Sahana Banerjee

Children Stories Horror Tragedy

1.0  

Sahana Banerjee

Children Stories Horror Tragedy

বেড (সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

বেড (সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

4 mins
941


মনোরমা আর যাই হোক না কেন কিন্তু দুর্বল হৃদয়ের ছিলেন না । অল্প বয়সে নয় টা সন্তানের মা হওয়া কোনো মুখের কথা না।

 আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগের ঘটনার কথা বলছি, আজ ও এই ঘটনা কাউকে বলতে গেলে গা হাত পা শিউরে ওঠে। 

1965 সালে আজকের মত উন্নত ছিল না চিকিৎসা বিজ্ঞান। তখন সামান্যতম রোগে আক্রান্ত রোগীদের ও মৃত্যু হতো চিকিৎসার ওভাবে। তাই যখন মনোরমা দেবীর কনিষ্ঠ কন্যা ডিপথেরিয়া নামক এক রোগের শিকার হোল, সে নিজের নিজের মাথার ঠিক রাখতে পারলেন না। নিজের দু বছরের কচি শিশুর মৃত্যু তিনি দেখতে পারতেন না। তাই ঘরের সমস্ত বাধা ভেদ করে, এক গৃহ বধূর পায়ের শিকল ছিড়ে, তিনি নিজে নিয়ে গেলেন নিজের কন্যা কে হাসপাতালে। 

সেই তখন কার দিনের রেল হাসপাতাল, অবস্থা খুব একটা ভাল না তবে মনোরমার জানার মধ্যে এইখানেই একমাত্র উপায় তার শিশু কন্যা কে বাঁচিয়ে তোলার। 

হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া তে সঙ্গে সঙ্গে তার কন্যা কে এমারজেন্সী কক্ষ তে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসক মনোরমা দেবী কে জানাল যে উনার মেয়ে এক গুরুতর রোগে আক্রান্ত : ডিপথেরিয়া। তাকে এখন পরিস্থিতি হিসেবে মোট পাঁচ দিন হাসপাতালে রাখতে হবে আর যেহেতু রোগী এক শিশু তার মা অতএব মনোরমা কে ও হাসপাতালে থাকতে হবে এটা স্পষ্ট করে বলে দিলেন ডাক্তার বাবু। 

এক মায়ের কাছে তার সন্তান এর জীবনের থেকে বেশি জরুরি আর কিছু হয় না, তাই উনি সরাসরি রাজি হয় গেলেন হাসপাতালের এক বেড এ পাঁচ দিন কাটাতে। 


প্রথম রাত :


রাত তখন প্রায় 1.30 বাজে। মনোরমা দেবীর ঘুম হঠাত ভেঙে যায়, এক দুঃসাধ্য বিশ্রী গন্ধ যেন তার চারি দিকে ঘুর ঘুর করছে এবং তাকে ক্রমশঃ গ্রাস করছে। তিনি নাক মুখ দু হাতে বন্ধ করে উঠে বসলেন। চারি পাশ টা একটু ভাল করে দেখলেন এবং খানিক ক্ষণ বাদে যেমন অদ্ভূত ভাবে গন্ধ টা এসেছিল ঠিক অমনি অদ্ভূত ভাবে কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল। 

বেশি কিছু না ভেবে তিনি আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। 


 দ্বিতীয় রাত :


রাত প্রায় 2 বাজে। মনোরমা দেবী তখন নিজের মেয়ে কে দুধ খাইয়ে নিজের ওয়ার্ড এ ফিরছিলেন, হঠাত উনি দেখতে পেলেন, ওয়ার্ড এর দরজার মুখে দাঁড়িয়ে, যেন এক ছায়ার মত আকৃতি উনার বেডের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। জানলার জাল থেকে ছেঁকে আসা চাঁদের আলোয় তিনি এই দৃশ্য অবাক হয় দেখেছিলেন। এক মিনিট পর সাহস করে তিনি ওয়ার্ড এর লাইট টা অন করেন আর আশ্চর্য হয় যান, সেখানে আর কেউ নেই। 


তৃতীয় রাত :


শত চেষ্টা করেও আজ উনি আর ঘুমোতে পারছেন না। ডাক্তার বাবু বলেছেন যে মেয়ের শারীরিক অবস্থা তে উন্নতি দেখা দিয়েছে এবং খুব জলদি উনি তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন। মনে আনন্দ আছে তবে একটা অদ্ভূত অস্থিরতা ও যেন তাকে বশ করেছে। 

