Quotes New

Audio

Forum

Read

Contests


Write

Sign in
Wohoo!,
Dear user,
অনীকের কলকাতায়
অনীকের কলকাতায়
★★★★★

© অঙ্কন গাঙ্গুলী

Drama

11 Minutes   16.0K    150


Content Ranking

হাওড়া স্টেশন পেরিয়ে রাস্তায় নামতেই অনীক টের পেল-কলকাতা বদলে গেছে । এই তিনটে শব্দ ভেঙে ভেঙে বেশ কয়েকবার উচ্চারণ করে নিজের মনেই হাসলো সে । আশ্চর্যের কী ! সবকিছুই তো বদলায়, তাই কলকাতাও বদলেছে । কলকাতার নির্জনতা বদলেছে, কলকাতার ইঁট-কাঠ-চুনকামের পোশাক আর নেই । এখন তার কংক্রিটের দুনিয়া । তার ছেলেবেলার সাথী কলকাতা । ওর বাবা নেই, বাড়িতে মা আর অনীক এই দুজন মাত্র লোক ।

মা'য়ের কথা মনে হতেই অনীকের সেদিনকার ঘটনাটা মনে পড়ে গেল । মা'য়ের সাথে তুমুল ঝগড়া, মনোমালিন্য, কথাকাটাকাটি, আর অনীকের বাড়ি থেকে চলে আসা ।

একেই বলে টান । একেই বলে কলকাতা । মুম্বাই তে থাকতে অনীকের একদিনও পুরোনো ঘটনাগুলো মনে পড়েনি, আর কলকাতায় পা রাখতেই কী না...! অনীকের মনে হচ্ছে, কলকাতা যেন তাকে ঠিক মেনে নিতে পারছেনা । সূক্ষ অভিমান ওর উপর । কারণটা কি অনীক আজ কলকাতার অতিথি হিসেবে এসেছে বলে ? কোলের ছেলে যখন অতিথি হয়ে যায়, তখন বেদনাটাও হয় মাকড়সার জালে আটকে পড়া ছটফট করা পোকার মতো । কিন্তু অনীক করবেই বা কী ! তার কাজ যে মুম্বাইতেই ।

" ক্ষমা করে দাও কলকাতা । অনীককে তুমি অতিথি হিসেবেই স্বীকৃতি দাও ।"

হাওড়া স্টেশনে হাজার রকম মানুষের ভিড় ঠেলতে ঠেলতে বাসস্ট্যান্ডে এলো সে । তারপর শোভাবাজারের একটা বাসে উঠে বসলো । কত্তদিন ও বাসে চাপেনি ! কাঁধে চামড়ার ঝোলানো ব্যাগ আর হাতের আঙুলে দশটাকার নোট গুলো মুড়িয়ে ধরা কন্ডাকটারদের হাতে ভাড়া দেয়নি । সময়মতো দরজার সামনে ভিড় ঠেলে নিজের স্টপেজে নামেনি কত্তদিন ! আজ সে এই সব করবে । এক অনির্বচনীয় আনন্দে সে খুশি হয়ে উঠলো, তার কবিমন পাগল হয়ে উঠলো কলকাতার ব্যাস্ততায় । ওর মনে হয় কলকাতাটাই যেন আসলে পশ্চিমবঙ্গ, আর বাকিটুকু নগণ্য । মাঝে মাঝে তার এটাও মনে হয় যে কলকাতার নির্দিষ্ট কোনো আকার আকৃতি নেই, কোনো চেহারা নেই । যেমন তেমন করে এটা ওটা জোড়াতালি দিয়ে তৈরি হয়ে গেছে ।

মনে মনে জিজ্ঞাসা করল, " কেমন আছো ? কলকাতা ? আমায় স্বাগতমও জানবেনা ? দশ বছর পর আমি তোমার কাছে এসেছি, তোমার কোনো ঔৎসূক্য নেই, কোনো উত্তেজনা নেই ।"

