Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Sukdeb Chattopadhyay

Others


5.0  

Sukdeb Chattopadhyay

Others


বাংলায় রেলের শৈশব

বাংলায় রেলের শৈশব

18 mins 775 18 mins 775

ধন্য ধন্য সুকৌশল,

জ্বালিয়ে অঙ্গারনলপরিতপ্ত করি জল,

বার করি বাষ্পদল,

বেগে কল চলিছে।– দীনবন্ধু মিত্র।

চারদিকে ‘হরিবোল’ ‘হরিবোল’ ধ্বনির মাঝে গর্জন করতে করতে আকাশ কালো করে ছুটল ‘পাগলা হাতি’। ‘বাষ্পীয় রথ’, পশু ও মানুষের শক্তির উপর নির্ভরশীল পথচলাকে অনেক পিছনে ফেলে এগিয়ে চলল। ১৮৫৪ সালের ১৫ই অগস্ট মঙ্গলবার, সকাল ৮.৩০এ প্রথম ট্রেন হাওড়া থেকে ছেড়ে ৩৮কিমি দূরে হুগলী পৌছল ১০.০১এ। প্রথম ট্রেন যাত্রায় শামিল হওয়ার জন্য তিন হাজার দরখাস্ত জমা পড়েছিল। তারমধ্যে আটশো জনের সৌভাগ্য হয়েছিল ওই ট্রেনে যাওয়ার।

ততদিনে অবশ্য ভারতের পশ্চিম প্রান্তে রেল চলাচল শুরু হয়ে গেছে। ৬ই এপ্রিল, ১৮৫৩ তে বিকেল তিনটে পঁয়ত্রিশ মিনিটে ভারতবর্ষ তথা এশিয়ার প্রথম ট্রেন বম্বে থেকে রওনা হয়ে ৩৪কিমি দূরত্ব অতিক্রম করে পৌছয় থানা স্টেশনে।

দেশে প্রথম রেল কোলকাতাতেই চলার কথা।

The first train in India might well have run from Calcutta, if it hadn’t been for a careless captain who sank the ship carrying the first carriages for the East Indian Railway, and a careless clerk who dispatched the first locomotive to Australia instead of India.----- Sir Mark Tully.

বিলেত থেকে রেলগাড়ি বহন করে আনা জাহাজ “গুডউইল” গঙ্গাসাগরের কাছে Sand heads এসে ডুবে যাওয়া আর ইঞ্জিন “ফেরারি কুইন” বহনকারী জাহাজ ভুল বশত অস্ট্রেলিয়া চলে যাওয়া ছাড়াও আর একটি সমস্যার কারণে “ইস্ট ইন্ডিয়ন রেলওয়ে কোম্পানি” প্রথম হতে পারেনি। ইঙ্গ ফরাসি বৈরিতার কারণে ফরাসি অধিকৃত চন্দননগরের উপর দিয়ে রেল লাইন পাতার অনুমতি দিতে ফরাসি সরকার প্রথমে অস্বীকার করে। দীর্ঘ সময় আলাপ আলোচনার পর অনুমতি মেলে।

কথা ছিল বড়লাট ডালহৌসি উদ্বোধন করবেন স্বয়ং এই ট্রেনে যাত্রী হয়ে। তিনি কোন কারণে আসতে না পারায় রেলের সাহেব সুবোদের নিয়ে বিজ্ঞাপিত সময়ের দেড় ঘণ্টা আগেই প্রথম ট্রেন রওনা হল হুগলী অভিমুখে। মাঝে তিনটে স্টেশন- বালি, শ্রীরামপুর আর চন্দননগর। গাড়ির গতি ছিল ঘণ্টায় ২৬.৩২ মাইল। ইঞ্জিনের প্রধান সুপারেন্টেন্ডেন্ট ছিলেন মি. হজসন। ১লা সেপ্টেম্বর ১৮৫৪ থেকে রেলপথ এগোল পান্ডুয়া পর্যন্ত আর ৩রা ফেব্রুয়ারি ১৮৫৫ তা পৌছল রানিগঞ্জ।

হাওড়া থেকে প্রথম ট্রেন ছাড়ার খবর ছড়িয়ে পড়তে মানুষের মধ্যে এক অদ্ভুত উন্মাদনার সৃষ্টি হয়। হাওড়ায় এবং রেলপথের দুধারে কাতারে কাতারে মানুষ জড় হয় এই অভূতপূর্ব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার জন্য। শুধু প্রথম দিন নয়, প্রথম দিকে এ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সেদিনের মানুষগুলোর মনে কৌতূহলের মাঝে ছেয়ে থাকত ভয় আর অপার বিস্ময়। বিশাল সরীসৃপের মত রেলগাড়িকে আসতে দেখে মানুষের প্রতিক্রিয়া এক সাহেব রেল যাত্রীর “দ্য বেঙ্গল হরকরা” পত্রিকায় লেখা চিঠি থেকে আন্দাজ করতে পারি—

As we passed along, the native assembled on either side of the road, sallamed the furious salamandrine in its course.

সাপের মত লম্বা শরীর, এঁকে বেঁকে চলতে চলতে নাক দিয়ে বিষের ধোঁয়া ছাড়ছে আর শিস দিচ্ছে, ভয় তো হবারই কথা। ভয় থেকে আসে ভক্তি। শুরু হল দেব জ্ঞানে পুজো। গাড়ি এসে দাঁড়ালে গ্রামের স্ত্রীলোকেরা ইঞ্জিনে সিঁদুর পরিয়ে দিল। রেল লাইনের দুধারে রাখল নৈবেদ্য, ছড়িয়ে দিল ফুল।

গানও বাঁধা হল-

রেল রেল রেল

তোমার পায়ে দিই তেল।

রেলের কুঠি কতদূর,

ব্যাথার পায়ে তেল সিঁদুর।

এস রেল বোসো রেল

মুখে জল বাতাসা

চালে ডালে রেখো তুমি

আমার কাছারে বাছারে

রেল রেল রেল

আমার ভাতারে দিও মুড়ি তেল।

একেবারে প্রথম দিকে সাহস করে যে সব মানুষ রেলে চড়েছিলেন তাঁদের কিছু বিচিত্র উপলব্ধি Bengal Hurkaruথেকে আমরা জানতে পারি।