গত কাল রাতের সেই ছায়া মানব এর মূর্তি তিনি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। যত বারই চোখ বন্ধ করেন সেই ছায়া মূর্তি দেখে ভয় তার ঘুমের রেশ কেটে যাচ্ছে। 

এই সব ভাবতে ভাবতে কখন যেন উনার চোখ লেগে গেছিল, কিন্তু সেই ঘুম বেশি ক্ষণ হল না। ঠিক সেই রাত 2 বাজে আর তখন সেই বিশ্রী গন্ধ আবার ছড়িয়ে পড়েছে যেন পুরো ওয়ার্ড এ। গন্ধ টা তে বেশি গা না করে উনি ঘুমানোর চেষ্টা করছিলেন কি ইতি মধ্যে হঠাত উনার মনে হতে লাগল যেন কেউ উনার পায়ে হাত দিয়ে পা টা ঠেলে দিচ্ছে বার বার। ঘুমের মধ্যে দিয়ে উনি শুনতে পেলেন কারুর আওয়াজ যেন ফিস ফিস করে ভেসে আসছে, " ইয়ে মেরা বেড হায়, খালি কারো জলদি!" 

বিরক্ত হয়ে যেই না মনোরমা দেবী উঠে বসলেন উনি দেখতে পেলেন নিজের পায়ের কাছে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে, মুখ টা অস্পষ্ট তবু বুঝা যাচ্ছে একজন মেয়ে এবং আওয়াজ এ মনে হচ্ছে অল্প বয়েস। অথচ আওয়াজ টা তার কেমন যেন একটা অদ্ভুত। চোখ টা এক হাত দিয়ে মুছতে ই মনোরমা দেবীর শরীরের রক্ত যেন হিম হয় গেল। শির দ্বারা শিউরে উঠলো। নিজের চোখের উপর তার বিশ্বাস হয় না কিছু তে ই। উনার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল এক মহিলা কিন্তু তার সমস্ত কায়া ঝলশে যাওয়া!! 

এক পাশের চোখের সাদা অংশ টা গোলে পড়ছে আর আরেক পাশের কান টা নেই স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে তার পুড়ে যাওয়া কেশ কে ভেদ করে। আর সেই অসহ্য করে দেওয়া মরা পচা গন্ধ!! 

ভয় আতঙ্কে মনোরমা দেবী হুংকার দিলেন নার্স এর জন্যে আর আর্তনাদ করে জ্ঞান হারালেন।


 জ্ঞান ফিরল উনার সকালে, নার্স পাশেই ছিল, উনি হুড় মুড় করে উঠে বললেন, "নার্স এখানে এক পুড়ে যাওয়া রোগী এসেছিল কাল আর বলছিল এটা নাকি তার বেড, আপনি দয়া করে আমাকে অন্য বেড এ ট্রান্সফার করে দিন তার অবস্থা ভীষন খারাপ।" 

নার্স কিছু ক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, " ম্যাডাম আপ্নার মেয়ে এখন সুস্থ, তাকে নিয়ে যেতে পারেন ঘরে। আপনাকে আর এখানে রাত কাটাতে হবে না। যে এসেছিল কাল সে কোনো জীবিত মানুষ নয় ম্যাডাম। "


নার্স এর অদ্ভুত কথা শুনে থতমত হয় বললেন মনোরমা দেবী," মানে??!! " 


নার্স বললো, " আসলে যে বেড আপনাকে দেওয়া হয়েছিল ওই বেড এ আগে এক বার্ন এর রোগী ছিল, দীর্ঘ 15 দিন ধরে প্রচুর যন্ত্রণা ভোগ করেছিল সেই মহিলা। তার শ্বশুর বাড়ির লোকেরা তাকে পুড়িয়ে মেরেছে। যে দিন সে মারা যান সেই দিন ই বেড এর ওভাবে আপনাকে ওই বেড দেওয়া হয়। "


বেশি কথা আর না বাড়িয়ে যত জলদি সম্ভব মনোরমা দেবী নিজের কন্যা কে নিয়ে সেখানে থেকে প্রস্থান করেন। 

পরে শোনা যায় যে সেই বেড নাকি মর্গে শিফ্ট করা হয়েছে এবং তাতে কোন পেশেন্ট কে ই রাখা হয় না। 


গল্পের শেষে শুধু পাঠক দের জানাতে চাই যে মনোরমা দেবী ছিলেন আমার দীদা আর তার কন্যা আমার মা। 



Rate this content
Log in