Aayan Das

Others


2  

Aayan Das

Others


"ম" মানে মরবেনা মাতৃভাষা

"ম" মানে মরবেনা মাতৃভাষা

4 mins 9.6K 4 mins 9.6K

সেই দুধে আলতা রঙের যুবতীর চোখ দুটি ছিল রাইন নদীর মত নীল।নীলনয়নার কাঁধে এসে আটলান্টিক মহাসাগরের মত গর্জন করত সোনালি চুলের অহঙ্কার।এই মেয়ের প্রেমে না পড়ে পারা যায়?

হ্যাঁ,আমিও প্রেমে পড়েছিলাম মারিয়ার।

তখন সদ্য সদ্য ফেসবুকে ঢুকেছি।সেইসময় ছিল ছবি তোলার নেশা।সময় পেলেই আমার সদ্যকেনা ক্যানন sx150 নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম আর এন্তার ছবি তুলতাম।সেই ছবিগুলি কে ফটোশপে এডিট করে বিভিন্ন ফটোগ্রাফি গ্রুপে পোষ্ট করতাম।কম্পিটিশন গুলোতেও নিয়মিত যোগ দিতাম। 

একটা গ্রুপ ছিল,ছিল মানে এখনও আছে-'sunrise and sunset photography,'যেখানে সানরাইজ এবং সানসেট এর ছবি পোষ্ট করা হয়।সেখানে সারা বিশ্বের সমস্ত ফটোগ্রাফাররা সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের ছবি পাঠান।কী কুক্ষনে আমার মত এক আনাড়ির এক অতি সাদামাঠা সূর্যাস্তের ছবি(যেটি তুলেছিলাম হালিশহরের গঙ্গার ঘাট থেকে) সেই গ্রুপের শ্রেষ্ঠ ছবি(সেই মাসের দর্শকের বিচারে) হিসেবে বিবেচিত হল।সারা বিশ্ব থেকে অভিনন্দন আর শুভেচ্ছার বন্যা বয়ে গেল।বিখ্যাত ফটোগ্রাফাররা জানতে চাইছেন আমি ঠিক কোন অ্যাপার্চার ও শাটার স্পিড্ এবং অ্যাঙ্গেলে ছবি তুলেছি,কেন সাবজেক্ট হিসাবে নদী কে বাছলাম,ইত্যাদি।কেলেঙ্কারি!আমি যে ওসব মাথায় রেখে আদৌ ছবিটা তুলিনি,জাস্ট্ তুলে ফেলেছি, তারপর ক্যাজুয়ালি পোস্ট্ করে দিয়েছি-তা ওদের বোঝাই কী করে!

এই ছবিটা দেখেই আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট্ পাঠান বিখ্যাত ফটোগ্রাফার শ্রী শক্তি চৌধুরী ও শ্রী পরিতোষ দাস।শক্তিদা ও পরিতোষদা'র কাছ থেকে কত যে অমূল্য টিপস্ পেয়েছি!তারমধ্যে একটা টিপস্ ছিল-অয়ন,তোমার প্রতিটি ছবির মধ্যে যেন একটা গল্প লুকিয়ে থাকে।যে ছবিতে গল্প নেই-সে ছবি ছবিই না।

একদিন দেখি ছবিটার নিচে বেশ কয়েকলাইন কমেন্ট করেছে এক সোনালি চুলের রাজকন্যা।লেখার মাথামুন্ডু কিচ্ছু বুঝছিনা কারন, হরফটাই অচেনা।মেয়েটি চেকোস্লোভাকিয়া তে থাকে।সেও আমারই মত শখের ছবি তুলিয়ে।

আমরা বন্ধু হলাম।এরপর দুজনেই যখন ফেসবুকে অন্, -তখন চ্যাট্ করলাম-hi marya

মেয়েটি চেক বর্ণমালায় কিছু একটা লিখল।

এরপর আমাদের চ্যাট্ হয়েছিল মোটামুটি এরকম-

Don't you know English?