কলকাতার নামকরা ব্যবসায়ী রূপচাঁদ ঘোষ। শখ করে একদিন উঠলেন “আগুনের রথে”। নামার পরেই কেমন দিশাহারা ভাব। অতটা পথ এত অল্প সময়ে পৌঁছে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে তিনি হুগলীতে নেমেছেন। নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি স্থানীয় লোকেদের জনে জনে জায়গাটার নাম জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন।

পাঁজি পুঁথি দেখে দিন ক্ষণ বেছে গঙ্গা স্নান করে পণ্ডিত রাধালঙ্কার ইষ্টনাম জপতে জপতে হাওড়া থেকে গাড়িতে উঠলেন। হুগলী পৌঁছে ঠিক করলেন যে তিনি কোন অবস্থায় “আগুনের গাড়িতে” আর ফিরছেন না। দ্রুতগতিসম্পন্ন রেলগাড়ি যে ভাবে যাত্রার সময় কমিয়ে দিল তাতে তিনি নিশ্চিত যে এতে যাত্রা করলে সময়ের অনুপাতে মানুষের আয়ুও কমতে থাকবে। অতএব বাঁচতে হলে ওই গাড়িতে আর নয়।

 

আজকে ঘটনাগুলো যতই হাস্যকর মনে হোক, পালকি, গরুর গাড়ি, ছ্যাকরা গাড়িতে অভ্যস্ত মানুষজনের যান্ত্রিক গতিবেগকে প্রত্যক্ষ করে ভীত, বিস্মিত, হতচকিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। শুধু আমাদের দেশেই নয়, তুলনায় অনেক শিক্ষিত এবং উন্নত দেশেও এমন ঘটনা প্রচুর আছে। তখন আমাদের শাসক দেশটির যিনি শাসক, সেই মহারাণী ভিক্টোরিয়া রেলে চড়েন সেই দেশে রেল ব্যবস্থা চালু হওয়ার সতের বছর পর। এতটাই ছিল তাঁর রেল ভীতি।

এই ধরনের ভীতি থেকে এসেছে আশঙ্কা, বিদ্বেষ, আক্রোশ, যা প্রতিফলিত হয়েছে নানা লেখায়।

John Bull কাগজে এমনই একটি সমালোচনা—

If they succeed they will give an unnatural impetus to society, destroy the relation which exists between man and man, overthrow all mercantile regulations, overturn the metropolitan markets, drain the provinces of their resources and create at the peril of life, all sorts of confusion and distress. If they fail, nothing will be left but the hideous memorials of public folly.

এক জার্মান ডাক্তারের ভবিষ্যৎবানী—

it would be impossible for people to watch the trains pass along without going mad and unless hoardings were erected the cow’s milk would turn sour. চার্লস ডিকেন্সের Martin Chuzzlewitউপন্যাসে ধাত্রী শ্রীমতী গ্রাম্প রেল গাড়িকে শাপ শাপান্ত করতে করতে বলছেন যে ইঞ্জিনের ভয়ানক শব্দের জন্যই চারিদিকে এত অকাল প্রসবের ঘটনা ঘটছে।

কবি ওয়ার্ডস ওয়ার্থও রেলকে একেবারেই পছন্দ করতেন না। রেলের একটি শাখা লাইন সম্প্রসারণের প্রস্তাবকে নামঞ্জুর করার জন্য তিনি তাঁর দেশের প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করে চিঠি লেখেন—

The project if carried into effect will destroy the staple of the country, which is its beauty. It will prove subversive to its quiet and be highly injurious to its morals.

ভারতে রেলপথ চালু হয় ইউরোপের বেশ কয়েক দশক পরে। কিছু সমস্যা থাকলেও সেই সব দেশেযোগাযোগের এই বাহন তখন কালের পরীক্ষায় অনেকটাই উত্তীর্ণ। আমাদের দেশেরও বেশ কিছু বিশিষ্ট জনের ততদিনে বিদেশে গিয়ে রেলগাড়িতে সওয়ার হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে। সাধারণ অনভিজ্ঞ মানুষ এক অদৃষ্টপূর্ব অবিশ্বাস্য জিনিসকে প্রত্যক্ষ করে স্তম্ভিত, বিচলিত, উল্লসিত অথবা আশঙ্কিত হবে এটা স্বাভাবিক কিন্তু রেল ব্যবস্থার সাথে ততদিনে পরিচিত দেশ বিদেশের অনেক বিশিষ্ট জনেরও সুচনা লগ্নে বক্তব্যে ছিল মন্দগ্রাহী সূর।

নিজেদের দেশের শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচা মাল ভারত থেকে সস্তায় নিয়ে আসাই ইংরেজদের ভারতবর্ষে রেল ব্যবস্থা প্রবর্তনের একমাত্র উদ্দেশ্য, এমনটাই ছিল  কার্ল মার্ক্সের প্রাথমিক ধারণা।পরে তিনি উপলব্ধি করেন যে ঔপনিবেশিক স্বার্থ ছাড়াও রেল ভারতে এনেছে শিল্পায়নের এক বিশাল সম্ভাবনা। এ ছাড়াও তিনি জানিয়েছিলেন “ রেলওয়ে ব্যবস্থা থেকে প্রসূত আধুনিক শিল্পায়ন, বংশগত শ্রমবিভাগ যার ভিত্তিতে ভারতবর্ষের জাতি-ভেদ প্রথা দাঁড়িয়ে আছে, এবং যা ভারতবাসীর প্রগতি ও ক্ষমতার পথে চুড়ান্ত বাধাস্বরূপ, তাকে ভেঙে ফেলবে।“ শিল্পায়নে রেলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রশ্নাতীত কিন্তু বংশগত শ্রমবিভাগের কিছুটা পরিবর্তন এবং পুনর্বিন্যাস হলেও জাতিভেদ, বর্ণভেদ, আজও আমাদের সমাজের এক দুরারোগ্য ব্যাধি।

রেল ব্যবস্থা যে জনগণের সুখ ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধিতে সক্ষম নয় এই ধারণা বঙ্কিমচন্দ্র ব্যক্ত করেছেন তাঁর কমলাকান্ত চরিত্রের মাধ্যমে—কমলাকান্তের জিজ্ঞাসা এই যে তোমার রেলওয়ে টেলিগ্রাফে আমার কতটুকু মনের সুখ বাড়িবে?

