Ranu Sil

Children Stories Tragedy Classics


5  

Ranu Sil

Children Stories Tragedy Classics


রঙ্

রঙ্

6 mins 299 6 mins 299


------"আবার তুমি রঙ্ পেন্সিল নিয়ে বসলে ?"

 কর্কশ গলায় ধমকে উঠলেন, রীতা আন্টি। বুবাই একদম পছন্দ করেনা এই আন্টিকে, সব সময় চোখ দিয়ে বসে আছেন, মা যে কবে ভালো হবে.... মা কখনোও এরকম করতো না। কি মিষ্টি গলা ছিল মায়ের। কী যে একটা অসুখ হলো, খালি চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে..... সাড়াও দেয়না ডাকলে।


আজকাল আর স্কুলের বাস আসেনা। বন্ধুদের সাথেও খেলা হয়না। তাই সব সময় মনটা যেন কেমন কেমন করে বুবাইয়ের। আকাশটা এতো পরিষ্কার লাগে আজকাল, গাছের রঙও কেমন পাল্টে গেছে। বুবাইয়ের খুব আঁকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ঠিকঠাক রঙটা যেন পায়না! কিছুতেই পায়না। 


বারান্দায় এলো বুবাই, একদম ফাঁকা রাস্তা। কিন্তু দাদারা ক্রিকেট খেলছেনা কেন ? ঐ বাড়িটার সিঁড়িতে শুধু পকাই বসে আছে। পকাই খুব ভালো বল করে। সবসময় ব্যস্ত থাকতো ও। ওর মা নেই। বাবাও কিযেন করেন। সবসময় বাড়ি থাকেননা। ও স্কুলে যেত আর বিকেলে চায়ের দোকানে কাজ করতো। আটটায় দোকান বন্ধ হলে, একা একা বল ছোড়া প্র্যাকটিস করতো। ওর একটাই সবুজ রঙের জামা। ওকে নীল জামাটা দিয়ে দেবে কাল। 

হলুদটাও দেবে...ও পড়তো কখন ? ওর বাবা কিছু বলেন না ?


বুবাইকেও কেউ কিছুই বলেনা এখন। বাবাও আজকাল বড্ড রেগে থাকে। শুধু দাদু বলে, 

----- আশা রাখো দাদুভাই, একদিন মা ঠিক সুস্থ হয়ে উঠবে। 

দাদুর কাছেই থাকতে ভালো লাগে বুবাইয়ের । রাতে গল্প না শুনে ঘুমই আসেনা। কতো কী জানে দাদু। একদিন হোরাসের গল্প বলেছিল। আনুবিসের গল্পও শুনেছে। আজ ফিনিক্সের গল্প বলবে বলেছে। তাই তাড়াতাড়ি খেয়ে নিচ্ছিল বুবাই। শোয়ার আগে একবার মার ঘরে যায় রোজ। গালে একটা চুমু দিয়ে শুতে চলে আসে। 


------ বলো দাদু,------- বলে মুখটা দাদুর কাঁধে গুঁজে দিলো বুবাই,

----- ফিনিক্স পাখি খুব সুন্দর দেখতে, অনেক বছর বাঁচে। ওর চোখের জলে ক্ষত সেরে যায়...ও একটা ম্যাজিক পাখি......


শুনতে শুনতে, বুবাই ভাবে , ফিনিক্স যদি সত্যি হয় ?

ম্যাজিক করে মাকে সারিয়ে দেয় ?

ও পরেরদিন ইন্টারনেট থেকে ফিনিক্সের ছবি বার করলো। মন দিয়ে দেখলো। বুবাই মনদিয়ে যা দেখে, তাইই আঁকে। আর যতক্ষণ না মনের মতো হয় , ওর আঁকা সম্পূর্ণ হয়না। ফিনিক্সের মতো, এতো উজ্জ্বল আগুনরঙ বানাবে কিকরে ? খুব চিন্তায় পড়ে গেল সে। যতদিন না বানাতে পারবে, ততদিন তার মা তো ভালো হবেই না ! কি হবে তাহলে ??


অনেক ভেবে....চিন্তে...মাথা খাটিয়ে সে একটা উপায় বার করলো, ও শুনেছে, ফিনিক্সের সাথে সূর্যের আলোর একটা সম্পর্ক আছে। আর সুর্যের আলোর মধ্যে তো, রং ও আছে, আর আগুনও আছে। বুবাই পেন্সিল দিয়ে, একটা সুন্দর ফিনিক্স আঁকলো। ছাদে গিয়ে, রোদের মধ্যে, টানটান করে রেখে, দরজা বন্ধ করে এলো। মাঝেমাঝে গিয়ে দেখে আসছিল, রঙ হলো কিনা ! তবে দূ...র থেকেই।


নাঃ কোনো রঙই দেখতে পাচ্ছেনা। মুখটা কালি হয়ে উঠেছে ওর। হাত জোড় করে,স্কুলের রোজি আন্টির মতো করে বলল, 

------ ওঃ ! গড, ফিনিক্সকে পাঠাও না প্লিজ়, আমার কাছে অনেক চকোলেট আছে ! স...ব ! না না , টিউস ডে, আর ফ্রাই ডে , এদুটো তোমার। মা কে ম্যজিক করে ভালো করে দাও না গড....

