Sanghamitra Roychowdhury

Romance


Sanghamitra Roychowdhury

Romance


ওগো মোর নন্দিনী

ওগো মোর নন্দিনী

12 mins 1.8K 12 mins 1.8K

হোটেলের দরজা খুলতে অস্বস্তি হচ্ছিল মৃত্তিকার। যা শুনেছে তারপর...দরজা খুলেই... সামনে রুম সার্ভিসের বাচ্চা বাচ্চা মুখের ছেলেটিকে দেখে যেন খানিকটা স্বস্তি পেলো মৃত্তিকা। ছেলেটি ওদের ডিনার নিয়ে এসেছে। ছেলেটির সাথে সাথেই ঘরে ঢুকে এলো হাড়কাঁপানো বরফ শীতল হাওয়ার দমক। রুম হিটারের গরমের ওম যেন মূহুর্তে বিদায়!

দরজা খুলে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে মৃত্তিকা ছেলেটিকে ঘরের ভেতরে ঢোকার জায়গা করে দিলো। ছেলেটি সেন্টার টেবিলের ওপরে ট্রেটা নামিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে দিলো খাবার দাবারের পাত্রগুলো। আর জলের জাগ, কফিপট এগুলো রাখলো সোফার পাশের কাবার্ডটার ওপরে। তারপর একমুখ হেসে আর কিছু লাগবে কিনা জানতে চাইলো। মৃত্তিকা ঘাড় নেড়ে না বলাতে ছেলেটি টানমাখানো ভাঙা বাংলায় বললো,

"সালাম, খানা ঠান্ডি হয়ে যাবে, উনকো নিঁদ সে ডেকে চটপট খেয়ে লিন। অওর খানাপিনা হলে বেল বাজিয়ে দিবেন, নেহিতো রিসেপশনে ফোনে বলিয়ে দিবেন। হামি আসিয়ে উও সব বর্তন ওর্তন লিয়ে লিবো।"


মৃত্তিকার ভারী কৌতূহল হোলো! জম্মু থেকেও পাঁচ-ছ ঘন্টার পথদূরত্বে প্রায় অপরিচিত ছোট্ট জনপদ পাটনিটপে এই ছেলেটি বাংলা শিখলো কি করে? জিজ্ঞেসই করে ফেললো মৃত্তিকা। কাশ্মিরী ছেলেটি জানালো ওর চাচার সাথে বছর তিন-চারেক ও কলকাতায় থেকেছে কাশ্মিরী শালের ধান্দায়। তখনই শিখেছে বাংলা। এখন বাবা-মায়ের বয়স হয়েছে, ঘরে জোয়ান বোন, তাই ফিরে এসেছে গাঁয়ে। পাটনিটপেই হাঁটা পথে ওদের বাড়ী। হোটেলে কাজ করে বাড়তি হয়ে যাওয়া খাবারদাবার, আর মাইনের সাথে উপরি জোটে বেড়াতে এসে হোটেলে ওঠা লোকজনের কাছ থেকে পাওয়া বখশিশে ওদের বেশ চলে যায়। ওর বাবাও আপেল বাগানে পাহারাদারির কাজ পায় মাঝে মাঝে। আর ওর নাম আদিল। বিকেলের কফিমগগুলো নিয়ে মিষ্টি হেসে ছেলেটি চলে যেতে যেতে আবার ঘুরে দাঁড়ালো। তারপর বললো,


"অওর এক বাত, দরওয়াজা অন্দর সে আচ্ছা সে বন্ধ করিয়ে দিন, রাত মে জংলী জানোয়ার বাহার হয়।"


মুচকি হেসে ঘাড় নেড়ে মৃত্তিকা "হ্যাঁ" বললো।


ওদের এই রিসর্টটার একদিকে তিনতলা বিল্ডিং-এর হোটেল। যেদিকে ওরা আছে, পেছনদিকে খাদ বরাবর ঘন জঙ্গল। নানারকম গাছপালা--মৃত্তিকা অতশত গাছ চেনে না। হোটেল বিল্ডিংটার উল্টোদিকে সার সার হানিমুন কটেজ, খুব খরচবহুল। তাই ওরা হোটেলেই রয়েছে, বেশ অনেকগুলো দিন থাকার ব্যাপার যখন। ছেলেটি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলে মৃত্তিকা দরজাটা লক করে দিলো। দরজার সামনে থেকে সরে আসার সময় আবার একবার ভীরু দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকালো। একটু দুশ্চিন্তাও হোলো, মনে মনে ভাবলো এমন একটা জায়গায় এতদিনের জন্য থাকতে আসা হয়তো ঠিক হয় নি। পরক্ষণেই ভাবলো এছাড়া আর কি উপায়ই বা কি ছিলো?


মৃত্তিকা ওর বেটার হাফকে ডাকলো খেতে। এখনো ও অনেক ক্লান্ত। ডাক্তারের পরামর্শ মতো ওর এখনো অনেক বিশ্রাম দরকার। ধকল তো ওর.....মানে ওদের ওপর দিয়ে কম যায় নি! তবে ডাক্তার বলেছেন এই সময়ে ওদের একটু নিরিবিলি স্বাস্থ্যকর জায়গাতেই থাকা ঠিক হবে। শুধুমাত্র ওরা দু'জনেই থাকবে, আর কোনো চেনা পরিচিত সেখানে না থাকাই ভালো।একরাশ লাগেজপত্র, প্রায় মাসদেড়েকের জন্য দরকারি অদরকারি যাবতীয় জিনিসপত্রে ঠাসা সে সব। আর আছে ওর বেটার হাফের ওষুধপত্র। তার আঁকাআঁকির সরঞ্জাম, ওর নিজের কাজের জিনিসপত্র, ল্যাপটপ, গাদাকখানেক ফাইলপত্র।


সত্যিই আদিল ছেলেটি ঠিকই বলেছে, খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে। খুব আস্তে আস্তে ডাকলো ওকে, মানে নন্দনকে--- মৃত্তিকার বেটার হাফ। ডাক্তাররা বলেছেন শরীরে মনে পুরো মানিয়ে নিতে ওর এখনো অনেকটা সময় দরকার। মৃত্তিকা একেবারেই তাই চায় নি নন্দনের এই ক্রিটিক্যাল সময়ে, মনের দোলাচলের ক্রাইসিসের দিনগুলোতে চেনাশোনা গন্ডীতে থাকতে। তাই কলকাতা থেকে এই এত দূরে এসে থাকার সিদ্ধান্ত। তাছাড়া নন্দনের শরীরের ওপর দিয়ে রীতিমতো ঝড় গেছে, ওষুধ, ইঞ্জেকশন, সার্জারির ঝড়ই বটে। তাছাড়া ঠান্ডাতে শরীর সেরেও ওঠে তাড়াতাড়ি। মনটা শক্ত হওয়া সবচেয়ে বেশী দরকার। মৃত্তিকা যত দ্রুত যেকোনো পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে পেরেছিলো বা পারে, নন্দন তত দ্রুত হয়তো পেরে উঠছে না। তাই এইসব ব্যবস্থা, এই পরিবেশ, এই আবহাওয়া নন্দনের জন্য উপকারীই হবে এই বিশ্বাস নিয়েই মৃত্তিকা এখানে চলে এসেছে। দ্বিতীয়বার আর ভাবে নি। এছাড়া এই মূহুর্তে ওদের দু'জনের ঐ কিছু বন্ধু বান্ধব, চেনা পরিচিত প্রতিবেশী ছাড়া আপনজন বলতে তো কেউ নেইও তেমন।


ওষুধের ঘোরে ঘুমোচ্ছে নন্দন, কিছু খেতে চাইলো না। মৃত্তিকা নন্দনকে আবার ডাকলো, ধীরে ধীরে চোখ মেলেছে নন্দন। কলকাতা থেকে এখানে পৌঁছতেও অনেক ধকল হয়েছে। কলকাতা থেকে ফ্লাইটে দিল্লীতে ব্রেক করে জম্মু, তারপর গাড়ীতে এতটা রাস্তা। গতকালই সবে পৌঁছেছে। সব মিলিয়ে এখনো নন্দন বড্ড ক্লান্ত, বড্ড অবসন্ন। মৃত্তিকা নন্দনের প্রায় কানের কাছে মুখ এনে খুব আস্তে আস্তে বললো,

"একটু স্যুপ খেয়ে নে, সোনা। একটু উঠে বোস, পিঠটা বালিশে হেলান দিয়ে। এইতো দেখি, এইতো।"


পরমযত্নে নন্দনকে বসালো মৃত্তিকা, তারপর একটু একটু করে গরম চিকেন স্যুপটা খাইয়ে দিলো নন্দনকে।

"টয়লেটে যাবি?"


জিজ্ঞেস করলো মৃত্তিকা। নন্দন খুব ধীরে ঘাড় নাড়লো। মৃত্তিকা ওকে ওষুধ খাইয়ে আবার ধরে ধরে শুইয়ে দিলো। ভালো করে চাপা দিয়ে বড় আলোটা নিভিয়ে দিলো মৃত্তিকা। তারপর বেডসাইড টেবিল ল্যাম্পের শেডটা কাত করে ঐ আলোতেই নিজেও খেয়ে নিলো যাহোক! বেশীর ভাগটা পড়েই রইলো। হাতমুখ ধুয়ে মৃত্তিকা বেল বাজালো।

কিছুক্ষণের মধ্যেই আদিল এসে হাজির। মৃত্তিকা বললো,


"এক্সট্রা হয়ে গেছে খাবার, হাতই দেওয়া হয় নি।"


আদিল হেসে রুটির ফয়েল প্যাকটা আর কিছু একটা ড্রাই কারির প্যাক বোধহয় ছিলো, ওগুলো জোব্বার পকেটে রাখলো। তারপর বাকি অবশিষ্ট খাবার দেখিয়ে হেসে বললো,

"দুটা কুত্তা আছে, গেটের বাহারে, উসকো মজা আ জায়েগা, আজ বহোত খানা মিলবে উদের।"


কাল থেকে আদিলের এই ভাঙা বাংলা ছাড়া এখনো একটাও বাংলা শব্দ শোনে মৃত্তিকা। বাংলা ওর ভারী প্রিয়, নন্দন যে কখন থেকে আবার স্বাভাবিক ভাবে কথাবার্তা বলবে! কবে যে ওরা আবার পুরোনো ছন্দে ফিরবে! খুব একা লাগছে মৃত্তিকার।

নন্দন আবার ঘুমিয়ে পড়েছে, ওষুধের ঘোরে আজকাল ওর ঘুম খুব গাঢ় হয়। আবার কি ও রাতের পর রাত জেগে অনবদ্য সব শিল্প সৃষ্টি করতে পারবে? ওর ট্রিটমেন্ট চলাকালীন ওর কয়েকটা ছবি বেশ চড়া দামে বিক্রি হয়েছে। তার থেকে যা টাকা হাতে এসেছে তাতেই চলছে সব খরচাপাতি। মৃত্তিকাকেই সব হিসেব রাখতে হয়। সৃষ্টির বাইরের ব্যাপার স্যাপারে নন্দন আশ্চর্য রকমের উদাসীন। কোনো চিন্তাতেই মৃত্তিকা এই মূহুর্তে স্থির নয়, মনটা চঞ্চল হয়ে রয়েছে। হঠাৎ করেই ওর মনে পড়লো হোটেলের রিসেপশন থেকে বেয়ারা, সবার মুখেই তো জংলী জানোয়ারের ভয়ের কথা শুনলো, শুনে ভয়ও পেলো। কিন্তু এখন ওর মনে হচ্ছে জংলী জানোয়ার আসবে কোন পথে? এবারে মৃত্তিকা ভাবতে বসলো।


ওরা হোটেলের একতলার পেছনের দিকের অংশে আছে। ওদের ঘরের সামনে দিয়ে টানা লম্বা করিডোর। করিডোরের দু'পাশেই পরপর ঘর। করিডোরের একপ্রান্তে সিঁড়ি, ওপরে ওঠার, আর এক প্রান্তে তিনধাপ নেমে রিসেপশনের সামনে ছড়ানো চওড়া চাতাল। ঐ চাতালের মুখোমুখি রিসর্টে ঢোকার মেন গেট, অনেকখানি বাঁধানো রাস্তা পার করে। রাস্তার ডাইনে কারপার্কিং আর বাঁয়ে হোটেলের কিচেন, কমিউনিটি ডাইনিং হল কাম রেস্তোরাঁ আর ছোট্ট একফালি শপিং আর্কেড। প্রথমদিনে এসেই মৃত্তিকা এগুলো জরিপ করে নিয়েছে। তাহলে এইদিক দিয়ে জংলী জানোয়ারের পক্ষে আসা সম্ভব কি? ভাবলো, দূর! ফালতু ভয় দেখাচ্ছে! তবে ফালতু ভয় দেখিয়ে ওদেরই বা লাভ কি? সকালে বরঞ্চ একবার বেরিয়ে আশপাশটা ভালো করে দেখবে। ঘরটা বেশী গরম হলে নন্দনের কষ্ট হতে পারে। তাই রুম হিটার বন্ধ করে মৃত্তিকা কম্বলটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়লো, ঘুমও পেয়েছিলো ওর খুব। বাইরে শেষ নভেম্বরের নিশুতি পাটনিটপ হাড়হিম করা শীত চাদর জড়িয়ে, আর হোটেলের ঘরে ঘরে এক একটা আলাদা আলাদা পরিবার। ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগে মৃত্তিকার মনে হোলো হয়তো ওদেরও একদিন পরিবার হবে, নিজেদের, একেবারে নিজস্ব পরিবার!


বোধহয় ভোর হয়ে এসেছে, এরকম সময় মৃত্তিকার ঘুম ভেঙে গেলো। নন্দন খুব আস্তে আস্তে ডাকছে। ধড়মড়িয়ে উঠে বসলো মৃত্তিকা, নন্দন বলছে,

"কিসের আওয়াজ?"

প্রথমে মৃত্তিকা ভাবলো নন্দন বুঝি ঘুমের ঘোরে ভুল বকছে। অপারেশনের পরে গত কিছুদিনের মধ্যেই বেশ কয়েকবার হয়েছে এরকম। ভাবতে ভাবতেই মৃত্তিকা শুনতে পেলো স্পষ্ট খরখরে আওয়াজ, বাথরুমের পাশে ব্যালকনিতে যাবার দরজাটার দিক থেকে, মনে হচ্ছে ঐ দরজাটার বাইরেই। এবার মৃত্তিকার মাথায় ধাঁ করে খেলে গেলো---আরে! এই ব্যালকনিটা তো হোটেলের একেবারে পেছনের দিকে, হোটেলের সীমানার বাইরেই তো খাদ বরাবর জঙ্গল অর্থাৎ জংলী জানোয়ার আসে, এই পথেই।


দরজা ভালো করে বন্ধ আছে। মৃত্তিকা নন্দনকে বললো,

"কই, কিছু না তো!"

তবে মৃত্তিকার মনটা খচখচ করতে লাগলো, কী জানোয়ার হতে পারে?

নন্দন আবার অকাতরে ঘুমিয়ে পড়েছে। মৃত্তিকার আর ঘুম আসছে না। পাশ ফিরে একবার নন্দনের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকালো মৃত্তিকা।

অনেক মাস পেরিয়ে বছর কয়েক পেছনে চলে গেছে মৃত্তিকা। ওদের এই সম্পর্কটার জন্য ওরা দু'জনেই কত না অশান্তি, কটাক্ষ, কটূক্তি, উপহাস, বিদ্রূপ এমনকি থ্রেটনিংও সহ্য করেছে। হাতেগোনা মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছে, দূরে সরিয়ে দিয়েছে বেশীর ভাগ জনই, এমনকি জন্মসূত্রে পাওয়া নিজেদের পরিবার স্বজন পরিজন পর্যন্ত।

সবাই তো একছাঁচে ঢালা হবে না, প্রত্যেক মানুষের স্বাতন্ত্র্য থাকবে, আর সেটা অস্বাভাবিকও কিছু নয়।

কিন্তু এই সমাজ ব্যতিক্রমী স্বতন্ত্র জীবন যাপন ও বিশ্বাসে ভর করা মানুষজনকে কিছুতেই সহজ ভাবে মেনে নিতে পারে না। তাই তো নামজাদা ব্যস্ত মডেল মৃত্তিকা পুরুষ সম্পর্কে অনাগ্রহী, এই কঠিন সত্যটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কিছুতেই মেনে নিতে পারলো না। না ঘরে, না বাইরে। মৃত্তিকার নিজের বিন্দুমাত্র জড়তা নেই স্বীকার করতে যে ও একজন লেসবিয়ান! আর এই স্বীকারোক্তিই ওকে বিচ্ছিন্ন করে দিলো, ঘর-পরিবার, এমনকি কাজের জায়গা থেকেও। এলজিবিটি গ্রুপ থেকেই মৃত্তিকার পরিচয় নন্দনের সাথে।


নন্দন.....নামকরা চিত্রকর--- দেশ বিদেশে যার পরিচিতি ছড়াতে শুরু করেছে। এরকম একটা সময়ে নন্দনের ব্যক্তিগত জীবন সামনে চলে এলো। নন্দনের নাকি মেয়েদের প্রতি আগ্রহ নেই, এমনকি তার নাকি আইডেন্টিটি ক্রাইসিসও রয়েছে। যথারীতি পাশ থেকে পরিবার, আত্মীয়, বন্ধু সব নিরাপদ দূরত্বে সরে গেছে। একলা কাজে ডুবতে চেয়েছে, সেখানেও সেই বিশ্রী অযাচিত কৌতূহলের শিকার। প্রায় মানসিক ভারসাম্য হারানোর অবস্থা। মৃত্তিকার সাথে পরিচয় তখনই। মৃত্তিকা ডাকসাইটে মডেল..... পুরুষে যার রুচি নেই! বাধ্যই হয়েছিলো মৃত্তিকা একরকম মডেলিং ছেড়ে ড্রেস ডিজাইনার হিসেবে নিজস্ব ক্লোদিং লাইন নিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে। পাশে কিছু সমকামী এবং রূপান্তরকামী কয়েকজন বন্ধুকে পেয়েছিলো শুধু। তবে মনের জোরে মৃত্তিকা জয় করেছে প্রতিকূলতা। আর ছিলো নন্দন..... পুরুষ শরীরের খাঁচায় কোমল নারীমনের সত্যিকারের বন্ধু!


এরপর ভয়ঙ্কর সব মূহুর্ত! নন্দনের ভেতরের নারীস্বত্তা আর বাইরের পুরুষের চেহারা, কিছুতেই নন্দন ব্যালান্স করতে পারছিলো না। এইসময় মৃত্তিকাও সমস্ত অন্তঃকরণ দিয়ে নন্দনের পাশে দাঁড়ালো। মৃত্তিকাও পর্যুদস্ত হয়েছিলো, শরীরে-মনে। তার ওপর সেলিব্রেটি হওয়ার বিড়ম্বনা। একত্রিত হোলো দুই রূপান্তরকামী।

মৃত্তিকার ভেতরের পৌরুষস্বত্তা চায় কোনো নারী শরীরকে মথিত করতে। আর নন্দনের ভেতরের নারীত্ব চায় কোনো প্রেমী পুরুষ শরীরের কাছে মথিত হতে। প্রকৃতির কী বিচিত্র খেয়ালে কতশত জীবন! তাদেরকে অস্বাভাবিকতা আর অবৈধতার তকমা দিয়ে সমাজ সংসার তাদের জীবন ওলটপালট করে দিয়েছে। গতানুগতিকতার বাইরের এইসব মানুষগুলোর আন্দোলনের ফলে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আমূল সংশোধিত হোলো সংবিধানের ৩৭৭ ধারায়। স্বীকৃতি পেল সমকামিতা অন্যায় নয়, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ গণ্য হোলো মানুষ হিসেবে, খাতায় কলমে অন্তত! এলজিবিটি লড়াই পায়ের তলায় শক্ত মাটি পেলো। রূপান্তরকামী মানুষগুলোর মধ্যে স্বনির্ভর, স্বচ্ছল যারা ছিলো তাদের একাংশ এগোনোর বাড়তি ভরসা পেলো লিঙ্গ পরিবর্তনের জটিল ও ব্যয়বহুল অস্ত্রোপচারের জন্য।


মৃত্তিকা আর নন্দন দু'জনেই রূপান্তরকামী। নারী থেকে পুরুষ..... মৃত্তিকা থেকে মৃত্তিকাংশু, মনে তো পুরুষ ছিলোই, আপাতত শরীরেও। নন্দন মনে নারী..... দেহে পুরুষ। নন্দন অনেক লড়াই, একাধিক অপারেশনের ধকল, ঘরে-বাইরে যুদ্ধ অতিক্রম করে আজ নন্দিনী, হ্যাঁ নন্দিনী, মৃত্তিকাংশুর নন্দিনী।


ভারী পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে কাঁচের জানালার উপর ঝলকানো দিনের আলো। মৃত্তিকা পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো নন্দনের দিকে......না!আর নন্দন নয় নন্দিনীর দিকে। ওর ফর্সা মুখে ফোলা ফোলা লালচে ঠোঁট, লোমহীন মসৃণ ত্বক, কম্বলের ওপর দিয়েই সামান্য স্পষ্ট বুকের উপত্যকা, বালিশের ওপর ছড়িয়ে থাকা কুচকুচে কালো ঢেউ খেলানো চুল। খুব সুন্দর দেখাচ্ছে নন্দিনীকে। নাহ্, আর শুয়ে থাকা যাবে না, বেলা হয়ে যাচ্ছে, নন্দিনীকে ওষুধ খাওয়াতে হবে, চা ব্রেকফাস্টের সময় হোলো। রিসেপশনে ফোন করতে হবে।

চটিটা পায়ে গলাতে গলাতেই মৃত্তিকার মনে পড়লো কাল রাতের ঐ খড়খড়ে আঁচড়ানোর আওয়াজ। ও গায়ে শালটা চাপিয়ে ব্যালকনির দরজাটা খুলে চমকে গেলো। কী অপরূপ দৃশ্য, ঘন সবুজ ঠাসাঠাসি গাছের জঙ্গলের ফাঁকফোকর দিয়ে সূর্য উঁকি দিচ্ছে। উজ্জ্বল আলোর ছটা কারিকুরি করছে হোটেলের পেছনের দিকের কম্পাউন্ডে ছড়ানো ঘাসের গালিচায় জমে থাকা শিশিরের বিন্দুতে। হীরের কুচির মতো ঝকঝক করছে টলটলে শিশিরবিন্দু। মৃত্তিকা বুঝলো এই ব্যালকনিতে ওর নন্দিনীকে বসিয়ে দিতে হবে রঙ তুলি ক্যানভাস ইজেল দিয়ে। সৃষ্টিতে ফিরতে পারলেই ওর নন্দিনী নিজেকে মানিয়ে গুছিয়ে সামলে নিতে পারবে।


মৃত্তিকা ফোনে রিসেপশনে চা ব্রেকফাস্ট দেওয়ার কথা বলে দিলো। তারপর নিজে বাথরুমের কাজকর্ম সেরে তৈরী হয়ে নিয়ে জাগিয়ে দিলো নন্দিনীকে---ডাকটা এখনো পুরো অভ্যেস হয় নি, দু'জনেরই। আজ নন্দিনীকে অনেক ফ্রেশ দেখাচ্ছে, ঠোঁটে মৃদু হাসির রেখা। মৃত্তিকা সাহায্য করতে চাইলে বললো,

"একটু চেষ্টা করি, একা একা।"


ওদের কথার মাঝেই চা ব্রেকফাস্ট এসে গেছে। এখন একটি অন্য ছেলে। ওদের শিফ্টিং ডিউটি। আদিল বোধহয় ওবেলা আসবে। নন্দিনী বাথরুম থেকে বেরিয়েছে, আকাশী নীল এই হাউসকোটটায় ওকে খুব স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। তবে ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ও এখনো যথেষ্ট ক্লান্ত, বেশ দুর্বল। মৃত্তিকাংশু সোফায় বসিয়ে দিলো নন্দিনীকে ধরে। নন্দিনীর পরপর ওষুধ আছে। চা ব্রেকফাস্টের আগে ও পরে। এখনো স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে সময় লাগবে। যত্নে মৃত্তিকাংশু কোনো ত্রুটি থাকতে দেবে না, শপথ করে নিয়েছে। মৃত্তিকা থেকে মৃত্তিকাংশু হয়ে ওঠার পথে নন্দন ঠিক এভাবেই ওর সঙ্গে ছিলো। নন্দনকে নন্দিনীর রূপে সাবলীল করে তুলতে তাই আজ মৃত্তিকাংশুর ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

আজ ওরা ব্যালকনিতে এসে বসলো বেতের চেয়ারে। প্রকৃতির এই চোখ জুড়ানো রূপে নন্দিনী মুগ্ধ। ওর মায়াবী চোখ দুটো শুষে নিচ্ছে প্রকৃতির রূপ। হাজার হোক শিল্পী মানুষ। এরপর ধীরে ধীরে ওদের রুটিন হোলো ব্রেকফাস্টের পরে ব্যালকনিতে বসা। নন্দিনী সেদিন বসে বসে স্কেচ করছিলো, দূরে একজোড়া বনবেড়াল, মূহুর্তের মধ্যে ঢুকে গেলো জঙ্গলের আরও গভীরে। মৃত্তিকাংশুও দেখেছে। দু'জনেই একমত যে এই বনবেড়াল দম্পতিই নির্ঘাত ওদের ব্যালকনির দরজায় রাতে খড়খড় করে আঁচড়ায়। দু'জনের মনেই হাজারো চিন্তায় আর ফেলে আসা দিনের স্মৃতির টুকরো টাকরায় তোলপাড় ঢেউ ভাঙা চলছে।


খুব ধীর লয়ে ওরা ওদের নতুন জীবনে অ্যাডজাস্ট করছে। ওদের এই নতুন নামকরণও করেছে ওদের ডাক্তার, আর ওদের ঘনিষ্ঠ সহমর্মী বন্ধুরা এবং এলজিবিটি গ্রুপের কোলকাতা শাখার কর্ণধার, সকলে মিলে। ওদেরও বেশ লেগেছে এই নাম। কোলকাতায় ফিরে ছোট্ট একটা রিসেপশনের প্ল্যানিং আছে। রেজিস্ট্রেশনের দিনই কথা হয়ে গিয়েছিলো। ওরাও ঠিক করেছিলো এইসব ঝক্কির মাঝপথে আর অন্য কোনো কিছুতেই মন, অর্থ বা সময় ব্যয় করবে না। সেই মতোই এগোচ্ছে ওরা। এতো দীর্ঘ কষ্টকর এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় এক-আধ বার ভেবেছে, সিদ্ধান্তে ভুল হোলো না তো? তারপর আবার শরীরে মনে শক্তি সঞ্চয় করেছে। মৃত্তিকা ল্যাপটপে ওর ক্লোদিং লাইনের ব্যবসার হিসেবপত্র মেলাচ্ছে আর নন্দিনীর অভ্যস্ত তুলির টানে ফুটে উঠছে বনবেড়াল দম্পতির মিলনদৃশ্য। মৃত্তিকার চোখ আটকালো নন্দিনীর ক্যানভাসে। অপূর্ব!


ওরা মোটামুটি এখন ওদের পুরোনো চেনা ছন্দে ফিরছে। এখন সকাল বিকেল একটু হেঁটে বেড়ায় পাটনিটপের চড়াই উৎরাইতে। একদিন আদিল ওদের আপেল বাগান দেখিয়ে এনেছে। গাড়ীতে ফেরার পথে এক বাঘরোল পরিবার, সদ্যোজাত ছানাদের চেটে পরিষ্কার করছে মা'টি, রাস্তা জুড়ে বসে প্রায়। আর বাবা'ই হবে বোধহয়, অন্য বেশ তাগড়াই বাঘরোলটি গম্ভীর চালে পায়চারী করছে। ওরা প্রাণ খুলে হেসে ফেললো। আদিল তখন বলে যাচ্ছে,

"ইয়ে সব জানোয়ার ইধার বহোত আছে। অওর দুসরাওয়ালা ভি আছে। রাত মে ইয়েলোগই হোটেল মে আসিয়ে যায়। পিছওয়াড়ে কা জঙ্গল সে!"

ওরা ততক্ষণে মোবাইল ক্যামেরাতেই অনেক ছবি তুলে ফেলেছে। নন্দিনী খুব ভালো সাবজেক্ট পেয়ে গেলো ক্যানভাসে ফোটানোর জন্য।


ওরা আরও হয়তো কয়েকটা দিন থাকবে পাটনিটপের এই হোটেলে। দু'জনে ব্যালকনিতে বসে দু'চোখ ভরে প্রকৃতির রূপসুধা পান করছিলো চুপচাপ। দু'জনের মনেই হয়তো চলছে অব্যক্ত কথার ঝড়। এই যে দীর্ঘ সময় ধরে ওদের একান্ত কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর প্রক্রিয়া চললো, এতো আন্দোলন, এতো উৎকণ্ঠা, এতো খরচ, এতো আয়োজন-বিয়োজন...... কিন্তু তারপরে ওরা আর সমকামী রইলো কোথায়? ওরা তো এখন স্বেচ্ছায় রূপান্তরিত বিপরীতকামী!


ওদের পাটনিটপের মেয়াদ আর মাত্র দু'দিন। দেখতে দেখতে দু'মাস পার! ওরা এখানে থাকাটা আরো দু'সপ্তাহ বাড়িয়ে নিয়েছিলো। জায়গাটা ভালো লেগে গেছে ওদের। একটু একটু করে গোছগাছ সারছে। আদিল ওদের সাহায্য করছে খুব, ছেলেটার ওপর একটা মায়া পড়ে গেছে। ওকে একটু বেশী করেই বখশিশ দিয়ে যাবে ঠিক করেছে। আদিল ওদের ডিনারের বাসনপত্র নিতে এসে জানালো যে সেদিন "পূরণমাসী" মানে পূর্ণিমা। ঘরের ভেতরের আলো নিভিয়ে ওরা কাঁচের জানালার পাশে দু'জনেই চেয়ারে বসে। ভরা পূর্ণিমার চাঁদের ফটফটে আলোয় জঙ্গল ধুয়ে যাচ্ছে। সম্পূর্ণ আলাদা, দিনের আলোয় জঙ্গলের থেকে। ঘন সবুজ বনরাজি এখন গাঢ় কালচে নীল। ওরা নীরব দু'টি মূর্তির মতো মোহিত হয়ে কতক্ষণ বসেছিলো জানে না ওরা। ওদের যেন চমক ভাঙলো ব্যালকনির দরজায় খড়খড়ে আঁচড়ানোর আওয়াজে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ওরা দু'জনেই একসাথে কাঁচের জানালায় মুখ ঠেকিয়ে দেখতে গেলো।


দু'জনেই শুনতে পাচ্ছে দু'জনের ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ, আর পাচ্ছে উত্তপ্ত শরীরের স্পর্শ। বাইরে চাঁদের আলো, ছড়ানো জঙ্গল আর জংলী জানোয়ার দম্পতিই হবে....... এদের সাক্ষী রেখে অন্ধকার ঘরে প্রথমবারের জন্য মিলিত হোলো রূপান্তরিত দম্পতি। ধীর থেকে উদ্দাম, শান্ত থেকে উত্তাল, অপূর্ণ থেকে পূর্ণ। সে মিলনের একমাত্র জীবন্ত সাক্ষীরা হয়তো অনুভব করছিলো কিছু। তাই মাঝে মাঝেই থামছিলো ঘরের বাইরে তাদের দরজায় আঁচড়ানোর আওয়াজ, তখন রূপান্তরিত স্বত্তাদুটিও যে ঘরের ভেতরে একান্তে মিলনক্লান্তির অবসন্নতায় নিচ্ছিলো ক্ষণিকের বিরতি।

"ওগো মোর নন্দিনী....."


মৃত্তিকাংশুর ঠোঁটে আঙুল রেখে ওকে চুপ করিয়ে দিলো নন্দিনী। গভীর আশ্লেষে মৃত্তিকাংশুর সূক্ষ্ম রোমশ বুকে নন্দিনী মুখ গুঁজে শুলো পরম নির্ভরতায়, নিশ্চিন্তে, শান্তিতে। ব্যালকনির দরজায় শুরু হয়েছে আবার জংলী জানোয়ারের খড়খড়ে আঁচড়ানোর আওয়াজ। দেওয়ালে ঘড়িটার টিকটিক শব্দ.......জানান দিচ্ছে জীবন চলমান।


Rate this content
Originality
Flow
Language
Cover Design