কোন জিনিসের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি থাকা ভালো নয়, উক্ত গল্প এটাই বলা হয়েছে।
কোন জিনিসের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি থাকা ভালো নয়, উক্ত গল্প এটাই বলা হয়েছে।
প্রতিদিনের মতো আজও যথাসময়ে স্কুল গেলাম। স্কুল শুরূ হয় সকাল ১০:০০ মিনিটে। অবশ্য ১০ টায় এস- এম-লি থাকে। ক্লাস শুরু হয় (১০:৩০ টায়) সাড়ে দশ টায়। হেড স্যারের কড়া নির্দেশ, সকাল দশ টার মধ্যে স্কুল মাঠে উপস্থিত থাকতে হবে। না থাকলে প্রবেশ নিষেধ। তা এ নিয়ম অবশ্য সবাই মানে না। ভদ্র, শৃঙ্খল, আদব-কায়দা জানা ছাত্রদের জন্য এই নিয়ম। আমরা ভালুকা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় এর ছাত্র। তাই ছাত্রী তো একটাও নেই। এতেই ভালো, নিজের ক্লাসে পড়া অন্য এলাকার অনেক ছাত্রকে চেনা যাবে। যেহেতু
বয়েজ স্কুল, সবার ধারণা এখানকার অধিকাংশ ছেলেই অভদ্র এবং দুষ্টু প্রকৃতির। তাদের ধারণা ভুল, এখানকার সব ছাত্ররাই দুষ্টু। কেউ বেশি ,কেউ কম। আমি নিজেও কম নই। আমার নির্দিষ্ট কিছু বন্ধু আছে। সবাই যে, তা নয়। কাইফ, ছাইফ ফাইম, তাকিফ এই চারজন। বেস্ট ফ্রেন্ড বলা চলে। তবে ছাইফ অন্য স্কুলের। আমাদের বিদ্যালয় এর প্রধান শিক্ষকের ছোট ভাইয়ের স্কুল। জাহিদ মডেল স্কুল। নামটা অবশ্য প্রধান শিক্ষক জনাব মোঃ জাহিদ স্যারের নাম অনুসারে। আগের বিদ্যালয় এ আমরা একসাথে বসতাম। আমি আর কাইফ পাইলট স্কুলে আসলেও ও জাহিদ মডেল এই পড়ছে। ওর মায়ের ধারণা এই স্কুলে আসলে ও বাকিদের মতো দুষ্টু হয়ে যাবে। আমরা জানি একে অপরকে যে তারা কাজটুকু দুষ্ট। কিন্তু এটাও জানি যে অভদ্র বা বেয়াদব নই। সবাই ও তাই ভাবেন যে দুষ্টু হলেও অভদ্র নই। সবাই বলে যে আমরা নাকি খুব ভদ্র ছেলে। তবে আপনারা ভাববেন বেস্ট ফ্রেন্ড তো
একজন হয়। কে বলেছে? বেস্ট ফ্রেন্ড অনেকেই হতেও পারে। এই ধরুন একেক স্কুলে একেক জনে। পরে সবাই এক স্কুলে গেলে অনেকগুলো হয়। আসলে ক্লাসে একাকিত্বতা দূর করে ও বিপদেরসময় সাহায্য করা লোক ই বন্ধু। ১০ টায় স্কুলে গিয়ে রোজ ফাহিম আর তাকিফ এর সাথে বসি।কাঈফ ছাত্র
ভালো। তবে
প্রতিযোগীতাও কম মা। এবার ও "খ" শাখায় আছে। প্রতিদিনের মতো ক্লাসে ঢুকলাম এস-এম-লি শেষে। ওদের আর সাথে বসতে বলতে হয় না । এসেই দেখি ওদের ব্যাগ রাখা। ওদের সাথে বাড়ির কাজের বিষয়ক কিছু কথা বলছিলাম বলতে বলতেই স্যার ক্লাসে আসলেন। সবাই চুপ (আমরা সহ)। এভাবে ক্লাসটা শেষ হলো। আমরা স্কুল শেষে একসাথে বাড়িতে আসছি। আমি , তাকিফ , কাইফ, ফাহিম, আমি কথা প্রসঙ্গে ওদের বললাম আমি বই পড়তে ভালোবাসি বিশেষ করে গল্পের। আমি সিকান্দার আবু জাফর নাটক -সিরাজ উদ দৌলা ও বোর্ড বইসহ 'বিভিন্ন বইয়ের ছোটগল্প পড়েছি ও এগুলো থেকে ধারণা নিয়ে একসময় বইটই এ্যাপ এ গল্প লেখা শুরু করেছি। 'একটি গোয়েন্দা "ডিটেক্টিভ সৌরভ" অন্যটি "প্রোগামিং ফর বিগেনার্স" লিখেছি। ওরা বললো এটা তো ভালোই।