Gjhy vgmk hsnj

But I don't know this language..sorry..please write in English..

Gnmk bvcxz bmkkggk chhjdfbjj nvxhjkcb nbbcxz mnjkghk

What's your profession mariya?

Zccfdhhdh bncgjjffjjjk nnvxgjnk mmkgfdhj vcghftr vbchfhj

আরে এ মেয়ে তো নিজের ভাষার বাইরে অন্য কোনো ভাষাই জানেনা!এর সঙ্গে কথা বলব কী করে?

এইবার আমিও দুষ্টুমি শুরু করলাম।তোমার নিজের ভাষার প্রতি অহঙ্কার থাকতে পারে আর আমার পারেনা?অতএব আমিও বিশুদ্ধ বাংলা হরফে লেখা শুরু করলাম।

মারিয়া আমি তোমার ঠোঁটে চুমু খেতে চাই,দেবেতো?

Zcvngfgjjbjh vfhgdh hg dg j hg hjjjkkcvj

তোমার সোনালি চুলে আমি হারিয়ে যতে চাই৷আমি যে বহুদিন কোথাও হারাইনি,তুমি আমার সঙ্গে হারিয়ে যাবে?

Dgfghjjju bbdghnxfgnk nngfzhjcxvj bgmhch bhj njfg bb mgdjj

কখন তোমার দেখা পাবো,চোখের পাতায় চুমু খাব,চোখের তারায় জিজ্ঞাসা-বলো,কাকে বলে ভালবাসা?

Zcfffghj nmvgkk vfgonvg vcfjnbfh nmj

এইবার আমার শেষ দুষ্টুমি,কিচ্ছু না লিখে একটা 'হারট্-সাইন্' পাঠালাম। 

এই সাইনের মানে একটাই।অতএব মারিয়ার কাছ থেকে যে উত্তরটা পেলাম সেটাও একটা 'হারট্ সাইন্'৷

কিন্তু হায়!আর এগোতে পারিনি।আমরা দুজনে শুধু দুজনের ছবিতে লাইক দিতাম।

ও লিখতো-zfdsgh njffjk thidfjj ?

আমি উত্তরে লিখতাম-হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি ভাল আছি।তুমি ভাল তো?

একসময় মারিয়া নামের রাজকন্যাটি হারিয়ে গেল।একটা অসাধারন ছোটোগল্প মাঝপথে থেমে গেল।

ভাষা হল সেতু।গুপি গাইন বলেছিল না-'ভাষা এমন কথা বলে বোঝেরে সকলে,উঁচা নিচা ছোটো বড় সমান-মোরা সেই ভাষাতেই করি গান'।

আজ থেকে ৮০০০বছর আগে নতুন প্রস্তর যুগের মানুষ প্রথম কথা বলতে পেরেছিল।তার আগে মানুষ শুধু শব্দ করে আর ইশারা তে মনের ভাব প্রকাশ করত।কথা বলতে পারার পরও তারা ইশারার ব্যবহার ত্যাগ করেনি।এখনও পৃথিবীর সব দেশের সব ভাষার মানুষের ইশারার ভঙ্গি ও অর্থ এক।এই ভাষা আবিষ্কারের ফলেই কিন্তু মানুষ পৃথিবীকে ডমিনেট করতে পারল।

এই মুহূর্তে পৃথিবীতে ২৭৯৬ টি ভাষা প্রচলিত।তার মধ্যে প্রধান ভাষা ১৬০টি।আর ভারতে ১৬৫২টি ভাষার মধ্যে প্রধান ভাষা হল ২২টি।যথা-হিন্দি,বাংলা,তেলেগু,তামিল,মারাঠি,গুজরাটি,মালয়ালম,কন্নড়,ওড়িয়া,পাঞ্জাবি,অসমিয়া,সিন্ধি,নেপালি,কোঙ্কনি,মণিপুরি,কাশ্মীরি,সংস্কৃত,বোরো,ডোগরি,মৈথিলি ও সাঁওতালি।