এরপরই একবার দেখে নিল, একটা চোখ খুলে---

নাঃ ! এখনও কোনো রঙ নেই....


তখন দুপুর বেলা। বুবাই ভাবলো, একবার যাই, দেখে আসি, না হলে গডের সাথে আড়ি ! ও দরজাটা একটুখানি ফাঁক করে দেখলো, যেন হলুদ হলুদ হয়ে গেছে ছবিটা। ওর মনটা খুশিতে ভরে উঠল। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ভাবল, দেখি কী হয় ! 


হোমওয়ার্ক করতে করতে, কখন যে ঘুমিয়ে পড়লো, খেয়ালই নেই। যখন উঠলো, ওর খেলার সময় পেরিয়ে গেছে। কাউকে কিছু না বলে, ছাদে উঠল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মনে মনে গডকে প্রণাম করল। চোখটা বন্ধ করে দরজাটা একটু ফাঁক করে দেখলো, 

------ নাঃ , কিচ্ছু তো দেখা..... না না, আবছা আবছা যেন রঙ রঙ ! ও ছুট্টে গিয়ে কাগজটা তুলে দেখলো, যেদিকে ও এঁকেছিল , তার উল্টো দিকে, একটা রঙিন ফিনিক্স, হ্যাঁ, অবিকল ফিনিক্স । কিন্তু উল্টো দিকে কেন ? ওওও! এবার বুঝতে পেরেছে বুবাই....যাতে উড়ে যেতে না পারে.... হ্যাঁ ঠিক তাই। 


আস্তে আস্তে ছাদ থেকে নেমে এলো, যাতে কেউ দেখতে না পায়। এক্ষুণি পড়তে বসতে হবে। খাতার মধ্যে লুকিয়ে রাখলো ছবিটা। কেমন ক্ষিধে ক্ষিধে পাচ্ছে যেন। ফ্রিজ থেকে একটা চকোলেট বার করে, 

মনে হলো, "আজ কি ডে ? ওঃ আজ থার্স ডে" , তাহলে কালকের চকোলেটটা গডের। মনের সুখে খেতে খেতে ঘরে এসে, ছবিটা খুলে বসলো। 


কেমন রোদ্দুরের মতো গায়ের রঙ। সারা গা যেন ঝলমল করছে, ডানায় কমলা আর গাঢ় লাল পালকের সাথে একটা করে বেগুণী, নীল, সবুজ লম্বা লম্বা পালক। লেজেও ঠিক ঐরকম, আর মাথায় ঝুঁটির কাছেও । কী অদ্ভুত সুন্দর দেখতে। মিলিয়ে দেখলো, ওগুলোর একটা রঙও ওর বক্সে নেই ! 


হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ায়, ভারি চিন্তায় পড়ে গেল বুবাই। ও খাবে কি ? একটু ভেবে মনে হলো, সূর্য থেকে জন্মেছে যখন সূর্যের আলোই খায় নিশ্চয়ই। এবার কাগজ থেকে পাখির আউটলাইন কেটে, ঝুলিয়ে দিল জানলায়, যাতে ও আলো পায়। ওটা বেশ দুলতে লাগলো, যেন উড়ছে...


রাতে সব বলল, দাদুকে। স্বপ্ন দেখলো, রাতের আকাশে উজ্জ্বল তারার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে ওর ফিনিক্স। পরের দিন, উঠলো,তখন আলো ফুটেছে সবে। যে জানলায় সূর্যের আলো প্রথম আসে , সেখানে রেখেছে, ফিনিক্সকে। 


এখন তো আর স্কুলবাস আসেনা, বন্ধুদের সাথে শুধু কথা হয়। ওরা দেরিতে ওঠে। বুবাই আজ তাড়াতাড়ি উঠেছে। উঠেই তাকালো জানলায়। আরে !! ফিনিক্স কই ? 


দেখলো, সুতোর সাথে পোড়া কাগজ একটু লেগে আছে। কি হলো, বোঝার আগেই, পাশের ঘর থেকে রীতা আন্টির গলা শোনা গেল , 

----- ওও দাদা ! দেখুন, বৌদি চোখ খুলেছে গোওও......

বুবাই দৌড় দিল মার ঘরে। সবাই পড়িমরি করে, ঘুমচোখে মার ঘরে...বাবা সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারকাকুকে ফোন করল।


মা সোজা বুবাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে.... কিছু বলতে চায় কি মা ? বুবাই গিয়ে একটা চুমু দিল, গালে।

মার চারিদিকে নল বেঁধানো। মন খারাপ লাগে তোজোর। ও চলে এলো ঘর থেকে। মনে হলো, তবে কী পুড়ে গেল ফিনিক্স ? কিন্তু ছাই কই ? তবে কী ?

ও তবে আরও একটা আঁকবে....

জানলার কাছে গিয়ে অবাক হয়ে গেল। ঝুলছে তো !

আশ্চর্য, তবে কি ও ভুল দেখলো ঘুমের ঘোরে ? অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল রোদ-ঝরানো পাখিটার দিকে। কাগজের পাখি, কিন্তু কী সুন্দর রঙ। সান গড তো নিজের রঙ দিয়েছে , তাই ওরকম। কাল মনে করে চকোলেটটা দিতে হবে। মা চোখ খুলেছে....

রাতে শোওয়ার আগে দাদুকে বলে রাখতে হবে। এলার্ম বাজলে যেন ফিনিক্সের কথা মনে করিয়ে দেয়। 


বুবাইয়ের কথা শুনে অবধি, শশাঙ্কর এই বুড়ো বয়সেও কেমন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করলো, ওটা জ্যান্ত ফিনিক্স। সবটাই কি বানিয়ে বলছে, বুবাই ? উঠে গিয়ে অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করলেন, পাখিটাকে। সত্যি কী জ্যান্ত রঙ। কী অদ্ভুত চোখদুটো। এরকম রঙ বুবাই পেলোই বা কোথায় ! খুবই আশ্চর্যের কথা.... এই অল্প আলোতেও যেন ঝকঝক্ করছে.…..মনে হচ্ছে যেন হাওয়ায় না, ও এমনিই উড়ছে....


শশাঙ্ক শুয়ে পড়লেন। বুবাই বায়না করেছে, কাল সূর্যের আগেই ওকে তুলে দিতে হবে। সারারাত শশাঙ্কবাবু ঠিক ঘুমোতে পারেননি। তখন প্রায় পাঁচটা বাজে, একটা মৃদু শিসের শব্দে, ভোরের ঘুমটা ভেঙে গেল, চুপ করে শুনলেন, কোথা থেকে আসছে শব্দটা!! জানলার বাইরে কোনোও পাখি কি ? কাছে গিয়ে, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো তাঁর। 

মনে হলো, ঐ কাগজের পাখিটাই......


তখন, সবেমাত্র সূর্য উঠছে, এই জানলাটা বেশ বড়। প্রথম সূর্যের আলো এসে পড়ে এই জানলায়। ঠিক সেই সময় এলার্মটা বেজে উঠল। শশাঙ্ক তড়িঘড়ি ওটা বন্ধ করতে গেলেন। ফিরে দেখলেন, আগুনপাখি জ্বলছে, কয়েক সেকেন্ড লাগলোমাত্র। কী হলো! কী দেখলেন!যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলেন না। একটু মুখে চোখে জল দিয়ে আসতে গেলেন। এসে দেখলেন ফিনিক্স যেখানে ছিল, সেখানেই দুলছে।


বুবাই ঘুম থেকে উঠে শুনলো, এলার্ম বাজেইনি। ফিনিক্স ঠিক আছে। মা আস্তে আস্তে সেরে উঠতে লাগলো। শশাঙ্কবাবু জানলেন, ফিনিক্স রোজ সূর্য ওঠার সাথে সাথে নতুন কলেবর নেয়, তিনি কাতর প্রার্থনা করেন, বুবাই যেন ওর মাকে ফিরে পায়......


বেশ কয়েকদিন পরের কথা...….

বুবাই ওর মার কাছে বসেছিল। ডাক্তারকাকু বলেছেন, মা প্রায় সেরে উঠেছে। রাতে, শোবার সময় বুবাই পাখিটাকে দেখে শুলো।


শশাঙ্ক সেদিন ভোর বেলায় রোজকার মতো, তাকালেন, পাখিটার দিকে। একটু বাদেই সূর্য ওঠার সাথে সাথেই আগুন ধরে গেল, কিন্তু অন্যদিনের মতো আজ...…তো....


বুবাই আজ ঘুম থেকে উঠেই জানলায় গেলো। আশ্চর্য ! ওরই হাতে পেন্সিলে আঁকা, সেই ফিনিক্সটাই ঝুলছে, সুতোয় বাঁধা। চোখে জল ভরে এলো। জামার হাতায় চোখটা মুছে, আস্তে আস্তে দাদুর কাছে গেল। কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলো বুবাই... ফিনিক্স চলে গেছে ...গডকে চকোলেট দিয়েছিলাম... তবুও চলে গেল কেন ?

দাদু বললেন, 

------- তোমার মতো আরোও কতো বুবাই আছে, সে ওদের মাকে সারাতে গেছে দাদুভাই......কাঁদতে নেই....


বুবাই আবার তার কালার বক্সটা নিয়ে আঁকতে বসলো। একটা নতুন ফিনিক্স ! এবার গডকে বলতে হবে, তার স্কুলবাস যেন আসে আবার..... কিন্তু রঙ পছন্দ হচ্ছেই না তার...



Rate this content
Log in

More bengali story from Ranu Sil