Quotes New

Audio

Forum

Read

Contests


Write

Sign in
Wohoo!,
Dear user,
সই-সব
সই-সব
★★★★★

© Dhoopchhaya Majumder

Inspirational

10 Minutes   16.9K    110


#positiveindia

আদতে এটা কয়েকটা বন্ধুর একটা গল্প। ইস্কুলবেলার সেই ভোর থেকেই ওদের বন্ধুত্বের শুরু। খোলসা করে বলতে গেলে, সই পাতিয়েছিল ওদের মায়েরা, স্কুলের রোয়াকে, মায়েদের হাত ধরেই ওদের আলাপ।

রঞ্জনার মা চাকরি করতেন, আর শ্রাবণীর মা করতেন রঞ্জনাকে আগলানোর চাকরি, মানে জ্ঞান হয়ে থেকে ওরা শ্রাবণীর মা-কে সারাদিন রঞ্জনার বাড়িতেই থাকতে দেখেছে। ওরা স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে থেকেই পিসি রঞ্জনার বাড়িতে আসত, নাকি স্কুলেই মা পিসিকে খুঁজে পেয়েছিল, অনেকবার ওরা একে-ওকে খুঁচিয়ে জানতে চেয়েছে, কিন্তু সোজাসাপ্টা উত্তর কেউ দিতে পারেনি।

স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরেই তৃণার একবার টাইফয়েড হয়েছিল। হপ্তাখানেক কামাই হওয়ার পরে ক্লাসে আসতে পেরেছিল। তৃণার মা সেদিন স্কুলে এসে অন্য মায়েদের কাছে খুব কান্নাকাটি করেছিলেন। মেয়েটাকে কি কষ্ট করে যমের মুখ থেকে ছিনিয়ে এনেছেন, পড়াশোনা লাটে উঠেছে, এবার বন্ধুরা একটু দেখিয়ে না দিলে বোধহয় মেয়েটার একটা বছর নষ্টই হবে।

সেদিন শনিবার বলে শ্রাবণীর মায়ের সঙ্গে রঞ্জনার মা-ও ছিলেন ভিড়ের মধ্যে। পরের দিন থেকে রঞ্জনা আর শ্রাবণীর সঙ্গে তৃণাও এক বেঞ্চে বসতে শুরু করেছিল। তৃণা যখন বাড়ি থেকে আনা আপেলকুচি টিফিনে জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করত, রঞ্জনা নাকি কোমরে হাত রেখে চোখ পাকিয়ে বলত, 

“খেয়ে নাও শিগ্‌গির, নইলে টাইফয়েড আসবে বলে দিলাম!”

পায়েলের বাড়ি ছিল তৃণাদের পাশের গলিতে। ওদের বাড়িতে আবার মায়েদের বাইরে বেরনোর বিশেষ চল ছিল না। একদিন বাড়িতে আর কেউ না থাকায় ওনাকেই যেতে হয়েছিল মেয়েকে পৌঁছতে, সেখানে তৃণার মা-কে দেখেন। মুখচেনা দুজনেই, আলাপ জমতে দেরি হয়নি। পরের মাস থেকেই তৃণা আর পায়েল এক রিক্সায় স্কুলে যাওয়া শুরু করল। সহযাত্রী হওয়ার সুবাদে দিনতিনেকের মধ্যেই পায়েল জেনে ফেলল ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে গাছে জল দিতে তৃণার একটুও ভাল লাগে না, গাছেদেরও নিশ্চয়ই শীত করে, ঠাম্মা এসব বোঝে না, তেমনই পায়েলের ছোটকাকু প্রতি পূর্ণিমার রাত্রে মাদুর বগলে কোথায় যেন চলে যায়, পরদিন সকালে যখন বাড়ি ফেরে, সারা গায়ে মশার কামড়ের দাগ, আর তারপরের কদিন ছোটকাকে ওর ঘরে তালাবন্ধ করে রাখতে হয়, এগুলোও তৃণা জেনে ফেলল অনায়াসে। “কাউকে বলবি না” কথাটা না বলা হলেও শ্রাবণী আর রঞ্জনা ছাড়া আর কেউ জানেনি। ঠিক যেমন ওরা চারজন ছাড়া আর কোনও মেয়ে বহু বছর জানতে পারেনি যে শ্রাবণীর মা রঞ্জনার নিজের বা তুতো পিসি নন। অবশ্য একথা যে সবাইকে জানানোর নয়, সেটা ওরা টের পেয়েছিল রঞ্জনাদের বাড়িতেই।

