নন্দা মুখার্জী

Others


3  

নন্দা মুখার্জী

Others


পাশে আছি

পাশে আছি

1 min 214 1 min 214

প্রায় বছর পাঁচেক পরে গ্রামে ফেরা সুশোভনের| আসবার ইচ্ছা মোটেই ছিলোনা| কিন্তু মা বারবার করে বাবার শরীর খারাপের কথা বলছেন | তাই আসতে বাধ্য হওয়া| গ্রামের ছেলে সুশোভন ভালোবেসেছিলো গ্রামেরই মেয়ে অর্পিতাকে| দুক্লাস উঁচুতে পড়তো সুশোভন| মাধ্যমিক পাশ করার পরই অর্পিতার বিয়ে দিয়ে দেয় তার বাড়ির লোক| তখন সুশোভন উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছে| কিছুই করার ছিলোনা তখন সুশোভনের| অসহায়ের মত দেখেছিলো মা, বাবা আর বোন খুব সেজেগুজে অর্পিতার বিয়ের নিমন্ত্রণ খেতে যাচ্ছেন| আর সে নিজে শরীর খারাপের অজুহাতে দরজা বন্ধ করে চোখের জলে বালিশ ভিজিয়েছে| বিয়ের কথাবার্তা যখন চলছে তখন অর্পিতা একদিন এসে সুশোভনের কাছে খুব কান্নাকাটি করেছিলো| কিন্তু সুশোভনের তখন কিছুই করার ক্ষমতা ছিলোনা| অসহায়, নিরুপায় দুটি তরুণ তরুণী বুকে পাথর চাপা দিয়ে সবকিছু মেনে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলো মাত্র| 

 গ্রামের পথে বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটতে হাঁটতে সেই সব কথা ভীষণভাবে মনে পড়ছিলো সুশোভনের| গ্রামের স্কুল থেকে পাশ করে উচ্চতর শিক্ষা লাভের আশায় কলকাতা চলে আসার পর আজ এই পাঁচ বছর সুশোভন আর গ্রামে ফেরেনি| বারবার মা, বাবা আর বোনের অনুরোধ উপেক্ষা করে বলেছে সে আর কোনোদিনও গ্রামে ফিরবেনা |

 বিটেক পড়া শেষ করে কলেজ ক্যাম্পাস থেকেই একটা মোটা মাইনের চাকরি পেয়ে যায়| প্রতিমাসে বেতনের অর্ধেক টাকা সে মা বাবার একাউন্টে পাঠিয়ে দেয় যদিও তার টাকা তারা খরচ করেননা | নানান কথা ভাবতে ভাবতে সে বাড়ির দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ালো| 

 বাবার শরীরটা সত্যিই খুব খারাপ হয়েছিলো| বাবার ঘরেই সে বসে সকলের সাথে কথা বলছিলো| খাওয়াদাওয়ার পর যখন শুতে যাবে সে তখন মা তাকে এমন একটা কথা বলে বসলেন যা সে স্বপ্নেও কল্পনা করেনি|

--- তোর অর্পিতার কথা মনে আছে ?

--- কেন বলো তো ?

--- মেয়েটার কপালটা সত্যিই খুব খারাপ রে -

--- কেন কি হয়েছে অর্পিতার ?

--- সে এক ইতিহাস| ভালো চাকরি ভালো বাড়ি দেখে মা মরা মেয়েটার বিয়ে দিলো ওর বাবা কিন্তু মেয়েটার কপালে বিধাতা সুখ লেখেননি | বিয়ের পর মদ্যপ স্বামীর অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে একবার সুইসাইডও

 করতে গেছিলো |  

--- তারপর ?

--- তুই তোর নিজের ঘরে যা আমি এক্ষুণি আসছি |

--- আরে তুমি বলোনা আমার এখানে দাঁড়িয়ে শুনতে কোন অসুবিধা হচ্ছেনা|

 মনের ভিতর তখন তার তোলপাড় করছে | অর্পিতা বিয়ের পর ভালো ছিলোনা,  অর্পিতা বেঁচে আছে তো? নানান প্রশ্ন তখন তার মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে |

--- মা বলো তারপর কি হয়েছে অর্পিতার? 

--- নিজের হাতের শিরা কেটে বাড়িতে তার স্বামী না থাকাকালীন সময়ে বেশ কয়েকঘন্টা নিজের ঘরে পড়ে ছিল| ভাগ্যিস সেদিনই ওর ভাই পুজোর জামাকাপড় দিতে ওর বাড়ি গেছিলো | অনেক ডাকাডাকির পরও যখন দরজা কেউ খুলতে আসেনা ওর ভাই তখন ক্লাবের ছেলেদের ডেকে দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকে ওই পরিস্থিতি দেখে | যমে মানুষে পনেরদিন টানাটানির শেষে আবার ওর স্বামী ওকে বাড়িতে নিয়ে যায় | ওর বাবা , ভায়ের ইচ্ছা ছিল কয়েকটা দিন অন্তত ওদের কাছে এসে থাকুক | কিন্তু কিছুতেই ওর স্বামী সে কথা শোনেনা | হাসপাতালে থাকার সময় অর্পিতার বাড়ির লোকেরা ইচ্ছা থাকলেও ওর কাছ থেকে কিছু জানার চেষ্টা করেনি কারণ ডক্টরের নিষেধ ছিল | বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আবার সেই একই অত্যাচার শুরু করে | চুপচাপ সবকিছু মেনে নিতে নিতে পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ায় আস্তে আস্তে নিজের ভিতরে নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকে |শেষে একদিন ওর ভাই ও বাবা গিয়ে ওর স্বামীর বিরুদ্ধাচারণ করেই ওকে নিয়ে আসতে বাধ্য হয় | অনেক ডাক্তার দেখিয়েও কোন লাভ হয়নি | সবসময় চুপচাপ ঘরের মধ্যেই বসে থাকে | কারো সাথেই কোন কথা বলেনা | ওর বাবারও বয়স হয়েছে | অর্পিতার চিন্তায় চিন্তায় তার শরীরও ঠিক নেই | এদিকে ওর ভায়েরও বিয়ের বয়স হয়েছে | কিন্তু অর্পিতা সুস্থ্য না হওয়া পর্যন্ত ওর ভাই বিয়ে করতে চায়না |