তক্ষুনি অনীক টের পেল তার পাগলামো । এইসব অবান্তর প্রশ্নের কোনো মানেই নেই । কলকাতায় এলে কি সবাই তবে পাগল হয়ে যায় ?...না, সবাই না । যারা কলকাতার জন্য একরকম পাগল, শুধু তারাই । কলকাতার হাওয়াটা কেমন ছোঁয়াচে । অনীকের মন ব্যাকুল হয়ে উঠলো আবার কখন সে ঝিমধরা দুপুরে হাতে বাংলা গল্পের বই নিয়ে বিছানাতে উপুর হয়ে শুয়ে শুয়ে পড়বে । তাতে যেন মনটা বেশ উদাসীন হয়ে যায় । পৃথিবীতে খালি দুটি প্রাণী-সে আর কলকাতা । সন্ধ্যেবেলা ময়দানে শুয়ে ভাববে রবীন্দ্রনাথের কথা । ভাববে আর খেলবে জীবনের সাথে সার্থকতার লুকোচুরি । আবার হেঁটে যাবে ফুটপাথের এ মাথা থেকে ও মাথা । ক্লান্ত হলে বাস কিংবা ট্যাক্সি নয়, প্রাণ ভরে উপভোগ করবে হাতে টানা রিক্সার আনন্দ । দেখতে দেখতে দিন কাটাবে সেকেলে কলকাতার মাধুর্য । দেখবে আর গর্ব করবে জব চার্নকের জন্য । মেমোরিয়ালের সেই পরীর স্ট্যাচু, যেদিকেই যায় ও যেন তোমার দিকেই তাকিয়ে । গিরিশমঞ্চে নাটক দেখবে, ফুটপাথের তেলেভাজা, আলুকাবলি খাবে । অনুভূতি ছুঁয়ে যাবে গঙ্গার ধারের হাওয়া । লঞ্চে করে দেখে আসবে ঐ বাকি সব তীর গুলো । ঐ তীর গুলোর একটাতেই তো জব চার্নকের জাহাজ এসে ভিড়েছিলো । কফি হাউসে সামনে কফি আর কোলের উপর খুলে রাখবে 'চলন্ত কলিকাতা'-" ইঁটের-টোপর-মাথায়-পরা-শহর কলিকাতা/অটল হয়ে বসে আছে ইঁটের আসন পাতা ।" কলেজ স্ট্রীট, কলেজ স্কোয়্যার, শ্যামবাজার, ধর্মতলা, ডালহৌসি, ইডেন গার্ডেন...সব কিছুর আবছা হয়ে আসা স্মৃতির পাপড়িতে আবার হাত বুলিয়ে নেবে । একজন আদ্যন্ত বাঙালির মতো হাত গোটানো পাঞ্জাবী, জিন্সের প্যান্ট, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ নিয়ে হেঁটে যেতে চায় সে । আর হাতে থাকবে তার প্রিয় ক্যামেরা, ভাবনায় থাকবে পথের সঞ্চয় । সঞ্চয়ে কি থাকবে ? নিরবতা ? নির্জনতা ? রাস্তার ধুলো ? কাব্য ? কোনটা ? নাকি থাকবে ইঁট পলেস্তারা খসে যাওয়া সেই সব বাড়ি, যাদের অঙ্গে অঙ্গে গাছেদের কাড়াকাড়ি । কার্নিসে চড়ুই কিংবা শালিখের বাসা, পাতা ছাওয়া কাঠের ব্যালকনি, খড়খড়ি দেওয়া জানালা দরজা-এই সব মিলিয়ে লেন্সবন্দী ছবি ? তার এটাও মনে হয়-কলকাতা বড় কিউবিক । সেকেলে কলকাতা দেখে অনীকের ফটোগ্রাফারের চোখ বলে-কলকাতা যেন পিকাসোর ইজেল তুলিতে রামধনু রঙে রাঙা । কলকাতা সুররিয়ালিস্ট । যেন স্যাগালের নীলের লালের গূঢ় রহস্যে রাঙা । বড় দুরন্ত কলকাতা । তার মুখ থেকে আপনমনেই দু'লাইন কবিতা বেরিয়ে এল-প্রাণবন্ত হে বসন্ত, তুই হলি তার পিছুটান/চল অল্প করি গল্প, কিছু মুখচোরা অভিমান । আঃ ! সবরকম তুচ্ছতা ঝেড়ে ফেলে এক অনন্য অনুভূতি ।

