STORYMIRROR

Anindya Sanyal

Others

4  

Anindya Sanyal

Others

বাঘ

বাঘ

3 mins
7

-- এই জঙ্গলে কোন কোন জানোয়ার আছে সুজন?

-- কি নেই স্যার। চোখকান খোলা রাখুন। আমি যখন ইশারা দেবো। মাথা ঘোরাবেন। একের পর এক সব দেখবেন। শুধু ছবি তোলার জন্য বেশী কাছাকাছি যেতে বলবেন না। ভয় পায় ওরা। আর স্যার, বাঘের কথা আমি গ্যারান্টি দিতে পারবো না। ও আমাদের দেখলেও আমরা চট করে ওকে দেখতে পাবো না।

-- কিন্তু সুজন। আমি তো বাঘ দেখতেই এসেছি ভাই। বাঘ না দেখলে....

-- আমি বলিনি স্যার দেখতে পাবেন না। তবে পেট ভরা থাকলে। মেজাজ ফুরফুরে থাকলে তখনই তারা দেখা দেয়।

-- আমার এক বন্ধু এই জঙ্গলে বাঘ দেখেছে।

-- অনেকে দেখেছে। আমি নিজেই গতমাসে দু’জনকে বাঘ দেখিয়েছি। ওই যে বললাম খিদে আর মেজাজ। জোর করবেন না। লাইফ রিস্ক আছে।

একটা সত্যি গল্প বলি বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না স্যার।

আমি তখন ছোটো। সবে জঙ্গলের ভেতরে সাইটিং ট্র্যাক তৈরী শেষ হয়েছে বছরখানেক। ট্যুরিস্ট আসছে। বেশী আসছে ফরেন ট্যুরিস্ট। আমার বাবা জিপে দুজন ফরেনারকে নিয়ে জঙ্গলে গেলো সেদিন। সকালের ট্যুর। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেলো। ফেরে না। আমি স্কুল থেকে ফিরতেই মা বললো ফরেস্ট অফিসে খবর দিতে। বাবাকে সবাই খুব ভালোবাসতো। খুব সাহসী আর সৎ ছিলো আমার বাবা। মিশুকে ছিলো। জানোয়ারদের ভালোবাসতো প্রাণ দিয়ে। কতবার মা হারা শিশু জানোয়ার তুলে এনে ডিপার্টমেন্টে জমা দিয়েছে। একবার একটা আধমরা অজগরকে এনে নিজে হাতে চিকিৎসা করে বাঁচিয়েছিল। গাছগাছড়া চিনতো অনেক। মায়া পড়ে গিয়েছিলো। জানাজানি হওয়াতে নিজে হাতে অফিসে জমা দিয়ে এসেছিলো। কেউ কিছু বলেনি। বাবাকে জানতো সবাই।

তো যাই হোক। আমি গিয়ে খবর দেওয়াতে সাথেসাথে দু’জন ফরেস্টগার্ড দিয়ে উত্তরের জঙ্গলে একটা জিপ পাঠিয়ে দিলেন অফিসার। অপেক্ষা করে আছি কি খবর আসে। রাত তখন প্রায় দুটো। এক ফরেনারকে নিয়ে ফিরে এলো গাড়ি। শরীরে কোনো চোট নেই। লোকটা তিনদিন কোনো কথা বলেনি। খায় নি। বাথরুম পায়খানা যায়নি। ঘুমোয়নি। তারপর যেদিন ওদের আরেক বন্ধু এলো, তাকে দেখে হাউমাউ করে উঠলো

-- ইট ওয়াজ লার্জ।

ভেরি লার্জ।

উইথ টু কাবস।

মাই মিসটেক।

আই ওয়ান্টেড টু ক্যাপচার দেম ক্লোজ। 

-- ফরেন ট্যুরিস্ট। চার পাঁচদিন পরপর গাড়ি গেলো। কিন্তু, বাবাকে আর আরেক সাহেবকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

অনেকদিন পর। তখন আমি ট্যুরিস্ট নিয়ে জঙ্গলে যাওয়া শুরু করেছি। একদিন। উত্তরের জঙ্গলে বিকেলের ট্যুর সেড়ে ফিরছি। সূর্য্য ডুবছে। সারা জঙ্গলটা লাল হয়ে আছে। একটা বড় বিল আছে ওদিকে। ট্যুরের রাস্তায় পড়ে না। রাস্তা থেকে দেখা যায়। অনেক জানোয়ার তখন ওখানে আসে দিনের শেষে জল খেতে। আমার গাড়ির ম্যাডাম খুব রিকোয়েস্ট করলেন গাড়িটা ঘাসজমির ওপর নামিয়ে বিলের আরেকটু কাছে নিয়ে যেতে। ছবি তোলার জন্যে নয় স্যার। চোখ ভ’রে দেখবেন ব’লে। একটুআধটু রিস্ক আমরা নিই। গাড়ি গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছি বিলের কাছে। হঠাৎ গাড়িটা বাধলো। দু বার একটু জোর দিয়ে চেষ্টা করলাম। এগোয় না। চারিদিক ভালো করে দেখে নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে। নীচু হয়ে দেখি চাকা আটকাচ্ছে একটা মানুষের মাথার খুলিতে। মনের মধ্যে তখন হঠাৎই সেই রাত্তিরটা ছটফট করে উঠলো। অন্ধকারে উঠোনের দরজায় মা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধ’রে ব’সে আছে। ঘর থেকে বাবার গায়ের গন্ধ পাচ্ছি। আমি কাজ থেকে ঘরে ফিরলে এখনও সেই গন্ধটা পাই। নীচু হয়ে মাটিতে শরীরটা রেখে হাতে তুলে নিলাম খুলিটা। কে জানে, হতেও পারে! আমরা কতদিন অপেক্ষা করেছি বাবা ফিরে আসবে। গাড়ি মোছার কাপড়ে জড়িয়ে পাশের সিটটায় বসিয়ে চললাম বিলের কাছে। আমাকে দেখে ম্যাডাম কি বুঝলেন কে জানে, কোনো কথা জিজ্ঞেস করেন নি। ম্যাডামকে খুশি ক’রে টুরিস্ট লজে ফিরিয়ে দিয়ে এলাম। কাঁধে হাত রেখে কৃতজ্ঞতা জানালেন। বকশিস দিতে চাইলেন। সেদিনের বকশিস আমি হাতজোড় ক’রে ফিরিয়ে দিলাম। খুলিটা আমার ঘরে আছে। ফেরার সময় আপনাকে ওই বিলের কাছে নিয়ে যাবো আজ। কি যে সুন্দর দৃশ্য স্যার!

ওই দেখুন। ওইদুটো ভারতীয় চিতল হরিণ।

মেলফিমেল দুইই আছে। অ্যালার্ট হয়ে আছে। বাচ্চা আছে কাছে।

-- ছবি তুলি সুজন?

-- আরে হ্যাঁ স্যার। এটা বাঘ নয়। ওরা বেশ ভিতু। শুধু বেশী নড়াচড়া করবেন না। বাচ্চা আছে তো সাথে। পালাবে।


Rate this content
Log in

More bengali story from Anindya Sanyal