arijit bhattacharya

Children Stories Horror

3  

arijit bhattacharya

Children Stories Horror

সময়ঘূর্ণি

সময়ঘূর্ণি

5 mins
646



তুষারে মোড়া ছবির মতো সুন্দর অ্যালপাইন সুইজারল্যান্ডে অবস্থিত ছোট্ট সুন্দর গ্রাম ম্যান্ডারমট। পাইন ফারের অরণ্যে ঘেরা আর দিগন্তরেখায় আল্পসের তুষারমোড়া শৃঙ্গ দিয়ে সুসজ্জিত এই গ্রামের সৌন্দর্য এতই অনুপম যে মনে হয় , এটিকে কোনো সুদক্ষ চিত্রশিল্পী ততোধিক সুন্দর রঙের তুলি আর নিজের সর্বোৎকৃষ্ট কল্পনার সাহায্য নিয়ে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন। পাশ দিয়ে সদ্যযৌবনা চঞ্চলা যুবতীর মতো দুর্বার বেগে তিরতির করে বয়ে চলেছে সান নদী।গ্রীষ্ম ও বসন্তকালে এই গ্রামের প্রকৃতি সত্যিই রাণীর মতো সেজে ওঠে, তাই এই গ্রাম তখন পর্যটকদের কাছে মূল আকর্ষণ।


অনেকদিন আগের কথা।এই গ্রামেরই একজন সম্পন্ন কৃষক মাইকেল ডারলিম্পল। ঘরে যুবতী স্ত্রী, ছোট্ট দুই ছেলেমেয়ে আর এক বৃদ্ধা মাকে নিয়ে সাজানো গোজানো সুন্দর সংসার তার। আল্পসের উপত্যকার কোলে সুন্দর ছবির মতো ফার্মহাউস। বলতে গেলে, পরিশ্রমী, নিরহংকারী আর মিশুকে মাইকেলকে গ্রামের সবাই স্নেহ ও সম্মান করে। গ্রামের শিশুদের কাছেও পছন্দের পাত্র সে। প্রভু যিশুর পরম অনুগত ভক্ত মাইকেলও শিশুদের ঈশ্বরের দূত বলে মনে করে।

এমনভাবে স্বপ্নের মতো কেটে যাচ্ছিল দিনগুলি।এইসময় একদিন সন্ধ্যার কথা। ফার্মহাউস থেকে প্রচণ্ড পরিশ্রান্ত এবং ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে এল মাইকেল। প্রকৃতিতে এক অদ্ভূত নীরবতা। এক অদ্ভূত আলো আঁধারি। উপরতলায় তার স্ত্রী ছেলে আর মেয়েকে পড়াতে ব্যস্ত। বৃদ্ধা মা একমনে কাপড় বুনে চলেছেন।মাইক বাড়ি এসে কবিতা লেখার কাজে মন দিল। বলতে গেলে এটাও তার এক বিশেষ গুণ!


হঠাৎই দরজায় শব্দ হল খট খট খট। মাইক শুনতে পেল তারই নাম করে কেউ ডাকছে। অবাক হল সে। এইসময় তার প্রয়োজন কার থাকতে পারে!যাই হোক,গ্রামবাসীদের সুবিধা অসুবিধায় তো তাকেই ছুটে যেতে হয়। এটা তার দায়িত্ব আর কর্তব্য দুটোরই মধ্যে পড়ে।

মনকে দৃঢ় করে নিচের তলায় নেমে দরজা খুলল মাইক।আলো আঁধারিতে দেখতে পেল এক অদ্ভূত লোক,কাঁধ অবধি লম্বা জটপাকানো চুল,বুক অবধি লম্বা দাড়ি, ছ ফুট লম্বা আর লোকটা যে পোষাকটা পরে আছে সেটাও অদ্ভূত। যতদূর মনে হচ্ছে কোনো বুনো জন্তুর কালো লোম দিয়ে বুনন করা হয়েছে পোষাকটা!কিম্ভূতকিমাকার লোকটার কাঁধে কিম্ভূতকিমাকার এক বিশাল বোঝা। হয়তো লোকটা গ্রামেরই কোনো বাড়ির অতিথি হয়ে এসেছে। আর বৃদ্ধ হয়েছে!তাই বোঝাটা বহন করতে হয়তো পারছে না। তাই এই বোঝাটা এখন হয়তো মাইক কেই বহন করতে হবে। কিন্তু,মাইকেলের যতদূর মনে পড়ছে,এর আগে লোকটাকে সে কোনোদিনই গ্রামে দেখেনি। লোকটা মাইকেলের নাম জানল কি করে!