সেবার গরমের ছুটিতে, রঞ্জনার জন্মদিনে বাকিদের নেমন্তন্ন। পাড়ার আরো ক’টা বাচ্চা ছেলেমেয়েও এসেছে। কেক কাটার পর যখন রঞ্জনা প্রথম টুকরো-টা শ্রাবণীর মুখে পুরে দিচ্ছিল, তখনই বোধহয় ঝিমলি বা বুল্টি, হয়ত বাড়িতে কারো মুখে ঐধরনের কথা শুনে থাকবে, সুর করে টেনে টেনে বলে উঠেছিল,

“আয়ার মেয়েকেই আগে কেক খাওয়ানো, আদিখ্যেতা যত্তসব!”

হাততালির আওয়াজে বাকিরা শুনতে না পেলেও তৃণা আর পায়েলের কানে ঢুকেছিল কথাগুলো। খুব বেশি তলিয়ে ভাবার বয়স যদিও সেটা নয়, তবে সুরটা বুঝিয়ে দিয়েছিল, পিসি যে আদতে রঞ্জনার আয়া, সেটা ঢাক পিটিয়ে স্কুলে রাষ্ট্র করার দরকার নেই। এমনকি, ওরা নিজেদের বাড়িতেও ব্যাপারটা ভাঙ্গেনি। মনে হয়ত সন্দেহ ছিল, আয়ার মেয়ের সঙ্গে মিশতে যদি বাড়ি থেকে বারণ করে!

পায়েল তো বরাবরই বাড়ির লোকের ভয়ে কাঁপত। ওর পায়েল নামটাও নাকি বাড়ির বড়দের ঘোর অপছন্দের। ছোটবেলায় বাড়ির লোক ওর নাম কি রাখবে ভেবে পাচ্ছিল না। রাধামাধবের পূজারী বাড়ি তো, তিন পুরুষে ছেলে জন্মেছে এবাড়িতে, মাধবের নামেই তাদের নাম রাখা হয়েছে। বহু বছর পর বংশে মেয়েসন্তান, শ্রীরাধার নামে নাম রাখলে সে মেয়ে যদি সুখী না হয়? রাধিকার মতোই যদি তার জীবনও বাঁশির সুরে উথাল-পাথাল হয়? এইসব সাত-পাঁচ ভেবে দাদু-ঠাকুমা মনস্থির করতে পারছিলেন না। এদিকে অন্নপ্রাশনের কার্ড, বার্থ সার্টিফিকেট—এসবে তো ভদ্রস্থ একটা নাম লিখতে হবে,তাই পায়েলের বাবা কাউকে কিছু না জানিয়ে ‘পায়েল’ নামটাই ফাইনাল করে বার্থ সার্টিফিকেট তৈরি করিয়ে ফ্যালে। ছেলের কাজ, তাই বাপ-মায়ে আর রাগারাগি করতে পারেননি। তবে এই ‘মডার্ণ’ নামের ধাক্কায় মেয়েটা যাতে ভেসে না যায়, তা খেয়াল রাখা হয়েছে ছোটবেলা থেকেই। মেয়ে যদি গানের তালে মেঝেতে দু’বার পা ঠুকল, 

“ব্যস, শুরু হল ধিঙ্গি মেয়ের ধেই নাচন”

কিংবা, হঠাৎ অকারণে মেয়ের হাসি পেল, সাড়ে পাঁচ বছরের মেয়ে, হাসি পেতেই পারে, শুরু হল বাক্যবাণ,

“ধাড়ি মেয়ের সারাক্ষণ অত হি হি হাসি কিসের?”

