অবিস্মরণীয় ভালোবাসা ❤ পর্ব ১০
অবিস্মরণীয় ভালোবাসা ❤ পর্ব ১০
অহনা : " Oh ! Sorry , এখানে বসো । "
অহনার বিছানার একপাশে বসে আদি আর অপরদিকে পিছন ঘুরে বসে অহনা নিজে , দুজন আবারও চুপচাপ । এবার আগের মতো আদিই প্রথম কথা বললো ।
আদি : " অহনা তোমাকে যে আমি কি বলে ধন্যবাদ জানাবো তা নিজেই বুঝতে পারছি না । আজকে আমি ভীষণ ভীষণ খুশি আর এটা সম্পুর্ণ তোমার জন্য । আজকে শুধুমাত্র তোমার জন্যই আমার আয়ুশের মুখে প্রথম বুলি ফুটেছে । জানোতো অহনা, তুমি ঠিকই বলেছিলে আয়ুশের মায়ের খুব প্রয়োজন আর দ্যাখো যেই ও শুনেছে তুমি ওর মা অমনি সাথে সাথেই ওর প্রথম বুলি ফুটেছে ' মা ' ডাক দিয়েই । Really I'm so happy Ahana . "
এই বলে আদি নিজের জায়গা থেকে উঠে অহনার সামনে এসে হাটু মুড়ে বসে তারপর অহনার ডান হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলে , " আজ আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি অহনা যতোদিন যেই সময়টুকু পর্যন্ত আমার শ্বাস - প্রশ্বাস চলবে সেই সময় পর্যন্ত এই আদিত্য মুখার্জী তোমার ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকবে । এক মূহুর্তের জন্যেও তোমাকে কোনোরকম কষ্ট পেতে দেবো না আমি । আমি, তুমি আর আয়ুশ মিলে হবে আমাদের তিনজনের ছোট্ট সুখের সংসার তবে.......... । "
অহনা এতোক্ষণ মাথা নিচু করে আদির কথাগুলো শুনছিল কিন্তু আদি " তবে....... " বলে থেমে যেতেই অহনা মুখ তুলে তাকায় আদির দিকে , চোখে তার বিষ্ময়ভাব স্পষ্ট ।
অহনাকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে আদি গলাটা ঝেড়ে নিয়ে আমতা আমতা করে বলে, " না মানে, তবে.........। " আবারও আদি একইভাবে ' তবে ' বলে থেমে যাওয়ায় অহনা প্রথমে একটু ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকায় আদির দিকে তারপর বিরক্ত হয়ে সটান উঠে চলে যাবার চেষ্টা করতেই পিছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরে আদি । প্রথমবার আদি এবং অহনা একেবারে নিশ্ছিদ্র কাছাকাছি আসায় লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে অহনার পুরো মুখমণ্ডল আর কানদুটি , সেই সময় আদি নিজের মুখটা অহনার কানের কাছে নিয়ে এসে ধীর গলায় বলে, " এমনিতে তো আমাদের তিনজনের ছোট্ট একটা সুখী পরিবার তবে যদি তুমি চাও তিনজনের পরিবর্তে চার - পাঁচজনও হতে পারে তাতে আমার কোনো অসুবিধা নেই । " আদির মুখে এই কথা শুনে অহনা লজ্জা পেয়ে তাড়াতাড়ি আদির হাতদুটো ছাড়িয়ে পালাবার চেষ্টা করতেই আদি পুনরায় অহনার ডান হাতটা ধরে টেনে নেয় নিজের কাছে আর অহনাও প্রচন্ড লজ্জায় নিজের মাথাটা নুইয়ে দেয় আদির প্রশস্ত বুকে । এইভাবে পরস্পরকে আলিঙ্গন করে কেটে যায় প্রায় মিনিট কুড়ি হঠাৎই দরজায় ঠকঠক শব্দে সম্বিৎ ফেরে দুজনের ।