মজা হল-অঞ্চলভেদে আমাদের বাংলা ভাষার কথ্য রূপও পাল্টে যায়।মজা দেখুন-

কলকাতা-'ছোটো ছেলেটি তার বাবাকে বলল'

ঢাকা-'ছোটো ছাওয়াল তার বাপেরে কইলো'

কোচবিহার-'ছোটো বেটা উয়ার বাপোক কইলো'

পুরুলিয়া-'ছুট্ বেটা তার বাপকে বল্লেক'

চট্টগ্রাম-'ছোড়ুয়া পোয়া তার ব-রে কইলো'

এই যে আমরা গল্প লেখার জন্য একেবারে মুখের ভাষা ব্যবহার করি-এর সুচনা হয় ১৮৫০সালের পর থেকে।কারন লেখকরা কিছুতেই অশিক্ষিত বা কম শিক্ষিত মানুষের কাছে পৌঁছতে পারছিলেন না।এইবার মুশকিল হল, এক-এক জায়গার তো এক-এক কথ্যরূপ।তাহলে কোনটা নেওয়া হবে?এইসময় বেশ একটা পলিটিক্স হয়েছিল।কলকাতা,নদীয়া,২৪পরগনা তে যেহেতু পন্ডিতদের সংখ্যা বেশি অতএব, এখানকার কথ্য ভাষাই সাহিত্যের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেল।এইবার ভাষা হয়ে উঠল জীবন্ত।লেখকরা সাধারন মানুষের মনে জায়গা পেলেন।

একটা কথা জানলে অবাক হই যে, বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে আজ থেকে ১০০০ বছর আগে অথচ, বাংলা ব্যাকরণ প্রথম রচিত হয় মাত্র পৌনে তিনশো বছর আগে।শুনলে অবাক হবেন প্রথম বাংলা ব্যাকরণ লেখেন একজন সাদা চামড়ার সাহেব।নাম-'মানোয়েল দ্য আস্সুম্পসাম'।১৭৪৩সালে পোর্তুগালের লিসবন্ শহরে রোমান অক্ষরে তা ছাপা হয় কারন, 'ছাপার' জন্য বাংলা অক্ষর তখনও তৈরি হয়নি।১৭৭৮সালে 'নাথানিয়েল হ্যালহেড্' নামের এক ইংরেজ;ইংরেজি ভাষায় একটি বাংলা ব্যাকরন বই লেখেন যেখানে, প্রথম ছাপার সময় বাংলা অক্ষর ব্যবহৃত হয়।

রাজা রামমোহন রায় হলেন প্রথম বাঙালি যিনি বাংলা ব্যাকরণ বই লেখেন ১৮২৬ সালে।দুঃখের বিষয় এই বইটিও ইংরিজিতে লেখা।১৮৩৩সালে এই বইয়ের বাংলা অনুবাদ বাজারে প্রকাশিত হয় ও অচিরেই তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।(তথ্য সংগ্রহ-রণেন গুপ্ত-নবোদয় ব্যাকরণ)

নিজের ভাষাকে মাতৃভাষা বলে কে যে সম্বোধন করেছিল কে জানে,তবে এর চেয়ে মোক্ষম শব্দ আর নেই।মায়ের মতই প্রিয় হয় ভাষাও।আমার বড় গর্ব হয় আমি বাংলায় লিখি বলে।

অথচ আমাদের ছেলেমেয়েগুলোকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াই বলে ওরা বাংলা ভাষাকে অপছন্দ করে,বাংলা পড়তে গেলে জ্বর আসে।ইংরিজি ওদের ভালবাসার ভাষা।

আজকের অধিকাংশ মায়ের ঠাঁই যেমন বৃদ্ধাশ্রমে তেমনি মাতৃভাষাটাও বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই পাবেনাতো?অন্তত তার আগে যেন আমার মৃত্যু হয়।


Rate this content
Log in