তা ব’লে পায়েলকে যে বাড়িতে দুচ্ছাই করা হত, তা কিন্তু নয়। দুটো রাতদিনের কাজের লোক, দাদু, ঠাকুমা, জ্যাঠা, জেঠি, মা, সারাদিন ধরে তোয়াজ করে চলেছে। কিন্তু ওই, সবটুকু করতে হবে ওনাদের নিয়মমতে। 

এসব কথাও অবশ্য ওরা চারজন ছাড়া আর কেউ জানত না। 

এভাবেই ওরা বড় হচ্ছিল। ইস্কুলের ভোরবেলা কালে কালে সকাল-দুপুর পেরিয়ে বিকেলের দিকে গড়ালো। মাধ্যমিকের পরেই শ্রাবণীর রাস্তা বাকিদের থেকে একটু আলাদা হয়ে গেল। যতই রঞ্জনা-রা পিসিকে আপন করে নিক, পরের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালানো মায়ের মেয়ে শ্রাবণী পড়ার সব খরচ মায়ের কাঁধে আর চাপাতে চায়নি। ইলেভেনে ভর্তি হয়েই সে চার-পাঁচটা বাচ্চাকে টিউশনি পড়াতে শুরু করে দিয়েছিল। তাই স্কুলের বাইরের আড্ডায় সেভাবে ঢোকা হত না ওর। স্কুলেও ক্লাস, ল্যাব এসবের ফাঁকে বিশেষ সময় মিলত না। চারজনের বৃত্তটা থেকে বোধহয় শ্রাবণী আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছিল। 

ক্লাস ইলেভেনে পুজোর ছুটির পর পায়েল দিনসাতেক স্কুলে এল না। তৃণাদের পাশের পাড়াতেই বাড়ি, দু’দিন আসেনি দেখে তিনদিনের দিন তৃণা ডাকতে গিয়েছিলো, শুনল পায়েল নাকি মেজজ্যেঠুর বাড়ি বেড়াতে গেছে, কবে ফিরবে ঠিক নেই। 

“ক’দিন থাকবে রে জ্যেঠুর বাড়িতে? পুজোর ছুটি শেষ, ফেরার নামগন্ধ নেই?” টিফিনে এটাই বলাবলি করছিল ওরা।

শ্রাবণী শুনছিল ঠিকই, তবে সিক্সে পড়া দুই ছাত্রীর অঙ্কের খাতাও দেখতে হচ্ছিল ওকে। মেয়েদুটো অ্যানুয়ালে একটু ভাল রেজাল্ট করলে তার মাইনে বাড়ার চান্স থাকে। বড্ড খুচরো ভুল করে দুটোই। কি হবে কে জানে? 

“এই শ্রাবণী, রাখ্‌ না খাতাগুলো! সর্বক্ষণ কাজ দেখাস না তো! আপদগুলোকে জোটানোর পর থেকে আমাদের ভুলেই গেছিস!”

তৃণার কথার ঝাঁঝটা গায়ে লাগলেও শ্রাবণী মুখে কিছু বলে না। পায়েলের জন্য তারও চিন্তা হচ্ছে, মুখ ফুটে বলছে না, এই যা।

আলোচনাটা চলত, কমার্সের রীণাকে আসতে দেখে এরা থেমে গেল। মেয়েটা পায়েলদের পাশের বাড়িতেই থাকে, ইলেভেনে এদের স্কুলে ভর্তি হয়েছে। 

“পায়েলের কি হয়েছে শুনেছিস তোরা?”সাবধানী গলায় প্রশ্নটা শুনে এরা ঘাবড়ে যায়। 

“ও তো জ্যেঠুর বাড়ি গেছে”, তৃণাকে থামিয়ে দিয়ে বলে ওঠে রীণা।

“ধুৎ, ওটা তো আইওয়াশ”,

“মানে? কোথায় গেছে তাহলে? কি হয়েছে ওর?” হুড়মুড় করে একগাদা প্রশ্ন হাজির হয়।

“গেছে জ্যেঠুর বাড়িতেই, কিন্তু তলে তলে বাড়ির লোক ওর বিয়ের ঠিক করেছে”।

“হ্যাট, কি যা তা বকছিস?"

