বর্শা
বর্শা
7 mins
9
একটি অপরিশুদ্ধ ভোজ্য তেলের পাইপ ফেটে গিয়ে সেই সব তেল গিয়ে মিশেছিল একটা পুকুরে, আর সেটা দেখার পর সব গ্রাম্যরা একেবারে হাবাইত্তার মত সেখানে গিয়ে বাল্টি সস প্যান বোতল মগ গাড়ু এমনকি নিজেদের লুঙ্গি ও শাড়ির আচলে অবধি সেই তেল তুলে নিতে একেবারে সেই তেল ভর্তি পুকুরে লাফালাফি শুরু করে দিল, তাদের শরীরের সব নোংরাও গিয়ে মিশল সেই তেলে, সেই তেল তারা নিয়ে কী যে করবে, তারাই জানে, পুকুরের সব মাছগুলো সেই তেল-জলের মধ্যেই কিলবিল করছে পুকুরে, তেমনই তাদের ভিড়ে রতনও ছিল, সেখানে তেল তুলতে সেও গেছিল, একটা ফুটো কৌটোতে করে, সেই ফুটোটা নিজের হাত দিয়ে চেপে রেখে সেই তেল নিয়ে সে এগোচ্ছিল নিজের বাড়ির দিকে, সেখানে সব খবরের লোকেরাও গিয়েছিল পৌঁছে ততক্ষণে, খবর করার জন্য।
কিন্তু যখন শালার রতন ফিরল নিজের বসতি এলাকায় আরও বেশ কিছু লোকজনদের সাথে, তখন সেখানে বাড়িঘরের বদলে কতগুলো চ্যাপটা হয়ে যাওয়া বাড়িঘর দেখে অবাক হয়ে গেল একেবারে, মানে একেবারে যেন চুতিয়া বনে গেল, আর তার সাথে বাকিরাও।
আসলে তখন হয়ে গেছিল বিকেল, আর তারা সবাই সেই পুকুরে গিয়ে তেল ভরতে ব্যস্ত ছিল, ফলে বিকেলের দিকে হাতিদের উপদ্রবের কথাটা তাদের ঠিক মনে থাকেনি। আর ওদিকে হাতিরা সব এসে একেবারে তাদের যা কিছু ছিল, বাড়িঘর বলে বস্তু,সব একেবারে তছনছ করে ছেঁড়ে দিয়েছে, আর তাদের প্রিয়জনদেরও একেবারে চেপ্টে দিয়েছে, রতনের মত বাকিদেরও হাত থেকে সেই তেলের কৌটো বা মগ বা যা কিছুই থাকুক না কেন, সব পড়ে গেল মাটিতে, তেল সব ছড়িয়ে গেল নীচে।
সেই গুঁড়িয়ে যাওয়া ভাঙাচোরা ভগ্নাবশেষের মধ্যে থেকে নিজের বউ ও ছোট্ট মেয়ের একেবারে বাজেভাবে থেঁতলে যাওয়া লাশগুলোকে দেখে থ হয়ে গেল রতন, বেশ কিছুক্ষনের জন্য। ততক্ষণে বাকিরাও সকলে হাহাকার করতে শুরু করে দিয়েছে, কিন্তু রতনের কানগুলোতে যেন একেবারে তালা ধরে গেছে, যেন একেবারে শালা কালা হয়ে গেছে সে। তার বউয়ের তো কোনটা মাথা আর কোনটা পাছা তা বোঝাই যাচ্ছেনা, তার মেয়েটির কথা না হয় বাদই দেওয়া হল।
হাতিগুলো সব সংলগ্ন জঙ্গল এলাকা থেকে চলে এসেছিল, আসলে তাদেরও তো আর দোষ দেওয়া যায় না, তারা আর অতকিছু বোঝে নাকি, তাছাড়া সমানে জঙ্গল তো সব দঙ্গল বেঁধে একেবারে সাফ করে চলেছে লোকেরা, তাহলে তারা যে জনবসতি এলাকায় ঢুকে পড়বে সেটাই তো স্বাভাবিক, কারন তারা নিজেরাই তো এভাবে আস্তে আস্তে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। তেমনি সেই হাতিগুলোও অনেকসময় ঢুকে পড়ে, বিকেল বা সন্ধ্যের দিকেই বেশি ঢোকে মানে উৎপাত করে, জেনেবুঝে করে না, অনেকসময় অনেক বাচ্চা হাতিও ঢুকে পড়ে, গতবার কোন এক সময় একটা বাচ্চা হাতি যেমন ঢুকে পড়েছিল, আর প্রাণ হাতে নিয়ে ফিরে যেতে পারেনি, তাকে একেবারে ঘিরে ধরে গায়ে পেট্রোল ঢেলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরে ফেলেছিল বাঞ্চোদ গ্রামবাসীরা। সে নিয়ে খবরও হয়েছিল আর শহরের কিছু বোকাচোদা পশুপ্রেমীরা তাই নিয়ে কয়েকদিনের ন্যাকামো মারিয়েছিল রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলনের নামে। আসলে এই মানুষ ও দাঁতালের সংঘাত সত্যিই একটি জ্বলন্ত সমস্যা এখনও, সমানে ভিন রাজ্য থেকে লোকেরা সব লোটা কম্বল বেঁধে এখানে এসে জঙ্গল সংলগ্ন সব এলাকায় বসতি স্থাপন করছে, আর তার ফলে এই সংঘাত, বন বিভাগের লোকেরা নিজেদের বাল ছিঁড়ে আটি বাঁধছে, অনেকসময় সব ট্রাইবাল দেরকে তাড়াতে ফরেস্ট রেঞ্জাররাও বনে ইচ্ছে করে আগুন লাগিয়ে দেয়, আবার অনেক সময় হাতি দের করে দূরে রাখতে অনেক উপজাতির লোকদেরকে টাকা দিয়েও কাজে রাখে হাতি তাড়ানোর জন্য।
এবারে যেই হাতিগুলো ঢুকে পড়েছিল, সেগুলোর মধ্যে দুটো সেই বসতি এলাকা থেকে বেশ দূরে একটা আঁখবাগানের মধ্যে গিয়ে লুকিয়েছিল, একটি মা হাতি আর তার সাথে তার একটি ছোট্ট বাচ্চা, তারা নিজেরাই খুব ভীত, কারন জঙ্গলের মধ্যে তো সেই কিছু গ্রামবাসীরাই জঙ্গল পরিষ্কারের জন্য বেশ কিছু জায়গায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল যাতে পড়ে সেই জমিতে তারা চাষাবাদ করতে পারে, আর তারা সেই আগুন দেখে মা আর ছেলে মিলে দিয়েছিল একেবারে চোচা দৌড় অন্যান্যদের সাথে। তারা অবশ্য দূরের এক জঙ্গল থেকে সেখানে দৌড়তে দৌড়তে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে এসেছিল, ফলে কোথায় কী বাড়ি ঘর, অত খেয়াল করেনি, আর শেষমেশ সেই আঁখবাগানের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিল। ওদিককার গ্রামবাসীরা আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল জঙ্গলের মধ্যে।
ওদিকে গ্রামের সব লোকেরা তাদের ঘরবাড়ি আর প্রিয়জনেদের হারানোর জন্য একেবারে হা পিত্যেস করে যাচ্ছে, তখন সন্ধ্যার অন্ধকার প্রায় ঘনিয়ে এসেছে, যে সকল খবরের লোকেরা আগে গ্রামবাসীদের পুকুর থেকে তেল তোলার খবর করছিল তারা এখন সেখানে উপস্থিত হয়েছে হাতিদের দ্বারা মানুষদের বাড়ি তছনছ হয়ে যাওয়ার ঘটনার খবর করতে, বসে কাঁদতে থাকা অনেক লোকের মুখের সামনেও তারা সব মাইক নিয়ে তাদেরকে প্রশ্ন করছে কিন্তু তারা কেউ কান্না ছাড়া মুখের ফুটো দিয়ে আর কিছু বের করতে পারছে না, এসবের মাঝে হঠাৎ কে একজন ছুটে এসে তাদেরকে খবর দিল, যে ওখানে আঁখবাগানের মধ্যে একটা হাতি আর তার বাচ্চা লুকিয়ে আছে, সে নিজের চোখে দেখেছে, দূর থেকে, তারা তাকে আরেকবার জিজ্ঞেস করে নিল যে সে ঠিক দেখেছে কি না, সে বলল যে দূর থেকে সে একটা বড় আর একটা ছোট ছায়া