--- আমাকে কি করতে বলছো ?

 মা একটু আমতা আমতা করে বললেন,

--- ওই যে তোর বন্ধু বিপিন আছে না ও বলছিলো ------ আসলে আমি তোর বাবা মেয়েটাকে খুব ভালোবাসি --

--- বিপিন কি বলছিলো ?

--- না সে রকম কিছু না ওই আর কি--- তুই একটু কলকাতা নিয়ে গিয়ে চেষ্টা করে দেখ না যদি মেয়েটাকে সুস্থ্য করা যায় --

--- মা, বিপিন কি বলেছে ?

 সুশোভনের মা আমতা আমতা করে কয়েকবার ঢোক গিলে বলেই ফেললেন কথাটা | কারণ তিনি যখন জানতে  পেরেছেন তার শুভ কেন গ্রামে আসতে চায়না তখন তো তাকে বাড়িমুখো করার আপ্রাণ চেষ্টা তিনি করেই যাবেন |

--- বলছিলো তোরা তো একই স্কুলে পড়তিস যদি তোকে দেখলে ওর কোন পরিবর্তন হয় নুতবা তুই যদি ওকে কলকাতা নিয়ে গিয়ে বড় ডাক্তার দেখাস ----

--- সেতো ওর ভাইও করতে পারে |

--- হ্যাঁ তা পারে কিন্তু তুই তো ওকে ভালোবাসতিস---

--- আচ্ছা এখন যা তোর ঘরে বাকি কথা কাল বলবো |

 সুশোভনের মাথায় তখন নানান চিন্তা| মা কি ঠিক এই কারণেই ওকে গ্রামে ডেকে পাঠিয়েছেন? বাবার এখন বয়স হয়েছে নিত্য শরীর খারাপ লেগেই আছে - তবে কি এবার জোর করেছেন অর্পিতার জন্যই? আসলে মা কি ভাবছেন? 

  পরদিন সকাল হতেই সুশোভন অর্পিতাদের বাড়িতে হাজির হয় | অর্পিতার ঘরে ঢোকার আগেই সে তার বাবার কাছ কাছ থেকে জেনে যায় অর্পিতা কারও সাথেই কথা বলেনা| চুপচাপ সবসময় ঘরের মধ্যে শুয়ে বসে থাকে | পরিবারের কেউ ছাড়া তার ঘরে ঢুকলে সেদিন রাগে সে সেই বেলার খাবার হাত দিয়ে ছুঁয়েও দেখেনা | কিছু জানতে চাইলে মাথা নেড়ে হ্যাঁ না তেই জবাব দেয়| দেখো গিয়ে তোমার সাথে কথা বলে কিনা ?

 সুশোভন দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকে | অন্য দিকে মুখ করে খাটের উপর অর্পিতা শোয়া | সুশোভন গিয়ে খাটের উপর বসে | অর্পিতা ফিরেও দেখেনা | সুশোভন আস্তে আস্তে ডাকে ,

--- অর্পিতা আমি শুভ -- এদিকে একটু ফেরো 

 অর্পিতা উঠে বসে শুভর মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে | শুভ জানতে চায়,  

---- আমায় চিনতে পারছো ?

 অর্পিতা ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ জানায় |

--- কি হয়েছে তোমার? আমায় বলো সব ঠিক হয়ে যাবে আমি এসে গেছি তো --

  শুভ হাত বাড়িয়ে অর্পিতার একটা হাত ধরে বলে, 

--- আমি তোমাকে কলকাতা নিয়ে গিয়ে ডক্টর দেখাবো কিন্তু তার আগে তো আমায় জানতে হবে তোমার কোথায় কষ্টটা --- 

  অর্পিতা এবার হাউহাউ করে কেঁদে উঠে শুভর বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পরে| ঠিক এইরূপ একটি পরিস্থিতির জন্য সুশোভন মোটেই প্রস্তুত ছিলোনা | ধাতস্ত হতে তার কিছুটা সময় নিলো তারপর সে আস্তে আস্তে অর্পিতার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো | অর্পিতার কান্নার আওয়াজে তার বাবা ও ভাই ঘরে ঢুকে এসে এ দৃশ্য দেখে দুজনেই ঘর থেকে বেরিয়ে যান | এবং দুপুর গড়িয়ে গেলেও তারা কেউই আর এঘরে আসেননা কারণ বাইরে থেকে দুজনেই শুনতে পান অর্পিতার গলার আওয়াজ |


Rate this content
Log in