“যা বলছি ঠিক বলছি”।

শ্রাবণীদের মাথায় কিছু ঢুকছিল না। কি বলে যাচ্ছে রীণা এসব?

“পায়েল বাড়ির একটাই মেয়ে, সবার কত আদরের, ইলেভেনে পড়তে পড়তে ওর বিয়ে কেন দেবে বাবা-মা?”

টাকা-পয়সার অসুবিধে থাকলেও নাহয় কথা ছিল, ভাবে রঞ্জনা, যদিও শ্রাবণীর মুখ চেয়ে কথাটা গিলে ফেলে। 

“তুই কি করে জানলি? পায়েল বলেছে তোকে?”, আমাদের না জানিয়ে পায়েল তোকে জানাল? তুই আপন হ’লি ওর কাছে? থমথমে মুখে তৃণা ভাবছিল। ভুল ভাঙল রীণার কথায়।

“পায়েলের জ্যেঠতুতো দাদা মুরলীধর, ও-ই বলেছে আমায়”। 

“সে তোকে পেল কোথায়?”তৃণা জেরা করতে ছাড়েনা।

“আঃ, সেসব পরে শুনিস ‘খন। পায়েলের খুব বিপদ। ক’দিন পরেই আশীর্বাদ আর রেজিস্ট্রি। মাঘমাসে বিয়ে। মুরলীদা আমায় ই-মেল করেছে কাল রাত্রে। ফোনে এসব কথা বলা যাচ্ছে না। পায়েল খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল, তাতে বাড়ির লোক আরও বিগড়ে গেছে। মুরলীদা কোনমতে দু’দিক সামলাচ্ছে। ও-ই পায়েলকে বুঝিয়েছে নর্ম্যাল থাকতে, সবাই মিলে ভেবে বাঁচার একটা উপায় বেরবেই”। ঝড়ের বেগে কথাগুলো বলে রীণা থামল। 

পায়েলের ‘মুরলীদা’র নাম করার সময় রীণার কান লালচে হওয়াটা বাকিদের নজর এড়ায়নি, অন্য সময় হলে রোম্যান্সের গন্ধে সবাই মেতেই উঠত হয়ত, কিন্তু এখন কারো মাথা ভাল করে খেলছে না। সেই ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে ওঠা-বসা, আজ তাদের একজন অদ্ভুত গেরোয়, “ওঠ্‌ ছুঁড়ি তোর বিয়ে’, ধাক্কাটা যতটা পায়েলের, এদেরও তার চেয়ে কম নয়।

কিন্তু ধাক্কাটা এল কবে? কিভাবেই বা?

বিজয়া দশমীর দিন পায়েলের বাড়ি থেকে সবাই মিলে কুলগুরুর আশীর্বাদ চাইতে যাওয়া হয়েছিল। সেখানেই নাকি গুরুদেব পায়েলের কপাল, কিংবা ঠিকুজি, কিছু একটা গুনে জানতে পারেন আঠেরো বছর বয়স পার করেও যদি মেয়ের কুমারীত্ব অটুট থাকে, তবে তার ভাগ্যে চরম বিপর্যয়, বৈধব্যযোগ। কোনো গ্রহরত্নই তার বৈধব্য ঠেকাতে পারবে না। আঠেরো পেরনোর আগেই যদি তাকে পাত্রস্থ করা যায়, একমাত্র তবেই বৈধব্যযোগ খণ্ডানো যাবে। গণনা শুনে বাড়িতে কান্নার রোল উঠল। কচি মেয়ের কপালে এই লেখা ছিল! আঠেরো পেরোতে যে বেশি বাকি নেই। এই বয়সে মেয়ের বিয়ে দিতেও বাপ-মায়ের মন সরে না, আবার না দিলেও মেয়ে বিধবা হবে। এত তাড়াতাড়ি যোগ্য পাত্রই বা জোগাড় হবে কোত্থেকে? সব মিলিয়ে মা দুগ্‌গার বিসর্জন, নাকি পায়েলের বিসর্জনের জোগাড়, হাওয়া দেখে নাকি বোঝা যাচ্ছিল না। দিনপনেরোর মধ্যে পাত্রও পাওয়া গেল, গুরুদেবেরই এক শিষ্যের ছেলে, সরকারি চাকুরে, বয়স আঠাশ-ঊনত্রিশ, বয়সের তফাৎটা একটু বেশি হল বটে, কিন্তু এর কমে যে পাত্র উপযুক্ত হয় না। 

