প্রাপ্য (পর্ব-১)
প্রাপ্য (পর্ব-১)
ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্য দিয়ে গাড়িটি এগিয়ে চলছে। সকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি, এখন অবশ্য ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে। গ্রামের কাঁদামাটির রাস্তায় ড্রাইভারকে খুব সাবধানে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। মহিন চৌধুরী তার ঘড়ির দিকে চোখ বুলিয়ে ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলল, আবজাল আর কত সময় লাগতে পারে??
- এটাতো বলা মুশকিল, রাস্তায় যে পরিমাণ কাঁদা হয়েছে, একটু এদিক সেদিক হলে গাড়ি কাঁদায় আটকে যাবে। আর এই রাস্তায় আমি আগে কখনো আসিনি। তাই অনুমান করে বলাটা খুব মুশকিল হবে, আর কত সময় লাগতে পারে।
-সাড়ে এগারোটা বাজতে চলছে, এখনো পৌঁছাতে পারলাম না, ওদিকে বুবু মনে হয় দুশ্চিন্তা শুরু করে দিয়েছে । মহিন চৌধুরী রাগের মাত্রা বাড়িয়ে স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলল, যত দোষ এই মহিলার, আমি বারবার বলেছি তুমি তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে থাকবে, কে শোনে কার কথা? সকাল ১০টায় বের হবার কথা, বের হতে হতে তিনটা বাজালো। উনি পার্লারে গিয়ে ফেরার কোন নাম নেই।
মহিন চৌধুরীর স্ত্রী রত্না বেগম বিনয়ের সুরে বলল, কি করবো, যে পরিমাণ বৃষ্টি শুরু হলো, আমিতো পার্লার থেকে বেরই হতে পারলাম না। আমি কি ভিজতে ভিজতে বাসায় ফিরতাম ?? আবজালকে বললাম গাড়ি নিয়ে আসতে, সেও না কি বাসা থেকে বৃষ্টির কারণে বের হতে পারছে না ।
- তোমার পার্লারে যাবার কি দরকার ছিল?? গত পরশু মির্জা সাহেবের মেয়ের বিয়েতে যাবে বলে আমার থেকে একগাদা টাকা নিয়ে পার্লারে গেলে। দু'দিন যেতে না যেতে আবার একগাদা টাকা নষ্ট করতে ছুটলে।
রত্না বেগম একটু বিরক্ত হয়ে বলল, কি আমি তোমার টাকা নষ্ট করি?? যখন ক্লাবে গিয়ে টাকার শ্রাদ্ধ করে আসো, তোমার সুন্দরী পিএ, কি যেন নাম? ও মনে পড়েছে রুমিন তার পেছনে যখন গাদা গাদা টাকা ওড়াও ওখন টাকা নষ্ট হয় না। আমার প্রয়োজনে টাকা দিলে তোমার হিসাব থাকে,তখন টাকা নষ্ট হয়ে যায় । আমি বলে এখনো চুপচাপ তোমার সাথে সংসার করছি। অন্য কেউ হলে, অনেক আগে তোমার সংসারের কপালে ঝাঁটা মেরে বিদায় হতো।
মহিন চৌধুরীর মেয়ে রাইসা বলল, আহ তোমরা দুজন কি শুরু করলে?? ঘরে তোমাদের ঝগড়া চলতে থাকে, এক রকম মেনে নেওয়া যায়,এখন একটা জায়গায় যাচ্ছি এখানেও শুরু করলে। তোমরা কি ঝগড়া না করে থাকতে পারো না?? সারাক্ষণ টম এন্ড জেরির মত লড়তে থাক।
রত্না বেগম বলল, তুই দেখ আজই এমন বৃষ্টি শুরু হলো, সে দোষ কি আমার?? বৃষ্টি না হলে তো ঠিক সময় বের হতে পারতাম। আমি সবার আগে পার্লারে শিডিউল করিয়ে রাখছিলাম।
রাইসা বলল, আম্মু এবার তুমি একটু থামো আমার ভালো লাগছে না।
রাইসা মহিন চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বলল আব্বু , ফুপুদের বাসা আর কত দূরে??
- আর যে কত দূর হতে পরে, ঠিক বুঝতে পারছি না, সেই ২৭ বছর আগে তোর ফুপুর বিয়েতে এই গ্রামে এসেছি আর আসা হয়নি। আশেপাশে কোন ঘর বাড়ি দোকানপাট কিছুই নেই, যে কাওকে ডেকে জিজ্ঞেস করব জগন্নাথপুর কত দূরে! দিনের আলো থাকলেও এক কথা ছিল, এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে কিছুই বুঝতে পারছি না।
- তবে যাই বলো আব্বু আমার কিন্তু খুব ভালো লাগছে, ঝিরঝির বৃষ্টি, হালকা হিমেল হাওয়া, মাঝে মধ্যে অদ্ভুত কিছু শব্দ ভেসে আসছে, অনেকটা হরহর ফিল্মের মত পরিবেশ। আশেপাশে কোন টং দোকান থাকলে সেখানে দাড়িয়ে চা খেতাম। এই আবহাওয়া এক কাপ গরম চা শরীরকে চাঙ্গা করে দিতো। আমাকে এর আগে কেন ফুপুদের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসলে না??