মহাত্মা গান্ধীও রেলওয়েকে সন্দেহের চোখে দেখেছেন। তাঁর ধারণা, রেল আসার ফলেই দুর্ভিক্ষ বেড়ে গেছে, রোগের বিস্তার ঘটেছে আর সভ্যতার যত কুফল ছড়িয়ে পড়েছে।

রমেশ চন্দ্র দত্ত, সখারাম গনেশ দেউস্কর এর মত তখনকার অনেক বিশিষ্ট মানুষেরা নানান কারণে রেলকে স্বাগত জানাননি।

রেলপথ পত্তনের প্রথম দিকে কর্মীদের নানান প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কখনো তা ছিল প্রাকৃতিক কখনো বা সামাজিক। জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় লাইন পাতার কাজ চলার সময় মুখোমুখি হতে হয়েছে হিংস্র জন্তু জানোয়ারের। বুনো হাতি এসে টেলিগ্রাফের খুঁটি উপড়ে ফেলে দিত। খুঁটিতে পেরেকের মালা জড়িয়ে সামলান হত এই উৎপাত। এই জলা-জঙ্গলে কাজ করতে এসে শ্রমিকেরা কালাজ্বরের মত দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হত। উপযুক্ত প্রতিষেধক বা ওষুধপত্রের অভাবে তা মহামারীর আকার নিত এবং মৃত্যু হত বহু কর্মীর। প্রথমদিকে শ্রমিক যোগাড় করাও বেশ কঠিন ছিল। সাহেবদের সাথে কাজ করলে জাত যাবে তাই কুলি কামিনের কাজ করতে কেউ আসতে চাইত না। কিন্তু কিছু সময় পরে অনাহার ক্লিষ্ট নিম্নবর্গীয় নিপীড়িতরা একটু খেয়ে পরে বেঁচে থাকার আশায় জাত যাওয়ার ভয়কে দূরে সরিয়ে দলে দলে রেল নির্মাণের কাজে শরিক হল। দক্ষিণ ভারত থেকে এল ‘কাউলি’ বা ‘কেলি’ সম্প্রদায়, যেখান থেকে এসেছে আজকের ‘কুলি’ শব্দটি। বাংলায় অধিক রোজগারের আশায় কামার, কুমোর, জেলে, কৃষক, সব ধরণের লোকই বংশানুক্রমিক বৃত্তি ছেড়ে রেলের কাজে যোগ দিল।

তখনকার কুসংস্কারাচ্ছন্ন, রক্ষণশীল সমাজ থেকেও এসেছিল বিস্তর বাধা। সমাজের মাথারা ম্লেচ্ছদের গাড়ি লোকালয়ের আশপাশ দিয়ে যেতে দিতে আপত্তি করায় বেশ কিছু যায়গায় প্রস্তাবিত পথ পরিবর্তন করে অনেক ঘুরপথে লাইন পাততে হয়। তাই তখন স্টেশনগুলো ছিল গ্রামের থেকে অনেকটা দূরে।

এ ছাড়া ছিল নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর পরিবহনের সমস্যা। কাঠের স্লিপার, রেল, ইত্যাদি আনা হত নদীপথে অথবা দেশি গাড়িতে যা ছিল সময় এবং খরচ সাপেক্ষ।

তবে সবথেকে বড় সমস্যা এবং বাধা আসে ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল বিদ্রোহ বা সান্তাল হুল এর সময়। বাংলার এবং বিহারের অনেক যায়গাতেই তা ভয়ানক আকার নেয়। স্থানীয় জমিদার, মহাজন ও ইংরেজ কর্মচারীদের অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সিধু, কানু, চাঁদ প্রমুখের নেতৃত্বে সাঁওতালরা ঐক্যবদ্ধভাবে গড়ে তোলে সশস্ত্র গণ সংগ্রাম। রেলওয়ে কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ারেরা তাদের সাথে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।  ওই সময় রেলপথ পত্তনের কাজ ভয়ানক রকম ব্যাহত হয়।

 

 পূর্ব রেল হতে প্রকাশিত পুস্তকাদি থেকে জানা যায় যে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বর্তমান হাওড়া অঞ্চলটি ছিল এক বিস্তীর্ণ জলাভূমি। স্থানীয় ভাষায় “হাওড়”। চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেষের কারণে লোকবসতি প্রায় ছিল না বললেই চলে। ছিল কিছু কুলিদের বস্তি আর একটি রোমান ক্যাথলিক বালক বালিকাদের অনাথ আশ্রম। আশ্রমটির দায়িত্বে ছিলেন পর্তুগিজ ডোমিনিক্যান সম্প্রদায়ের মিশনারিরা। ওই অঞ্চলে মহামারী হওয়াতে তাঁরা আশ্রমটিকে কলকাতায় স্থানান্তরিত করেন। ওই অঞ্চলটাই পূর্ব ভারত রেল কোম্পানি পাদ্রিদের থেকে কিনে নেয়। সেখানে কয়েকটি টিনের ঘর বানিয়ে শুরু হয় ইঞ্জিন আর রেলগাড়ি তৈরি আর মেরামতের কারখানা। সেখানেই একপাশে তৈরি হয় টিকিট ঘর আর সামনে মোরাম ছড়ানো রেলের প্ল্যাটফর্ম। এখনকার তেরনম্বর প্ল্যাটফরমের জায়গা থেকেই ছাড়ে প্রথম ট্রেন। এই পারসেল শেডের বাফারই ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের প্রকৃত Zero Mile. এখনো হাওড়া ডি.আর.এম. এর অফিসের দেওয়ালে লাগান আছে ব্রোঞ্জের সেই ঐতিহাসিক ফলকঃ