রাসপূর্ণিমার দিন সন্ধেবেলায় নাকি আশীর্বাদ, মাসখানেক বাদে রেজিস্ট্রি, আর মাঘমাসে বিয়ে। এসব কথা রীণা কালকেই জেনেছে মুরলীর ই-মেল থেকে। ইদানীং তো ই-মেল-এর চলটা হয়েছে, এদের সবারই একটা করে ই-মেল আইডি খোলা আছে, শখ ক’রে। মুরলী ভেবেছিল পুলিশে জানাবে, যত হোক পায়েল এখনও নাবালিকা। কিন্তু দাদু-ঠাকুমা বুড়োমানুষ, পুলিশ দেখে ভালমন্দ কিছু একটা হয়ে গেলে কে ঠ্যালা সামলাবে?

তার চেয়ে যদি সবাই মিলে একটা উপায় বের করা যায় যাতে সাপও মরে, আর লাঠিও না ভাঙে, তবে বেশ হয়!

কিন্তু উপায় বের করবে কারা?

এই মেয়ে চারটে তো মুখ শুকিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পরদিন টিফিনবেলায় চার মাথা এক হল আবার। বাড়িতেও ভয়ে কেউ কিছু জানায়নি। আগের দিন অনেক রাতে নাকি মুরলীদা রীণাকে ফোন করেছিল লুকিয়ে, পায়েলকে ফোন ধরিয়েছিল। সে নাকি রীণার একঝুড়ি কথার জবাবে কেবল ফোঁস ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলেছে আর নাক টেনেছে। একবার শুধিয়েছিল,

“রাসপূর্ণিমার আর ক’দিন বাকি রে?” উত্তরটা রীণাও তখন জানত না, আজ সকালে বাংলা ক্যালেণ্ডারে দেখেছে চারদিন পর রাসপূর্ণিমা। 

তৃণা-রঞ্জনাদের গুনগুনানিতে শ্রাবণীর চিন্তাগুলো ছিঁড়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ চাপা গলায় চিৎকার করে ওঠে সে,

“রাস মানে পূর্ণিমা তো? চাঁদের আলোয় চারিদিক ভরে থাকে তো সেদিন?”

“হ্যাঁ, তা তো হবেই”।

“পায়েলের ছোটকাকে মনে আছে? আমাদের ক্লাস এইটে হার্টফেল করে মারা গেলেন, পূর্ণিমার রাতে ওনার কি একটা হত না? মনে আছে?”

এবার শ্রাবণীর সঙ্গে তৃণাও গলা মেলায়,

“হ্যাঁ হ্যাঁ, আবছা মনে পড়ছে, খুব ছোট তখন আমরা, পূর্ণিমার রাত্রে ছোটকা ঘরে থাকতে পারত না, সারারাত কোথায় জানি গিয়ে বসে থাকত। কেন করত রে ওর’ম?”

“সেসব জানিনা। পায়েলও জানত না। কিন্তু আমি ভাবছি ছোটকার মতোই চাঁদের টানটা যদি পায়েলের মধ্যেও চারিয়ে যায়?”

“ সে আবার কেমন?শ্রাবণী চকচকে চোখে বাকিদের বোঝাতে থাকে,

“ধর্‌ রাসপূর্ণিমায় চাঁদের আলোর জোয়ারে পায়েলেরও ঘরে রইতে ইচ্ছে হল না, কিংবা ছেলের বাড়ির লোকের সামনে চাঁদের আলোয় ভেসে গিয়ে মেয়েটা এমন কাণ্ড ঘটাল যে তারা মেয়ের রকম দেখে ভয়ে পালালো! হতে পারেনা এমনটা?”

