর একটি ছোট নীল ডায়েরি। ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
“যদি এটা কেউ খুঁজে পায়, বুঝবে আমি বেঁচে আছি না।”
আরিফের মাথা ঘুরে গেল। তার হাত কাঁপছিল। সে ডায়েরি উল্টে পড়তে শুরু করল। প্রতিটি পাতায় নাম, তারিখ, টাকার হিসাব, ফোন নম্বর, গাড়ির নম্বর—সবকিছু লেখা। কিছু পাতায় আবার মানুষের ছবি। আর তাদের পাশে শুধু একটা করে শব্দ—“বিক্রি”, “চাপ”, “চুপ”, “শেষ।”
সে বুঝতে পারল, এটা কোনো সাধারণ ডায়েরি নয়। এটা একটা অপরাধচক্রের হিসাব। মানুষের নাম, তাদের উপর চাপ, রেপুটেশন নষ্ট করা, ব্ল্যাকমেইল, অস্ত্র কেনাবেচা—সবকিছুর প্রমাণ।
কিন্তু এই ব্যাগ তার বাসায় কীভাবে এলো?
আরিফ ডায়েরিটা পড়া শেষ করতে পারল না। ঠিক তখনই দরজায় জোরে ধাক্কা পড়ল।
ঠক ঠক ঠক!
একবার না, তিনবার।
আরিফ নিঃশ্বাস চেপে দাঁড়িয়ে রইল। আবার ধাক্কা। এবার আরও জোরে।
একটা ভারী গলা ভেসে এল বাইরে থেকে।
“দরজা খোলো, আরিফ। তোমার কাছে যা আছে, সেটা নিয়ে কথা বলতে এসেছি।”
আরিফের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। বাইরে থেকে নাম ধরে কেউ ডাকছে। মানে তাকে চেনে। আর ব্যাগটার কথাও জানে।
সে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল, দুজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। একজন লম্বা, কালো শার্ট পরা। আরেকজনের হাতে রেইনকোট। তাদের মুখে ভয় দেখানোর মতো নিশ্চিন্তভাব। যাদের চোখে তাকালে বোঝা যায়, এরা প্রশ্ন করে না—আদেশ দেয়।
আরিফ দরজা খুলল না। সে জানালার পর্দা টেনে ফোন হাতে নিল। পুলিশের নম্বর ডায়াল করল, কিন্তু কল দেওয়ার আগেই বিদ্যুৎ চলে গেল। পুরো ঘর অন্ধকার। শুধু বাইরে রাস্তার আলো ঢুকে ম্লান ছায়া ফেলছে। আরিফ নিঃশব্দে বাথরুমের দরজার দিকে গেল। সেখানকার ছোট জানালা দিয়ে পিছনের সরু গলিতে নামা যায়।
ঠিক তখনই দরজার ওদিকে একটা শব্দ।
কিছু একটা ভেঙে পড়ল।
তারপর ভারী পায়ের শব্দ।
আরিফ বুঝল, তারা ভেতরে ঢুকে গেছে।
সে আর ভাবল না। জানালাটা ঠেলে বাথরুমের ভেতর ঢুকে পড়ল, তারপর সরু জানালা দিয়ে গলিতে লাফ দিল। কাঁটার গাছের ডাল হাতে কেটে গেল, কিন্তু সে থামল না। দৌড়াতে দৌড়াতে তার কানে শুধু একটা শব্দ ভেসে আসছিল—“ওর কাছে ব্যাগ আছে!”
গলির শেষে এসে আরিফ দেখল, একটা পুরনো নীল রঙের ভ্যান দাঁড়ানো। দরজা খোলা। ভেতর থেকে একটা মানুষ নেমে আসছে। মুখ ঢাকা। আরিফ থমকে গেল। সামনে পথ বন্ধ, পেছনে ধাওয়া। সে প্রথমবার বুঝল, সে এমন এক জালে ঢুকে পড়েছে, যার শুরু সে জানে না, শেষও জানে না।
ঠিক তখনই ভ্যানের ছায়া থেকে একটা পরিচিত মুখ বেরিয়ে এল।
আরিফের চোখ বড় হয়ে গেল।
এটা ছিল তার অফিসের বস, কামাল সাহেব।
কামাল সাহেব সবসময় খুব ভদ্র, হাসিখুশি মানুষ। অফিসে সবাই তাকে সম্মান করত। সে-ই এখন দাঁড়িয়ে আছে, আরিফের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলছে, “ডায়েরিটা দিয়ে দাও। আর কিছু জেনো না।”
আরিফ হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এগুলো কী? আপনি…?”
