Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Silvia Ghosh

Others


2  

Silvia Ghosh

Others


নববর্ষের ইতিকথা

নববর্ষের ইতিকথা

5 mins 1.8K 5 mins 1.8K

আমাদের ছোটবেলায় বছরের একটি দিনই বরাদ্দ ছিল বর্ষপূর্তি রাত হিসেবে তা হলো, গাজনের রাত। আর একটি দিনই নববর্ষ পালন করা হতো গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে তা হলো পয়লা বৈশাখ। সারা দিনের নানা রকম জল্পনা কল্পনার অবসান করে বিকেলের কাল বৈশাখীকে মাথায় করে হাসতে হাসতে পাঁচ রকমের মিষ্টি, নিমকী আর ক্যালেন্ডার সংগ্রহ করে কত ধরণের গান গুনগুন করতে করতে বাড়ির পথে পা বাড়াতাম তার হিসেব নেই।

ক্লাস যখন এইট-নাইন (মানে নব্বই দশক) তখন রূপালী পর্দার নায়কেরা আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরতে লাগলো বিশ্বের নববর্ষ পালনের রূপটি অবশ্যই তাদের প্রযোজকের সহায়তায়। ফলতঃ কিছু ব্যবসায়ীর  তৈরি করা লোভে পা দিয়ে আমরা কার্ড, টেডি, কেক ইত্যাদিতে মনোযোগ দিলাম আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যকে শিকেয়ে তুলে। 


এবার তাহলে আসা যাক বাংলার নববর্ষের সৃষ্টির আদি পর্বে। কিভাবে সৃষ্টি হলো বাংলা নববর্ষ ? আসুন তাহলে একটু জানা যাক নববর্ষের সৃষ্টির আদি কথায়----


নববর্ষ উদযাপন প্রচলন শুরু হয় আজ থেকে চার হাজার বছর আগে প্রাচীন ব্যাবিলনে। সম্ভবত সেটা খ্রিষ্টপূর্ব দুই হাজার সাল।বসন্তকালকে পুনর্জীবন,নতুন ফসল এবং ফুল ফোটার প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হতো।      


 বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নববর্ষ পালনের রীতিনীতি কিন্তু এক নয়। কিছু কিছু মিল থাকলেও নববর্ষের অনুষ্ঠানের সঙ্গে যোগ হয় দেশীয় ঐতিহ্য।     


প্রাচীন বাংলায় বর্ষা আরম্ভ হত হেমন্তে ,অগ্রহায়ণ নামটাই তার প্রমাণ। ফল -ফুলের মরশুম, শস্যের মরশুমকে বছরের প্রথম বলে গণ্য করার রেওয়াজটাই যে মুখ্য ছিল এটা বেশ বোঝা যায়।  বাংলা নববর্ষও যে প্রাচীনকালে একমাত্র হেমন্তেই হতো এমন নয়।উত্তরায়ণ শুরু হত যখন ফাল্গুনের পূর্ণিমা, তখনই বছর শুরু বলে ধরা হত এদেশে একসময় ।দোল ইত্যাদি বসন্তোৎসবকে তারই স্মৃতিবাহী বলে গণ্য করেছেন কেউ কেউ। তামিল নববর্ষ পোঙ্গালও মাঘের শুরুতে ।   


জাপান,চীন,শ্রীলঙ্কা সর্বত্রই নতুন শস্য , নতুন ফসলকে কেন্দ্র করে উৎসব চলে। এ জিনিস মেক্সিকো সহ উত্তর আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের বিভিন্ন গোষ্ঠী যেমন-ইরোকায়া,স্যালিস,চিপ্পেওয়া প্রভৃতির মধ্যেও এই উপলক্ষে আনন্দোৎসবটাই মুখ্যতর বলে গণ্য ।    


কৃষিকেন্দ্রিক সভ্যতার মূল অর্থনৈতিক ভিত্তি যা, সেই শস্য যখন নতুন থাকে তখনকার চন্দ্র-সূর্যের অবস্থানকে তিথিগত ভাবে হিসেব কষেই একদা পৃথিবীতে নববর্ষ পালন করার প্রথা চলিত হয়েছিল। শস্য ঘরে তোলার উপলক্ষে আদিবাসীদের মধ্যে যে ধরণের উচ্ছ্বাস,উৎসব দেখি তারই সমধর্মী নববর্ষের উৎসব। উর্বরতা কেন্দ্রিক সংস্কৃতিরই লব্ধ ফল এটি।


