STORYMIRROR

Aditya Bhowmik

Others

5  

Aditya Bhowmik

Others

আগমনী : শরতের বুকে মায়ের ফিরে আসা

আগমনী : শরতের বুকে মায়ের ফিরে আসা

4 mins
2

আগমনী : শরতের বুকে মায়ের ফিরে আসা
 আদিত্য ভৌমিক
তারিখ: ১১/১০/২০২৬
 শরৎ আসে প্রতিবছর, আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়, কাশবনের বুকে দুলে ওঠে শুভ্র ফুলের ঢেউ, ভোরের শিশিরে ভিজে থাকে ঘাসের ডগা। তবু সব শরৎ এক রকম হয় না। কিছু শরৎ মানুষের হৃদয়ে নতুন করে ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে, কিছু শরৎ ফিরিয়ে আনে হারিয়ে যাওয়া শৈশব, আর কিছু শরৎ পৃথিবীর সমস্ত বিষণ্নতার ওপর মায়ের আঁচলের মতো শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। শারদীয়া দুর্গোৎসবের আগমনী ঠিক তেমনই এক অনুভূতি, যা কেবল চোখে দেখা যায় না, হৃদয়ের গভীরে অনুভব করতে হয়। আকাশের নীল ক্যানভাসে যখন তুলোর মতো সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়, দূরের মাঠে যখন কাশফুল বাতাসের সঙ্গে মৃদু দোল খায়, আর ভোরের বাতাসে শিউলির মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে পড়ে, তখন প্রকৃতি যেন নীরবে ঘোষণা করে, মা আসছেন। চারদিকে শুরু হয় এক অদ্ভুত ব্যস্ততা। মণ্ডপে মণ্ডপে বাঁশের কাঠামো গড়ে ওঠে, শিল্পীর তুলির আঁচড়ে ধীরে ধীরে প্রাণ পায় প্রতিমার মুখ, রঙিন আলোয় সেজে ওঠে পথঘাট, আর মানুষের চোখে জ্বলে ওঠে বহুদিনের প্রতীক্ষিত আনন্দের দীপ্তি। কিন্তু দুর্গাপূজার আগমনী কি শুধুই উৎসবের প্রস্তুতি? শুধুই নতুন পোশাক, আলোকসজ্জা, ঢাকের বাদ্যি আর আনন্দের আয়োজন? না, আগমনী তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। আগমনী হলো অপেক্ষার নাম, ভালোবাসার নাম, ফিরে পাওয়ার নাম। যে মানুষটি সারা বছর ব্যস্ততার ভিড়ে নিজের মনের কথা ভুলে থাকে, আগমনী তার হৃদয়ের দরজায় এসে আলতো করে কড়া নাড়ে। যে মানুষটি পুরোনো দিনের স্মৃতি বুকে নিয়ে নিঃশব্দে পথ চলে, আগমনী তার চোখের কোণে জমিয়ে দেয় একফোঁটা আনন্দাশ্রু। শৈশবের দুর্গাপূজা ছিল অন্য রকম। তখন আনন্দের জন্য খুব বেশি কিছু প্রয়োজন হতো না। নতুন জামার গন্ধ, প্যান্ডেলের রঙিন আলো, ঢাকের তালে তালে মানুষের উচ্ছ্বাস, মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা, আর আপনজনদের সঙ্গে পাশাপাশি হেঁটে বেড়ানোতেই পূর্ণ হয়ে উঠত পৃথিবী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বয়স বেড়েছে, বদলেছে চারপাশ, বদলেছে জীবনের ব্যস্ততা। তবু শরতের প্রথম শিউলি ঝরে পড়লে মনে হয়, কোথাও যেন সেই ছোট্ট ছেলেটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে, মায়ের আগমনের অপেক্ষায়। প্রতিমা নির্মাণের শেষ মুহূর্তে শিল্পী যখন মায়ের চোখ আঁকেন, তখন মনে হয়, মাটির শরীরে কেবল রং লাগানো হচ্ছে না, জেগে উঠছে মানুষের বিশ্বাস। সেই চোখে রয়েছে স্নেহ, আশ্রয়, সাহস আর মমতার অমলিন ভাষা। মায়ের দশ হাতে যেন পৃথিবীর সমস্ত অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শপথ, আর তাঁর শান্ত মুখে রয়েছে ক্লান্ত মানুষের জন্য এক টুকরো নির্ভরতার আকাশ। তাঁর পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশকে নিয়ে সাজে দেবীর পরিবার। সেই দৃশ্য যেন মনে করিয়ে দেয়, ভালোবাসা আর একতার মধ্যেই জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। ঢাকিরা যখন ঢাকের চামড়ায় প্রথম কাঠির আঘাত হানেন, তখন বাতাসের বুক কেঁপে ওঠে। সেই শব্দ শুধু উৎসবের ডাক নয়, যেন বহুদিনের ঘুম ভাঙানোর