Quotes New

Audio

Forum

Read

Contests


Write

Sign in
Wohoo!,
Dear user,
স্বপ্ন দেখে মন
স্বপ্ন দেখে মন
★★★★★

© Debdutta Banerjee

Inspirational Thriller Others

22 Minutes   1.5K    30


(১)


উত্তরে জায়গাটা বেশ সুন্দর, সবুজ ঘাসের কার্পেটে মোড়া ছোট্ট পাহাড়ি গ্ৰাম, খুব কাছেই এশিয়ার দ্বিতীয় উচ্চতম সেতু সিনসোর ব্রিজ। ভালোই লাগছিল স্পন্দনের। ছোট্ট হোমস্টে , দোতলায় ওর ঘরের জানালা খুললেই মখমলের মত সুন্দর উপত্যকা, সিংগালীলা রেঞ্জ। এপথে সবাই ট্রেক করে সান্দাকফু বা নেপাল সীমান্তে যায়। আর রয়েছে গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটা পথে পাহাড়ের কোলে মেইন-বাস জলপ্রপাত।


জানালা খুলতেই এক-ঝাঁক ভেজা মেঘ ওর ঘরে ঢুকে পড়েছিল। তাড়াতাড়ি কাচের জানালা বন্ধ করে বাইনোকুলারে চোখ রেখেছিল স্পন্দন। বহুদূরে পাহাড়ের মাথায় ছোট্ট লাল চালের বাংলোটা আবছা দেখা যাচ্ছিল । দূরবীনের জন্য কাছে মনে হলেও ঘুরে গেলে ওটা বহুদূর এখান থেকে।সুব্বাজি ওর হোম স্টের মালিক বলেছিল ওটা ডক্টর-সাবের বাংলো। এর বেশি ওরা কিছুই জানে না। একটা বড় মেঘের দল এসে ঢেকে দিয়েছিল ঐ পাহাড় আর বাংলো। স্পন্দন এসে ওর ল্যাপটপ খুলে বসেছিল আবার। এখন অবধি যা যা ইনফরমেশন পেয়েছে সাজিয়ে নিচ্ছিল পরপর। কিন্তু কাজটা কি করে শুরু করবে ও নিজেও জানে না। আগের দিন বিকেলে পেলিং থেকে আসার সময় গাড়িটা ইচ্ছা করে দাঁড় করিয়েছিল ঐ পাহাড়ের নিচে যেখান থেকে ঐ প্রাইভেট রোড এঁকে-বেঁকে ঢুকে গেছে ঐ বিশাল গেটের ভেতর। কয়েকটা পাখির ফটো তুলতে তুলতে এগিয়ে গেছিল গেটের দিকে। গেট থেকেও তিনশ মিটার দূরে বাংলো যেন পিকচার পোস্টকার্ডে আঁকা ছবি। ওপর থেকে নিচের পাহাড় জঙ্গলের বেশ কয়েকটা ছবি তুলে ও গিয়ে দাঁড়িয়েছিল গেটের কাছে। ভাব জমাতে চেয়েছিল গোর্খা দারোয়ানের সাথে। কিন্তু ঐ ভাবলেশ হীন দারোয়ানকে ঠিক রোবট মনে হয়েছিল ওঁর। একটা কথারও উত্তর দেয়নি দারোয়ান। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ও ফিরে এসেছিল। গেটের আড়ালে সিসিটিভির ক্যামেরাটা আড় চোখে দেখেছিল শুধু। দুই মানুষ সমান উঁচু ঘন কাঁটাতারের বেড়া দেখে মনে অবশ্যই প্রশ্ন জেগেছিল এত সর্তকতার কারণ কি?


লোকাল থানা যেটুকু ইনফরমেশন দিয়েছিল তাতে সন্দেহর কোনো অবকাশ নেই। এক বৃদ্ধ ডক্টর থাকেন পরিবার সহ। তবুও একটা খটকা থেকেই যায়। ওনার অল্প বয়সী ছেলে মেয়েরা চাকরী বা অন‍্যকিছু করে না কেনো?