ORIGINAL ZERO MILE

E. I. RLY.

কলকাতার যাত্রীদের জন্য আরমেনিয়ান ঘাটে টিকিটঘর ছিল। মালপত্র সমেত যাত্রীদের গঙ্গা পারাপারের জন্য ছিল ষ্টীম বোট। রেলের টিকিটের মধ্যেই বোটের ভাড়াও ধরা থাকত। স্যার ব্রাডফোর্ড লেসলির উদ্যোগে ভাসমান পন্টুন ব্রিজ চালু হওয়ার পর স্টিমার পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়।

হাওড়া থেকে রওনা হওয়া প্রথম ট্রেনটিতে তিনটি প্রথম শ্রেণীর, দুটি দ্বিতীয় শ্রেণীর, তিনটি তৃতীয় শ্রেণীর ও গার্ডের জন্য একটি ব্রেকভ্যান ছিল। একটি কামরা এক ভারতীয় এবং আর একটি কামরা শিরকোর নামে এক ইউরোপীয় ভদ্রলোক রিজার্ভ করেছিলেন। হুগলী পর্যন্ত প্রথম শ্রেণীর ভাড়া ছিল তিন টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণীর এক টাকা দু আনা আর তৃতীয় শ্রেণীর সাত আনা। তৃতীয় শ্রেণীর কামরার দরজা বাইরে দিকে খুলত আর কোন শৌচাগার ছিল না। ১৮৭৪ সালে চতুর্থ শ্রেণীর কামরা যুক্ত হয়। তখন ওই কামরায় বসবার বেঞ্চ থাকত না। মেঝেতে বসতে হত। ১৮৮৫ সালে বসার জন্য বেঞ্চের ব্যবস্থা করা হয়। তখন থেকে ওই কামরা হল তৃতীয় শ্রেণী আর আগের তৃতীয় শ্রেণীর নাম হল ‘ইন্টারমিডিয়েট’ বা ‘ইন্টার ক্লাস’। আজকাল কিছু কিছু ট্রেনে যে দোতলা কামরা দেখি তা কিন্তু রেলে নতুন সংযোজন নয়। ১৮৬২ সালে রেলে দোতলা তৃতীয় শ্রেণীর কামরা ব্যবহার করা হয়। 

তৃতীয় শ্রেণীতে শৌচাগার না থাকায় সকলেরই অল্প বিস্তর সমস্যা হত। একবার শ্বশুরবাড়ি থেকে গুরুপাক ভোজের সাথে অতিরিক্ত কাঁঠাল খেয়ে নতুন জামাই শ্রীমান অখিলের বড়ই করুণ অবস্থা হয়েছিল। স্টেশনে নেমে কাজ সারতে সারতেই ট্রেন দিল ছেড়ে। পড়িমড়ি করে দৌড়ে আসতে গিয়ে ট্রেনও গেল, জামাকাপড়ও গেল । ক্রুদ্ধ হয়ে District Traffic Superintendent, Sahibganj Divisional Office কে লিখল এক কড়া চিঠি—

 

Beloved Sir,

I am arrive by passenger train atAhmedpore station and my belly is too much swelling with jackfruit. I am, therefore went to privy. just as I doing nuisance that guard making whistle blow for train to go off and I am running with ‘Lotah’ in one hand ‘Dhoti’ in the next when I am fall over and expose all my shockings to man and female woman on the platform. I am got leaved at Ahmedpur station.

This too much bad, if passenger go to make dung the damn guard not wait train five minutes for him. I am, therefore pray your honour to make big fine on that damn guard for public sake, otherwise I am making big report to papers.

 

Yours faithful servant,

                                                                                                                                  Okil Ch. Sen.


 রেলের সংগ্রহালয়ে আজও রাখা আছে মজার এই চিঠিখানি। এরপর ১৮৯১ সালে তৃতীয় শ্রেণীতে শৌচাগার হল।

উচ্চ শ্রেণীতে বিলাসের সবরকম বন্দবস্ত থাকলেও তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীদের কষ্টের শেষ ছিল না। একটু চোখ বোলান যাক সেই সময়ের সংবাদ প্রভাকরের পাতায় ----আহা যাহারা তৃতীয় শ্রেণীর শকটারোহণে গমনাগমন করে তাহাদিগের দুঃখ বর্ণনা করা যায় না, কোন ব্যক্তি হাবড়াতে তৃতীয় শ্রেণীর টিকিট ক্রয় করিতে গেলে কি সাহেব কি সামান্য চাপরাসি সকলেই তাহার উপর বিরক্ত হইয়া ওঠে, ধাক্কা দেয়, ঠেলা মারে, সময়ে সময়ে বেত্রাঘাতও করিয়া থাকে , ঐ ব্যক্তি এই সমস্ত ক্লেশ স্বীকার করিয়া যদ্যপি টিকিট প্রদানের গর্ত্তের সম্মুখে গিয়া তিন আনার একখানি টিকিট চাহে তবে বিক্রেতা রৌপ্য মুদ্রা চাহেন। ক্রেতা মূল্যের রৌপ্য মুদ্রা কোথায় পাইবে, অতএব যদ্যপি টাকা কিম্বা আধুলি দিয়া অবশিষ্ট পয়সা চায় তাহা গোলযোগে প্রায় প্রাপ্ত হয় না...।

--- সে গাড়িতে উঠিবার স্থানে আসিয়া দণ্ডায়মান হইলে তথাকার প্রহরীরা তাহাকে ধাক্কা মারিয়া ফেলিয়া দেয়, এই সমস্ত যন্ত্রণা সহ্য করিয়া গাড়ি আরোহণ করিলেও তাহার নিস্তার নাই, সাহেব ও চাপরাসিগণ গাড়িতে অধিক লোক পুরিবার নিমিত্ত ঘুসা ও ধাক্কা মারিতে থাকেন। এইরূপ পরিপূর্ণ হইলে এবং সকলের অঙ্গ প্রসারণের শক্তি অবরোধ হইলেও যদ্যপি কোন ব্যক্তি টিকিট লইয়া উপস্থিত থাকে তবে তাহাকে জানোয়ারের গাড়িতে তুলিয়া লয়েন....।