ফাহিম বলল," আমার কাছে হুমায়ূন আহমেদের হিমুর মধ্যদুপুর" সিরিজের সবগুলো বই আছে। এছাড়াও 'মিসির আলীর ও বই আছে।"
ও আমাকে বলল, "তোর কি এই বইগুলো লাগবে , খুবই চমৎকার বই।"
আমি বললাম না থাক আমি ইন্টারনেট থেকে সার্চ দিয়ে পড়বো।
আমারও ইচ্ছে করছে নেই তবে লজ্জা লাগছে চাইতে।
কিন্তু বলে না যে ভালো কোনো জিনিসের প্রতি আগ্রহ থাকলে এবং উদ্দেশ্য ভালো হলে অবশ্যই কোনো না কোনো দিন সেটি পাবে। আসলে তাই, কোনো না কোনো দিন না, আমি ওই দিন দুপুরে গণিত প্রাইভেট পড়ার সময় দেখি ও সাথে করে বইটা নিয়ে এসেছে।
ও বলল, "এই নে বইটা পড় ভালো লাগবে
"না থাক পড়ে নিব।"
"আরে নে না"
এবার বুঝলাম নেওয়াই ভালো। আর খারাপ কিছু তো অফার করছে না। পড়ে দেখি।
ভেবে ছিলাম ১ ঘণ্টার ভিতর পড়বো। কিন্তু যেই 'চমৎকার গল্প পড়তে ১ ঘণ্টা তো লাগলো বটে, তবুও পড়া শেষ হয় না , ৯৪ পেজের। বুঝলাম ধীরে সুস্থে পরতে হবে। হিমুকে আমি কল্পনা করে পরতে থাকলাম। বইয়ের ১২ পাতা থেকে আগের গুলো ছেড়া ছিল। কিন্তু আনন্দ -একটুও কম নেই। সে যখন পল্টু সাহেব এর বাড়িতে কাজ করতে গেলো তখন খারাপ লাগলো। তবে,যখন রবিন্দ্রনাথের কবিতার - উক্ত লাইন বলল, লাইনটার কিছুটা "মনে আছে যা মনে আছে তার মূলভাব হলো,
রবিন্দ্রনাথ চাকরের পুত্র হতে চান। তিনি শূণ্য থেকে শুধু করতে চান। এই মূলভাবের আসল লাইনটা মনে আসছে না। নাহলে লিখতাম। কবিতার এই লাইনটি আমার পূর্বের খারাপ লাগাটা দূর করে দিল। বল্টু সাহেবের বাবার নিয়ত করেছিলেন যেদিন 20 কোটি টাকার সম্পত্তি জানাবেন তখন তো ব্যাপারে সকল অবৈধ টাকার পথ বন্ধ করে দিবেন। টাকা তো কামালেন কিন্তু যেদিন তওবা করতে যাবেন সেদিন সকালে নাস্তা করতে গিয়ে গলায় খাবার আটকে মারা গেলেন। আসলে লেখক বুঝেছেন যে তওবা করার চেয়ে ভালো খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকা। এটা আরো সহজ কাজ। তার গল্প সম্বন্ধে এতদিন শুনেছি ,আর আজ নিজে পড়লাম। প্রায় অর্ধেক শেষ। হঠাৎ, মা বলল বাজারে যেতে হবে। রেডি হয়ে বাজারে গেলাম, বাজার শেষে বাসায় আসলাম। কিছুক্ষণ পর বইটা খুঁজতে গিয়ে দেখি বইটা নেই, ভ্যানিশ। আমি জানি যে, জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে আমি জানিনা। তাই বলে এটা হারিয়ে ফেলবো তা নয়। এটা খুব যত্ন সহকারে টেবিলের ড্রয়ার এ রেখে দিয়েছিলাম।