লোকাল থানা বলেছিল ওনার বাড়িতে ল্যাব আছে। ছেলে মেয়েরা রিসার্চ করছে কিছু একটা। বিদেশের এক ফার্মা কোম্পানির সাহায্য আসে মাসে মাসে। এর আগে অফিশিয়ালি সরকারের পক্ষ থেকে দুবার দেখে গেছেন বিশেষজ্ঞরা বেআইনি কিছু হচ্ছে না। ট্রাউট মাছের প্রজননের উপর রিসার্চ হচ্ছে। উত্তরের কাছে এমন প্রজনন কেন্দ্র আরেকটি আছে। ঝরণার বহমান জল ছাড়া এসব মাছ বাঁচে না। তাই ঝর্ণার জল চৌবাচ্চায় একদিক দিয়ে ঢুকিয়ে বার করে দিতে হয়। ঐ বহমান জলে মাছের চাষ হয়। এই মাছের বিদেশের বাজারে প্রচুর দাম। তাই বাক্স বন্দী হয়ে বিদেশে পারি দেয় ট্রাউট মাছ।


এই বাংলোর ভেতর ও ঝরনার জলের একটি ধারাকে কৃত্রিম ভাবে ঢুকিয়েছিলেন বাংলোর নির্মাতা। সেই জলেই মাছের চাষ করছেন হয়তো ডক্টর।


কিন্তু তবু আইবি রিপোর্ট অনুযায়ী কিছু একটা চলছে এই বাংলোকে ঘিরে।


আপাতত স্পন্দনের পরিচয় ও লেখক । সিনেমার গল্প লিখতে এসেছে এই অঞ্চলে। সুব্বাজির বাড়ি আট দিন থাকবে, পরে বাড়াতেও পারে থাকার মেয়াদ।


বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল। জ্যাকেটের উপর রেইন কোট চাপিয়ে বেরিয়ে পরে স্পন্দন। জুম কার থেকে একটা গাড়ি ভাড়া নিয়ে ও একাই এসেছে এই সুন্দরী সিকিমে।


দিনটা সোম বার, রিপোর্ট অনুযায়ী ডক্টরের মেয়ে বাজার করতে পেলিং যাবে । ওকে ফলো করতেই হবে স্পন্দন কে। ওর সাথে পরিচয় করে ঐ বাড়িতে একবার ঢোকার পাসপোর্ট ভিসা জোগাড় করতেই হবে ।


পাহাড়ি পাকদণ্ডি পথে এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলে স্পন্দনের গাড়ি। একটা পাহাড়ি ঝর্ণার সামনে টুরিস্ট গাড়ির ভিড়। সেই ভিড় কাটিয়ে দেখতে পায় সাদা ইনোভাটা, ড্রাইভারের সিটে রয়েছে মেয়েটি। রিপোর্ট অনুযায়ী ওর নাম রিমি।


ওর পিছন পিছন চলতে থাকে স্পন্দনের গাড়ি। কখনো পিছিয়ে গেলেও স্পিড বাড়িয়ে ধরে ফেলছিল স্পন্দন গাড়িটাকে।


পেলিং এ ঢুকেই একটা বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকে পড়েছিল রিমি। স্পন্দন ও সেখানেই ঢুকল। শপিং করতে করতে চোখ রাখছিল মেয়েটার উপর। টুকটাক গ্ৰসারী সবজি ফল বিস্কুট সব কিনছে মেয়েটা। ইচ্ছা করেই ওর সামনে গিয়ে নিজের হাতের কয়েকটা শুকনো কেক ও বিস্কুটের প্যাকেট মাটিতে ছড়িয়ে ফেলেছিল স্পন্দন। তবে ওর প্রত্যাশা মত মেয়েটা তুলে দিল না কিছুই‌। পিছিয়ে অন্য কিছু দেখতে শুরু করেছিল মেয়েটা। আলাপ জমানোর জন্য স্পন্দন সব গুছিয়ে আবার এগিয়ে গেল ওর দিকে।


-''এক্সকিউজ মি, আপনি বাঙালী? ''


স্পন্দনের প্রশ্নে ঘুরে তাকিয়েছিল মেয়েটি। বয়স পঁচিশ থেকে তিরিশ, রোগা পাতলা, এক রাশ অবাধ্য চুল পনিটেল করে বাঁধা মাথার ওপর, চোখ গুলো বেশ মিষ্টি। গায়ের রং বেশ ফরসা তবে ফ্যাঁকাসে। চোখ পড়ার মত সুন্দর ওর নখ গুলো, উজ্জ্বল নেল-পালিশে ঝিকমিক করছে যেন। মেয়েটা একটু হেসে বলল -''ইন্ডিয়ান।''


-''না, ভারতীয় তো বুঝেছি, বাঙালী কিনা.....!!'' একটু ইচ্ছা করেই একটা বোকা বোকা ইম্প্রেশন তৈরি করে স্পন্দন।


মেয়েটার মাথার উপর একটা সানগ্লাস হেয়ার-বেল্টের মত ঝুলছিল।ও সেটা নামিয়ে নিলো চোখের উপর মিষ্টি হেসে বলল,

-''এনি প্রবলেম ?''


