Suroshri Paul

Drama


4.4  

Suroshri Paul

Drama


শহুরে মেয়ে

শহুরে মেয়ে

5 mins 17.5K 5 mins 17.5K

"বাবান, ঠাম্মা ফোন করেছে! আয়, একটু কথা বলে যা", তিন্নির মা ডেকে ওঠে।

"ব্যস্ত আছি মা, ঠাম্মা কে বলো আমি বাইরে গেছি, পরে কোনোদিন কথা বলবো।"

বিছানায় বসে অঙ্ক করছিল তিন্নি। পাশের ঘরে বাবা ঠাম্মার সাথে কথা বলছে বেশ কিছুক্ষণ ধরে। এতবার ডাকার পরেও সে ফোন না ধরায় মা আর বাবা দুজনেই যে বেশ বিরক্ত, তা তিন্নি ভালোই আন্দাজ করতে পারছিল। অবশ্য বিরক্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। শেষ তিন-চার বছরে সে একবারো দেশের বাড়ি ঘুরতে যায়নি। বাবা যতবারই যায়, তাকে সাথে নিয়ে যেতে চায়, তবে তিন্নি প্রত্যেকবারই কিছু না কিছু অজুহাত দেখিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা এড়িয়ে যায়।

"আজকালকার ছেলেমেয়েদের ব্যাপার বাবাঃ বুঝিনা। দাদু-ঠাম্মা, আত্মীয়দের ভালোবাসার আদর তো করেইনা, তাই বলে এতটুকু সম্মান দেখাবেনা? শহুরে মেয়ে হয়েছে বড়ো!", একটু পরেই মায়ের এই চেনা, নাটকীয় মন্তব্য হালকা কানে আসে তিন্নির। "শহুরে মেয়ে, হেহেহে", নিজের মনেই এক শুকনো হাসি হাসতে থাকে সে। এই তকমাটা তার বেশ অনেকদিনেরই পাওয়া। প্রথমের দিকে তার খুব কষ্ট হলেও সে এটাকে বেশ ভালোই আপন করে নিয়েছে, অভ্যাসও বলা যেতে পারে। তার হাব-ভাব দেখে যে কেউই ভাববে কারোর প্রতি সে কোনো টান অনুভব করেনা।

অনুভূতিগুলো সত্যি-সত্যি না থাকলেই হয়ত ভালো হতো। কেউ তা আর জানতে পারেনা, ঠাম্মা যতবারই ফোনে তার সাথে কথা বলতে চায়, ততবারই তার বুকে চাপা পুরোনো পাথরটা নড়েচড়ে ওঠে; মনে হয় একবার তার ঠাম্মার গলার আওয়াজ পেলে, একবার যদি সে তার কাঁপা গলায় বলে ওঠে "বাবু, কতদিন আসিস নারে। একবার এই বুড়ি ঠাকুমাটার কথা কি তোর মনে পড়েনা? এত কিসের পড়াশুনা বলতো?", তক্ষুনি হয়তো ভেতরে চাপা আবেগগুলো একেবারে হাউমাউ করে বেরিয়ে আসবে, ভেঙ্গে পরবে তিন্নি সবার সামনে। মা বাবা ভাবে সে হয়তো তার শৈশবকে একদম ভুলে গেছে। কিন্তু তারা যে কতটা ভুল সেটা একমাত্র তিন্নিই জানে। ভুলতে যে সে কিছুই পারেনা! আর তাই বলেই তো যত সমস্যা। সে কি করে ভুলবে সেই দিনগুলো যখন বাড়ির সব ভাই-বোন মিলে একসাথে পুকুরে নামতো সাঁতার কাটবে বলে, কিভাবে মেজদা তাকে পিঠে চাপিয়ে সারা পুকুর এপার থেকে ওপার করে ঘোড়াত, কেমন করে মেজদির সাথে মেজদার ঝামেলা লেগে যেত প্রত্যেকবার এই ঠিক করতে গিয়ে যে লুকোচুরি খেলার সময় তিন্নি কার দলে থাকবে, কিরকম যত্ন করে টোটনদাদার বিয়ের সময় বড়দি আর মেজদি তাকে সাজিয়ে দিয়েছিল! কি সুন্দর করেই না বিকেল গড়াতে না গড়াতেই ঘরের বারান্দার সামনে আসর বসে যেত আড্ডার, আর সাথে চা, মুড়ি আর পাঁপড়! আহঃ, মনে হয় সব কিছু যেন কালকেই ঘটেছিল। তবে এই মনে হওয়াগুলো আজ পুরোটাই ভ্রম। এখন আর গ্রামের বাড়িটা আগের মতো নেই। বদলটা শুরু হয় সাত বছর আগে তার দাদু মারা যাওয়ার পর থেকে। তিন্নি তখন সবে ক্লাস ফাইভে, দাদুর সাথে ছোট থেকে কোনোদিনই সেই অর্থে কথা হয়নি, সে শুধু দেখেছে ওই বৃদ্ধ রুগ্ন চেহারাটা নিজের ঘরে বসেই সকালের কাগজ পড়ছে, দুপুরে ঘরেই খাচ্ছে; মোটামুটি সব কাজই একই ঘরে থেকে করতেন তিনি। কিন্তু তিন্নি প্রত্যেকবারই অবাক হয়ে যেত এটা দেখে যে এই অত্যন্ত বয়স্ক মানুষটাই কি পরিমাণ জীবন্ত হয়ে ওঠে বড়দাকে ইংরেজি পড়ানোর সময়!

দাদু মারা যাওয়ার পর তিন্নি যে প্রচন্ড দুঃখে কাতর হয়ে পড়েছিল তা নয়, কারণ তার সাথে দাদুর দূরত্বটা ছিল অনেকখানি। তবে শ্রাদ্ধতে গিয়েই তিন্নি আঁচ করতে পেরেছিল, বাড়ির পরিবেশটা বদলাচ্ছে। কাকু-জেঠু-পিসীদের মধ্যে জমি নিয়ে একধরণের জটিল বিবাদ শুরু হয়ে যায়। সে পুরো ঘটনা বুঝতে না পারলেও বড়দের কথা পাশ থেকে শুনে এটুকু বুঝেছিল দাদু মৃত্যুর আগে কোনো উইল না বানানোর ফলেই যত জটিলতার শুরু। বাবা কখনো মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করলেই বাকিরা বলে উঠত, "তুই কিকরে বুঝবি বলতো আমাদের পরিস্থিতি? তোকে তো আর আমাদের মতো এক-এক পয়সা খরচ করার আগে ভাবতে হয়না, তোকে তো আর নিজের মেয়ের পড়াশোনার সামান্য খরচের জন্য চিন্তায় চিন্তায় হন্যে হতে হয়না। তুই তো ন-মাসে ছ-মাসে এসে মায়ের কাছে ঘুরতে আসিস মাত্র।" কথাগুলো শুনে তিন্নির মন খারাপ হয়ে যেত।

এরপর যতবারই সে গ্রামে গেছে, সে শুধু দেখতে পেয়েছে কিভাবে আস্তে আস্তে সব সম্পর্কের সূক্ষ সুতোগুলোতে টান ধরছে, কি নিঃশব্দেই না সবার মধ্যে এক অপরিসীম দূরত্ব তৈরি হয়ে যাচ্ছে। তাও যতদিন তার দাদা-দিদির সঙ্গ পেত, অতটা খারাপও লাগত না তিন্নির। তবে তারাও যে বড় হচ্ছিল, আর সাথে সাথে মাথার মধ্যে ঢুকছিল জটিলতাগুলোও। কিছুদিন পরই মেজদি পড়াশুনার সুবিধার জন্য তার মামার বাড়ি চলে গেল, মেজদাও পলিটেকনিক পড়বে বলে চলে গেল দুর্গাপুর। বড়দিও আর তেমন ডাকাডাকি করতোনা। বড়দাও বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকতো, তাও মাঝে মধ্যে দেখা হয়ে গেলে একগাল হেসে তার সাথে পাঁচটা মিনিট কথা বলে যেত; ওই পাঁচ মিনিটের খোঁজ-খবর নেওয়াটা তিন্নির কাছে একটু সান্তনার মতোই লাগতো। ধীরে ধীরে মানুষজনে ঠাসা বাড়িটাও তার বড্ডো খালি খালি লাগতে শুরু করলো। সেই আনন্দ-হাসির জাদুমন্তরের চাদরটা যেন হঠাৎই কেউ নির্মমভাবে সরিয়ে নিয়েছিল। কতদিন দুপুরে যে পুকুরপাড়ে একা বসে তিন্নি চোখের জল ফেলেছে, তার হিসাব সে নিজেও রাখেনি। ঠাম্মার হাতে বানানো সেই সবচেয়ে সুন্দর আঁচারও যেন তার স্বাদ হারিয়ে ফেলছিল তার কাছে। দাদু মারা যাওয়ার পর থেকে যতবার সে বাড়ি গেছে, ততবারই যেন তার সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতিগুলোর মাঝে অন্ধকার ছেয়ে যেত। তাই বোধহয় সে আস্তে আস্তে গ্রামে যাওয়া কমিয়ে দিল, আর একটা সময়ের পর তা বন্ধই হয়ে গেল একেবারে।

তিন্নি বড্ডো ভীতু। সে আসলেই ভীষণ ভয় পেয়েছিল; ভয় পেয়েছিল তার শৈশবের শ্রেষ্ঠ কিছু আনন্দঘন মুহূর্তের স্মৃতির ঘরেতে বাস্তবের আগুন লেগে যাওয়ার!

তবে তার সব দুঃখ, ভয়ের খবর শুধু তার মনই রাখে। তাই তার এতটুকুও অসুবিধা হয়না তার অর্জন করা ওই তকমাটাকে বজায় রাখতে।

"উফফ! বড্ডো আলো এই ঘরটাতে। চোখে লাগছে যে। অন্ধকার চাই, অন্ধকার!", সবসময়ের মতো আজও সবার নজর ফাঁকি দিয়ে সে দু-চোখের জল নিজেই মুছলো।

বই-খাতা বন্দ করে দিয়ে তিন্নি তখন বসে পড়ল কম্পিউটারের সামনে। নীল পর্দায় চলছে "ফেসবুক"। তাই তো চলার কথা। "শহুরে মেয়ে"রা কি আর চোখের জল ফেলে নাকি বসে বসে? তারা তো একগুঁয়ে, বড্ড জেদি, কারোর কথা শোনেনা, তারা তো শুধু ফেসবুক, হোয়্যাৎসাপ খুলে চ্যাটিং করে, ঘন্টার পর ঘন্টা ফোন ঘেটে সময় নষ্ট করে, নিজস্বী তুলে অন্যদের দেখাতে ব্যস্ত থাকে। আসল সুখ কি তারা তো কিছুই বোঝেনা!


"সত্যিই, আসল সুখ কি তা বোধহয় আর বোঝা হলোনা...", বলতে বলতে তিন্নি চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়; আর দৃষ্টি, সেই ভার্চুয়াল দুনিয়ার অনন্ত গহ্বরে।।


Rate this content
Originality
Flow
Language
Cover Design