অহনা তড়িঘড়ি আদিকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই ইভান দরজার বাইরে থেকে ঘরের ভিতরের দিকে মুখটা বাড়িয়ে আদিকে ঠাট্টা করে বলে, " হোলো ভাই তোদের ? এই বুড়ো বয়সে প্রথম প্রেমতো, বুঝি বুঝি মনটা উড়ুউড়ু করছে এখন । তা এবার তো অহনার মায়ের সাথেও কথা বলতে হবে তাইনা ? "
তারপর অহনার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলে, " কি ব্যাপার মিস সান্যাল, ওহ্ ! Sorry মিসেস মুখার্জী , মুখটাতো দেখছি একেবারে রক্তজবার মতো লাল হয়ে গেছে । বুঝেছি এখন আদিকে পেয়ে আমাকে ভুলে গেলে তাইতো ? অথচ দ্যাখো বিয়ের ঘটকালিটা কিন্তু আমিই করলাম । " এই বলে ইভান একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলতেই অহনা বলে ওঠে, " এটা কি হচ্ছে ইভান বাবু ? একটু চুপ করুন না please । পাশের ঘরে মা আছে তো । "
ইভান এবার মিথ্যে রাগের ভান দেখিয়ে বলে, " অহনা , এবার থেকে আমাকে বাবু বললে আর আপনি - আজ্ঞে করলে তাহলে তোমার সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দেব । আর হ্যাঁ, পাশের ঘরে মা আছে সেটা এতক্ষণে মনে পড়লো ? "
ইভানের কথায় অহনা দুহাত জোড় করে নমস্কারের ভঙ্গিতে বললো, " ঠিক আছে, উফ! এবার থেকে তুমি করেই বলবো । " ইভান মুচকি হেসে বলে, " আর ঐ ইভান বাবু......... " , ইভানের কথা শেষ না হতেই অহনা বলে ওঠে, " ইভান বলেই ডাকবো, এবার শান্তি ? " অহনার বিরক্তিভাব দেখে আদি আর ইভান দুজনেই একসাথে হেসে ওঠে ।
সেদিন অহনার মা আদির সাথে আলাদাভাবে প্রায় ঘন্টাখানেক কথা বলেন তারপর ইভান ও অহনাকে ডেকে বলেন, " বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে আমি বেশী দেরী করতে চাই না তাই তোমাদের তিনজনের সব দায়িত্ব নিতে হবে । আসলে আমি সম্পূর্ণ একা তাছাড়া বয়সও হয়েছে , সেইজন্য কেনাকাটা থেকে শুরু করে অনুষ্ঠান সবকিছুই তোমাদের নিজেদের করে নিতে হবে । "
ঠিক সেই সময় আদি একটু ইতস্ততঃ করে বলে," আমি বলছিলাম রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করে আমরা নিজেরা ছোটো করে একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠান করে নিলেই তো ভালো , তাই না ? "
অহনা এবং ইভান সম্মতি জানিয়ে " হ্যাঁ " বললেও তীব্র আপত্তি জানান অহনার মা । তিনি বলেন, " অহনা আমার একমাত্র মেয়ে তাই ওর বিয়ে নিয়ে বহু বছর ধরে অনেক স্বপ্ন আছে আমার মনে , যা আমি আমার সাধ্যমত পূরণ করতে চাই । তাই সমস্ত নিয়ম - রীতি মেনে অনুষ্ঠান করেই এই বিয়ে হবে । "
অহনার মায়ের কথা শেষ হলে প্রায় মিনিট দুয়েক সবাই চুপচাপ তারপর আদি আবারও একটু ইতস্ততঃ করে বলে , " কিন্তু অনুষ্ঠান করতে গেলে আপনাদের কোনো সমস্যা হবে নাতো ? মানে......... " এই বলে মাথা নিচু করে দুহাত কচলাতে শুরু করে । অহনার মা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন , " সমস্যা ? কিসের সমস্যার কথা বলছো আদিত্য ? " ইভানও অহনার মায়ের সাথে একমত হয়ে বলে, " হ্যাঁ সেটাতো, কিসের সমস্যা আদি ? তুই কি কোনো কিছু নিয়ে আশঙ্কা করছিস ? "