প্রায় এক দশক পরে লেখা কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ তেও তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীদের দুঃখ দুর্দশার একই ছবি দেখতে পাই---

---থার্ডক্লাস বুকিং অফিসে লোকের ঠোল মেরেচে, রেলওয়ের চাপরাশীরা সপাসপ্ বেত মাচ্চে, ধাক্কা দিচ্চে, ও গুঁতো লাগাচ্চে, তথাপি নিবৃত্তি নাই। ‘মশাই শ্রীরামপুর!’ ‘বালি বালি!’ ‘বর্দ্ধমান মশাই!’ আমার বর্দ্ধমানেরটা দিন্ না’ শব্দ উঠছে চারিদিকে কাটের ব্যাড়াঘেরা বুকিং ক্লার্ক সন্ধ্যা পূজার অবসরমত ঝোপ্ ব্যুঝে কোপ্ ফেলচেন। কারো টাকা নিয়ে চার আনার টিকিট ও দুই দোয়ানি দেওয়া হচ্চে, বাকি চাবা মাত্র চোপ রও ও নিকালো, কারো শ্রীরামপুরের দাম নিয়ে বালির টিকিট্ বেরুচ্চে... যদি চিৎকার করে ক্লার্ক বাবুর চিত্তাকর্ষণ কত্তে চেষ্টা করে, তখনি রেলওয়ে পুলিশের পাহারাওয়ালা ও জমাদারেরা গলা টিপে তাড়িয়ে দেবে...… ।

প্রতিতুলনায় প্রথম শ্রেণীতে রাজসিক সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা ছিল। যদিও সে সুখ ১৯৩৩এর আগে পর্যন্ত কেবলমাত্র সাহেবদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

ভ্রমণকারীদের মধ্যে শ্রেণী বিভাজনরেলেই প্রথম পরিলক্ষিত হল। এর আগেও শ্রেণী বৈষম্য ছিল। গরিবেরা পায়ে হেঁটে, মধ্যবিত্ত গরুর গাড়িতে, ধনীরা পাল্কিতে আর সাহেবরা ঘোড়ার গাড়িতে যাতায়াত করতেন। জলপথেও খেয়ার পাশাপাশি ছিল বিলাসবহুল বজরা। কিন্তু সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য একই পরিবহণে শ্রেণীবিভাগের ব্যবস্থার পথিকৃৎ হল ঔপনিবেশিক ভারতের রেল।

উচ্চবর্ণের গোঁড়া কিছু হিন্দুর তৃতীয় শ্রেণীর গাদাগাদি করে যাওয়াটা একেবারেই নাপসন্দ ছিল। তবে সেটা কেবলমাত্র শারীরিক কষ্টের কারণে নয়। নানা জাতের ছোঁয়াছুঁয়ির কারণে তাঁদের জাত যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। আপত্তি জানিয়ে রেলে চিঠিও জমা পড়ে। উত্তরে ১৮৫৪ সালে মাদ্রাজের চিফ ইঞ্জিনিয়ার জানান -- জাতপাত, ধর্মবিশ্বাস, এইসব মেনে চলার দায়িত্ব রেলওয়ে প্রশাসনের নয়, এবং তাই ব্রাহ্মণের জন্য এক কামরা, ও তাদের চোখে যারা অস্পৃশ্য, তাদের জন্য অন্য কামরার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়।

তিনি এও জানান—একটা মাত্র পার্থক্যই আমরা মানতে রাজি যা শুধু অর্থ দিয়ে নির্ধারিত হয়।

কিন্তু অর্থ দিলেও একজন ভারতীয় যাত্রী ও একজন শ্বেতাঙ্গ যাত্রীর সাথেসাধারণত সমব্যবহার করা হত না। প্রথম শ্রেণীর কামরায় স্বেতাঙ্গের দ্বারা ভারতীয় যাত্রীদের হেনস্থা হওয়ার বহু ঘটনা নথিভুক্ত হয়ে আছে। অবশ্য ব্যতিক্রমও আছে।

বাবু রামগোপাল ঘোষ তখনকার একজন নামী লোক। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার। হাওড়া থেকে বর্ধমান পর্যন্ত পরীক্ষামূলক ট্রেন যাত্রায় বিশিষ্ট যাত্রীদের মধ্যে তিনিও ছিলেন। পান্ডুয়ার কাছেই তাঁর দেশ। ঐ অঞ্চল দিয়ে পাকাপাকি ভাবে ট্রেন চালু হলে তিনি মাঝে মাঝে দেশে যাতায়াত করতেন। যাতায়াতে তাঁর সাচ্ছন্দের প্রতি রেল কোম্পানি বিশেষভাবে নজর রাখত। একবার ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে কিন্তু রামগোপাল বাবু পালকি করে আসছেন দেখে ড্রাইভার গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিল। তিনি ওঠার পর আবার গাড়ি ছাড়ল।

পরাধীন দেশে বাঙালি বাবুর এই খাতির কেবল ব্যতিক্রমই নয় অচিন্তনীয়।

ব্যতিক্রম আরো কিছু ছিল। সেকালের স্থানীয় রাজা মহারাজাদের নিজস্ব সেলুন এমনকি স্পেশাল ট্রেনও ছিল। গোয়ালিয়র, বারানসি, বরোদা, পাতিয়ালা, প্রভৃতি মহারাজাদের সেলুনগুলিতে বিলাস বৈভবের অন্ত ছিল না। শয্যা, স্নান ঘর, ব্যাঙ্কোয়েট হল, সবে মিলে এগুলি ছিল রাজমহলের এক একটি ছোট সংস্করণ।

 

