বোতলের দাম
বোতলের দাম
শিরোনামটা দেখে আনন্দিত হবার বা রেগে যাবার কোনো কারণ নেই। এই প্রবন্ধ বলুন , বা গল্পই বলুন এর বিষয়বস্তুতে বোতলের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায়না। সালটা ২০০৫ বা ২০০৬ হবে, ঠিক মনে নেই। বিয়েবাড়ির প্রীতিভোজ এর নিমন্ত্রণ এসেছে একটা। ভোজ খেতে কার না ভালো লাগে ? দিন গুনছি , কবে আসবে সেই দিন। খাবার ব্যাপারে লোভ আমার বরাবরই বেশি। যাইহোক, অবশেষে সেই দিন এলো । স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতেই মনের মধ্যে বেশ একটা আনন্দ হচ্ছে।পাঁঠার মাংস , মিষ্টি এসবের কথা মনে পড়ছে। সন্ধ্যে বেলায় বাবা এর সাথে পৌঁছলাম ভোজ খেতে। আমি আর বাবা টেবিল এর একটা দিকে বসেছি , অন্য প্রান্তে শহরের একজন নামকরা ব্যক্তি। খুব গম্ভীর মানুষ , সেরকম গম্ভীর তার গলার স্বর। মনে মনে ভাবলাম , আর বসার জায়গা পেলনা ! যাইহোক , মাংসের গন্ধে ভয়টা অনেকটা কেটে গেলো। খাবার পরিবেশন সবে শুরু হয়েছে , ওই ভদ্রলোক বলে উঠলেন -- "পড়াশোনা কেমন হচ্ছে ?"এই রে ! বললাম , ভালোই হচ্ছে। সাথে সাথে জিজ্ঞেস করলেন - "একটি বোতল এবং একটি ছিপির মোট দাম ১.১০ টাকা (১ টাকা ১০ পয়সা)। বোতলের দাম ছিপির দামের চেয়ে ১ টাকা বেশি হলে, ছিপির ও বোতলের দাম কত?" সর্বনাশ ! সত্যি কথা বলতে, পড়াশোনা সেরকম করতাম না তখন , খুব একটা মেধাবী ছাত্রও আমি কোনোকালে ছিলাম না । যথারীতি , উত্তর দিতে পারলাম না। চুপচাপ বসে রইলাম। ভদ্রলোক খানিক রেগেই বললেন - "শুধু ভোজ খেলে হবে ? পড়াশোনা করতে হবে না ?" শিরদাঁড়া দিয়ে একটা অপরাধ বোধের ঠান্ডা ,না না , গরম স্রোত বয়ে গেলো। আর খেতে পারলাম না ভালো করে। উনি হয়তো আমার ভালোর জন্যই এ কথা বলেছিলেন কিন্তু এখন , কেন জানিনা মনে হয়, মানুষের না পাওয়া , frustration যখন কোনোদিক থেকে বেরোতে পারেনা , তখন এই ধরণের ঘটনা ঘটে। ভালো করে খেতে পারিনি সেদিন। ২১ টা বর্ষা বেরিয়ে গেছে , এখন আর অঙ্ক করতে হয়না , কিন্তু এখনো ওই দিনের ঘটনা টা মনে পড়ে। কয়েকবার স্বপ্নেও বোতল আর ছিপি এর অঙ্ক করতে গিয়ে বোতল ভেঙে ফেলেছি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ , ওই ভদ্রলোক আর আমাদের মধ্যে নেই। কয়েকমাস আগে ওনার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান এর নিমন্ত্রণ খেতে গেছি , টেবিল এর ওপরে সাদা চাদর পাতা। পরিবেশন শুরু হয়েছে। প্রথমেই , মিনারেল ওয়াটার এর একটা বোতল দিয়ে গেলো। বোতলটা হাতে নিলাম আর নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম , এই বোতল এর দাম কত হবে আর ছিপিরই বা কত ?
-----অর্ঘ্যদীপ
