STORYMIRROR

Indra Banerjee

Romance Tragedy

3  

Indra Banerjee

Romance Tragedy

নীলা

নীলা

6 mins
17


গ্রামের প্রতি আমার টানটা বরাবরই গভীর। খোলা আকাশ, মুক্ত বাতাস, সবুজের সমারোহ—এসবের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে ভালো লাগে। গ্রামের পুকুরে স্নান করা আর মাছ ধরা, এই দুটোই আমার সবচেয়ে প্রিয়। এ যেন জীবনের এক অদ্ভুত স্বাদ। তাই যখনই বাল্যবন্ধু সমীরের কাকার শ্বশুরবাড়ি শিমুরালিতে যাওয়ার সুযোগ পেলাম, তখন এক মুহূর্তও হাঁ বলতে দ্বিধা করিনি।

শিমুরালি নদীয়া জেলার এক শান্ত, নিরিবিলি গ্রাম। কলকাতা শহর থেকে মাত্র দুই ঘন্টার দূরে অবস্থিথ এই গ্রামে পৌঁছানোর পর, তার চারপাশের সৌন্দর্য আমাকে নিমেষে মুগ্ধ করল। একটি ভ্যান রিকশায় কাকার শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে আমার কাঙ্খিত স্বপ্ন পুরোনোর রসদ পেয়ে গেলাম। চোখের সামনে এক মস্ত বড় ঝিল, ঠিক কাকার শ্বশুরবাড়ির সামনের রাস্তার পাশে । ব্যস, এতো বড় পুকুর দেখে আমি হৈ হৈ করে উঠলাম, কিন্তু কাকার কথায় আমার সেই উৎসাহ নিমেষে হতাশায় পরিণত হলো। জানা গেলো ওই পুকুরটি ইজারা দেওয়া আছে, তাই ঠিক সেই কারণে ওই পুকুরে স্নান করা যাবে না । আমার নিরাশা দেখে কাকার শ্বশুর ত্রাতার ভূমিকা পালন করলেন এবং জানালেন, 'কোনো চিন্তা নেই, তোমরা সবাই আমাদের রায় বাড়ির পুকুরে স্নান করো, সেই সঙ্গে তিনি আমাদের বার বার করে বলে দিয়েছিলেন, যেন অবশই ওদের বাড়ির অনুমতি নিয়েই স্নান করা হয় ।

কিছুটা পথ হেঁটে রায় বাড়ির পুকুরে পৌঁছে, আমি তো মুগ্ধ হয়ে গেলাম। পুকুরের চারপাশে ঘন গাছপালা, বাঁধানো পরিষ্কার ঘাট, সেইসাথে জলটা এতো পরিষ্কার যে আমার আর তার সইল না। গায়ের গামছাটা খুলে একদম সোজা পুকুরে ঝাঁপ মারলাম। আঃ, ট্রেন জার্নির পার এই রকম ঠান্ডা জলে স্নান করা, একটা অন্যরকম অনুভূতি। কিছুক্ষনের মধ্যে আমি মাঝ পুকুরে সাঁতার কাটতে কাটতে চলে গেলাম, সমীর ও কাকা পুকুরের ঘাটে বসেই কথা বলছিলো । কিন্তু হঠাৎই আমার স্নানের আনন্দটা বিষাদে পরিণত হলো।