- কি করে নিয়ে আসি, তোর ফুপার চাকরি কারণে ওরা বিভিন্ন শহরে থেকেছে , তাদের কি আর স্থায়ী কোন ঠিকানা ছিল। বছরের দু একবার হয়ত তোর ফুপু আর ফুপা এক দু দিনের জন্য গ্রামে এসে ঘুরে যেতো। আমারও ব্যবসায় কারণে কখনো সময় হয়ে ওঠেনি।
-ফুফাতো রিটার্নমেন্ট করার পর শহরে বাড়ি করল, সেখানে থাকবে বলে কিন্তু কি মনে করে গ্রামে চলে আসলো?
-তোর ফুপুর কারণে, তোর ফুপুর শখ ছিল গ্রামে থাকবে, গ্রাম নাকি তার খুব ভালো লাগে। আমাদের বাসায় বেড়াতে গেলেই আমাকে বলত, মহিন তোর দুলাভাই রিটায়ার্ড করলে আমরা গ্রামে চলে যাবো, পাখির খাঁচার মত বন্দী জীবন আমার ভালো লাগে না।
রত্না বেগম বলল, তোর ফুপার, আকাশের কারও ইচ্ছে ছিল না গ্রামে আসার। তোর ফুপুর জেদের কারণে গ্রামে এসেছে, না হলে কি শহরের এত সুযোগ সুবিধা রেখে কেউ এই অজপাড়া গাঁয়ে পড়ে থাকে।
- আকাশ ভাইয়া কি আর গ্রামের থাকে, সে তো বার মাসে এগারো মাস শহরে থাকে। তবে এটা ঠিক গত ছয় মাস তাকে আর আগের মত শহরে দেখা যাচ্ছে না।
- গ্রামে কি একটা প্রজেক্ট শুরু করছে না কি!
আমি গ্রামের গল্প অনেক শুনেছি,
আমারও খুব ইচ্ছা করে যদি আমি গ্রামে থাকতে পারতাম, খোলা আকাশের নিচে সবুজ ঘেরা এক মাঠের মধ্যে টুনটুনি পাখির মত ছোট্ট একটা ঘর থাকবে, আমি ঐ বাড়ির উঠানের এক পাশে বসে রান্না করব। উঠানের অন্য পাশে ডালিম গাছে টুনটুনির কয়েকটি বাসা থাকবে। সারাক্ষণ ওরা ছোটাছুটি করবে, কিচিরমিচির করবে, ইস আমার ভাবতেই কি ভালো লাগছে, টুনটুনির ঘরের সামনে টুনটুনির বাসা।
মহিন চৌধুরী রাইসাকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, তোকে ছাড়া কি আমরা থাকতে পারবো?? তোর আম্মু আর আমি যতই টম এন্ড জেরির মত ঝগড়া করতে থাকি আমরাতো তোর জন্য বেঁচে আছি। তোকে ঘিরেই আমাদের ভালো মন্দ।
রাইসা কোন কথা বলল না, মুখখানা ম্লান করে জানালার বাইরে তাকালো।
মহিন চৌধুরী বুঝতে পারছে হঠাৎ কি কারণে রাইসার মন খারাপ হয়ে গেলো। তাই তিনিও চুপ হয়ে গেলো। হঠাৎ করে একটা স্তব্ধ পরিবেশ সৃষ্টি হলো।
রাইসাও বিষয়টা বুঝতে পারলো ওর মন খারাপের কারণে আব্বুর মন খারাপ হয়ে গিয়েছে , পরিবেশটা স্বাভাবিক করার জন্য আব্বুর দিকে তাকিয়ে বলল তোমরাও মাঝে মাঝে আমার বাড়ি আসবে, আমাকে দেখে যাবে। তোমরা যখন আসবে আমি দৌড়ে এসে তোমাদের জড়িয়ে ধরে টুনটুনিদের ডেকে ডেকে বলব, দেখ টুনি দেখ টুনা, দেখ আমার আব্বু আম্মু আসছে। কত মজা হবে বলো? ওরাও তোমাদের দেখে খুব খুশি হবে।
রত্না বেগম বলল আচ্ছা তোর গ্রামে থাকতে মন চাইলে তোর ফুপুর বাসায় কিছুদিন থাকিস। লাবনীকে পাত্রপক্ষের পছন্দ হলে সামনের মাসেই বিয়ে ঠিক হবে। তখন বিয়ে পর্যন্ত থেকে যাস। আমার মনে হয় না তুই গ্রামে বেশিদিন থাকতে পারবি। গ্রামের পরিবেশ আর শহরের পরিবেশ এক হবে না। যেটা দূর থেকে সুন্দর দেখা যায় সেটা কিন্তু কাছ থেকে অতটা সুন্দর লাগে না। ২/১ দিন কোথাও বেড়াতে গেলে সেখানে অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করে কিন্তু সেখানে থাকলে ঐ ভালো লাগা উপভোগ করা যায় না। সময়ের সাথে সাথে সব ভালো লাগা ম্লান হতে থাকে।