দেখেছে, যা দেখে তার হাতি বলেই মনে হয়েছিল, তাও সে বলল সবাইকে যে নিজে গিয়ে সেখানে একবার দেখতে, যাদের ঘরবাড়িগুলো ভাগ্যদোষে(হাতিদের) অক্ষত ছিল তারা সকলে মিলে মুহূর্তের মধ্যে নিজেদের বাড়ি থেকে হাতে যা কিছু পেল ছুরি কাচি লাঠি ভোজালি কুড়াল দাঁ মশাল এই সব এবং আরও অনেক কিছু জোগাড় করে ফেলল নিমেষে আর সাথে বেশ কয়েকটা তেলের টিনের তোড়ঙ্গও নিল, একসাথে মিলে তারপর সব চলল সেই আঁখবাগানের দিকে, ওদিকে দূর থেকে মশালের আগুনের আলো দেখতে পেয়ে সেই মা আর বাচ্চা হাতি যারা এতক্ষণ সেই আঁখবাগানের মধ্যে আত্মগোপন করে ছিল, তারা সেখান থেকে বেরিয়ে অন্যদিকে ভয়ে ছুটতে শুরু করল, ততক্ষণে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আরও বেশি নিবিড়ভাবে আসতে শুরু করেছে, তাদেরকে ছুটতে দেখে সেই গ্রামের লোকেরাও সব তাদেরকে ধাওয়া করল চিৎকার করতে করতে, হাতিগুলো সব ছুটছে, আর তাদের পেছনে সব ক্ষেপে ওঠা সকল গ্রামবাসীরাও, আর তাদের পেছনে ছুটছে খবরের লোকেরা ক্যামেরা হাতে, হাতিদেরকে ধাওয়া করতে করতে একেবারে বড় রাস্তা অবধি ছুটিয়ে নিয়ে চলল সব বাঞ্চোদ গ্রামবাসীরা, যখন সেই হাতিদুটো বড় রাস্তা পাড় করতে যাবে, তখন একজন একটা বোতল বোমাতে আগুন ধরিয়ে সেটা ছুড়ল সেই হাতিগুলোকে লক্ষ্য করে, আর সেটা গিয়ে পড়ল সেই বাচ্চা হাতিটার গায়ে, সঙ্গে সঙ্গে নিমেষে আগুন ধরে গেল বাচ্চাটার সারাটা গায়ে, আর সেভাবেই সে আগুন গায়ে নিয়ে ছুটে চলল, সেই বড় রাস্তা দিয়ে যাওয়া সব গাড়িগুলো থমকে গিয়ে অবাক চোখে দেখছে, যে একটা বড় হাতি আর সারা গায়ে আগুন নিয়ে একটা ছোট বাচ্চা সেই রাস্তা পাড় হচ্ছে, দৌড়োচ্ছে, আর তাদের পেছনে দৌড়োচ্ছে ক্ষ্যাপাচোদা উন্মত্ত জনতা, হাতে লাঠি দাউ কুড়ুল আরও যা কিছু পেয়েছে সব কিছু নিয়ে, তাদের অনেকে আবার হামলে পরে রাস্তার ধারের খাবারের দোকানগুলোর ওপর, সেখান থেকে খাদ্য সামগ্রী ও জল, এমনকি বসার চেয়ার ও টেবিলও অবধি নিয়ে যায় ছিনিয়ে, বাকিরা তখনো ধাওয়া করতে থাকে হাতি দুটোকে, বাচ্চা হাতিটা একটা সময় জ্বলতে জ্বলতে মাটিতে পড়ে গেল আর নড়তে না পেরে, আর সেখানে শুয়ে থেকেই কাতরাতে লাগল, মা হাতিটা তখনও দৌড়োচ্ছে, তার এক সন্তান মারা পড়লেও তার পেটে যে আছে আরেকটা প্রাণ। তাকে বাঁচাতে তখনও ছুটে চলেছে সে, আগুনে দগ্ধ হয়ে যাওয়া এই বাচ্চা হাতিটার কাছে যখন সেই গ্রামবাসীদের কয়েকজন গেল, তখন সেই বাচ্চা হাতিটা মারা পড়েছে, তারা তাতেও শান্ত না হয়ে একজন তার হাতে ধরা একটা শাবলের এক কোপে সেই হাতিটার একটা মাথা একেবারে উড়িয়ে দিল, দেখলে মনে হবে হাতিটার আগুনে পুড়তে থাকা লাশটাও যেন একেবারে ছটফট করে কাঁপতে শুরু করল, তারপর কিছুক্ষণ পর শান্ত হল, কিন্তু আসলে মড়া লাশ তো আর কাঁপে না, সেই হত্যার দৃশ্য সেই খবরের লোকেরা ক্যামেরবন্দী না করতে পারলেও জ্বলতে থাকা লাশটুকু ক্যামেরায় তুলতে পেরেছিল।