কামাল সাহেব একটু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা ছিল না।
“তুমি যেটা হাতে পেয়েছ, সেটা অনেক দামী জিনিস। ভুল করে হাতে এসেছে। এখন যদি বেঁচে থাকতে চাও, দিয়ে দাও।”
আরিফ পেছনে সরে গেল। “আমি পুলিশকে দেব।”
কামাল সাহেব এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “পুলিশ? পুলিশ এই গল্পের মধ্যেই আছে, আরিফ।”
এই কথাটা শুনে আরিফের বুকের ভেতর বরফ জমে গেল। যদি সত্যিই পুলিশ জড়িত থাকে, তাহলে সে কোথায় যাবে?
হঠাৎ রাস্তার অপর প্রান্তে সাইরেন শোনা গেল। কেউ হয়তো ফোন করে দিয়েছে। কামাল সাহেবের মুখে বিরক্তির ছায়া পড়ল। তিনি দ্রুত ড্রাইভারের দিকে ইশারা করলেন। কিন্তু যাওয়ার আগে আরিফের দিকে তাকিয়ে বললেন, “রাতটা বাঁচলে, কাল সকালটা পাবে না।”
ভ্যানটা চলে গেল। আরিফ স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর সে বুঝল, তার একমাত্র আশ্রয় এখন কেউ নয়—নিরাপদ জায়গা খুঁজে বের করা।
সে শহরের পুরনো অংশে তার এক পরিচিত সাংবাদিক, নীলা আপার কাছে গেল। নীলা ছিলেন অনুসন্ধানী রিপোর্টার। সত্য বের করা তার নেশা। আরিফের কথা শুনে তিনি প্রথমে অবিশ্বাস করলেও ডায়েরিটা দেখে চুপ হয়ে গেলেন। পাতায় পাতায় এমন সব তথ্য, যা দিয়ে পুরো একটা অপরাধচক্র ধরা সম্ভব। নীলার চোখ জ্বলতে লাগল।
তিনি বললেন, “এটা শুধু চুরি বা ব্ল্যাকমেইলের গল্প না। এটা বড় কিছু। এই শহরে দীর্ঘদিন ধরে কিছু মানুষকে গায়েব করা হয়েছে, আর তাদের নামের পাশে এই ডায়েরিতে ‘শেষ’ লেখা।”
আরিফ জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু ডায়েরিটা আমার কাছে এল কেন?”
নীলা একটু চুপ করে থেকে বললেন, “কারণ কেউ চেয়েছে সত্যটা তুমি খুঁজে বের করো। অথবা কেউ জানত, তুমি সেটা অন্যদের চেয়ে বেশি ভালোভাবে লুকিয়ে রাখতে পারবে।”
আরিফ অবাক হয়ে তাকাল। সে কোনো প্রশ্ন করার আগেই নীলা বললেন, “তুমি কি কখনো ভাবোনি, তোমার অফিসে যে পুরনো ফাইল ঘরে তুমি মাঝে মাঝে কাজ করতে, সেখানকার রেজিস্টারে কিছু নাম অদ্ভুতভাবে বাদ পড়ে যাচ্ছে?”