সবার মাঝে অহনা বোবার মতো বসে থাকে আদির মুখের দিকে তাকিয়ে । আদি মাথা তুলতেই চোখাচোখি হয় অহনার সাথে তারপর আবারও মাথাটা নীচু করে অহনার মাকে বলে, " আসলে অনুষ্ঠান করলে আপনার আত্মীয়স্বজনরা এই বিয়ে নিয়ে নানান কথা বলতে পারে কারণ সবাই জানতে পারবে আমার একটি সন্তান আছে । তাই অহনা ও আপনার কথা ভেবেই আমি শুধু রেজিস্ট্রি ম্যারেজের কথা বলেছিলাম । "
আদির দিকে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার পর অহনার মা বলেন, " দ্যাখো বাবা, আমি বুঝতে পারছি আমাদের কথা ভেবে তোমার খারাপ লাগছে তাই তুমি রেজিস্ট্রি ম্যারেজের কথা বললে কিন্তু এই বিয়েতে আমার আর অহনার যখন কোনো সমস্যাই নেই তখন শুধুমাত্র সুখের পায়রাদের কথা ভেবে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো মানেই হয় না । কে কি বলবে সেই নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যাথা নেই, আমি শুধু চাই আমার একমাত্র সন্তানের সুখী আনন্দময় জীবন । সুতরাং মনের সব কুচিন্তাকে গঙ্গাবক্ষে বিসর্জন দিয়ে বিয়ের তোড়জোড় শুরু করে দাও । "
অহনার মায়ের কথায় আদিত্য আর ইভান দুজনেই খুব অবাক হয়ে যায় । সেই সকলে মিলে অনেক আনন্দ করে ডিনার শেষ করে । ডিনার শেষ হতে বেশ রাত হওয়ার কারণে আয়ুশ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিল, আদি বাড়িতে যাওয়ার সময় আয়ুশকে ঘুমন্ত অবস্থায় নিয়ে যেতে চাইলে অহনা বাধা দেয় । কাজেই অহনার কাছে ঘুমন্ত আয়ুশকে রেখে বাড়িতে ফিরে যায় আদি আর ইভান ।
দিন দুয়েক পর অহনার মা আদিকে ফোন করে জানান, " আদিত্য, আমি একজন পুরোহিতের সাথে কথা বলে বিয়ের শুভদিন, শুভলগ্ন সব স্থির করে নিয়েছি । আজকে আর মাত্র এক মাস পাঁচ দিন পর একটা খুব ভালো দিন আর লগ্ন আছে তাই আমি আর দেরী না করে ঐ দিনটাই ঠিক করে ফেললাম । এবার তুমি বলো তোমার কি মত ? "
অহনার মায়ের কথা শুনে আদি উওর দেয়, " আমার কোনো অসুবিধা নেই, আপনি যেটা ভালো মনে করবেন সেটাই করুন । আপনি বিয়ের দিন ঠিক করে ফেলেছেন ব্যস্ এবার সবকিছুর দায়িত্ব আমাদের হাতে ছেড়ে আপনি নিশ্চিন্তে আরাম করুন, আমরা সব সামলে নেব । বিয়ের সব কেনাকাটা করার সময় অহনা, আপনি, ইভান এবং আমি সকলে মিলেই যাবো । কবে যাবেন সেটা আপনি আর অহনা মিলে ঠিক করে আমাকে জানিয়ে দেবেন , তাহলে এখন ফোন রাখলাম । "
অহনার মা : " হ্যাঁ বাবা রাখো । "
আদি ফোন কেটেই তড়িঘড়ি ফোন করে ইভানকে অফিসেই ডেকে পাঠায় । আদি এমনভাবে ফোনে কথা বলে ইভান ঘাবড়ে গিয়ে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব আদির অফিসে পৌঁছে যায় , দরজা ঠেলে আদির কেবিনে ঢুকেই জিজ্ঞাসা করে, " কি হয়েছে আদি ? "
আদি একটু মুচকি হেসে বলে, " কোথায় কি হয়েছে ? কিছু হয়নি তো । "
****** To Be Continued