ওদিকে মা হাতি তখনও নিজের প্রাণ বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে, গ্রামবাসীরা সংখ্যায় অনেক, আর সে একা, অতএব তাকে তারা সহজেই চাইলে পুড়িয়ে মেরে ফেলতে পারে, হাতিটা তখন নিজের জঙ্গলের দিকেই ছুটে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে, কারন সেখানে ঢুকতে পারলেই সে নিরাপদ, কিন্তু বেচারির শেষরক্ষা আর হল না, সে জঙ্গলে পৌঁছতে পারে তার আগেই বেকায়দা হোচট খেয়ে পিছলে মাটিতে পড়ে গেল সে, সেখান থেকে জঙ্গল অনেক দূরে, সে পড়ে গিয়ে চিৎকার করতে লাগল যাতে তার সঙ্গীরা তার চিৎকার শুনে অন্তত কেউ আসে, যদিও সেখান থেকে জঙ্গলের ভেতর অবধি চিৎকার যাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু তাও সে চিৎকার থামাল না, তাছাড়া পড়ে গিয়ে গুরুতর চোট পাওয়ার কারনেও সমানে চিৎকার করছিল সে, আর ততক্ষণে সেখানে সেই সকল ক্ষেপে ওঠা গ্রামবাসীরাও সব একেক করে হয়ে গেল একাট্টা, আর তারপর রতন এগিয়ে গিয়ে একটা জ্বলন্ত বর্শা সোজা ঢুকিয়ে দিল সেই হাতিটির পেটের ভেতর, একটা তীব্র আর্তনাদ, তারপর টান মেরে সেই বর্শাটা রতন বের করতেই সেই মা হাতিটার পেটের ভেতরের অপত্যের আধা বিকশিত রক্তাক্ত দেহটাও বেরিয়ে এল, সেটাকে ফেলে দিল রতন মাটিতে, আর সেই হাতিটা মুহূর্তে সেখানেই প্রাণ ত্যাজিল। তার শবের ওপর আবার একটা লোক একটা তেলের টিনের ডিব্বা নিয়ে চড়ে দাঁড়িয়ে প্রথমে বেশ কিছুক্ষণ নাচতে নাচতে আনন্দে লাথি মারল সেই হাতিটার নিথর শরীরে, তারপর সে আর তার সাথে আরও অনেকে একেক করে নিজেদের সাথে আনা টিনের ডিব্বা থেকে তেল ঢালতে শুরু করে দিল সেই হাতিটার লাশের গায়ে, তারপর সন্ধ্যের আকাশে, দাউদাউ করে আগুন জ্বলে অন্ধকার হয়ে আসা আকাশটা একেবারে দিনের বেলার মত আলোকিত করে তুলল আবার করে, নিজের বউ আর সন্তানের হন্তারক সেই হাতিটার শরীরে গায়ে রাগের মাথায় পেচ্ছাপ আর মলত্যাগ করার ইচ্ছেও ছিল রতনের, কিন্তু ততক্ষনে তার লাশটা জ্বলে উঠেছে, আর রতন শুধু দাঁড়িয়ে দেখছে দূর থেকে বাকি লোকেদের সাথে।
পরবর্তীকালে সেই ঘটনাকে নিয়েও খবরে নানা বিতর্ক হয়, কয়েক দিনের মত পশুপ্রেমীরা রাস্তা দখল করেন, আর তারপর শান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন।
পরবর্তীকালে একজন সাংবাদিকের ক্যামেরায় তোলা বড় রাস্তা পার করে পালানোর চেষ্টায় রত একটি বড় মা হাতি আর তার কয়েক হাত পেছনে গায়ে আগুন লাগা একটি ছোট্ট বাচ্চা হাতির ছবি একটি আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি ম্যাগাজিনে সেরা পুরষ্কার পায়।
