Banabithi Patra

Others


3  

Banabithi Patra

Others


অভিমান

অভিমান

4 mins 1.5K 4 mins 1.5K


অনেকক্ষণ বসে থাকতে থাকতে মনটা সিগারেটের জন্য আনচান করছে অভিজ্ঞানের । ডাক্তারখানা বলতে যেমনটা বোঝায়, এখানটা ঠিক তেমন নয় । সুন্দর করে সাজানো ঘরটা, কাচের জানলাগুলোতে ভারী পর্দা , সুন্দর করে সাজানো সোফাসেট, সামনে কাচের সেন্টার টেবিলে কিছু ম্যাগাজিন। এসি চলছে, বাইরের প্রখর দাবদাহের লেশমাত্র নেই এখানে। আর পুরো ঘরটাই যেন একমুঠো আকাশের রঙে সাজানো । সোফাকভার , জানলার পর্দা , দেওয়ালের বিশাল অয়েলপেন্ট ছবিটা , এমনকি ফুলদানির ফুলটা অবধি আকাশি নীল । অদ্ভুত রকমের একটা নীরবতা ঘরটাতে । জীবনের টানাপোড়েন , দুশ্চিন্তা সবকিছু থেকে যেন সাময়িক একটা অবসর । অভিজ্ঞানের মতই আরো কয়েকজন পেসেন্ট অপেক্ষা করছে । প্রত্যেকেই অপরিচিত অথবা ঘরের নীরবতা ভঙ্গের আশঙ্কায় কেউই কারো সাথে কথা বলছে না । ডাক্তারবাবুর আজ কোনকারণে চেম্বারে বসতে একটু দেরী হচ্ছে । দুটো পঁচিশ বাজে , দেড়টার সময় অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল অভিজ্ঞানের । কি জানি আর কতক্ষণ দেরি হবে । অলস পায়ে কাচের দরজা টেনে বাইরে বেরিয়ে আসে । লম্বা প্যাসেজটা পেরিয়ে রাস্তায় আসতেই বুঝতে পারে রোদের কি তেজ! এতক্ষণ এসিতে থাকার পর বাইরে এসে কেমন যেন অস্বস্তি করছে শরীরটা । একটু ছায়া দেখে দাঁড়ায় অভিজ্ঞান, পকেট থেকে সিগারেটটা বের করে দুটো টান দিতে যেন স্বস্তি ফিরে পায়।


প্রায় তিনটে বাজতে যায়, শ্রী নিশ্চয়ই চিন্তা করছে এতটা দেরি দেখে। অকারণ টেনশন করাটা যেন ওর একটা স্বভাব হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। ওর সাথে ফোনে একটু কথা বলে চেম্বারে ফিরে আসে অভিজ্ঞান । ডাক্তারবাবু এসে গেছেন, পেশেন্ট দেখতে শুরু করে দিয়েছেন । নরম সোফায় শরীরটা এলিয়ে দেয় অভিজ্ঞান, আলসেমি না ক্লান্তি কেমন একটা অস্বস্তি ঘিরে রয়েছে শরীর মনটাকে । সব ঠিকঠাক ছিল কোথা থেকে যে কি হলো বুঝতেও পারল না । শেষ অবধি সাইক্রিয়াটিস্টের শরণাপন্নও হতে হলো , জানি না এখানেও কোন সুরাহা হবে কিনা। মেয়েটার সামনের বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা, অথচ ওকে বাড়িতে একটু শান্তির পরিবেশ দিতে পারছে না । বাবা-মা হিসাবে এটা যে কতটা অক্ষমতা সেটা অভিজ্ঞান অন্তরে উপলব্ধি করে ।

মায়ের সাথে শ্রীয়ের বনিবনা কোনদিন-ই হয়না । কিছু না কিছু নিয়ে খুটোখুটি লেগেই আছে । দু'পক্ষের অভিযোগ শুনতে শুনতে কান বশ হয়ে গিয়েছিল , নতুন করে আর কিছু মনে হতো না অভিজ্ঞানের । কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে সমস্যাটা যেন অন্যরকম হয়ে গেল। দিন দিন খিটখিটে হয়ে যেতে থাকে। শুধু শ্রীর সাথে না, ছেলে-নাতি-নাতনির সাথে অবধি দৈনিক অশান্তি । একরকম বাধ্য হয়েই সিদ্ধান্তটা নিতে হয়েছিল। কিন্তু মা যে সেটা জেনে ঐ কান্ড ঘটাবেন ধারণারও বাইরে ছিল । যদি আর একটু দেরি হতো মাকে হয়ত আর বাঁচানোই যেত না ।

ভাবনার গভীরে এতটাই অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল, রিসেপশনের মেয়েটি ওর নাম ধরে ডাকতেই চমকে ওঠে অভিজ্ঞান ।

গত পরশুদিন মাকে সঙ্গে নিয়ে ডাক্তারবাবুর কাছে এসেছিলেন । উনি সাধারণ কিছু কথাবার্তার পর মায়ের সাথে একান্ত কিছু কথা বলেছিলেন , অল্প কিছু ওষুধপত্রও দিয়েছেন । তবু আজ অভিজ্ঞানকে একা আসতে বলেছিলেন । কি কথা বলবেন কে জানে !!!! একটা চাপা টেনশন নিয়েই চেম্বারে ঢোকে অভিজ্ঞান । সৌমদর্শন ডাক্তারবাবুকে দেখেই যেন মনে একটা ভরসা জন্মায় । এতো সুন্দর ব্যবহার ডাক্তারবাবুর, যেন মনের সব অলিগলির গোপন অন্ধকার স্বীকার করা যায় অকপটে । মনের ডাক্তার বোধহয় এমনটাই হয়!