-সেটা অবশ্য ঠিকই বলেছ, মানুষ যখন কোথাও ঘুরতে যাই সেটা দু একদিনের জন্যই মজার হয়, কিন্তু স্থায়ীভাবে সেখানে থাকলে ওই মজাটা থাকে না। আচ্ছা আগে গিয়ে তো দেখি গ্রাম আমার স্বপ্নের মত হয় না কি! স্বপ্নের মত হলে ফুপুর মত আমিও না হয় গ্রামে থেকে যাবো। তোমাদের দুজনকে একটা কথা বলে রাখি, তোমরা টম এন্ড জেরির মত ঝগড়া করতে থাকবে না।
কথাটা শুনে মহিন চৌধুরী মুচকি হেসে বলল, আচ্ছা আমরা আর ঝগড়া করব না। স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলল, মনে থাকে যেন তুমি আর আমার সঙ্গে গায়ে পড়ে ঝগড়া করবে না??
- আমাকে আগে আগে খোঁচা না দিলে আমি কি গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে যায়??
হঠাৎ করে গাড়ি একটা কাঁদার গর্তে আটকে গেল, আবজাল গাড়িটা গর্ত থেকে কিছুতেই উঠাতে পারছে না।
মহিন চৌধুরী ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলল কিরে কি হলো??
- কাঁদার মধ্যে আটকে গেছে।
-দেখে চালাবি না, এমনি লেট হয়ে গেছে আবার একটা নতুন সমস্যা, তোর খেয়াল থাকে কোন দিকে??
- খেয়াল তো ঠিকই ছিল, কিছুক্ষণ আগে দূর থেকে কাওকে দেখলাম মনে হলো , গায়ে ধবধবে সাদা লম্বা পোশাক, রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছিল, হঠাৎ গায়েব হয়ে গেল। সেটা দেখতে গিয়ে এই কান্ড।
- এই রাতে রাস্তা একটা মশা মাছিও নাই আর তুই সাদা ধবধবে পোশাক পরা একটা মানুষ দেখলি। আজগুবি গল্প বলে এখন মাথা খাস না।
- সত্যি বলছি স্যার, আমি স্পষ্ট দেখেছি ধবধবে সাদা পোশাক পরে কেউ একজন খুব সাবধানে হেটে যাচ্ছে। হঠাৎ আর তার দেখে নেই। আমার মরা মায়ের কসম।
- কিছু থেকে কিছু হলে মরা মায়ের কসম, কসম ছেড়ে কি হলো সেটা দেখ।
স্যার মনে হচ্ছে গাড়ি খুব ভালো ভাবে কাঁদায় আটকে গেছে, আপনারা একটু নেমে দাঁড়ালে ভালো হতো।
- কি বলছিস, তোর মাথা ঠিক আছে? এইখানে কি ভাবে নামবো? দেখ চেষ্টা করে ওঠানো যায় কিনা?
আবজাল কিছুক্ষণ চেষ্টা করেও গাড়ি এক চুল পরিমাণ সরাতে পারলো না, যেখানের গাড়ি সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে, বাধ্য হয়ে গাড়িতে থাকা ছাতা নিয়ে তিনজনে নেমে দাঁড়ালো। এখন এতটা বৃষ্টি পড়ছে না, দুই এক ফোঁটা ঝিরঝির বৃষ্টি আর গাছের পাতায় জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। আবজাল আরো কিছু সময় চেষ্টা করেও তেমন কোন গতি করতে পারলো না ।
হঠাৎ একজন ধবধবে সাদা পোশাক পরা লোক মহিন চৌধুরীর কাঁধে হাত রেখে বলল, স্যার কোন সমস্যা, আমি কি কোন ভাবে আপনাদের সাহায্য করতে পারি??
মহিন চৌধুরী ঘুরে দেখতেই বুকের মধ্যে ধুপ করে উঠল।
🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹

