STORYMIRROR

Sayantani Ghosh

Romance

4  

Sayantani Ghosh

Romance

মেঘের শেষে রোদ্দুর

মেঘের শেষে রোদ্দুর

4 mins
7

আমার যখন তিন বছর বয়স, তখন বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেক ডাক্তার দেখানো হয়, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। ঠিক দুই মাস পর তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। বাবার সেই চওড়া কপাল আর চশমা পরা হাসিমুখটা আজও আমার আবছা মনে পড়ে।
মা লোকের বাড়ি কাজ করে সংসার চালাতেন, আমাকে মানুষ করতেন। মাও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। বাবার মৃত্যুর এক বছর পর মা-ও আমাকে একা রেখে চলে যান।
আমি মামার কাছে গেলাম। মামা-মামি মিলে আমাকে অনাথ আশ্রমে রেখে এসেছিলেন। আমি অনাথ আশ্রমেই বড় হয়েছিলাম। সেখানের সবাই খুব ভালো ছিল।
আমার যখন সাত বছর বয়স, আমাদের অনাথ আশ্রমে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট লেখক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অভিজিৎ গাঙ্গুলী এবং তাঁর স্ত্রী প্রিয়া গাঙ্গুলী।
আমি অনুষ্ঠানে একটি রবীন্দ্রসংগীত গেয়েছিলাম—
“আকাশ ভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।”
এই গান শুনে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলেই অনুপ্রাণিত হয়েছিল।
বিশিষ্ট অতিথি অভিজিৎ গাঙ্গুলী ও প্রিয়া গাঙ্গুলীর আমাকে খুব পছন্দ হয়েছিল। তাঁরা আমাকে অনাথ আশ্রম থেকে তাঁদের বাড়িতে নিয়ে আসেন।
সেই থেকে তাঁরা আমাকে মেয়ের মতো বড় করেছেন। অনাথ আশ্রমের সেই চার দেয়ালের একাকীত্ব মুছে আমার জীবনে যেন এক নতুন আকাশের খোঁজ পেলাম।
আমি ওনাদের জেঠু ও ভালো মা বলি। জেঠু ও ভালো মায়ের একটি ছেলে আছে, যার নাম শান্তনু গাঙ্গুলী। আমি তাঁকে শান্তনুদা বলে ডাকি।
আমি ওনাদের ভালোবাসা ও স্নেহে বড় হয়ে উঠেছি।
এখন—
এই বাড়িতে আমার কথাই শেষ কথা। বাড়িতে কী আনা হবে, কী রান্না হবে—সব আমি বলি। জেঠু ও ভালো মা বাইরে যাওয়ার সময় কী জামা ও শাড়ি পরবেন, তাও আমি ঠিক করে দিই।
শান্তনুদা এম.এ. পড়ার পর চণ্ডীগড়ে ডাক্তারি পড়তে গেল। আমিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ. পড়ি।
দুপুরবেলা আমি ও ভালো মা খেতে বসেছিলাম। ভালো মা আমাকে বলল,
— “খেয়ে নিয়ে একবার আমার ঘরে যাবি।”
— “ঠিক আছে।”
ভালো মায়ের গলার স্বরে কেমন যেন একটা রহস্য আর চাপা উত্তেজনা টের পাচ্ছিলাম।
আমি ভালো মায়ের ঘরে গেলাম। ভালো মা খাম খুলে কয়েকটি মেয়ের ছবি আমার হাতে দিয়ে বলল,
— “দেখ, তোর শান্তনুদার সঙ্গে কোন মেয়েকে মানাবে।”
আমি ছবিগুলো সব দেখে একটিও মেয়ে পছন্দ করতে পারলাম না।
আমি ভালো মাকে বললাম,
— “এইসব মেয়েদের সঙ্গে বিয়ে দিলে শান্তনুদা নির্ঘাত সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হবে।”
আমি একটু থেমেই বললাম,
— “কী মেয়েদের রুচি দেখো, ভালো মা! শান্তনুদা তো এদের সঙ্গে এক সেকেন্ডও থাকতে পারবে না। এদের হাতে জল খাওয়া তো দূরের কথা!”
ভালো মা আমার হাত থেকে ছবিগুলো কেড়ে নিয়ে বলল,
— “তুই তাহলে শান্তনুর জন্য স্বর্গের অপ্সরা নিয়ে আসবি?”
আমি সঙ্গে সঙ্গেই বললাম,
— “শান্তনুদা কোনোদিন বিয়ে করবে না, আইবুড়ো থাকবে, তবুও এই মেয়েদের বিয়ে করবে না।”
বিকেলে জেঠু অফিস থেকে বাড়িতে আসতেই ভালো মা জেঠুকে ছবিগুলো দিয়ে বলল,
— “দেখো, আমাদের শান্তনুর জন্য কোন মেয়েকে তোমার পছন্দ?”
জেঠু বলল,
— “স্মৃতি দেখেছে? ও কী বলল?”
ভালো মা একটু রেগেই বলল,
— “স্মৃতির একটাও মেয়ে পছন্দ হয়নি। ও স্বর্গের অপ্সরা নিয়ে আসবে!”
জেঠু তখন বলল,
— “স্মৃতির যেহেতু পছন্দ হয়নি, তাহলে থাক। অন্য মেয়ে দেখা যাবে।”
আমি ঘরে ঢুকেই বললাম,
— “তোমরা এত চিন্তা করছ কেন? শান্তনুদা তো কাল আসছে। তখন তাকেই দেখিও। যে বিয়ে করবে, তার কাকে পছন্দ, সেই বলবে।”
জেঠু বলল,
— “ঠিক বলেছিস।”
ভালো মা ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে বলল,
— “আমার ছেলেটার আর বিয়েই হলো না, এই তোমাদের জন্য!”
সকালে জেঠু শান্তনুদাকে বাড়ি নিয়ে আসার পর ঘণ্টা দুয়েক হইহুল্লোড়ে কেটে গেল।
ভালো মা বলল,
— “স্মৃতি, তোর শান্তনুদাকে মেয়েদের ছবিগুলো দেখিয়ে আয়।”
আমি শান্তনুদার ঘরে গেলাম। ছবিগুলো শান্তনুদার হাতে দিয়ে বললাম,
— “ভালো মা তোমার জন্য দেখেছে।”
শান্তনুদা টেবিলের ওপর ছবিগুলো রেখে দিয়ে আমাকে বলল,
— “মনে আছে স্মৃতি, যখন আমি প্রথম হোস্টেলে পড়তে যাচ্ছিলাম, তুই লুকিয়ে আমার ব্যাগে তোর হাতের তৈরি একটা কার্ড রেখে দিয়েছিলি? তখন থেকেই তুই আমার পুরোটা জুড়ে আছিস।”
আমাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল,
— “অন্য মেয়েকে বিয়ে করব বলে তোকে দশ বছর ধরে ভালোবাসলাম?”
শান্তনুদার মুখে এই কথা শুনে আমার বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। লজ্জায় আর আনন্দে চোখ দুটো জলে ভরে উঠল। মুখ ফুটে একটা কথাও বলতে পারলাম না।
ভালো মা গেটের বাইরে থেকে আমাদের কথা শুনে জেঠুর কাছে ছুটে গিয়ে বলল,
— “আমার ছেলের জন্য পাত্রী পেয়ে গেছি!”
জেঠু চেয়ার থেকে উঠে বলল,
— “পাত্রী কে?”
ভালো মা একগাল হাসি নিয়ে জেঠুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— “তুমি তাড়াতাড়ি বিয়ের আয়োজন করো। পাত্রী আমাদের স্মৃতি!”
ভালো মায়ের কথা শুনে দরজার আড়াল থেকে শান্তনুদা আমার দিকে তাকিয়ে একগাল হাসল। আর আমি লজ্জায় মুখ লুকিয়ে জেঠু আর ভালো মায়ের পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করলাম।
মেঘ কেটে গিয়ে আমাদের জীবনে সত্যিই আজ রোদ্দুর নেমে এসেছে।

                          — সমাপ্ত —


এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Romance