STORYMIRROR

Aniya Ahmad

Drama Horror Thriller

4.2  

Aniya Ahmad

Drama Horror Thriller

ছায়া বাস্তব

ছায়া বাস্তব

4 mins
7

​টেবিলের এক কোণায় ঘুণের কটকট শব্দটা নিতান্তই বিরক্তিকর। তবে এই শুনশান ফাঁকা ঘরে একাকী কাজের মুহূর্তে ঘুণের এই একটানা আওয়াজটাও একেবারে মন্দ লাগছে না। নিজের মনে যেন সেই ঘুণ ধরার শব্দটাই বুঁদ হয়ে শুনছে আরবিদ। ঘরের আসবাবপত্র এদিক-ওদিক ছড়ানো-ছিটানো, সবকিছু একদম হযবরল হয়ে আছে। নতুন বাসা বদলানোর ঝক্কি তো এই একটাই! ঘরের চারপাশটায় একবার আলতো চোখ বুলিয়ে নিয়ে সেই আগের মতো গভীর আলসেমি ভর করে বসে রইল সে।

​ঠিক তখনই বেজে উঠল মোবাইল ফোনটা। আরবিদকে এমন অলসতায় চেপে ধরেছে যে ফোনটা হাতে তুলে নেওয়ার শক্তিটুকুও যেন নেই। তবুও জরুরি কোনো বিষয় ভেবে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রিসিভ করল সে। ওপাশ থেকে ভেসে এলো বন্ধু অসীমের কণ্ঠ—

​"আরবিদ! আমি বাকি জিনিসপত্র নিয়ে সকালেই আসছি। তুই পারলে সব গুছিয়ে রেখে বাইরে থেকে কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়িস।"

​আরবিদের অলস জড়ানো উত্তর, "হুমম..."

​কথা শেষেই ফোনটা পাশে রেখে আবার আগের ভঙ্গিমায় ঢলে পড়ল সে। ঘুণপোকার কাটার শব্দটাও এখন আর আগের মতো সুনির্দিষ্ট তালে হচ্ছে না; মনে হয় ঘুণপোকাটার ওপরেও আরবিদের মতোই অলসতার ভূত ভর করেছে! ভাবতে ভাবতে শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিল আরবিদ। সারাদিনের খাটাখাটুনির ক্লান্ত শরীর আর একঘেয়ে থমথমে মুহূর্তে তার চোখ দুটো আঠার মতো লেগে এলো। প্রবল ঘুমাচ্ছন্নতা ঠেকানোর সাধ্য তার ছিল না।

​ক্লান্তির সেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েই অদ্ভুত এক স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করল আরবিদ...

​এক অচেনা, রহস্যময় স্থানে দাঁড়িয়ে আছে সে। পায়ের নিচে শুকনো পাতার মড়মড় আওয়াজ, মাঝে মাঝে হুটহাট মাথা উঁচু করে উঁকি দিচ্ছে দু-একটা অজ্ঞাত বুনো ফুল। চারপাশের ন্যাড়া, শুকিয়ে যাওয়া গাছগুলো দেখে মনে হয় যেন কোনো মৃত বনভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে সে! এত বড় বনে পাখির কলকাকলি তো দূরের কথা, কোনো কীট-পতঙ্গের অস্তিত্বও টের পাওয়া যাচ্ছে না।

​সামনে দু-এক পা এগোতেই হঠাৎ কিছু একটা নড়ে ওঠার শব্দ কানে এলো। শুকনো পাতায় কোনো কিছুর উপস্থিতি খুব ভালোভাবেই টের পাওয়া যায়। অনুভূতির স্পষ্ট সংকেত—তার ঠিক পেছনেই কেউ একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে! অবিকল যেন কেউ পা ফেলে এগোচ্ছে তার দিকে। দ্বিধাগ্রস্ত মনে পেছন ফিরে তাকাতেই চোখ দুটো কপালে উঠে গেল আরবিদের!

​নিজের ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে—সে নিজেই!

