Aayan Das

Others


2  

Aayan Das

Others


গর্ভধারিনী

গর্ভধারিনী

3 mins 10.2K 3 mins 10.2K

মেয়েটির ছিল এমনই পড়ার নেশা যে শুধু বই নয়, মেয়েটি বাড়ির ঠোঙা পর্যন্ত পড়ে ফেলতো।বাড়িতে তার মায়ের জন্য লাইব্রেরি থেকে বই ও অন্যান্য পত্রিকা আসে,মায়ের পড়ার আগে সেগুলি মেয়ের পড়া হয়ে যায়।চোদ্দো পনেরো বছর বয়সের মধ্যেই মেয়েটি বাংলা সাহিত্যের বহু মণিমুক্তোর সন্ধান পেয়ে যায়।

মেয়েটি তার বাবা মায়ের প্রথম সন্তান।মেয়েটির পরে আরো দুটি ভাই ও দুটি বোন।মেয়েটি যেন তার ভাই বোনদের কাছেও খানিকটা মায়েরই মত।মেয়েটির মা প্রখর ব্যক্তিত্ত্বময়ী,সন্তানেরা তাকে ভয় পায় আর মনের সব কথা খুলে বলে তাদের দিদির কাছে।আস্তে আস্তে মেয়েটি গোটা সংসারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যায়।মেয়েটির বাবা রেলের চাকুরে,তার উপর ভোজনরসিক।মেয়েটি রেল কোয়ার্টারে মোটামুটি স্বাচ্ছল্যের মধ্যেই বড় হতে থাকে।

মেয়েটির বিয়ে হয় এক হতদরিদ্র পরিবারে।হতদরিদ্র মানে যাকে বলে একেবারে হাঁ করা অভাব।মেয়েটির স্বামী-ই সংসারের একমাত্র রোজগেরে।বাড়িতে লোক প্রায় জনা দশেক।বাড়িতে অভাব থাকলে অসুখ বিসুখ লেগেই থাকে।আরো একটি ব্যাপার মেয়েটিকে কষ্ট দেয়।সে তাদের বাপের বাড়িতে কখনও কোনো ঝগড়া-ঝাঁটি হতে দেখেনি অথচ এদের বাড়িতে প্রতিদিন অশান্তি হয়।মেয়েটির শ্বশুর ও স্বামী দুজনেই ভয়ানক বদরাগী।এ বাড়িতে ঝগড়া ও অশান্তির সময় মেয়েটি কেঁপে ওঠে।সে নিতান্ত নিরীহ ও অন্তর্মুখী,ফলে মেয়েটিকে নতুন পেয়ে তার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা এমনকি তার স্বামীও অকারনে হেনস্থা করে।মেয়েটির ভীষন কষ্ট হয়,সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে,মাঝে মাঝে চোখ ফেটে জল আসে৷সেইসময় সে গীতবিতান খুলে বসে,গীতবিতান তার সমস্ত দুঃখ কে দুর করে দেয়।

মেয়েটি বিয়ের পরেও পড়াশুনো করতে চায়।প্রায় জোর করেই সে বি.এড কলেজে ভর্তি হয়।বিয়ের পর বাড়ির বউ কলেজে যাচ্ছে,শ্বশুর বাড়ির লোকেরা ব্যাপারটাকে খুব ভালভাবে নিতে পারেনা।কলেজে কিছু ছেলের সঙ্গে মেয়েটির বন্ধুতা হয়।মেয়েটির স্বামী সেই বন্ধুতাকে সহজ ভাবে নিতে পারেনা।

সংসারের যাবতীয় কর্তব্য সামলেও মেয়েটি সসম্মানে বি.এড(তখনকার দিনে বলা হত -বি.টি) পাশ করে।

মেয়েটি তার স্বামীর কাছে শিক্ষিকার চাকরি করার অনুমতি চায়,অনুমতি মেলেনা।মেয়েটির শ্বশুর ফরমান জারি করেন-বাড়ির বউ রান্নাবান্না করবে,হোক অভাব-কিন্তু চাকরি!নো,নেভার।বউ মানুষ রাস্তায় বেরোলে নষ্ট হয়ে যায়।মেয়েটির স্বামীর বাবার বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষমতা নেই।

মেয়েটি কান্নাভেজা গলায় স্বামী কে বলে,''তাহলে এত কষ্ট করে বিটি পাশ করে কী লাভ হল আমার?''

মেয়েটি সন্তানসম্ভবা হয়।এ বাড়িতে কন্যা সন্তান অবাঞ্ছিত।যদিও পুত্র বা কন্যা সন্তান জন্মানোর জন্য আসলে দায়ী পুরুষটি'ই কিন্তু এখানে বাড়ির বউটিকেই দায়ী করা হয়।মেয়েটি ভয় পেতে থাকে।যথাসময়ে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়ে সে নিজের ও শ্বশুরবাড়ির মুখরক্ষা করে।

এই হল আমার মায়ের গল্প।মায়ের কাছ থেকে শিখেছি সহ্যক্ষমতা কাকে বলে।শিখেছি বিভিন্ন চরিত্রের মানুষকে কিভাবে এক সুতোয় গেঁথে একটা অপূর্ব মালা তৈরি করা যায়।মায়ের কাছ থেকে শিখেছি কিভাবে মানুষকে আশ্রয় দিতে হয়,কিভাবে একটা যৌথ পরিবারে ছোট্ট একটা বিন্দু থেকে কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যেতে হয়।মায়ের কাছে শিখেছি বুকের মধ্যে অশ্রুর বন্যা বয়ে গেলেও কিভাবে প্রাত্যহিক ব্যবহারে তাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা যায়।মায়ের কাছে শিখেছি টাইম ম্যানেজমেন্ট ও প্ল্যানিং শব্দদুটির আক্ষরিক অর্থ কী।মায়ের কাছ থেকে আত্মস্থ করেছি নিয়মানুবর্তিতা।তাঁর কাছে ভোর পাঁচটা মানে ভোর চারটে ঊনষাট মিনিট ষাট সেকেন্ড।না,একষট্টি সেকেন্ড ও নয়।

এতদিন ধরে মা'কে দেখে আজ আমার এই উপলব্ধি হয়েছে যে যিনি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করছেন তার চেয়ে একজন সাধারন গৃহবধুর সুচারু ভাবে সংসার চালানোর কৃতিত্ব কোনো অংশে কম নয়।


Rate this content
Log in