লোকটা আকারে ইঙ্গিতে ইশারা করল মাইকেলকে। হয়তো তার মাথার বোঝাটা ধরে সাহায্য করতে লাগল। লোকটা ভীষণভাবে হাঁফাচ্ছিল। যাই হোক,লোকটার প্রস্তাবে সায় দিল মাইকেল ডারলিম্পল। লোকটার সাথে সাথে হাঁটতে লাগল মাইকেল। বাবা,কি জোরে হাঁটে রে লোকটা!যেন বাতাসে ভর দিয়ে চলছে। হাঁটতে হাঁটতে গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে আসল তারা। লোকটার পেছনে যেন সম্মোহিত হয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো যেন হাঁটতে থাকল মাইকেল। দুপাশে ধূ ধূ করছে ফাঁকা মাঠ । দিগন্তরেখায় আল্পসের তুষারমোড়া শৃঙ্গ মায়াবী জ্যোৎস্নায় ঝলমল করছে। খোলা আকাশে প্রেমের গান গাইছে পূর্ণিমার গোল চাঁদ। চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে গেল মাইক। লোকটি তার ঝোলা থেকে বের করল অদ্ভূত এক পানীয় গোলাপী রঙের। কিরকম কটু গন্ধ!দারুণ ঠাণ্ডা। তাই প্রাণভরে খেল সে। কিন্তু সে কতক্ষণ আর হাঁটবে এই অদ্ভুত লোকটার সাথে!

আজ রাতে প্রকৃতিকে সত্যিই অপূর্ব লাগছে। আঁধারেরও যে এমন সৌন্দর্য থাকে এতদিন মাইকের চোখেই পড়েনি। এই নিশুতি রাতে এই রহস্যময় সঙ্গী তাকে কোন্ রহস্যের দিকে নিয়ে এসেছে !

এইসময় হঠাৎই চমক ভাঙল ডারলিম্পলের। কোথায় গেল সেই অদ্ভুত লোকটা!আর এই জ্যোৎস্নারাতে সে জলতরঙ্গের 

মাধুর্য নিয়ে বয়ে যাওয়া ফনের সুগন্ধ গায়ে মেখে কোন্ অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিচ্ছে। আর কেনই বা দিচ্ছে!সে কি পাগল হয়ে গেল নাকি।

আর আকাশই বা কেন এত অন্ধকার হয়ে এসেছে!অবাক হয়ে দেখতে থাকল মাইক,হঠাৎই আকাশে ছেয়ে পড়েছে ঘনকৃষ্ণ মেঘরাজি। আর সেই আবরণে ঢাকা পড়েছে চন্দ্রমার সুন্দর মুখশ্রী।তাকে অবাক করে দিয়ে শুরু হল প্রচণ্ড ঝড়। একটা ব্যাপার অনুভব করল মাইকেল ,ঝড়টা যেন তার চারপাশেই হচ্ছে। সে যেন হঠাৎই কোনো ভয়ঙ্কর প্রলয়ঘূর্ণির মধ্যে পড়েছে। আতঙ্কে চোখ বুজল মাইক।

সকালের রোদের ভালোবাসা মাখানো স্পর্শে আর পাখির মন মাতানো কূজনে ঘুম ভাঙল ডারলিম্পলের। সে যেন অনেকক্ষণ ধরে ঘুমিয়েছে। পোষাকেও ধূলোবালি লেগে রয়েছে। আগের রাতের সেই অদ্ভুত পোষাক পরা রহস্যময় ব্যক্তি আর প্রলয়ঙ্কর ঘূর্ণির কথা মনে পড়ল ডারলিম্পলের।

কিন্তু যতই গ্রামের কাছে আসতে লাগল এক প্রবল অস্বস্তিতে ভরে উঠতে লাগল মাইকেলের মন। একইভাবে মৃদুমন্দ গতিতে বয়ে চলছে ফন,মাথার ওপর সুনীল আকাশ আর তাতে ভেসে চলেছে পেঁজা পেঁজা সাদা মেঘখণ্ড। স্বর্ণালী এক সুন্দর সকাল। নরম রোদ গায়ে মেখে মাইকেল রাস্তায় দেখতে পেল তাদের,যাদের সে আগে কখনো দেখেই নি। অথচ এই গ্রামের সবাইকেই সে চেনে। আচ্ছা,গ্রামে ঢুকতে তার কোনো ভুল হয়নি তো। বাড়িগুলোও কেমন যেন অন্যরকম! কিন্তু না,ঐ তো সান নদী বয়ে চলেছে,ঐ তো বাচ্ছাদের খেলার মাঠ,ঐ তো দূরে দেখা যাচ্ছে আল্পসের কোলে ক্যাথিড্রাল,ঐ তো তার সুদৃশ্য ফার্মহাউস,কিন্তু এক রাতে এত ম্রিয়মান দেখাচ্ছে কেন!