হটাৎ চিৎকার চেঁচামিচি শুনে তাকিয়ে দেখলাম, রায় বাড়ির একজন কর্মচারী আমাদের দেখে চিৎকার করে কিছু একটা বলছে, শুনে বুঝলাম, সে বলছে ‘এই তোমরা কারা, কাকে জিজ্ঞাসা করে এখানে স্নান করছো?’ ঘটনার বিড়ম্বতায় আমরা রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। ওই চিৎকারে রায় বাড়ির আরও কিছু সদস্য এক ষণ্ডামার্কা দারোয়ানকে নিয়ে পুকুরের ঘাটে এসে উপস্থিত হলো। আমার অস্ফুট উক্তি, যা কেলো করেছে! চেয়ে দেখলাম, সমীর ও কাকার অবস্থাও বেশ শোচনীয়। সেই অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যে, আমার চোখ গিয়ে পড়লো এক ষোড়শী-সপ্তদশী শ্যামবর্ণ মেয়ের দিকে, যে ওই ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়েছিল। আমার দৃষ্টি তার দিকে পড়েছিল কারণ, সে কিন্তু কোনো চিৎকার করছিলো না, বরং উপস্থিত অন্য সবাই কে কিছু একটা বারণ করছিলো। তার সেই দৃষ্টি কখনোই ভোলার নয়।


পুকুরের ঘাটে উঠে জানতে পারলাম সে ওই রায় বাড়িরই মেয়ে, নাম নীলা। সেদিনের তার সেই সরলতা মাখা নিষ্পাপ দৃষ্টির মধ্যে কিছু একটা ছিল, যা আমি আজও ভুলতে পারি নি, মনের নিভৃতে রয়ে গিয়েছে । সেখানে দাঁড়িয়ে সে সবাইকে কিছু একটা বলতে চাইছিলো, সবাই কে কিছু একটা বারণ করতে চেয়েছিলো, যা কেউই কর্ণপাত করেনি। 

ঘটনার পরপরই, পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলো। রায় বাড়ির একজন সদস্য আমাদের পরিচয় জানতে পেরে ক্ষমা চাইলেন। আমরাও একে একে পুকুর থেকে উঠে এলাম। সবকিছুই ঠিক ছিল, কিন্তু কেন জানি না আমার তাল কেটে গেয়েছিল।

 কাকার বাড়িতে ফিরে মনে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি বোধ করলাম । দুপুরের সুস্বাদু রান্নার পদগুলিও ঠিক জমলো না। বুজলাম - আমার কিছু একটা হয়েছে। মনকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কি কিছু মিস করছি?বসার ঘর থেকে 'নীলা' নাম তা শুনে, ধীর পায়ে একটা ছোট বাক্সর ওপর বসে পারলাম। জানলাম নীলার অনেক কথা। লেখাপড়া স্বভাবে এক খুব ভালো মেয়ের কথা। তার ভালো লাগার বিষয়গুলি, জীবনে চাওয়া পাওয়ার কথা। খুব দেখতে ইচ্ছে করছিলো তাকে, ইচ্ছে করছিলো তার সাথে কথা বলি - অনেক গল্প করি, শেয়ার করি আমাদের নিজেদের মনের কথা। লজ্জার মাথা খেয়ে কাকিমাকে বলেই ফেললাম, ডাক না তাকে একবার। 

সেদিন বিকেলে, আমরা কাকার শ্বশুরবাড়ির উঠোনে বাড়ির সবাই মিলে গল্প করছিলাম। সবাই খুব জমিয়ে আড্ডা দিলেও, আমি খুব একটা স্বাছন্দ্য বোধ করছিলাম না। আসলে, সকালের ওই মেয়েটি যেন আমার মন থেকে সরতেই চাইছিল না।

কিছুক্ষন পর আমি সবার মাঝ থেকে উঠে পাশের বড় ঝিলটার দিকে কিছুটা এগেয়েছি, ঠিক তখনই এক সুরেলা রিনরিনে কণ্ঠস্বর আমাকে পিছন ফিরে তাকাতে, একপ্রকার বাধ্য করলো। শুনলাম, কেমন আছিস রিনাদি ! কাকিমা চেঁচিয়ে উঠলো, তুই এতক্ষনে এলি ? সকালে যা কান্ড হলো তোদের ওখানে, তুই কোথায় ছিলিস। 'সরি রিনাদি, আমি ওখানেই ছিলাম, আসলে কি হয়েছিল - সবাই মিলে এতো হৈ চৈ শুরু করলো যে আমি কিছু বলারই সুযোগ পেলাম না। আমার সবথেকে খারাপ লাগছিলো জামাই দাদাভাই এর জন্য। আসলে অকেন দিন পর দাদাভাই কে দেখলাম তো। কাকিমা শুনে বললো সে ঠিক আছে, যা হবার তা হয়ে গেছে, তুই হয়তো ভুলে গিয়েছিলি, কিন্তু আমি তোর মাকে জানিয়েছিলাম কলকাতা থেকে তোদের জামাইয়ের আসার ব্যাপারে।