"কোথায় গেল?" পাগলের মত খুঁজছি কিন্তু পাচ্ছি না। না ওই বউয়ের ব্যাপারে জানে না। আসলে বই পড়ার ঝোকে বলতেই ভুলে গেছি। খাবার খাওয়ার সময় কিছুটা চিন্তা হচ্ছিল। মানুষের মনে সাধারণত ওভার থিংকিং হয় ঘুমের সময়। আমিও ঘুমাতে পারলাম না। কি বলবো বা কোথা থেকে আনবো কিংবা এতো অল্প সময়ে কিভাবে পাব সেটা ভেবে না। কোথায় আছে এটা ভেবে। আমি জানি ঠান্ডা মাথায় খুঁজলে পাওয়া যাবে। তাই ভাবলাম ঘুমাতে হবে। একটু কষ্ট করে ঘুমালাম। সকালে উঠলাম খুব ভোরে। দুটো কারণে (এক). বই খুঁজতে
আর
(দুই). বইটার বাকি পেজগুলো শেষ করতে একটু বেশি টাইম লাগবে বলে।
সকালের ঠান্ডা বাতাসে ভেবেছি মাথাটা একটু ঠান্ডা করব। কিন্তু মাথাও ঠান্ডা হচ্ছে না আর বইটাও পাওয়া যাচ্ছে না। মাথা ঠান্ডা করতে হলে যোগ ব্যায়াম করতে হবে ,মানে ইয়োগা। আমি নরমালি একটা করি না। তবে ব্যাপারটা পড়লে করাই যায়। তাছাড়া যোগ ব্যায়াম একটা ভালো কাজ। কিন্তু তার আগে ভাবলাম আরেকবার চেষ্টা করা যাক। তাই বিসমিল্লাহ্ বলে আবার রিচেক দিলাম। খুঁজে পেয়েছি, স্বপ্নে। বাস্তবে আর পেলাম না। মা এসে বললেন,"কিছু খুঁজছো ?"
"হ্যাঁ, মা একটা গল্পের বই।"
"দেখতো এটা নাকি।"
"হ্যাঁ, এটাই তো। তুমি কোথায় পেলে?"
"তোমার টেবিলের নিচে পড়েছিল। তুমি যে পড়তে পড়তে যেই জানে মগ্ন হয়েছ, তাই বইটা কখন যে ড্রয়ের ফাঁক দিয়ে মেঝেতে পড়ে গেছে টের পাওনি।"
"বই টা কার ?"
"আমার বন্ধুর।"
"আমি বইয়ের কভার পেজে নাম "দেখেই বুঝেছি এটা তোমার না।"
বই পড়া ভালো কথা ,কিন্তু বই পড়তে পড়তে ধ্যানে বন্ধু হওয়া ভালো নয়।মনে রাখবে যখন যেই কাজটি করছো ,শুধু সেটি মন দিয়ে কর ।তাহলেই সফল হতে পারবে।"
"আর কোনো জিনিস হারিয়ে গেলে বা কারো কাছ থেকে আনলে আমাদের অবশ্যই বলবে। তাহলে আমরা তোমাকে সাহায্য করতে পারবো।"
"সরি মা আমি ঘর থেকে তোমাদের সব জানাবো আর সব কাজ মন দিয়ে করব।"
"মায়ের সাথে কথা শেষে রেডি হয়ে বইটা নিয়ে স্কুলে চলে গেলাম। আর
বইটা নিয়ে ফাহিমকে ফেরত দিলাম।"
আসলে আমরা অনেক সময় অনেক কিছু চোখের সামনে থাকার পরেও খুঁজে পাই না। কারণ,আমরা তখন কোন বিষয়ের ধ্যানে মগ্ন থাকি। তাই আমাদের উচিত যখন যে কাজটি করছি, সেটি ভালোভাবে করা। তবে আমরা সৃজনশীল মানুষ হয়ে নিজেদের উপস্থাপন করতে পারবো। আর সৃজনশীলতা একটি ভালো গুণ। আমরা যেন কোন বিষয়ে অতিরিক্ত ধ্যানে মগ্ন না হই সেটি খেয়াল রাখতে হবে।
(গল্পটি মানিক বঙ্গোপাধ্যায় এর
ম্যাজিক গল্প থেকে অনুপ্রাণিত।)