যানে যারা যাতায়াত করে তাদের জানের একটা খতরা থাকেই। কারিগরির এত উন্নতির পরেও রেল দুর্ঘটনা এখনও মাঝে মাঝেই হয়। সূচনা লগ্নে সে সম্ভাবনা আরো অনেক বেশি ছিল। রেল যাত্রীদের হিতার্থে বিখ্যাত যুক্তিবাদী লেখক অক্ষয় কুমার দত্ত ১৮৫৫ সালে ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’র যন্ত্রালয় থেকে মুদ্রিত করেন ‘বাষ্পীয় রথারোহীদিগের প্রতি উপদেশ’ নামক এক পুস্তিকা। বিষয় বস্তুর নির্যাসে বলা ছিল—যাঁহারা কলের গাড়ী আরোহান করিয়া গমন করেন, তাঁহাদের তৎসংক্রান্ত বিঘ্ন নিবারণের উপায় প্রদর্শন।

বাষ্পীয় রথকে ‘পরমাদ্ভূত বস্তু’ আখ্যা দিয়ে বিজ্ঞানের এই উদ্ভাবনকে সাধুবাদ জানিয়েও এর সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে যাত্রীদের অবহিত করার নিমিত্ত এই পুস্তিকা প্রকাশ করেন।

“ নরলোকে নিরবিচ্ছিন্ন কল্যাণকর পদার্থ অতীব দুর্লভ। শুভাশুভ একত্র এতাদৃশ মিলিত হইয়া রহিয়াছে, যে তাহাদিগকে পরস্পর পৃথক করা অসাধ্য বলিয়া বোধ হয়। ... অশেষ শুভ সাধক বাষ্পীয় রথেও মধ্যে মধ্যে বিঘ্ন ঘটিয়া অনেক ব্যক্তি হত ও আহত হইয়া থাকে। কিন্তু দূরদর্শী পণ্ডিতেরা গণনা করিয়া দেখিয়াছেন, স্থল-পথে, ও জল-পথে অন্যান্য যানে গড়ে যত ব্যক্তির শরীর পীড়া ও প্রাণ বিয়োগ হয়, বাষ্পীয় রথে কদাচ তত ব্যক্তির হয় না। তাঁহারা অবধারণ করিয়াছেন, অধুনা বাষ্পীয় রথে উক্ত প্রকার যত বিঘ্ন উপস্থিত হয়, তাহার অর্ধাংশ রথারূঢ় ব্যক্তিদিগের স্বকীয় দোষে ও অন্যান্য কারণে উৎপাদিত হইয়া থাকে। অন্যের দোষে যে সমস্ত বিঘ্ন উপস্থিত হয়, তাহার নিরাকরণ করা রথারোহীদিগের পক্ষে সম্ভব নয় বটে, কিন্তু তাঁহাদের আপন দোষে যাবতীয় বিঘ্ন উৎপন্ন হয়, তাঁহারা সাবধান ও সতর্ক হইয়া অবশ্যই তাহা নিবারণ করিতে পারেন।“

গাড়ি চলন্ত অবস্থায় ওঠানামা, জানলার বাইরে হাত বার করা, ইত্যাদি বেশ কিছু ব্যাপারে পুস্তিকায় বিস্তারিতভাবে যাত্রীদের সতর্ক করা হয়েছে। এ ছাড়াও বইটিতে আছে রেলের ভাড়া, শ্রেণীবিন্যাস, যাত্রীদের মানসিকতা, রেল যাত্রার সময়, ইত্যাদি নানা তথ্য। কলেবরে ছোট হলেও বইখানি ঐ সময়ের এক মূল্যবান দলিল।

 

রেল ব্যবস্থা তৎকালীন সমাজ বিশেষত গ্রাম্য সমাজকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছিল।তা কেবল উন্মাদনা, স্তুতি, ভয় বা কৌতূহলে সীমাবদ্ধ থাকেনি, সমাজের অন্দরেও নানা স্তরে ঘটেছিল বহুবিধ পুনর্বিন্যাস।

এতদিন গ্রামীণ মানুষের জীবন এবং জীবিকা আবর্তিত হত নির্দিষ্ট অঞ্চলকে কেন্দ্র করে। মুষ্টিমেয় কিছু ধনী বণিক সম্প্রদায়ের কথা বাদ দিলে দূর দূরান্তের সাথে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ প্রায় ছিল না বললেই চলে। গ্রামের মানুষের নিত্য প্রয়োজন মিটত স্থানীয় মানুষেরই মাধ্যমে। গ্রামে উৎপন্ন পণ্য সন্নিহিত অঞ্চলের হাটে বাজারেই বিক্রি হত। রেল পরিসেবা চালু হওয়ার পর পণ্যের বাজার আর নির্দিষ্ট এলাকাতে আটকে থাকল না। উন্নত পরিবহণ ব্যবস্থার সুবাদে দূর দূরান্তে পণ্য চলাচল শুরু হল। অনেক দুর্লভ জিনিস সুলভ হল। পালটে গেল বাজারের চেনা চরিত্র।

কেবল বাজারই নয় সামগ্রিকভাবে সমাজজীবনেই এল পরিবর্তনের হাওয়া। বদ্ধ সমাজে বংশপরম্পরায় একই বৃত্তিকে অবলম্বন করে মানুষ জীবনধারণ করত। রেল লাইন পাতার সময় থেকেই প্রাথমিক জড়তা ও সংস্কার কাটিয়ে অধিক উপার্জনের আশায় পারিবারিক পেশাকে বিসর্জন দিয়ে দলে দলে শ্রমিক রেলের কর্মকাণ্ডে সামিল হতে থাকে। রেল পরিষেবা শুরু হলে ধীরে ধীরে মানুষ ভিটে ছেড়ে রুজি রুটির সন্ধানে এদিক উদিক বেরিয়ে পড়ল। অধিকাংশ হল শহরাভিমুখী। ‘কপাল ফিরাইতে চল কোলকেতা শহর।‘ উপার্জনের কিছু ব্যবস্থা করতে পারলে শুরু হল কর্মস্থলে যাতায়াত, অর্থাৎ ডেলি প্যাসেঞ্জারি। অনেক পরে সুধীর চক্রবর্তীর লেখায় যাদের পেলাম ‘ডেলি পাষণ্ড’ নামে। বাড়ি শহরের থেকে অনেক দূরে হলে প্রত্যহ যাতায়াত করা কষ্টকর, তাই কর্মস্থলের কাছাকাছি থাকার ব্যবস্থা করতে হল। মধ্যবিত্ত আর নিম্ন মধ্যবিত্ত বহিরাগতদের ঠাঁই দিতে শহরে গজিয়ে উঠল অসংখ্য মেস। কাজের দিনগুলোয় মেসে বাস আর সপ্তাহান্তে বাড়ি ফেরা। যার রোজগার বেশি সে একটু বেশি সুখ সুবিধের আশায় চেষ্টা করল শহর বা শহরতলিতে পাকাপাকি একটা আস্তানা বানানোর। ধীরে ধীরে শিথিল হতে থাকল গ্রামের যৌথ পরিবারের বাঁধন। পরিবহণ ব্যবস্থা যত উন্নত হয়েছে ততই নড়বড়ে হয়েছে যৌথ পরিবারের ভিত।