কিন্তু তার কলকাতার যে জিনিসটা ভালো লাগেনা, তা হল আকাশ ছোঁয়া ফ্ল্যাটবাড়ি আর অফিস বিল্ডিং । আকাশটাকে ওরাই খেয়ে নিয়ে ঠুঁটো জগন্নাথের মতন দাঁড়িয়ে আছে । যেন কিছুই জানেনা । অনীককে যদি কেউ একদিনের যা ইচ্ছে তাই করার সুযোগ বা ক্ষমতা দিত, তবে আগে ভাঙত ঐ বড় বড় বাড়িগুলো । চুলোয় যাক লোকের অফিস কাছারি । তার মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি সে দু'শো বছর আগে জন্মাত তবে কত্ত ভালো হত ! চোখের সামনে দেখতো ব্রিটিশ সরকারের ছড়ি ঘোরানো শাসন । স্মার্ট ফোন নয়, একে অপরের সাথে কথা বলত চিঠির মাধ্যমে । যার চল এখন প্রায় উঠতে বসেছে, আর টেলিগ্রামের কথা না তোলাই ভালো । দেখতে পেত পর্তুগিজ দস্যুদের লাল চোখ । প্রত্যেকটি বাড়ি একে অপরের সাথে লাগোয়া । সবকটার ছাদের পাঁচিলে শাড়ির একচেটিয়া অধিকার । রোদে চাল কিংবা গম কিংবা আমের আচার রাখা । আর সেই সময়কার সিনেমা ?...না, সিনেমা বলা ঠিক নয় । কেমন ছিল তখনকার বায়োস্কোপ ? সাদাকালো ছবি । ধূ-ধূ মাঠ । একটা কয়লাচালিত রেলগাড়ি মাঠের মাঝখান দিয়ে আকাশ কেটে ধোঁয়া উড়িয়ে চলে যাচ্ছে । আর সেটা দেখছে দু'জন কমবয়সী ছেলে মেয়ে । এককথায় অনবদ্য বায়োস্কোপ পথের পাঁচালী । তখনকার বিশুদ্ধ প্রেম, যাতে এখনকার মত সেক্সের রমরমা নেই । কিন্তু কলকাতার নায়ক ফেলুদার এসব বিয়ে প্রেমের কোনো বালাই নেই । তাঁর প্রথম কাজ গোয়েন্দাগিরি এবং আবহমান কাল ধরে তিনি বিখ্যাত ওনার গোয়েন্দাগিরির জন্য ।

অনীক এ কথাটা খুব মানে যে তাকে কলকাতা প্রেমী করে তুলেছে ফেলুদা । ষোলোআনা বাঙালী । আর ফেলুদাকে চিনিয়েছে তার মা । মা'ও প্রচুর গল্পের বই পড়েন, নানারকম বাংলা সাহিত্যের বই পড়েন ।

মা কেমন আছেন ? এই দশবছরে মায়ের সাথে টোটালি ডিটাচ্ । তার মধ্যে যে এত আবেগ এত অনুভূতি আছে, তা সে কোনোদিনই বুঝত না, যদি না মা বোঝাতেন । তার কবি সত্ত্বাও কেউ জানতে পারতো না, যদি না মা জানাতেন । মায়ের সাথে তার বন্ডিং টা একটু অন্যরকম । একটু রোমান্টিক, আবার একটু ভয় । একটু বাবার স্নেহ আছে । একটু একটু আছে বন্ধুর খুনসুটি । মা তার হৃদয়ের অনেকটা জুড়ে রয়েছেন । মায়ের অবদানও তার জীবনে অনেকখানি । বাবা মারা গেছেন অনীকের যখন তিন বছর বয়স । তবু একটি মুহূর্তের জন্যেও অনীক বাবার অভাব টের পায়নি তার কারণ শুধুমাত্র মা । মা'কে দেখার জন্য তার মন ব্যাকুল হয়ে উঠছে । অস্থির হয়ে উঠছে মা'কে জড়িয়ে ধরার জন্য । সে মনের চিত্রপটে কল্পনায় মায়ের একটা ছবি আঁকার চেষ্টা করল । এখন নিশ্চয়ই মায়ের চুল সব পেকে গেছে ? সব না হোক, খানিকটা তো পেকেছে । গলার আওয়াজ বুড়িয়ে এসেছে, হয়তো নাকের ডগায় একটা চশমাও আঁটা হয়ে গেছে । হতেই পারে । অনীক চলে আসার পর থেকে মায়ের একমাত্র সাথী বলতে গল্পের বই । সে চায় আবার একহাতে মায়ের হাত ধরে আর একহাতে কলকাতার হাত ধরে ঘুরে বেড়াতে । একটা ছোট্ট লেখা মা'কে নিয়ে, তার মনে পড়ে গেল । কিন্তু কোথায় পড়েছে সে সেটা কিছুতেই মনে করতে পারছেনা-"যুক্তির যেখানে শেষ, সংকটের বিপন্নতার শুরু, সেই খড়ির গন্ডির পর-সেইখানেই মায়ের অধিষ্ঠান ।"