আরিফের মনে পড়ল। গত এক মাস ধরে অফিসের পুরনো কাগজপত্রে বারবার কিছু নাম মুছে যাওয়ার মতো ঘটনা দেখেছে সে। কিন্তু গুরুত্ব দেয়নি।
নীলা বললেন, “তুমি শুধু হিসাবরক্ষক নও। তুমি আসলে এমন কিছু দেখেছ, যেটা দেখা উচিত ছিল না।”
এবার আরিফের মনে পড়ল, দুই মাস আগে সে এক রাতের শিফটে অফিসে এক সহকর্মীকে কাউকে ফোন করতে শুনেছিল। ফোনে বারবার “টাকা পাঠানো হয়েছে”, “সব মিটে যাবে”, “ছেলেটা বেশি জানে না তো?”—এসব কথা। তারপর সে মানুষটা অফিস থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। সবাই বলেছিল, নাকি সে চাকরি ছেড়ে গেছে। কিন্তু আরিফ এখন বুঝতে পারছিল, গল্পটা এত সহজ ছিল না।
নীলা ডায়েরির কিছু পৃষ্ঠা স্ক্যান করে রাখলেন। তারপর বললেন, “এখন আমাদের এটা পুলিশের কাছে নয়, প্রথমে অনলাইনে জমা দিতে হবে। কারণ যাদের নাম আছে, তাদের মধ্যে একজন শুধু অফিসার নয়, একজন প্রভাবশালী লোকও আছে।”
রাত আরও গাঢ় হলো। বাইরে বৃষ্টি আবার নামতে শুরু করল। আরিফের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ভয় আর সাহস একসাথে চলতে লাগল। তিনি জানতেন, এবার পিছিয়ে যাওয়ার পথ নেই।
কিন্তু বিপদ সেখানেই শেষ নয়।
হঠাৎ নীলার ফোন বেজে উঠল। অপরিচিত নম্বর। তিনি স্পিকার অন করতেই ওপাশ থেকে একটা বিকৃত কণ্ঠ বলল, “ডায়েরিটা কারও হাতে তুলে দিয়ে লাভ নেই। তোমরা দুজনেই শহরের বাইরে পৌঁছানোর আগেই শেষ হয়ে যাবে।”
আরিফ ও নীলা একে অপরের দিকে তাকালেন। তাদের চারপাশে তখন যেন রাতের নিঃশ্বাসও ভারী হয়ে এসেছে। নীলা ধীরে ধীরে জানালার পর্দা সরালেন। বাইরে রাস্তার ওপারে একই কালো ছাতার লোককে দেখা গেল। এবার সে একা নয়। তার সাথে আরও তিনজন। একজনের হাতে লোহার রড, একজনের হাতে ব্যাগ, আর একজন গাড়ির মধ্যে বসে।
আরিফ ফিসফিস করে বলল, “এরা কি আমাদের খুঁজে পেয়েছে?”
নীলা খুব শান্ত গলায় বললেন, “না। ওরা আমাদের আগেই পেয়ে গেছে।”
আর সেখানেই গল্পের মোড় বদলে গেল।
নীলা হঠাৎ ডায়েরির শেষ পাতাটা খুলে দেখালেন। আরিফের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। শেষ পাতায় নাম লেখা—
“নীলা রহমান”
আর ঠিক তার নিচে, ছোট করে লেখা—
“সতর্ক থাকো, সে-ই এই কেসের আসল দরজা।”
আরিফ বুঝতে পারল না। নীলা নিজেই যদি এই ডায়েরির অংশ হন, তাহলে তিনি কেন সাহায্য করছেন?
নীলা তখনও চুপচাপ। তারপর খুব ধীরে বললেন, “আমাকে বিশ্বাস করো না, আরিফ। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—এই শহরে যারা সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে, তারাই সবচেয়ে বেশি লুকিয়ে রাখে।”
আরিফ পিছিয়ে গেল। “আপনি… তাহলে?”