উত্তরভারতে চৈত্র মাসের শুক্লা তিথিতে বর্ষারম্ভ হয়। এইদিনে কলস স্থাপন,ধ্বজা রোপণ ইত্যাদি শাস্ত্রীয় ও লৌকিকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে বসন্তে বর্ষারম্ভ হয় বলেই এই সময় বাসন্তী পূজার প্রচলন হয়। অবশ্য আমাদের শাস্ত্রীয় গ্রন্থাদিতে কোথাও বৈশাখে নববর্ষ উৎসব সম্পর্কিত আচার নির্দেশ নেই।   


বাঙালীর নববর্ষের দুটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য :


হালখাতা এবং গণেশ মূর্তির প্রতিষ্ঠা ও পূজা ।এ দুটিই বর্তমান ব্যবসায়ী সমাজে প্রায় অবশ্য পালনীয় প্রথা।  

   

তবে সম্রাট আকবরের সময় কাল থেকেই এই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয় । একথা ইতিহাস স্বীকৃত।সেই সময় থেকে বাদশাহী রাজস্ব এবং তহশীল ইত্যাদি বিষয়ে হিসেব নিকেশ করা হত মুসলিম চন্দ্রবর্ষ তথা হিজরির দিন সন প্রভৃতির অনুযায়ী। ফসলই যেহেতু ছিল রাজস্বের প্রধান মাধ্যম,তাই এই সন তারিখের নূতন হিসেবের প্রচলিত নাম দাঁড়ায় 'ফসলী"।

মুসলিম ঐতিহ্যের হিজরি সনকে ভিত্তি করেই মুঘল সম্রাট আকবর বাংলার কৃষকদের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন।বাংলা নববর্ষ পদচারণা খুব বেশি দিনের নয়। চলতি নববর্ষে বাংলা সন ১৪২৬ তম বছরে পদার্পন করলেও মূলত এর যাত্রা শুরু হয়েছে মুঘল শাসনামলে মাত্র ৪৬০  বছর আগে।


"বাংলা ক্যালেন্ডার" যা "বাংলা সন"নামে পরিচিত তা ১৫৮৪ সালে সম্রাট আকবরের সময় সরকারীভাবে চালু করা হয়।এটি প্রথমে তারিখ-এ-এলাহি নামে পরিচিত ছিল।তারিখ-এ-এলাহি সম্রাট আকবরের  শাসনামলে ২৯বছরের মাথায় ১৫৮৪ সালের ১১ই মার্চ প্রথম চালু করা হয়। যদিও এটা আকবরের রাজত্বের ২৯ বছর শাসন ব্যবস্থা পরিচালনার পর রাজকার্যের সুবিধার্থে চালু করা হয়। তবুও এর গনণা করা হয় ৫ই নভেম্বর ১৫৫৬ সাল থেকে যখন সম্রাট আকবর সিংহাসনে আরোহণ করেন।


তখন তারিখ-এ-এলাহি উদ্দেশ্য ছিল আকবরের রাজত্বকে আরো গৌরবময় করে তোলা এবং রাজস্ব আদায়ে চলমান অসুবিধা সমূহ দূর করা। এর আগে হিজরি সাল ব্যবহার করেছিলেন মুঘল সম্রাট রাজস্ব আদায়ের কাজে।কিন্তু হিজরি সাল ব্যবহারের কারণে কৃষকদের সমস্যা হতো কারণ চন্দ্র ও সৌর বছরের মধ্যে ১১ বা ১২ দিনের পার্থক্য ছিল। ফলে ৩১ টি চন্দ্র বছর ৩০ টি সৌর বছরের সমান হয়ে যেত। সম্রাট আকবর তাঁর শাসনের প্রথমেই এই সমস্যা অনুধাবন করতে পেরেই এর একটি বৈজ্ঞানিক কার্যকর সমাধান খুঁজছিলেন । তাই তিনি প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিক এবং রাজ জ্যোতিষি আমির ফাতেউল্লাহ সিরাজীকে পরিবর্তন আনার আদেশ দেন। 