প্রথমে সকলের থেকে ক্ষমা চেয়ে সে ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এসে বললো, ‘আপনাদের নিশ্চয়ই আজ খুব অসুবিধে হয়েছে ? তার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। আসলে আমাদের পরিবারে এমন কিছু ব্যক্তিরা আছেন, যাদের সব বিষয়ে বাড়াবাড়ি করাটা একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে, তাই এমনটা হয়েছে।’ ক্ষমা চাইছি, প্লিজ- কিছু মনে করবেন না। 

আমি তখন বললাম, ‘না না , সে ঠিক আছে আপনাদের জন্য তো কিছু হয়নি। বরং আমি ক্ষমাপ্রার্থী, অনুমতি ছাড়া পুকুরে স্নান করতে গিয়েছিলাম ।’ আসলে শহরের মানুষ তো, পুকুরে স্নান করাটা হয়ে ওঠে না। তাই এতো সুন্দর পুকুর দেখে, কিছু নি ভেবেই দুম করে নেমে পরলাম। 

মেয়েটি মুচকি হেসে বললো, ‘আমি নীলা। আপনার নাম ইন্দ্র, তাই না?’

আমি হেসে মাথা নাড়লাম। তারপর আমাদের কথোপকথন ধীরে ধীরে শুরু হলো। নীলার সঙ্গে কথা বলতে বলতে সময় যেন উড়ে গেল। সেই তিন দিনের ছোট সময়ের পরিসরে, সে ঠিক সময় বের করে আমার কাছে আসতো। আমরা অনেক কিছুই শেয়ার করতাম , তার ছোটবেলার গল্প, গ্রামের জীবন, আর আমার শহরের জীবনের গল্প।

নীলা ছিল খুব মিষ্টি, আর তার সরলতাটা আমাকে বার বার মুগ্ধ করেছিল। ওই কদিনে সে একটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে পড়েছিল। সেই কারণেই হয়তো আমাদের মধ্যে এক অদ্ভুত বন্ধন তৈরি হলো।

শিমুরালিতে কাটানো সেই কয়েকটা দিন আমার জীবনের অন্যতম সুন্দর অভিজ্ঞতা। প্রতিদিন নীলার সঙ্গে সময় কাটানো, পুকুরের ধারে বসে গল্প করা, গ্রামের পথে হাঁটতে হাঁটতে সূর্যাস্ত দেখা—এমন মিষ্টি মুহূর্তগুলো মনে গেঁথে রইলো। সত্যিই নীলার সরলতা আমাকে ছুঁয়ে গিয়েছিলো। আমার তাকে ভালো লেগেছিলো। ফিরে আসার দিন অনুভব করলাম আমার প্রতি নীলার অনুরক্ত হবার কথা। তার হঠাৎ চুপ করে যাওয়া, চোখের কোন জল , ধরা গলা - সর্বোপরি আমাকে আরো কয়েকদিন ওখানে থেকে যাওয়ার জেদাজেদির মধ্যে, আমাকে ঘিরে তার মনে হয়তো কোনো একটা স্বপ্নের জাল সে বুনছিলো। 