অনীকের একটা ছোটবেলার স্মৃতি হঠাৎ মনে পড়ে গেল । সে আর ওর মা রোজ বিকেলে যেতেন দেশপ্রিয় পার্কে । তারপর সেখান থেকে অনীকের বায়না হত ট্রামে উঠবে । অনীক কেমন যেন হতভম্ব হয়ে যেত, এটা তো ট্রেন, কিন্তু রাস্তায় চলে ! আবার অন্যসব ট্রেনের মত এগুলো অত জোরে যায়না । কচ্ছপের গতি, যেন সারাক্ষণই এরা মাতাল । রাস্তায় ট্রেন-তাজ্জব ব্যাপার !

আর একদিন সন্ধ্যেবেলা অনীক পড়ছে, আর মা পাশে বসে চাল বাছছেন । হঠাৎ অনীক বলল, " মা, তাড়াতাড়ি কিভাবে বড় হওয়া যায় ?"

মা বললেন, " কেন ? তোর তাড়াতাড়ি বড় হয়ে কি হবে ?"

" না, অর্কর মা ওকে বলছিল যে তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যা, তারপর আমাকে আর বাবাকে দেখবি ।...মা, এখন কি তবে অর্ক দেখতে পায়না ?"

মা হেসে ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বললেন, " ঐ দেখা মানে চোখে দেখা না । ওর মানে খেয়াল রাখা ।...আর তোর বেশী তাড়াতাড়ি বড় হয়ে কাজ নেই ।"

তিনি চাইতেন না যে তাড়াতাড়ি বড় হওয়ার নেশায় অনীক ওর ছেলেবেলার স্বাদ হারিয়ে ফেলুক । ছোট্ট অনীক বলেছিল, আনাড়ি হাতে মায়ের সাথে চাল বাছা, রান্নার সময় মাঝে মধ্যে গিয়ে এটা ওটা এগিয়ে দেওয়া, মায়ের ভিজে আঁচল মুখে পুরে জল টানা-এগুলোও নাকি একপ্রকার খেয়াল রাখা ।

এইসব মনে পড়ায় অনীকের বুকের বাঁ দিকটা একটু মোচড় দিয়ে উঠল । খুব জোর করে সে কান্না চেপে আছে । কীভাবে যে অনীক মায়ের সাথে এমন একটা সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়ে চলে গেছিল কে জানে । কিন্তু মায়ের সেদিনকার কথাগুলো এখনও তার কানে বাজে । মনে পড়ে গেল আবার সেই দশ বছর আগের ঘটনাটা । তখন অনীক কলেজ লাস্ট ইয়ার ।

" মা, কতবার বলবো এইসব আমার ভালো লাগেনা ।"

" ভালোলাগেনা মানে ! কি ভালোলাগেনা তোমার ? পড়াশুনা করতে, চাকরি করতে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে ভালোলাগেনা ?"

" নিজের পায়ে আমি দাঁড়াতে চাই মা । কিন্তু পড়াশুনা করে সেটা আমি পারবো না । এইসব সাইন কস ট্যান ফিজিক্স কেমিস্ট্রি ভালোলাগেনা আমার । আমার ভালোলাগেনা ইঞ্জিনিয়ারিং ।"

" তবে কি ভালোলাগে ? হু ? ক্যামেরা হাতে নিয়ে সারাদিন টো-টো করে ঘুরে বেড়াতে ? তোমার স্বপ্নটা এত ছোট ?"

" কারোর স্বপ্ন ছোট হয়না মা । আর সত্যি বললে, হ্যাঁ । আমার ক্যামেরাই ভালোলাগে ।"

" তুই অনেক বদলে গেছিস অনীক । মা হয়েও সেটা আমি বুঝতে পারিনি ।"

" তুমিও অনেক বদলে গেছো মা । শুধু আমরা কেউ কাউকে বুঝতে দিই নি ।"

" তুই কি চাস ?"

" আমি নিজের মতো বাঁচতে চাই ।"

" এটা অবান্তর । আমার অত সাধ্য আছে কী, যে তোকে আমার স্বপ্নে বেঁধে রাখব ।"

" এটাই তো ভুল মা । আমার জীবনে যদি আমার স্বপ্নের দাম না থাকে, তবে সেই জীবনের কী মানে !"