 

সাহিত্য সমাজের দর্পণ। রেলকে কেন্দ্র করে তদানিন্তন সমাজের নানা রূপ চিত্রায়িত হয়েছে তৎকালীন সাহিত্যে।রেলকে নিয়ে রচিত হল অসংখ্য গল্প, কবিতা, নাটক ও গান। এমনকি সে যুগের বাউল ও দেহতত্ত্বের কবিরা ওই বাষ্পীয় রথের চালক যন্ত্রে সন্ধান পেলেন মানব দেহের নতুন রূপকালঙ্কার। রেলগাড়ি আসার পরে স্থানীয় লোকেরা বিদেশিদের চাল-চলন, আদব-কায়দা, রীতি-নীতি, সব কিছু খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেল। জনৈক Sm Mitra এর ‘Hindupur’ নামে এক উপন্যাসে খুঁজে পাই তারই এক ছবি—

You may live in India twenty years—you would never see even a husband kisses his wife. This is why the people crowd round a railway platform to watch an Englishman indulge in kisses at leave taking. It gives the India, Hindu or Mahamedan, something to gossip about for the next fortnight.

সাহেবদের রীতিনীতি, জীবনযাপন নিয়ে শুধু যে রঙ্গ রসিকতা বা গালগল্পই হয়েছে এমনটা নয়। ধীরে ধীরে তা বদলে দিতে থাকল আমাদের দেশের  মানুষের পছন্দ অপছন্দ, সাজ পোশাক, চাল চলন।

বটতলা থেকে প্রকাশিত শ্রীমুন্সী আজিমদ্দিনের লেখা প্রহসন ‘কি মজার কলের গাড়ি’তে রঙ্গ তামাশার মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে রেলের কারণে দৈনন্দিন সমাজ জীবনে ঘটা এবং ঘটতে চলা বেশ কিছু মজার গল্প। গান দিয়ে শুরু—

রাগিণী হাবড়ার ঘাট।                                        তাল শিয়ালদহের মাঠ।

গাওয়া হচ্ছে—

বানিয়েছে রেল রোডের গাড়ি ধন্য সাহেব কারিকর

এখন বিশ্বকর্মার পূজা ছেড়ে ঐ সাহেবকে পূজা কর।

এরপর নাটক শুরু হচ্ছে ‘আই বুড়ি’ নামে এক বয়স্কা মহিলার সাথে কয়েকটি অল্প বয়সী বৌ এর কথাবার্তা দিয়ে।

বয়েরা ( বউএরা ) – প্রণাম আই আশীর্বাদ করো।

আই বুড়ি- আশীর্বাদ আর কি করবো লো, এখন তোদের অদৃষ্টক্রমে ইংরাজ বাহাদুরেরা কল বানিয়েছেন, সেই কলেতেই সকল কল চলছে।

বয়েরা—হাঁ গা আই, সকল কল চলছে কি গা, আরো কি কল আছে।

আই ( হাস্যরূপে )—সে কি লো, তাও কি আর বুঝতে পারিস নি নিত্তি২ তোদের কত্তা বাড়িতে আসছে, এর চেয়ে আর কি সুখ আছে।

বয়েরা—ওরে বুড়ী বড় রসিক এক বলতে আর এক বলে বসে, তোমার কি আর কত্তা বাড়ীতে আসতো না।

বুড়ী—তা তো আসতো, কিন্তু ঐ ন মাসে ছ মাসে তা আবার পথ চলতেই ছেলের বয়েশ যেতো, তখন বারো বৎসর অন্তর একটি ছেলে হওয়া ভার হতো, এখন কলিকালে বৎসর ফিরতে দেয় নি, একটি করে সন্তান বাড়ে, তোমাদের তো এখন বৎসর ফাঁকা যায় না।

ঐ সময়ে চাকুরিজীবী মধ্যবিত্তের পরিবারে জন্মহারে কোন পরিবর্তন হয়েছিল কি না বা  ঘন ঘন পোয়াতি মহিলাদের ‘বছর-বিওনি’ আখ্যা রেল চলাচলের সাথে কতটা সংশ্লিষ্ট তা গবেষণার বিষয়।

আরো কয়েকটি পাতা ওল্টালে দেখতে পাই গ্রামে গৃহবধূরা বিকেলবেলা ট্রেন আসার সময়ে স্বামীদের ঘরে ফেরার প্রতীক্ষায় আনন্দিত। তবে সকলে কিন্তু আনন্দিত নয়, কেউ কেউ আবার চিন্তিত।

‘উপপতি অসতী ধনীদের বিলাস’ এই শিরোনামে রয়েছে মজার কথোপকথন—

যুবতী—ওহে প্রাণনাথ। বলে এখন বাড়ি যাও হোথা মাথা খেয়েছে যে, গাড়ী আসচে কি জানি সে মুকপোড়া যদি এসে পড়ে।

উপপতি—কি কি প্রাণ প্রিয়ে এমন নিষ্ঠুর উক্তি ব্যক্ত কি প্রকার কল্লো হে।

তখন যুবতি গান গেয়ে ওঠে—

যাও যাও হে প্রাণনাথ ঐ এলো এলো গাড়ী

কে জানি সে সর্বনেশে পড়ে যদি এসে বাড়ী।

টাইম ছেড়ে অটাইমে, বসো হে অবনীর ধামে,

টাইম গেলে, তুমি এলে, সমর্পিব মধুর হাঁড়ি।

মজার ব্যাপার, সতী অসতী সকলেরই ‘টাইম’ বা সময় রেলের টাইমকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে।

সে যুগের দেহ তত্ত্বের কবি এবং বাউলেরা বিভিন্নভাবে রেলকে তাঁদের কল্পনায় ঠাঁই দিয়েছেন। পিলু রাগে ও খেমটা তালে রচিত বাউল গানটিতে চলমান রেলকে দেহতত্ত্বের নানা আঙ্গিকে বর্ণনা করা হয়েছে—

দেহ মন কলের গাড়ি

ব্যাপার কি বা পরিপাটি

মূল হতে লাইন খুলে

সাত স্টেশন ঘাঁটি ঘাঁটি

সাঙ্কেতিক দন্ডমূলে

কুন্ডলিনী মুখ তুলে...

