Dhoopchhaya Majumder

Others


3  

Dhoopchhaya Majumder

Others


আঁধারের কথা

আঁধারের কথা

3 mins 16.9K 3 mins 16.9K

"মা, বাইরে অন্ধকার", কদিন ধরেই রাত্রে বিছানায় শোবার আগে কচি গলায় একটু আপত্তির সুরে কথাটা শুনতে হচ্ছে। বাইরে অন্ধকারের উপস্থিতি খুব একটা ভাল লাগছে না, সেটা ছোট্ট মানুষের কথায় বোঝা যাচ্ছে। প্রথম দু -একদিন আমল দিইনি, "রাত্রে তো অন্ধকার হবেই" এসব বলে চাপড়ে ঘুম পাড়িয়েছি।

কালকেও একই কথা আবার। ভয়ানক ঘুম পাচ্ছিল। একবার ভাবলাম বাইরের অন্ধকারকেই হাতিয়ার করে হাল্কা ভয় দেখাই, তাহলে ঝিমুনি আসার সময়টাতেই যে গায়ে ঠেলা দিয়ে "মা, ও মা, বাইরে অন্ধকার" বলে ব্যস্ত করা, সেটা থামবে।

তারপরেই মনে হল, ছি ছি, কি করছি, নিজের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে দেব না বলে মিছিমিছি একটা অবান্তর ভয় মেয়েটার মনে ঢুকিয়ে দিতে চাইছি? আলোর না থাকাটাই যে অন্ধকার, আলাদা করে কোনও ভয় জাগানোর মানে যে অন্ধকারে নেই, সেটা তো আমরাই বোঝাব, নাকি? বাগানে গাছটার নিচে ঝুপসি মত কি একটা প্রাণী যেন গুঁড়ি মেরে বসে আছে মনে হচ্ছে, ওটা যে আসলে গাছেরই ছায়া, ছায়ার চলাফেরা আসলে আলো -আঁধারের খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়, চাঁদের আলো এগোলে কিংবা মেঘের আড়ালে লুকোলে যে গাছের ঝুপসি ছায়াটাও ভোল পাল্টায়, সেসব তো কচি মনটাকে বোঝাতে হবে। নইলে খামোখা ছোট্ট মনটা বিনা কারণে অন্ধকারকে ভিলেন ঠাউরে বসবে। আর এই বয়সে একবার কোনও ভয় মনে বাসা বাঁধলে তাকে তাড়ানো মহা ঝকমারি।

অগত্যা নিজের ঘুমে লাগাম পরিয়ে বোঝাতে শুরু করলাম, "দ্যাখো বাবু, রাত্তিরে যেমন আমাদের ঘুম পায়, তেমন আলোরও ঘুম পায়। আলো চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লেই অন্ধকার হয়ে যায়।"

সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন এল, "যেমন আমরাও হই?"

থমকালাম। তাই তো! আমরাও কি অন্ধকার হয়ে যাই? চোখ বুজলে চারপাশ অন্ধকার, এ তো খুব সত্যি কথা। এটাকে কি "আমরাও অন্ধকার হয়ে গেলাম" বলা যায়? উত্তর হাতড়াচ্ছি, এমন সময় শুনলাম আলো -আঁধারির তত্ত্বে উৎসাহ হারিয়ে মেয়ে তার ঘুমের আগের গান গাওয়ার রুটিনে ঢুকে পড়েছে। আমিও প্রসঙ্গ পাল্টে গলা মেলাতে লাগলাম৷

মেয়ে তো ঘুমোলো একটু পরেই, আমার মনে ঢুকে পড়ল ভাবনার নতুন সুতো। অন্ধকারকে ভয়! এ কি মানুষের রক্তে মিশে থাকা অভ্যেস, যা নিয়েই সে জন্মায়? নাকি পৃথিবীতে যারা কিছুদিন আগে এসেছে, দু 'চারটে বর্ষা -ভূমিকম্প -মহামারি দেখেশুনে ভয় পেতে শিখেছে, অন্ধকারের ভয়টা নতুন মানুষের মনে তারাই গেঁথে দেয়। নাকি যাকে আমরা দেখতে পাই না, তা -ই আমাদের কাছে অজানা? জানি না বলেই তাকে ভয় পাই? তা -ই যদি হবে, তবে যারা নিজের বাড়ির চেনা বাথরুমটাতেও অন্ধকারে যেতে ভয় পায় তাদের কি বলবে? বাড়ির বাথরুমটাকে দিনের বেলায় চিনতাম, আর মাঝরাতে হুট করে সেটা অচেনা হয়ে গেল, এ হয় নাকি?

তারপর দ্যাখো, মানুষের ভাষাতেও অন্ধকারকে কেমন নেতিবাচক করে দেখায়! অন্ধকার আর কালো, এই দুটো কথা যেন যত ময়লা আর খারাপের বোঝা বইছে। কারো মন খারাপ, অমনি তার মনে আঁধার জমল। কারও ছেলে বদসঙ্গে পড়েছে, ব্যস, সে নাকি অন্ধকারে হারিয়ে গেল। যে টাকা সৎপথে আয় হয়নি, সে টাকা অমনি হয়ে গেল কালো টাকা। কেন, অসৎ টাকা ময়লা টাকা হতে পারত না? ময়লা কি শুধুই কালো? তার রং তো হলুদ, সবুজ, ফিকে বেগুনি হতেই পারে? শুধু কালোর কপালেই ময়লার বদনাম কেন? মনের খারাপ হওয়ার দায় অন্ধকার নিতে যাবে কোন দু:খে? তোমার মনের কোন তারে ব্যথা লেগেছে বলে তোমার মন খারাপ, তাতে অন্ধকারের দোষ কি?

আলো সারাদিনের পরে একটু বিশ্রাম নিতে যায়, তখন পৃথিবীর সব রং মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়ে আসে অন্ধকার, আঁধারের মানে তো এইটুকুই। তাকে কেমন আমরা ভিলেন বানিয়ে ফেলি, নিজেদের মনের পাপচিন্তাগুলোকে অন্ধকারের আড়ালে বাইরে এনে ফেলি, আর দোষ চাপাই কালো আঁধারের ঘাড়ে। রাতের অন্ধকার না থাকলে যে সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়েমুছে আবার পরেরদিনের সূর্যটার আসা হত না, সেকথা আমরা ভুলেই যাই।।


Rate this content
Log in