দরজায় কড়া নাড়ল মাইকেল। দরজা খুলে দিল একজন সুবেশী মূল্যবান পোষাক পরা যুবক। একে তো চেনেই না মাইকেল ডারলিম্পল!এ আবার কে!


"ভেতরে গিয়ে বলো যে মাইকেল এসেছে ,আজ আমি প্রচণ্ড ক্লান্ত। খাবার রেডি করতে বল।"


"তুমি কে!"যুবকের মুখে প্রশ্ন।

"বলো যে এই বাড়ির মালিক এসেছে!"চেঁচিয়ে উঠল মাইকেল আর থাকতে না পেরে।

"কে মালিক!"গর্জে উঠল যুবক। "তুমি নিশ্চয়ই একজন ফ্রড। এই বাড়ির মালিক আমি।আমার নাম উইলিয়াম ডারলিম্পল।"

চমকে উঠল মাইকেল। উইলিয়াম যে তার শিশুপুত্রঃর নাম। এই যুবকটি যে পোষাক পরে আছে ,সেটির রং নীল। আর বলা বাহুল্য, তার পুত্র উইলিয়ামেরও পছন্দের রং নীল।

"ওহে প্রতারক,জান-এই বাড়ি শুধু নয়,এই এস্টেটের মালিক আমি-উইলিয়াম।"

এবার আর থাকতে পারল না মাইকেল। গর্জে উঠল "না মোটেই না। এই ফার্মহাউসের মালিক আমি,মাইকেল।"মানছি কাল রাতে আমি ছিলাম না। কিন্তু একরাতে মালিকানা বদলে যেতে পারে না।"

"শয়তান,তুই আমার বাবার নাম নিস।"নিমেষে তুমি থেকে তুই এ নেমে এল যুবক। কলার ধরে বলল মাইকেলের,"জানিস আমার বাবা পঁচিশ বছর আগের এক পূর্ণিমারাতে নিখোঁজ হয়ে যান। তারপর আর ফেরেন নি।"

পায়ের তলার মাটি কাঁপতে লাগল মাইকেলের। এ কি শুনছে সে!আর তার ফার্মহাউস টাকেই এত পুরনো আর মলিন লাগছে কেন!এক রাতে কি সে চলে এসেছে পঁচিশ বছর পরের কোনো ভবিষ্যতে।ছোটবেলায় বড়োদের কাছে সে শুনেছিল 'সময়ঘূর্ণি'র কথা,যার মধ্যে পড়লে মানুষকে গিয়ে পড়তে হবে অতীত বা ভবিষ্যতের কোনো অজানা সময়ে। অথচ সে নিজেই যে এর শিকার হবে জানা ছিল না তার!


"কি হয়েছে রে উইল!এত চেঁচামেচি কিসের!"ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন প্রৌঢ়া সেনোরিটা। আর সামনে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন!তার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে,পঁচিশ বছর আগে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া তার স্বামী,তার প্রাণেশ্বর,তার মাইকেল। কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে প্রৌঢ়ত্ব এসেছে সেনোরিটার শরীরে,কিন্তু তার স্বামীর বয়স যেন এক দিনও বাড়ে নি। সেই বত্রিশ বছরের এক তরতাজা যুবক।বয়স যেন থমকে গিয়েছে তার মাইকেলের!


সেইদিন গ্রামের মানুষেরা শুনল মাইকেলের মুখে এক অপরূপ অনুপম কাহিনী।বিশ্বাস করা দুঃসাধ্য,কিন্তু বিশ্বাস না করাও কঠিন। জলজ্যান্ত উদাহরণ তো তাদের সামনেই বিদ্যমান।


যাই হোক,এর কিছুদিন পরেই ভেঙে পড়তে লাগল মাইকেলের স্বাস্থ্য। মায়ের মৃত্যু আর যক্ষ্মায় মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনে মন এমনিতেই ভেঙে গেছিল মাইকেলের,আর এইবার শরীরও ভেঙে পড়তে থাকল তার। তিনমাসের মধ্যে মৃত্যু হল মাইকেলের।

এর পরে অনেক বছর কেটে গেছে। আজও পূর্ণিমার রাতে অজানা লোক দরজায় খটখট করলে দরজা খোলে না ম্যান্ডারমট গ্রামের লোকরা। তাদের মনে এখনোও গেঁথে বসে আছে সেই অচেনা কিম্ভূতকিমাকার চেহারার লোক আর সময়ঘূর্ণির কাহিনী।



Rate this content
Log in