" আর তোর স্বপ্ন ফটোগ্রাফার হওয়া ?"

" হ্যাঁ, মা । তাই ।"

" ছবি তুলে কে বড়লোক হয়েছে রে ? হ্যাঁ ?"

" তবে ঈশ্বরচন্দ্র এত গরিব ছিলেন কেন ? বলো ?"

" ওনার নাম নিসনা । তোর এতটুকু যোগ্যতা নেই যে..."

" আসল ব্যাপার হল-উচিৎ কথা তোমার সহ্য হলনা । আর তোমাদের জেনারেশনের চিন্তা ভাবনা গুলো এত লো কোয়ালিটি তা আমি জানতাম না ।"

" তবে তুই কি জানিস ?"

" যে তোমরা টাকা ছাড়া কিছুই বোঝোনা । জীবন মানে টাকা উপার্জন । লেখাপড়া মানে পয়সা কমানো । এর বাইরে আর কী ই বা জানার আছে !"

অনীকের মা কোনো কিছু না বলে শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছতে মুছতে কাজে চলে গেলেন । অনীকের ছোটবেলায় আঁচলের যেখানটা সে মুখে নিয়ে চুষে চুষে কলের জল খেত, আজ সেখানটাতেই ওর মায়ের চোখের জল । অনীকও বাড়ির বাইরে চলে গেছিলো । দুপুরেও ভাত খেতে আসেনি ।

অনীক কারোর উপর বেশিক্ষণ রাগ অভিমান করে থাকতে পারেনা । নিজেকে অপরাধী বলে মনে হচ্ছে । এরকম ভাবে মায়ের সাথে ব্যাবহার করা তার মোটেই ঠিক হয়নি । কোথা থেকে পেল সে এমন শিক্ষা ? নিজের মনেই বলল, " ধিক্কার অনীক ! মা'কে সম্মান করতে না পারলে সে মানুষ নয়-জানোয়ার ।"

সন্ধ্যের দিকে মায়ের ঘরে গিয়ে সে দেখল মা শুয়ে আছেন । অনীক ঘরে ঢুকে মাথার কাছে দাঁড়িয়ে মা'কে ডাকল- "মা...ও মা ।...একটু উঠবে ? খুব খিদে পেয়েছ গো ।"

মা উঠতে উঠতে বললেন, " তোর এত রাগ আমার উপর দেখা, খাবার কী দোষ করল ।...আয়, দেখি..."

অনীক মায়ের পিছন পিছন ডাইনিং রুমে গেল । সে ঠিকই করে ফেলেছে যে ওসব ছবি টবির চিন্তা বাদ দিয়ে দেবে । মা'কে বলবে সে মায়ের কথা মতোই চলবে ।

সে কিছু বলার আগেই মা বললেন, " তোকে জন্ম দেওয়ার থেকে নিঃসন্তান হয়ে থাকা অনেক ভালো ছিল । তোর মত পাপকে জন্ম দিয়ে আমিও খুব বড় পাপ করেছি । তোর পাপই আমার স্বামীকে মেরে ফেলেছে, এবার আমাকেও মেরে ফেল । সব ল্যাঠা চুকে যাবে ।"

এই কথাগুলোর প্রত্যেকটি শব্দ, একেকটি অক্ষর অনীকের বুকের বাঁদিকে অত্যন্ত নরম এক জায়গায় তীব্র আঘাত করেছিল । নিজের এত কাছের মানুষের থেকে এমন অপ্রত্যাশিত সম্মান সে কখনোই আশা করেনি । সেদিন রাতেই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছিল । এসব মনে হতে অনীকের নীচের ঠোঁটটা ফুলে ফুলে উঠছে ।

" দাদা, শোভাবাজার আসছে । আপনার ভাড়াটা ।"

অনীক চমকে উঠল । এতক্ষণ ধরে কোথায় হারিয়ে গেছিল সে ? এই কী তবে দিবাস্বপ্ন ! কই আগে তো এমনটা হয়নি ?...আশ্চর্য !