আমরা ফিরে এলাম। শহরে ফিরে আসার পরও নীলার সাথে আমার যোগাযোগ ছিল। আমরা কথা বলতাম চিঠির মাধ্যমে, যেখানে একে অপরের জীবনের গল্প শেয়ার করতাম, শেয়ার করতাম মনের কথা । কিছু না বলা কথা সে আমাকে জানাতো, আমার কাছ থেকে শুনতে চাইতো। আমাদের সেই মুহূর্তগুলো তার জীবনে এক বিশেষ অধ্যায় হয়ে থাকবে, সে আমাকে তা জানাতো । এই ভাবেই বেশ কয়েক বছর পার হয়ে গেলো। সময়ের নিয়মে আমিও আমার কর্মজীবনে বাস্ত্য হয়ে উঠলাম। তার সব চিঠির উত্তর আমি আর দিতে পারতাম না, আসলে আমার কাছে হয়তো সে ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছিল। 

মাঝে বেশ কয়েক বছর কেটে গেলো। কোনো এক শীতের দুপুরে নীলার চিঠিতে জানতে পারলাম যে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। পাত্র মুম্বাই নিবাসী এক মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। নীলার বাবার খুবই পরিচিত ওই ছেলেটি। নীলার চিঠির বয়ানটা কেমন যেন খাপছাড়া, সে খুশি না অখুশি সেটা বোঝা গেলো না, শুধু তার একটাই অভিযোগ - কেন আমি কিছু বলিনি? নীলার বিয়ে -একথাটা আমার কাছে কিছুটা অপ্রত্যাশিতই ছিল। নীলা যে একদিন পর হয়ে যাবে, সে কথা আমি কোনোদিন ভাবি নি। নীলা হয়তো আশা করেছিল আমি কিছু একটা বলবো, আমার মনের কথা তাঁকে জানাবো । তার প্রতি আমার দুর্বলতা, আমার ভালোলাগা, সর্বোপরি আমার ভালোবাসা, এই সবকিছু আমি তাকে জানাবো। কিন্তু না, আমার মনে তখনকার মতো তেমন কিছুই আর ছিল না। হয়তো শহরের বাস্ত্যময় জীবনে নীলাকে নিয়ে চিন্তা করার মতো অবকাশ, হয়তো বা তেমন কোনো ইচ্ছাও আর আমার ছিল না। স্বভাবতঃই আমি কোনো কষ্ট অনুভব করলাম না। কিন্তু বুঝতে পারলাম যে জীবনের এই অধ্যায়টি বন্ধ করতে হবে, মুছে ফেলতে হবে নীলাকে। 

এরপর বহু বছর কেটে গেছে। এখন আমি পুরোদস্তুর এক সংসারী মানুষ, আর তাই বাস্তব জীবনের কঠিন পথচলায় প্রেম-ভালোবাসার ভাবনাগুলো মনের কোনো কোণে চাপা পড়ে গেছে। তাই যখনই কারুর কাছে প্রেম ভালোবাসার কথা শুনি, আমি তাকে বলি, ওসব ফাঁদে কখনো পড়তে নেই।

কিন্তু সত্যি বলতে, সময়ের অবকাশে আজও মনে পড়ে, শিমুরালির সেই দিনগুলো, নীলার সেই গভীর দৃষ্টি, আমার প্রতি তার ব্যাকুলতা, সবকিছু —এসবই কি সত্যি ভুলে যাওয়া সম্ভব? আমি হয়তো এখন নিজের অক্ষমতাকে চাপা দিতে চাইছি, কিন্তু অজান্তে আমি জানি মনের গভীরে নীলার স্মৃতিগুলো আজও রয়ে গেছে।

হয়তো সেই কারণে, এই অস্বীকারের মধ্যে কি আমি নিজেকে বাঁচাতে চাইছি! হয়তো বা ভালোবাসার সেই অনুভূতিগুলোকে ভুলে গিয়ে বাস্তব জীবনে স্থির হতে চাইছি? এই প্রশ্নের উত্তর আমি আজও খুঁজে চলেছি । 


________________*****_________________


এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

More bengali story from Indra Banerjee

নীলা

নীলা

6 mins পড়া

Similar bengali story from Romance