রেলগাড়ি কুলকুণ্ডলিনী শক্তির মত উৎস স্টেশন( শরীরে মূলাধার ) হতে যাত্রা শুরু করে বিভিন্ন স্টেশন ছুঁয়ে( চক্র ) গন্তব্যে( ব্রহ্মরন্ধ্র ) পোঁছচ্ছে।

সুষুম্নাতে রেল বসেছে,

তার দুপাশে তার চলেছে

ইড়া পিঙ্গলা এই দুটি।

কৃপাবাষ্প দিয়া ছাড়ি,

শ্রীগুরু চালান গাড়ি,

হংসঃ হংসঃ রব ছাড়ি

চলে গাড়ি ছুটোছুটি।

 ‘রেলযাত্রার পাঁচালি’তে সুকুমার সেন লিখেছেন “ বাংলাদেশে রেলরাস্তার স্থাপন ও আধুনিক সাহিত্যের পত্তন উনবিংশ শতাব্দীর একই দশকে ঘটেছিল, দু এক বছর এদিকে ওদিকে।“ সেকালে প্যারিচাঁদ মিত্রের ‘যৎকিঞ্চিত’ এবং কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশায়’ রঙ্গ রসিকতার মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে নিম্নবিত্ত যাত্রীদের বিড়ম্বনার নানা ঘটনা। রবীন্দ্রনাথের ‘রাতের গাড়ি’, ‘ইসটেশন’, তারাশঙ্করের ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘রেলের কামরার গল্প, রেলকে নিয়ে রচিত হয়েছে এমন অসংখ্য উপন্যাস, গল্প, নাটক, প্রহসন এবং কবিতা। ডেলি প্যাসেঞ্জার বা সুধীর চক্রবর্তীর রসিকতায় ‘ডেলি পাষণ্ড’ , রেলের হকার, শহরের মেস, বারে বারেই লেখকের কলমে উঠে এসেছে গল্পের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে। কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনায় পেয়েছি নিত্যযাত্রীদের লিডার বিখ্যাত ‘খুড়ো’কে যিনি ছিলেন অন্য যাত্রীদের পথের সম্বল। কেবল নিত্যযাত্রীই নয়, রুজি রুটির আশায় কামরায় এসেছে হকার- ক্যানভাসার- ফেরিওয়ালা---

হাটুয়া বেচয়ে দ্রব্য হাটতে বসিয়া

খদ্দের ঘুরিয়া ফিরে কিনিতে আসিয়া।

এ হাট ঘুরিয়া ফিরে খদ্দেরের তরে,

খদ্দের বসিয়া ঘরে দ্রব্য ক্রয় করে।।

চলচিত্রেও রেলকে দেখা গিয়েছে নানা ভাবে। ‘পথের পাঁচালী’তে কাশবনের মধ্যে থেকে অপু আর দুর্গার রেলগাড়ি দেখার দৃশ্য চিরস্মরণীয়। সত্যজিতের ‘নায়ক’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’ ছবিতেও রেল অনেকটা জায়গা জুড়ে ছিল। রেলকে জড়িয়ে বাংলায় অসংখ্য ছবি বিভিন্ন সময়ে হয়েছে।  আর মূলত রেলের কারণে গজিয়ে ওঠা মেসবাড়িকে জানতে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ এর তো জবাব নেই।

 

‘No railways, no modern India’….রেলই আধুনিক ভারতের রূপকার।রেলপথ স্থাপনের পিছনে ইংরেজদের ঔপনিবেশিক স্বার্থ অবশ্যই ছিল কিন্তু ধীরে ধীরে এই বাহনটি আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনে অপরিহার্য হয়ে পড়ল। কূপমণ্ডূকতা দূর করে প্রবাসী সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশের ক্ষেত্রে রেলের ভূমিকা নেপথ্য নায়কের মত। ‘চাকরীর উপরোধে গঙ্গা গর্ভ ছাড়িয়া, যে দেশে রেলওয়ে আছে, তথায় আসিয়া’ মানুষ বাস করতে লাগল।

ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের মত রেলও আমাদের সমাজের গোড়া ধরে নাড়িয়ে দিয়েছিল। খাদ্য, পানীয়, পোশাক, চিন্তা-ভাবনা, সাহিত্য, শিল্প এবং সর্বোপরি মানুষের নির্দিষ্ট পেশাভিত্তিক জীবন যাপনে এসেছিল আমূল পরিবর্তন। এত পরিবর্তনের মাঝেও বিদগ্ধজনের ভবিষ্যৎবাণীকে ভ্রান্ত প্রতিপন্ন করে আজও অপরিবর্তিত রয়ে গেল জাতপাতের বিষ বৃক্ষটি।


তথ্যসূত্রঃ সটীক হুতোম প্যাঁচার নকশা- কালীপ্রসন্ন সিংহ, সম্পাদনা-অরুণ নাগ, কলিকাতা দর্পণ- রাধারমণ মিত্র, সমাজচিত্রে ভারতীয় রেল- প্রদোষ চৌধুরী, উনিশ শতকের কলকাতা ও সরস্বতীর ইতর সন্তান- সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, বাষ্পীয় রথারোহীদিগের প্রতি উপদেশ- অক্ষয় কুমার দত্ত 


Rate this content
Log in