একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে
একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে
কাহিনী : একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে
কলমে : অঙ্কিত রায় ( রাহুল )
প্রচন্ড রকমের বিরক্তি এবং মাথার ফালতু চিন্তাগুলো মাকড়সার মতো একটু একটু করে জাল বুনছিল অভিরঞ্জনের মাথায়।
আজকের দিনটা ভীষণ খারাপ গিয়েছে তার।
এখন খুব বেশি না হলেও তাও প্রায় রাত আড়াইটা,
ঘুম আসছে না ওর।
এরপর উঠে টেবিলে রাখা ডায়েরীতে হাত রাখল অভিরঞ্জন।
ভাবল মাথার চিন্তার জালগুলো এবারে চিঠিতে বুনে রাখবে সে।
যেমন ভাবনা তেমনি কাজ,
অহেতুক ভাবনাগুলো এবার লিখতে লাগল সে—
প্রিয় রঞ্জন, কেমন আছো? আশা করি খুব ভালো আছো। কারণ তোমার তো ভালো থাকারই কথা,
কারণ 'একদিন তো সব ঠিক হয়ে যায়'।
সেই ছোটবেলা থেকেই তুমি সবার মতো করে নিজেকে সাজিয়ে তুলেছিলে।
ঠিক যেমন করে কুমোরটুলির মাটি দিয়ে তৈরি হয় এক একটি প্রতিমা।
যখন যার যেরকম প্রয়োজন, সেরকমই প্রতিমা।
তুমিও তো একদম তাই, সাজিয়ে তুলছো সকলের মতো নিজেকে।
তাই চিঠিটা লিখেছি তোমাকে এটা বোঝাতে, যে একদিন সব ঠিক হয়ে যায় না।
সেই ছোটবেলায় যখন তুমি মাঠের দিকে চেয়ে থাকতে,
দেখতে বাড়ির পাশের ছেলেমেয়েগুলো যখন মাঠে দৌড়াদৌড়ি করছে, খেলা খেলছে,
তখন তুমি বদ্ধ ঘরের ভেতর ইতিহাস বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছো।
কারণ তোমাকে কেউ একজন বুঝিয়েছিল,
এটাই বয়স নিজেকে তৈরি করার, এখন খেলাধুলো করে সময় নষ্ট করলে, পরবর্তী জীবনে কষ্ট করতে হবে।
অর্থাৎ এখন যদি ঠিকঠাক করে তুমি পড়ালেখা করো,
তাহলে পরবর্তী জীবনে তোমার সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু যখন তুমি দেখলে একটা সরকারি চাকরি হয়েও,
তুমি তোমার মতো করে বাঁচতে পারছ না,
কারণ তোমাকে বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলা হচ্ছে।
তখন হয়তো তুমি বুঝলে বিয়ে করলেই হয়তো এবারে সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু এ জীবনে শান্তি কোথায় বলো,
জীবন যেন Temple Run গেমের মতো, তুমি জানো একটা সময়ের পর তোমাকে মরতে হবেই, কিন্তু ততক্ষণ বেঁচে থাকার জন্য তোমাকে করে যেতে হবে লড়াই।
আশা করি তুমি বুঝতে পারছ,
কোনো কিছুই তোমার না বোঝার মতো নয়।
বিয়ের পর আর সব ঠিক হলো কই?
বিয়ের ৯ মাসের মাথায়, তোমার মায়ের শরীর খারাপ।
ডাক্তার বলেছে বেশি দিন আর বাঁচবেন না।
অর্থাৎ তোমার মায়ের শেষ ইচ্ছে, তোমার ছেলেমেয়েকে দেখে যাওয়ার।
সেই মতো তুমি মায়ের কথা ভেবে একটা সন্তানও নিলে।
তার খুশিতে তুমি ভুলে গেলে নিজের যন্ত্রণাগুলো।
কিন্তু সে যখন ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলো, আবার তুমি যখন তোমার সে চাকরি, পরিবার আবার চাকরি আবার পরিবার—
হঠাৎ বার্ধক্য তোমার জানালায় উঁকি মারল, তখন তোমার মনে হলো কই সব ঠিক তো আর হলো না।
তাহলে কি আরো কয়েকদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে?
এবার অপেক্ষা...
তোমার চোখের সামনে একটু একটু করে সন্তানের বেড়ে ওঠা। তারপর তাদের জীবন, তাদের পরিবার এসব করতে করতে, আজ তোমার বয়স ৬২,
কই সেদিনটা তো আর এলো না, তাহলে কি আরো কিছুদিন বাকি সব ঠিক হয়ে যেতে?
এখন তোমার কাছে তোমার মা নেই, তোমার স্ত্রীর অসুখ, তোমার সুগার-প্রেসার, তোমার সন্তানের নিজস্ব পরিবার।
এখন আর ঠিক হয়ে কি হবে বলো?
এখন তো জীবনের দেওয়ালে তোমার পিঠ ঠেকে যাওয়ার কথা।
এখন আর ঠিক হওয়ার দরকার নেই, তবুও তোমাকে বলছি রঞ্জন এখন কি তোমার সব ঠিক হয়ে গেছে?
ভাবলাম এতদিন যখন কিছু ঠিক হলো না, তবে যদি ভবিষ্যতে সব ঠিক হয় আর কি!
হয়ে গেলে অভিনন্দন, আর না হলে, এটা ভেবে নিও না, এটা তোমার জীবনের ব্যর্থতা। কারণ এটা তোমার ব্যর্থতা নয়, বরং এটা তোমার জীবনের বেঁচে থাকার মন্ত্র।
এবং শুধু তোমার বলা ভুল হবে, কারণ এটা সকলের বেঁচে থাকার মন্ত্র।
যেমন করে বৃদ্ধাশ্রমের একজন বৃদ্ধও ভাবেন, হয়তো একদিন তার জীবনে সব ঠিক হয়ে যাবে।
ঠিক যেমন করে ডিভোর্স পাওয়া মেয়েটাও ভাবে একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
আর যেমন করে ভেবেছিলে তুমি, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
ইতি তুমি নিজে,
অভিরঞ্জন চক্রবর্তী ( রঞ্জন )
নিজের ভবিষ্যৎকে চিঠি লিখতে লিখতে এবারে ক্লান্ত হয়ে টেবিলের উপর মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে রঞ্জন।
কারণ সে এখনো মনে করে একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
সমাপ্ত