​তবে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তার অবিকল প্রতিরূপটির মুখে এক হিংস্র, কুটিল হাসি ঝুলছে। দেখতে দেখতে মুহূর্তের মধ্যেই পালটে যেতে লাগল পরিবেশটা! আরবিদের সেই প্রতিরূপটা রূপান্তরিত হতে শুরু করল এক নারকীয়, লোমহর্ষক রূপে! কেমন যেন কোটর থেকে লোহাপিন্ড দিয়ে টেনে বের করে আনা জোড়া চোখ, চামড়াগুলো ছাল-চামড়াহীন হয়ে এক একটা জায়গা থেকে খসে পড়ছে, আর মুখগহ্বরে মাংস বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই!

​প্রতি রূপটার এই ভয়াল চেহারা দেখে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল আরবিদ। ঠিক তখনই বীভৎস সত্তাটি এসে আরবিদের গলা চেপে ধরল! প্রাণপণ চেষ্টা করেও শ্বাসনালী থেকে কোনো আওয়াজ বের করতে পারছে না সে। কোনোমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে জীবন বাঁচাতে ছুটতে শুরু করল আরবিদ। পকেটে মোবাইলের অনুভূতি পেয়ে কেঁপে ওঠা হাতে ফোন লাগাল অসীমকে।

​কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না—পা পিছলে কাদার ওপর আছড়ে পড়ল সে! হাতের ফোনটা ছিটকে পড়ে কাদায় মাখামাঝি হয়ে গেল। নাক ফেটে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। আর পেছনে থাকা সেই ভয়ংকর অবয়বটি একদম কাছে চলে এসেছে!

​হঠাৎ চারপাশটা এক ঘন, থমথমে কুয়াশায় ঢেকে গেল। চৈত্র কিংবা বৈশাখেও এমন কুয়াশা সম্ভব নয়—এমনকি নিজের নাকের ডগা অব্দি দেখা যাচ্ছে না! এই ভয়ার্ত অন্ধকারের ভিড়ে বহু দূর থেকে ভেসে আসছে কার যেন গম্ভীর কণ্ঠের ডাক... কেউ একজন একটানা তার নাম ধরে ডেকে চলেছে!

​প্রচণ্ড এক ধাক্কায় চোখ মেলে লাফিয়ে উঠে বসল আরবিদ!

​চোখ খুলেই সামনে অসীমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল সে। সকাল হয়ে গেছে, তবে ঘরের কোণগুলোতে রাতের আবছা অন্ধকারের রেশ তখনও জমাট বেঁধে আছে।

​অসীম কাজে হাত দিতে দিতে ক্ষোভ প্রকাশ করল, "কখন থেকে ডাকছি, শুনতে পাস না নাকি?"

​ধড়ফড় করে উঠে ওয়াশরুমে গেল আরবিদ। আয়নার দিকে তাকাতেই তার গা শিউরে উঠল—তার নাকের পাশে তখনও জমাট বাঁধা তাজা রক্তের স্পষ্ট দাগ! চকিতে মনের ভেতর খেলে গেল রাতের সেই ভয়াবহ স্বপ্নের কথা।

​ছুটে বিছানার কাছে গেল আরবিদ। কাঁপতে থাকা হাতে ফোনটা তুলে নিল—স্ক্রিনের একপাশে তখনও শুকিয়ে যাওয়া কাদার ছাপ লেগে আছে! কাঁপা আঙুলে কল-লগ চেক করতেই বুকটা হিম হয়ে গেল তার—স্বপ্নে ঠিক যে সময়ে সে অসীমকে ডায়াল করেছিল, ঠিক সেই সময়েই একটা ডায়ালড কল শো করছে রেজিস্টারে!

​কিন্তু... এটা কী করে সম্ভব?! যা কিছু সে স্বপ্নে দেখেছে, তা কীভাবে বাস্তব রূপ নিতে পারে?

​আরবিদের মনে এই পুরো বিষয়টাই এক গহীন রহস্যের জন্ম দিল। তবে এই রহস্যের কোনো উত্তর আরবিদের জানা নেই। কী ছিল তবে রাতের সেই স্বপ্ন? আদোও কি ওটা কোনো স্বপ্ন ছিল, নাকি সে প্রবেশ করে ফেলেছিল অন্য কোনো রহস্যময় সমান্তরাল জগতে...?


এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Drama