“হি হি, বেশ হয় তবে। বাবা-জ্যাঠার মুখগুলো কেমন হবে ভাব একবার! সুস্থ-সবল মেয়ে, চাঁদের আলো গায়ে পড়তেই বাড়িসুদ্ধু লোককে নাচিয়ে ছাড়বে!”

“ওরে রীণা, তোর মুরলীকে এক্ষুণি লিখে দে বুদ্ধিটা। পায়েলটা তো চিরকেলে ভীতুর ডিম, দাদা ঠেকনা দিয়ে যদি কাজটা করাতে পারে”। 

“শ্রাবণী রে, তোকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাই আয়”, দুহাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে তৃণা।

চারটে কচি মুখে শেষ পর্যন্ত খুশির হাওয়া লাগল তাহলে! ইস্কুল ছুটির পরে দলবেঁধে রীণার বাড়ি গিয়ে সব কথা লিখে মুরলীধরকে ই-মেল করা হল। চিঠির শেষে মোটা অক্ষরে লিখে দেওয়া হল চিঠিটা ভাল করে প’ড়ে রাত্রে মুরলী যেন অবশ্যই রীণাকে ফোন করে, পুরো ছকটা আরেকবার ঝালিয়ে নিতে হবে।

তার পর?

পায়েল অবশ্য আরও দিন সাতেক স্কুলে আসতে পারেনি, তবে তার ছোড়দা মুরলীধর রীণাকে ফোন করে রোজ ওবাড়ির সাতকাহন শুনিয়েছে, আর রীণা সেসব উগরে দিয়েছে বাকি তিনজনের কাছে এসে। 

আশীর্বাদের দিনে, সন্ধের বদলে দুপুরেই নাকি ছেলেপক্ষ এসে হাজির হয়েছিল। গয়নাগাটি পরিয়ে মাথায় ধান-দুব্বোর বাগান বসিয়ে আশীর্বাদ সেরে, পেটপুরে খেয়েদেয়ে ছেলের বাড়ির লোকেরা যখন গদিওয়ালা সোফায় গা এলিয়ে বসেছেন, আর পাত্র তন্ময় পায়েলের খোঁজে দরজার দিকে আড়ে আড়ে তাকাচ্ছে মাঝেমাঝে, তখন নাকি পায়েল কোত্থেকে এসে হবু বরের কোল ঘেঁষে বসে পড়ে খসখসে গলায় বলতে শুরু করেছিল,

“আশীর্বাদ তো হল গো, কিন্তু আসল কাজটা হল না যে? আমার কুমারীত্ব? সে তো রয়েই গেল গো? সেটি না ঘুচলে আমি যে বিধবা হব! ওগো আমার কি হবে গো?” বলেই ডুকরে কেঁদে ওঠে পায়েল। 

ঘরে তখন ছেলের বাপ-মা, পায়েলের গুষ্টিসুদ্ধু আত্মীয়, সক্কলে কথা বলতে ভুলে গেছে।

পায়েলের মা মেয়েকে টেনে তুলতে গেলে সে নাকি হাত ছাড়িয়ে তন্ময়ের পায়ে উপুড় হয়,

“এমন চাঁদের আলো, এ রাত মিথ্যে হতে দিও না গো, কথা শোনো, আমায় বিধবা হওয়ার হাত থেকে বাঁচাও”!

বাইরে তখন চোখ ঝলসানো রোদ, ঘড়িতে বেলা তিনটে। 

মুরলীর পেট গুলিয়ে হাসি উঠে আসছে, পায়েলও নাকি হাসি চাপতেই হবু বরের পায়ে প’ড়ে ফুলে ফুলে কাঁদছিল। 

সজ্জন গুরুভাইয়ের সুলক্ষণা কিশোরী কন্যা হলে কি হয়, এমন হায়া-লজ্জাহীন মেয়েমানুষকে তো আর বরণ করে ঘরে তোলা যায় না, অগত্যা তন্ময়ের বাড়ির লোক গয়না ফেরত নিয়ে বাড়ি রওনা হয়ে যান।

এরপর আরও দুদিন পায়েল জ্যেঠুর বাড়িতে ছিল। নিজের ঘরে বন্দী, সারাদিন “আমি বিধবা হব না” বলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদত। গতিক সুবিধের নয় বুঝে বাবা-মা মেয়েকে নিয়ে তড়িঘড়ি বাড়ি ফিরলেন। মুরলীর পরামর্শে তারই এক ডাক্তার বন্ধুকে বাড়িতে ডাকা হল। মেয়ের এই হঠাৎ মাথার দোষ-এর কথা লোক জানাজানি হতে দেওয়া ঠিক নয়, তাই বাড়ির লোক বাধ্য হয়েই ছোকরা ডাক্তারের কাছেই মেয়েকে নিয়ে বসলো। সে ডাক্তার নিদান দিল,“মেয়েকে ইস্কুল পাঠান। বিধবা হওয়ার কথায় খুব ভয় পেয়ে গেছে। ওসব কথা আর মুখেও আনবেন না। ওকে হাসতে দিন, খেলতে দিন। নইলে কিন্তু ভয়ের চোটে ভালমন্দ কিছু করে বসতে পারে”।

ডাক্তারটিকে দেখে খুব একটা ভরসা না হলেও কার্ডে বেশ লম্বা-চওড়া ডিগ্রি আছে দেখে বাপ-জ্যাঠাও আর কিছু বললেন না। পায়েল আবার স্কুলে যেতে শুরু করল। “জণ্ডিস হয়েছিল” বলে ডাক্তারের লেখা কাগজ জমা করা হল স্কুলে। 

এর পরের কয়েকটা দিন ভারি ফূর্তিতে কাটল। চারজনে এক জায়গায় জড়ো হলেই ‘বিয়ে-দমন পালা’র গপ্পে মেতে ওঠে, সে গপ্প আর ফুরোয় না।

“জানিস, সেই তন্ময় তো তখন ভয়ের চোটে আমায় বলছে, ছেড়ে দাও মা, বাড়ি যাব,”কিংবা,“আরে দূর, পলাশদা কেন ডাক্তার হতে যাবে? ও তো ছোড়দার বন্ধু, ওর বাবা ডাক্তার। বাবার কার্ড হাতিয়ে এনে বাবাদের দেখিয়েছে, আর সবাই ভেবেছে খুব বড় ডাক্তার, হি- হি”।

দশ-বারো বছরের ওপার থেকে পায়েলের হি-হি হাসিটা ভেসে এল শ্রাবণীর কানে। 

সেদিনের আঠেরো না পেরনো পায়েলের বিয়ে ভণ্ডুল করে এদের চারজনের কেমন যেন নেশা লেগেছিল মনে, বিয়ে ভাঙ্গার নেশা। তারপর থেকে যেখানে যত আঠেরো না পেরনো মেয়ে অকাল-বিয়ের হাত থেকে বাঁচতে ওদের কাছে আকুতি জানায়, তাদের সবার জন্য ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। কাজটা করছে অনেকদিন ধরেই, তবে দু’বছর আগে তৃণাদের বাড়ির রাঁধুনি সবিতাদির পনেরো বছরের মেয়েটার বিয়েও এরা আটকে দিয়েছিল, তার পর থেকেই ওদের নাম (কিংবা বদনাম!) চারপাশে ছড়াতে থাকে। পায়েলের মুরলীদা ততদিনে পুলিশের বেশ বড়ো একজন কর্তা হয়ে বসেছে, সে-ও ভারি আহ্লাদের সঙ্গে এদের হাতে হাত মেলায়।

একটু আগেই পোড়ামাধোপুর থেকে দুটো মেয়ে ফোন করেছিল। আরেকটা বিয়ে ভাঙার ডাক এসেছে। মেয়েদুটোর সেভেনে পড়া বান্ধবীর বিয়ে হচ্ছে কোনো এক দোজবরে কনস্টেবলের সঙ্গে। শ্রাবণী ওর ডায়রির পাতাটা ওল্টাতে শুরু করল, মুরলীদাকে ফোন করে পোড়ামাধোপুর থানায় খবর দিতে বলতে হবে।।

নাবালিকা বন্ধুত্ব সমাজসেবা

Rate the content


Originality
Flow
Language
Cover design

Comments

Post

Some text some message..