নীলা জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন, “আমি সেই সাংবাদিকদের একজন, যারা এক বছর আগে এই চক্রের বিষয়ে রিপোর্ট বানাচ্ছিলেন। আমার সহকর্মী নিখোঁজ হয়ে যায়। আমিও থেমে গিয়েছিলাম। কিন্তু এখন আর থামব না।”
তিনি পকেট থেকে একটা ছোট পেনড্রাইভ বের করলেন। “এই ডায়েরির আসল কপি এখানেই আছে। আর অফিসের ভিতরের ক্যামেরা ফুটেজও।”
আরিফ হতভম্ব হয়ে গেল। সে এতক্ষণ যাকে সন্দেহ করছিল, আসলে সে-ই শেষ ভরসা।
বাইরে দরজায় আবার ধাক্কা পড়ল। এ বার শুধু একবার না—লাগাতার।
নীলা শান্ত গলায় বললেন, “এবার সময় শেষ।”
তিনি পেনড্রাইভটা আরিফের হাতে দিলেন। “তুমি দৌড়াবে। পেছনে তাকাবে না। পুলিশ স্টেশনের সামনে গিয়ে এটা এক সাংবাদিক বন্ধুকে দেবে। যদি আমি না আসি, এই গল্পটা তুমিই বাঁচিয়ে রাখবে।”
আরিফ কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় দরজা ভেঙে গেল। কালো ছাতার লোকেরা ভেতরে ঢুকে পড়ল। ঘরটা মুহূর্তেই চিৎকার, ধাক্কাধাক্কি আর ভাঙচুরে ভরে গেল। নীলা প্রথমজনকে ছিটকে ফেলে দিলেন। আরিফ পেছনের জানালা দিয়ে পালাল। পেনড্রাইভটা সে বুকের কাছে চেপে দৌড়াতে শুরু করল।
রাস্তার শেষে পুলিশ স্টেশন। কিন্তু সেখানেও কী সত্যিই নিরাপত্তা আছে? সে জানত না। শুধু জানত, এখন থামলে সব শেষ।
পিছন থেকে গুলি ছুটল। একটা গুলি তার কানের পাশ দিয়ে শোঁ করে গেল। সে আরেকটু হলে মাটিতে পড়ে যেত। কিন্তু তার ভেতরের ভয় এবার শক্তিতে বদলে গেল। সে প্রাণপণে দৌড়াল। স্টেশনের সামনে পৌঁছে চিৎকার করে উঠল, “আমাকে বাঁচান! এটা প্রমাণ!”
তার কণ্ঠ শুনে লোকজন জড়ো হলো। একজন পুলিশ এগিয়ে এলো। আরিফ কাঁপা হাতে পেনড্রাইভটা তুলে দিল। পুলিশ প্রথমে অবাক হলো, তারপর নীরবে ভেতরে নিয়ে গেল। সেই মুহূর্তে আরিফের পেছনে ফিরে দেখার সাহস হলো না।
পরদিন সকালে খবর ছড়িয়ে পড়ল। শহরের এক বড় অপরাধচক্র ধরা পড়েছে। অফিসের বস কামাল সাহেব, এক পুলিশ কর্মকর্তা, আর আরও কয়েকজন প্রভাবশালী লোক গ্রেপ্তার হয়েছে। নীলা জীবিত ছিলেন, তবে আহত। পরে জানা গেল, তিনিই একমাত্র মানুষ যিনি বছরের পর বছর ধরে প্রমাণ জোগাড় করছিলেন। আর আরিফ? সে শুধু ভুল জায়গায় ভুল সময়ে ছিল না—সে ছিল সেই অনিচ্ছাকৃত চাবি, যা গোটা দরজাটা খুলে দিয়েছিল।
কিন্তু গল্পের শেষেও একটা অস্বস্তি থেকে গেল।
গ্রেপ্তারের তিন দিন পর আরিফের বাসার দরজার নিচে আবার একটা খাম পাওয়া গেল। ভেতরে একটিমাত্র কাগজ। তাতে লেখা ছিল—
“তুমি যা দেখেছ, সেটা শুধু প্রথম স্তর ছিল।”
আরিফ কাগজটা হাতে নিয়ে চুপ করে রইল। জানালার বাইরে শহর তখনও আগের মতোই ছিল—গোলমেলে, ব্যস্ত, নিরীহ দেখানো, অথচ গভীরে লুকানো অন্ধকারে ভরা।
আরিফ বুঝল, কিছু সত্যি প্রকাশ পেলেও সব সত্যি কখনোই শেষ হয় না। কিছু গল্প শুধু এক রাতের জন্য থামে। তারপর আবার অন্য কোনো অন্ধকারে বেঁচে থাকে।
আর সেই রাত থেকে আরিফ আর কখনো অন্ধকারে একা হাঁটেনি।