আহ্বান। দূরের কোনো বাড়ির জানালা খুলে যায়, কোনো শিশু আনন্দে ছুটে আসে, কোনো বৃদ্ধের মুখে ফুটে ওঠে হারানো দিনের হাসি। কারও মনে জেগে ওঠে মায়ের হাত ধরে মণ্ডপে যাওয়ার স্মৃতি, কারও মনে ফিরে আসে সেই মানুষগুলোর মুখ, যারা একদিন এই পৃথিবীর আলোয় পাশে ছিলেন, আজ আছেন কেবল স্মৃতির গভীরে। আগমনী তাই আনন্দের পাশাপাশি এক গভীর আবেগেরও নাম। কারণ উৎসবের আলো যত উজ্জ্বল হয়, স্মৃতির ছায়াও কখনো কখনো তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পুরোনো উঠান, শৈশবের পথ, আপনজনের স্নেহমাখা ডাক, কিংবা একসঙ্গে কাটানো কিছু সাধারণ মুহূর্ত হঠাৎ করেই অমূল্য হয়ে ওঠে। মানুষ বুঝতে পারে, জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি দামি উপহার নয়, বরং এমন কিছু মুহূর্ত, যেগুলো সময় চলে গেলেও হৃদয় থেকে মুছে যায় না। মা দুর্গার আগমন আমাদের সেই কথাই নতুন করে শেখায়। অন্ধকার যত গভীর হোক, আলো আসার পথ বন্ধ হয় না। দুঃখ যত দীর্ঘ হোক, আশার প্রদীপ নিভে যেতে নেই। পৃথিবীতে যত বিভেদ, যত হিংসা, যত অভিমান জমে থাকুক, ভালোবাসার একটি হাত বাড়িয়ে দিলে অনেক দূরত্বই কমে আসতে পারে। দেবীর অসুরবধের কাহিনি তাই কেবল পৌরাণিক বিজয়ের উপাখ্যান নয়, মানুষের নিজের ভেতরের লোভ, অহংকার, হিংসা ও নিষ্ঠুরতাকে পরাজিত করারও এক চিরন্তন আহ্বান। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি, যেখানে দুর্গাপূজার আনন্দ কোনো মানুষের ধর্ম, পরিচয় কিংবা আর্থিক অবস্থার কারণে সীমাবদ্ধ থাকবে না। যেখানে মণ্ডপের আলোয় সবাই সমানভাবে হাসবে, যেখানে কারও ঘরে অভাব থাকলে অন্য কেউ নিঃশব্দে পাশে দাঁড়াবে, যেখানে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় পূজা। কারণ মায়ের কাছে প্রার্থনার সত্যিকারের অর্থ কেবল নিজের সুখ চাওয়া নয়, অন্যের জীবনেও সুখের আলো জ্বালানোর সংকল্প করা। শরতের আকাশে সন্ধ্যা নামলে মণ্ডপের প্রদীপগুলো একে একে জ্বলে ওঠে। বাতাসে ভেসে আসে ঢাকের শব্দ, শিউলির গন্ধে মিশে যায় ধূপের ধোঁয়া। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, পৃথিবী যতই কঠিন হোক, মমতার কাছে মানুষের হৃদয় আজও নত হয়। আজও মানুষ ভালোবাসতে চায়, আপনজনকে কাছে পেতে চায়, হারানো আনন্দ ফিরে পেতে চায়। আজও মায়ের আগমনী শুনলে অজান্তেই বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টগুলো নরম হয়ে আসে। হে মা দুর্গা, তুমি এসো আমাদের হৃদয়ে। শুধু মণ্ডপের প্রতিমায় নয়, মানুষের বিবেকের মধ্যে, ভালোবাসার প্রতিটি সম্পর্কে, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিটি মুহূর্তে। আমাদের মন থেকে বিদ্বেষের অন্ধকার দূর করো, ভাঙা সম্পর্কগুলো জোড়া লাগানোর শক্তি দাও, আর আমাদের শেখাও কীভাবে মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়াতে হয়। তোমার আগমনে যেন শুধু শহরের পথঘাট নয়, আলোকিত হয়ে ওঠে প্রতিটি মানুষের অন্তর। আবার কাশফুল দুলবে, আবার শিউলি ঝরবে, আবার ঢাকের তালে মুখর হবে বাংলার আকাশ। মা আসবেন তাঁর সন্তানদের কাছে, নিয়ে আসবেন আশার বার্তা, ভালোবাসার আশ্রয় আর নতুন করে বাঁচার প্রেরণা। আমাদের জীবনের সমস্ত ক্লান্তি পেরিয়ে এই আগমনী হয়ে উঠুক নতুন শুরুর গান। কারণ মা দুর্গার আগমন মানে শুধু একটি উৎসবের শুরু নয়, মানুষের হৃদয়ে মানবতার পুনর্জন্ম। মা আসেন বলেই শরৎ এত সুন্দর, অপেক্ষা এত মধুর, আর ভালোবাসা এত চিরন্তন। মা আসছেন। শুভ শারদীয়া দুর্গোৎসব ২০২৬।


এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন