Debasmita Ray Das

Action Drama


Debasmita Ray Das

Action Drama


শুটার

শুটার

7 mins 18.3K 7 mins 18.3K

ভিড়ের মধ্যে চট করে মিশে গেল অভ্র, ঠিক যেমন কথা হয়েছিল। চেহারাটা তার খুব সাধারণ নয়, কিন্তু আজ সেটা বানিয়ে নিয়েছে নিজের কেরামতিতে। চুলের ধরণ একটু পালটে একটু গোঁফ দাড়ি.. ব্যাস্ শুধু হাইটটাই যা একটু সমস্যা।

একটু ইনট্রো দেওয়া হোক। নাম অভ্র মুখার্জী। পেশায় প্রফেশনাল কিলার। ফোন আসে জায়গা বলা হয়, সাথে ছবিও। আর্মস সাপ্লাই এরাই করে। শার্কস আই নামে একটি গুপ্ত এজেন্সি, ফোন ও ওখান থেকেই আসে। কাজ শেষের পর তার হোটেলে পৌঁছে যায় টাকা। এই ফোনটা আসে গতকাল। একেক সময় একেক শহরে। এখন সে পুনে শহরে। লাস্ট টার্গেট ছিল শহরের একজন বিগ শট বিজনেসম্যান।

লাইনটা সোজা না হলেও কিছু এথিক্স ফলো করে অভ্র। সেকথাও এজেন্সিকে বলাই আছে। কোনো বৃদ্ধ বা ছোট বাচ্চা যেন এই লিস্টে না থাকে। হলে সে ওই কাজ করবে না। নিখুঁত নির্ভুল কাজ তার, তাই এজেন্সি মেনে নিয়েছে। আজ পাঁচ বছর ধরে সে এই লাইনে। এখন তো সব রুলস ও মুখস্থ। এজেন্সির ও বেশ কিছু নিয়মকানুন আছে। সেগুলো অভ্র হুবহু মেনে চলে। যেমন কল এলে সেটা কোথা থেকে আসছে তাই নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা জানার চেষ্টা করা যাবে না। দুটো কাজের মধ্যে বেশ কিছুটা সময় ও পায় সে। তাই বেশ নিশ্চিন্তেই ঘুমিয়ে পড়েছিল অভ্র। রাত দুটো নাগাদ হঠাৎ তার ফোনটা বেজে উঠল। সাথে সাথেই তার ফোনে ভেসে উঠল ছবি। দু মিনিটের জন্য তার শ্বাস বন্ধ হয়ে এল। এ কার ছবি!! ব্রাউন কার্ল সামনে দিয়ে তেরছা ভাবে ছবিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে নিকিতা জোশী। অভ্রর কলেজ সহপাঠিনী। যেমন পড়াশনায় তেমনি ছিল দেখতে!! জায়গা দার্জিলিং।

এইবার অর্কর অবাক হওয়ার পালা! সে তো থাকতো দিল্লী তে। অভ্রর পড়াশনাও ওখানেই। তারপর অনেক ঘাটের জল খেয়ে এই কাজে!! কিন্তু নিকিতা হঠাৎ দার্জিলিং এ? আর তাকেও কেউ সরাতে চায় এই পৃথিবী থেকে? কেন?? আরো দশ রকম প্রশ্ন অর্কর মাথায় ঘুরতে থাকে, যার কোনো উত্তর সে খুঁজে পায় না। একবার ভাবে রাহুলের সাথে কথা বলবে, কিন্তু এতোদিন এ লাইনে থেকে নিয়ম ফলো করাটা তার মজ্জাগত হয়ে গেছে। না করলেও যে ফল ভয়ানক হতে পারে তাও তার জানা। এই এজেন্সির লোক সারা দেশে ছড়ানো। কোথাও পালিয়ে নিস্তার নেই!! তাই রাহুলকে ফোনের বদলে আবার বিছানায় এলিয়ে পড়ে সে। কাল দুপুরেই রওনা দিতে হবে। খুব ক্লান্ত লাগছে।।

পরের দিন দুপুরের ফ্লাইটে রওনা হয়ে পড়ল অভ্র। টিকিট আগেই পৌঁছে গেছিল। জার্নির টিটবিটস্ এজেন্সি ভালোই সামলে নেয়। দার্জিলিং এ ঢুকে গেল অভ্র সন্ধের আগেই। পূর্বনির্ধারিত হোটেলেই উঠল। নিকিতার বাংলো আরো তেরো কিমি ভিতরে। তার একটা ছবিও যথারীতি চলে এসেছে তার মোবাইলে। কাল সকালে সেখানে পৌঁছানোর কথা অভ্রর। বাড়িতে বেশী কেউ থাকে না নিকিতা আর তার এক মাসি। এর বেশী কিছু আর অভ্রর জানার কথা না।।

সকালেই মাহিন্দ্রার গাড়িতে বেড়িয়ে পড়ে অভ্র। রাস্তা এতো সুন্দর যে তা মুখে বর্ণনীয় নয়। জীবনের সাথে লড়াই করতে করতে সে এটাকে তার প্রফেশন হিসেবেই মানিয়ে নিয়েছে। তাই আজ আর অতোটা গিলটি ফিল হয়না। তবুও আজ মনটা যেন কিসের এক অস্বস্তিতে ভরে রয়েছে। সুন্দর আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে যেতে যেতে তার মনটাও যেন পিছনের বাঁকে মোর নিয়েছিল। নিকিতা সারা কলেজের হার্টথ্রব হলেও, অভ্র বিশেষ একটা আকর্ষণ বোধ করেনি কোনোদিন তার প্রতি। কারণ বোধহয় অধিক প্রাচুর্য। স্ট্রাগল করা অভ্র বরাবরি বড়লোকি স্নব মেয়েদের দেখতে পারতো না। তবে এতো কিছু থাকা সত্বেও কিন্তু নিকিতার কোনো চরিত্রদোষের কথা কোনোদিন শোনা যায় নি। বরং রেসাল্টে কাউকে সে কখনো আগে যেতে দেয় নি। একটা বড়ো জ্যামের মধ্যে আটকা পড়েই মুহুর্তে বাস্তবে ফিরে আসে অভ্র!! এখান থেকেই শুরু হবে নিকিতার বাংলোর রাস্তা। অভ্র ঘড়ি দেখে। গাড়ি ঠিকঠাক চললে হিসাব মতোন আর মিনিট পনেরোর মধ্যে গন্তব্যস্থান এ পৌঁছে যাবে সে।।

মিনিট কুড়ি পরে তার ছবিতে দেখা একটা ধবধবে সাদা বাংলোর সামনে নামলো অভ্র। সামনে অনেকটা জায়গা জুড়ে খুব সুন্দর বাগান, বেশীর ভাগ পাহাড়ী ফুলে ভর্তি। হঠাৎ ফুলের মধ্যে থেকেই পিংক ফ্রক পড়া একটা ছোট্ট মেয়ে বেরিয়ে এল। স্তব্ধ অভ্র। এমন তো কথা ছিল না! তাকে আরো অবাক করে দিয়ে পিছনে এসে দাঁড়ায় বছর তিরিশের এক মহিলা.. নিকিতা.... সৌন্দর্য প্রাচুর্য ফেটে পড়ছে সারা শরীরে,, একটু ও কমেনি আগের থেকে। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় অভ্র। নিকিতার ভ্রু সামান্য উঠল.. তারপর ই তা হাসিতে রূপান্তরিত হল।

অভ্র লক্ষ্য করল নিকিতার হাসিতে একটা সহজাত ছোঁয়া। এতোদিন পর দেখা হওয়াতে ও একবারেই চিনতে পেরেছে সে। পিছনে হুইলচেয়ারে বসা একজন বছর পঞ্চাশের মহিলা, বোধহয় মাসি। একটু অবাক হল অভ্র। এমন জায়গায় কেবল এক বয়স্ক মাসি আর ছোট্ট মেয়ের সাথে থাকে নিকিতা.. যদিও এ নিয়ে মাথা ঘামানোর জন্য সে এখানে আসেনি। নিয়ম অনুযায়ী কিছু মিনিট ম্যাক্সিমাম আধা ঘন্টার মধ্যে কাজ শেষ করে বেরিয়ে যাওয়াই এজেন্সির নিয়ম। কিন্তু এখানে তো তা হবে বলে মনে হয় না!! অলরেডি স্বাভাবিক সৌজন্যতা আদান প্রদানের পরই নিকিতা তাকে তাদের সাথে লাঞ্চ করার প্রস্তাব দিয়ে বসল! অভ্র ও না করতে পারলো না। মুহুর্তে নিকিতার মেয়ে অলি এসে অভ্রর সাথে ভাব জমিয়ে ফেলল। নিকিতার মা বাঙালি, তাই সে যথেষ্ট ভাল বাংলা বলতে পারে। মাসিও খুব খুশি হয়েছেন এতোদিন পর কাউকে কথা বলার পেয়ে। কিছুক্ষণ যেন অভ্রর মাথায় আসার সুযোগই পেল না তার এখানে আসার কারণ।

বারোটা নাগাদ একটা কল এলো এখনো কোনো খবর না যাওয়ার জন্য। অভ্র বলতে বাধ্য হল.. একটু সেন্সিটিভ কেস, তার একটু সময় লাগবে। এক্সেপ্ট হল, কিন্তু তার মনের অস্বস্তিটা আবার প্রবলবেগে বাড়তে লাগলো। নিকিতা তখন নতুন অতিথির জন্য স্পেশাল কিছু বানাতে ব্যস্ত। একবারও যদি জানতো যে এটা তার লাস্ট লাঞ্চ ও হতে পারে। কলেজে অভ্র নিকিতা খুব ঘনিষ্ঠ ছিল না,, কিন্তু এতোদিন পর পুরোনো বন্ধুকে পেয়ে তার মনটাও খুব খুশি হয়ে উঠেছিল। অলি তো প্রায় কোলে উঠে বসে।

একটা ফ্যান্টাসটিক লাঞ্চের পর নিকিতা তাকে অবাক করে দিয়ে বলে....

"দেখ অনেকদিন পর তো দেখা হল.. আমি ভাবছিলাম আজকের রাতটা নাহয় এখানে থেকেই গেলি.. এমনিও পাহাড়ি রাস্তায় সন্ধের পর আর কেউ গাড়ি চালায় না। তোর সেই ক্লায়েন্টকে একটা কল করে নে, কাল সকালেই না হয় সেখানে যাস!"

অভ্র বলেছে ক্লায়েন্ট ভিসিটে এদিকে এসেছিল, কমন ফ্রেন্ডের কাছ থেকে জেনেছে সে এখানে থাকে, তাই দেখা করতে এসেছে। সাথে সাথে বলল..

"না না, সে নিয়ে তুই চিন্তা করিস না.. আমার সাথে গাড়ি আছে। একটু বিশ্রাম নিয়েই বেরিয়ে পড়ব।"

মনে মনে ভাবল,, ঠিক সময়ে কাজ সেরে বেরোতে না পারলে আর কতোবার যে কল আসবে কে জানে!! কিন্তু এতো বলেও নিকিতাকে কিছুতেই কনভিন্স করতে পারলো না। অলি তো তার গলা জড়িয়ে বসে আছে। অবশেষে অভ্র ঠিক করল রাতটা এখানে থেকেই যাবে.. তার জন্য এজেন্সিকে যা জবাব দেওয়ার সে দিয়ে দেবে। তারপর রাতের অন্ধকারে কাজটা সেরে দিয়ে ভোরে উঠে পালাবে। নিকিতা তাদের গেস্ট রুমটা তার জন্য রেডি করে দিল। অভ্র ঘরে চলে এল একটু বিশ্রামের জন্য। ডানপাশের জানালাটা খুলে দিতেই ছবির মতোন শহরটা চোখে পড়ল। অনেকদিন পর একটা নৈসর্গিক আনন্দের আস্বাদ পেল সে। বিছানায় গা টা এলিয়ে দেওয়ার মিনিট খানেকের মধ্যেই গভীর ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল অভ্র। জার্নির ধকল তো ছিলই।।

ঠিক ছটা নাগাদ নিকিতা আবার তাকে ডেকে দিল। বাইরের লনে একটা ছোট্ট টি টেবলে বসল এসে দুজন। অলি পাশের বাড়ির আন্টির কাছে গান শিখতে গেছে। মাসি ভেতরে। অন্ধকারে দূরে আলোকবিন্দুর মতোন ছোট ছোট বাড়িগুলো অভ্রর কাছে মায়াবী লাগতে লাগলো। একটা ভাললাগার সাথে সাথে ভারী মনকেমনও এসে চেপে বসল মনে। পুরোনো স্মৃতি বিলি কাটছিল। নিকিতাও বুঝি তারই মতোন হারিয়ে গেছিল পুরোনো বাঁকে। কাছের কাউকে পেয়ে তার মন বোধহয় বাঁধ ভাঙল। গ্যাজুয়েশনের পরই প্রায় আট বছর আগে কিছুটা বা বাবার জোরাজুরিতেই বিয়েটা হয়ে যায় তার। বাবা সঞ্জয় যোশী নামকরা বিজনেসম্যান.. তাই বিয়েটাও হয়েছিল কিছুটা হয়তো বা বিজনেস ডিলের মতোই আরেক জন বিগ শটের সাথে!! শুরু থেকেই কোনো নেশার অভাব তো ছিলই না, এরপর তাকে যখন মারধোর শুরু করে তখন আর সহ্য না করে বেরিয়ে আসে নিকিতা। তখনি অলি তার পেটে। তারপর কয়েক বছর অলিকে আঁকড়েই থেকেছে। বছরদুয়েক আগে কাউকে আবার সে খুঁজে পায় নিজের করে.. কিন্তু ভাগ্য এবার ও তাকে সুখী হতে দিল না। বছরখানেক যেতে না যেতেই টের পেল নজর তার দিকে নয়.. তার বৈভবের দিকে। মা গত হয়েছেন বেশ কয়েক বছর আগেই.. তাই এবার যখন ছোট্ট অলিকে নিয়ে তার বাবার কেনা এই বাংলোতে চলে আসতে চায়.. সঞ্জয় যোশী আর চেয়েও বাধা দিতে পারেন নি। মাসির আর কেউ নেই বলে নিকিতাই তাকে নিজের কাছে এনে রেখেছে। অভ্রর মনে হল কথাগুলো বলতে বলতে যেন নিকিতার চোখ একটু ছলছল করছে। সাথে সাথে তার নিকিতার সম্বন্ধে ধারণা যে কতো ভুল ছিল.. তাও বুঝতে পারে। একটা হাত রাখে তার হাতের ওপর ছোটবেলার মতোনই বন্ধুর পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। তার নিজের মনটাও যেন আজ কেমন হয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে সেই পুরোনো দিনে যখন তাদেরও একটা সুস্থ স্বাভাবিক পরিবার ছিল।

স্থির করে ফেলে এই কাজটায় তাকে ফেল করতেই হবে.. হয়তো খুব কমই এমন হয়েছে। তাও করতে হবে। হয়তো তার জীবন সংকট হবে, তাও। নিকিতার এই বেঁচে থাকার লড়াইটা মিথ্যে করে দেওয়া যায় না, যাবে না। ঠিক করে নেয় কাল ভোরেই এখান থেকে রওনা হয়ে পড়বে। তারপর?? তারপর যা হবে তা দেখা যাবে। এতোদিন প্রায় রোবটের মতোন নির্দেশ পালন করতে করতে একবার নিজের থেকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে পেরে তৃপ্তির হাসি হাসে অভ্র, শুটার অভ্র।।


Rate this content
Originality
Flow
Language
Cover Design