অনীকের কাছে পর্যাপ্ত ভাড়াটাই ছিল । কিন্তু সে ব্যাগের পয়সা নাচিয়ে নাচিয়ে চেঞ্জ ফেরৎ দেওয়াটা দেখার জন্য নোট ভাঙাতে দিল ।

নিজের পাড়ায় ঢুকতেই কতগুলো কুকুর ওর পাশ কাটিয়ে চিৎকার করতে করতে চলে গেল । সেই জায়গা । ছেলেবেলার কত স্মৃতির সাক্ষী এই পাড়া । অনীকের হাঁটার গতি যে কমে আসছে তা সে বুঝতে পারছেনা । বুকটা কাঁপছে । তবে ভয় নয়, পুরনোকে আবার ফিরে পাবার আনন্দে ।

তার পাড়াটা আর আগের মতো কোলাহল মুখরিত নেই । সেই চামড়ার জুতো পালিশ করা লোকটার চিৎকার নেই । অনীক তাকে দেখলেই ভ্যাঙাত 'পওলিশ' বলে । ওদের বাড়ির রকটায় শুয়ে থাকা ভুলো কুকুরটা নেই । শ্যামাপিসির ভাইপো টা, যে পাগল ছিল, আর রাস্তার লোকদের দেখলেই গালাগাল করত । সে কোথায় ? সে ও তো নেই । পঞ্চতন্ত্রের গল্প বলিয়ে দাদুটা নেই । রহিম চাচার ছোট ওষুধের দোকানটাও নেই । রুবী কাকিমার সকাল থেকে শুরু করা সেলাই মেশিনের ঘর্ঘর আওয়াজটা নেই । বাগচী দাদুর পাড়ার লোককে শুনিয়ে শুনিয়ে রেডিওতে খবর শোনার শব্দ নেই । এরা সব কোথায় ? অনীকের এখন দশ-দশটা বছর না কাটানোর আফসোস হচ্ছে । পাড়াটা কে কখন, কীভাবে দশ বছর বেড়ে গেছে, তা সে নিজের চোখে দেখতে পারল না ।

" আড়ি আড়ি আড়ি !"

অনীক পিছনে ঘুরতেই...মা ! মা'কে সাথে সাথে জড়িয়ে ধরল সে । এবার আর চোখের জল কোনো বাধা মানল না ।

" কি রে বাঁদর, কাঁদছিস কেন ?"

" তোমার কান্না পাচ্ছেনা বুঝি ?"

" না রে । দশ বছর ধরে কাঁদছি । এই কাল রাতেই চোখের সব জল ফুরিয়ে গেল ।"

" মা, সেদিনকার জন্য আমাকে ক্ষমা করেছ তো ?"

" মায়ের কাছে আবার ক্ষমা কীসের । আর ক্ষমা তো আমার তোর কাছে চাওয়া উচিৎ । সেদিন ঐ কথাগুলো না বললে এই দশ বছর তোকে কাছে না পেয়ে বাঁচতে হতনা ।"

" ঠিক বলেছ ।"

মা অনীকের কানটা ধরে বললেন, " আর না বললে তুই এত বড় ফটোগ্রাফার হতে পারতিস না । আবার বকবক করছে ।"

" মা ! তুমি জানলে কিভাবে ?"

" এইতো বুড়োকাকুর দোকানে ঠোঙা বেচতে যাই । সেখানেই খবরের কাগজে তোর নাম উঠলে উনি আমায় ডেকে দেখান । এই এখনই ওখান থেকে আসছি । তখন মনে হয় তুই আমার ছেলে ।"

" তবে মানলে ছবি তুলেও বড়লোক হওয়া যায় ?"

" অগত্যা !"

" তবে সেদিন অত লেকচার দিছিলে কেন শুনি ?"

" শয়তান ছেলে ! তুই একটুও বদলাসনি ।"

" তুমি বদলেছ কই ।...আর শোনো, আজ থেকে আর ঠোঙা বেচতে যাবেনা । তোমাকেও আমি মুম্বাই নিয়ে যাবো ।"

" কেন রে ! তোর স্বপ্ন থাকতে পারে আর আমার স্বপ্ন কাঁচকলা ?"

" তোমার স্বপ্ন ঠোঙা বেচা ? উফ্ তোমাদের জেনারেশনটা আর বদলাবে না ।"

" বুঝেছি বুঝেছি ! আর সেই ছড়াটা ?"

অনীক আবার মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, " কাল যাবো বাড়ি ।"

" পরশু যাবো ঘর ।"

" মায়ের ভিজে আঁচল নিয়ে টানাটানি কর ।"

bengali story storymirror kolkata drama mother son

Rate the content


Originality
Flow
Language
Cover design

Comments

Post

Some text some message..