প্রেসক্রিপশনটা দেখেই উনি চিনতে পারলেন অভিজ্ঞানকে ।

----মিঃ দাশগুপ্ত , সেদিন আপনার মায়ের সাথে কথা বলে আমার মনে হয়েছে ওনার সবথেকে বেশি অভিমান আপনার ওপর । আর সেটা একদিনে হয়নি , অনেকদিনের তিলেতিলে সঞ্চিত সে অভিমান ।


অভিজ্ঞান একটু অবাক চোখে তাকাতেই ওর মনের অস্বস্তিটা ধরা পড়ে ডাক্তারবাবুর চোখে ।

----সব পরিবারেই এমন কিছু সমস্যা থাকে , আমার কাছে সবটুকু নিঃসঙ্কোচে বললে তবে তো আমি চিকিৎসা করতে পারব ।

অভিজ্ঞান বলতে শুরু করে , শ্রীর সাথে বনিবনা না হওয়া , অকারণ সবার সাথে খিটিমিটি আর শেষ অবধি ঐ আত্মহত্যার চেষ্টা ।

আপনি কি কখনো ভেবেছেন ,

----কতটা দুঃখে উনি আত্মহত্যাটা করতে গিয়েছিলেন ? আপনি ওনাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাবেন , এটা উনি ভাবতেও পারেননি । আপনজনদের ছেড়ে থাকাটা কতটা কষ্টের আপনি জানলে বুঝতেন , ওনার মধ্যে কতটা নিরাপত্তাহীনতা ওনাকে আত্মহত্যার পথে নিয়ে গিয়েছিল!

-----আপনজনদের ছেড়ে থাকার কষ্ট যে কতটা আমি খুব ভালো করে জানি ।

কথাকটা একটু জোর গলায় বলে ফেলে নিজেই অপ্রস্তুতে পড়ে যায় অভিজ্ঞান ।

হালকা স্বরে "সরি" বলতে , ডাক্তারবাবু বলেন , "ঠিক আছে আপনি বলুন কি বলছিলেন।"

অভিজ্ঞান বলতে শুরু করে .....


----তখন আমি সবে ক্লাস টু তে পড়ি , তখন আমার বোন হয় । আমি একটু দুষ্টু ছিলাম বলে আমার বাবা-মা আমাকে হোস্টেলে রেখে এসেছিল । মাকে ছেড়ে থাকতে আমার কষ্ট হতো বলে কাঁদতাম , সেদিন আমার কষ্টটা কেউ বোঝেনি । আমি মাছের কাঁটা বেছে খেতে পারতাম না । অথচ হোস্টেলে কাঁটা বেছে দেওয়ার কেউ ছিলনা , কতবার গলায় কাঁটা লাগিয়ে ফেলেছি সে খবর কেউ রাখেনি । একবার আমার খুব জ্বর হয়েছিল তখন সিক্সে পড়ি । সব বন্ধুরা ক্লাসে চলে গেলে আমি আমার ছোট্ট বিছানাটাতে সারাদিন জ্বরের ঘোরে মাকে খুঁজতাম । হোস্টেল থেকে বাড়িতে খবর দিয়েছিল আমাকে কটাদিন বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য । বাবা অফিসে কাজের দোহাই দিয়ে আমাকে আনতে গিয়েছিল সাতদিন পর , তখন আমি অনেকটা সুস্থ । কিন্তু বাড়ি এসে শুনলাম , মা-বাবা আর বোন পুরী বেড়াতে গিয়েছিল । তাই আমাকে আনতে যেতে পারেনি এতদিন । আমি যখন জ্বরে কষ্ট পাচ্ছিলাম তখন ওরা সমুদ্রে মজা করছিল !!!! খুব কষ্ট হয়েছিল সেদিন , সবাইকে লুকিয়ে চিলেকোঠার ঘরে খুব কেঁদেছিলাম সেদিন । আস্তে আস্তে মা-বাবার প্রতি অনুভূতি গুলো শুধুই কর্তব্যে পরিণত হতে থাকে । 

জানেন তো, আমি আমার ছেলেমেয়েকে হোস্টেলে দিই নি । চাইনি ছোট থেকেই একটা মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়ে যাক্ মা-বাবার সাথে ।

ডাক্তারবাবু একটু উদাস ভাবেই জবাব দেন ,

----তবু তো উনি আপনার মা!!

হঠাৎ এমন উদাসীন হয়ে গেলেন কেন কে জানে ?

হয়ত ওনার সন্তানও বড় হচ্ছে দূরে কোনো হোস্টেলে! তার শিশুমুখটা হয়তো ভেসে এলো চোখের সামনে । অথবা সুদূর অতীতে নিজের বার্ধক্যের পরিণতি ভেবে থমকে গেলেন ক্ষণিকের জন্য !!!!!!


(সমাপ্ত)


Rate this content
Log in