রাজ জ্যোতিষি তখন অনেক গবেষণার পর অত্যন্ত সুকৌশলে চান্দ্র সনকে সৌর বৎসরে পরিণত করে হিজরি ৯৬৩ সনকে ভিত্তি সন ধরে "বাংলা সন" গণনার পরামর্শ দেন।এর ফলে ৯৬৩ হিজরি সনের মহরমের প্রথম মাসকে তারিখ-এ-এলাহির প্রথম মাস ধরে গণনা শুরু করা হয়।যেহেতু ৯৬৩হিজরি সনের মহরমের প্রথম মাস বৈশাখ মাসের  সাথে মিলে য়ায় সেহেতু বৈশাখ মাস টিই হয় তারিখ- এ -এলাহী প্রথম মাস।এই তারিখ-এ-এলাহী শুরু করার পর সেই সময়ের মুসলিম সমাজে পালাপার্বনের সংখ্যা দাঁড়ায় চোদ্দটি।তার মধ্যে একটি প্রধান উৎসব হলো 'নওরোজ' বা নববর্ষ পালন উৎসব।পয়লা বৈশাখের দিনটিই সেদিন।এই নওরোজ উৎসবের সময়েই যুবরাজ সেলিম (পরবর্তী কালে সম্রাট জাহাঙ্গীর) মেহেরুন্নিসার(নুরজাহান নামে খ্যাত) প্রেম পড়েন।বাবার এই নওরোজের উৎসবেই যুবরাজ খুররম( সম্রাট শাহজাহান ) প্রথম চোখের দেখায় হৃদয় দিয়ে ফেলেন কিশোরী মমতাজ মহলকে। নওরোজ উৎসব না হলে ইতিহাসের পাতায় নুরজাহানই বা কোথায় থাকতেন, কোথা থেকেই বা তৈরি হতো শ্বেতমর্মরের তাজমহল!

 

রাজস্ব আদায়ের নির্দিষ্ট তারিখ রূপে প্রতিষ্ঠিত হলো বছরের প্রথমদিন। সংস্কৃত-নবীশরা আবার তার নাম দিলেন 'পুণ্যাহ',অর্থাৎ 'পুণ্য দিন'(প্রজার রক্ত শুষে খাজনা আদায় করার নির্দিষ্ট দিনটি অবশ্যই 'পুণ্য দিন'বৈ কি!) ।


সম্ভবত প্রাচীন কৌম জীবনে জীবন সংঘর্ষের ও শত্রু নিধনের এক নির্মম আচার আজও বাংলা তথা ভারতের জনসমাজে নববর্ষের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অথবা বিগত জীবনের পাপকে জীবন থেকে মুছে ফেলার এক রীতি এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে।


পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকেরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন।এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত।তখনকার সময়ে এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল হালখাতা তৈরি করা।হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসেবের বই বোঝান হয়েছে।প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হল বাংলা সনের প্রথম দিন দোকান পাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনগদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা,সকল স্থানেই পুরোন বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়।


এক একটি ঋতু এক একটি তাৎপর্য নিয়ে আমাদের জীবনে আসে বলেই বর্ষ শুরুর প্রথম মাস আমাদের জীবনে তাৎপর্যপূর্ণ ।রবীন্দ্রনাথ বৈশাখ মাসে নববর্ষ উৎসবকে শান্তিনিকেতনে গভীর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক তাৎপর্যমন্ডিত করেছেন নৃত্য ও গানের প্রবর্তনায়। বৈশাখী ঝড় নববিধানে দুর্ধর্ষ আশ্বাস নিয়ে আসে বাঙালি জীবনে। মনে প্রাণে আমরা প্রস্তুত হই আগামী দিনের জন্য। রবীন্দ্রনাথ বৈশাখকে দেখেছিলেন কখনো মৌনী তাপস হিসাবেও। বৈশাখের ভেতরের ধ্বনিকে প্রাণে ধারণ করেছিলেন বলেই ধ্বনিত হয়েছিল তাঁর বাণীতে,


জীর্ণ যা কিছু যাহা ক্ষীণ /নবীনের মাঝে হোক তা বিলীন/ধুয়ে যাক যতো পুরানো মলিন/ নব আলোকেরও স্নানে'।


এই গান আজও বাঙালির কন্ঠে বেজে ওঠে নববর্ষের আবাহনে। আধুনিক সামাজিক সংহতির এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান হল এই নববর্ষ।

(সমাপ্ত)


Rate this content
Log in