-''না, মানে ... আসলে আমার .... আমি আসলে বাঙালী মিষ্টির দোকান খুঁজছি। ভেবেছিলাম এখানে পাবো। নেই!! ওরা বলল আপনি বলতে পারবেন, তাই...!!''


স্পন্দন বলটা ঠিক জায়গায় পৌঁছে অপেক্ষা করতে থাকে।


মেয়েটা বলল,

-''দুটো সুইট শপ আছে মার্কেটে। তবে মিষ্টিতে বাঙালি টেস্ট পাবেন না। ট্রাই করতে পারেন একবার। ''


-''আমি ঠিক চিনি না কিছুই, যদি বলে দেন কোথায়.... মানে, নতুন তো ?''


-''আপার পোলিং ওল্ড হেলিপ‍্যাডের কাছে যে মার্কেট সেখানে পাবেন। ''


ওকে ধন্যবাদ বলার সুযোগ না দিয়েই মেয়েটি বিলিং এ চলে গেলো।


স্পন্দন মনে মনে বলল –“বড্ড কঠিন!!''


একটা দরকারি ফোন করে নিলো ও। তারপর বিস্কুট আর কেকের দাম মিটিয়ে বেরিয়ে আসল বাইরে। রিমি তখনো ভেতরে বিলিং এ ব্যস্ত। নিজের গাড়িটা বের করার সময় আড় চোখে সাদা ইনোভাটাকে একবার লক্ষ‍্য করল স্পন্দন।


আপার পোলিং জায়গাটা বড্ড সুন্দর। মনে হয় হাত বাড়ালেই বরফের চুড়া গুলো ছোঁওয়া যাবে, এতটাই কাছে। মিষ্টি কিনে গাড়িতে উঠতেই প্রয়োজনীয় ফোনটা এসেছিল ওর ফোনে। কাজ হয়ে গেছে। মুচকি হেসে গাড়িটা নিয়ে এগিয়ে যায় ও।


(২)


নির্দিষ্ট রুমের সামনে এসে বেল বাজায় ওয়েটার রাজ। একটা অল্প বয়সী মেয়ে দরজা খোলে। মেয়েটা রাজকে দেখে একটু অবাক হয়েছিল। জলের গ্লাস আর তোয়ালে দিয়ে ছেলেটা পিছন ফিরতেই মেয়েটি ডাকে –“ শুভায়ু”।


রাজ পেছন ফিরে তাকায়। তাকেই ডাকছে কি? বলে -''কিছু বলবেন ? ডাকলেন?''


-''তুমি শুভায়ু না!! আমায় চিনতে পারছ না? আমি সুমি!!''


রাজ একটু অবাক হয়, বলে -'' আমার নাম রাজ ম‍্যাম। আপনার ভুল হচ্ছে। ''


সুমি অবাক হয়ে ঠোঁট কামড়ায়। ওর ভুল হতেই পারে না। চার বছরে এতোটা বদলে গেছে শুভায়ু যে ওকে চিনতে পারল না!! সুমিরা কলকাতা থেকে বদলি হয়ে মুম্বাই চলে গেছিল চার বছর আগে। তারপর শুনেছিল, শুভায়ু কি একটা কেসে ফেঁসে জেলে ছিল। তারপরের কথা সুমি আর জানে না। সোশাল সাইটে খুঁজেও সুমি আর শুভায়ুকে পায় নি । না! সুমির মানুষ চিনতে ভুল হয় না কখনো।


চেঞ্জিং রুমে বসে ছিল রাজ। আজ আবার মাথাটা কেমন করছে। চুল গুলো দু হাতে খামচে ধরে ছেলেটা। চোখ বন্ধ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ ও। মনে হয় চোখের সামনে আবছা আবছা ছেড়া ছেড়া কিছু ভাসছে, সব ধূসর, রংহীন। বহুদূর থেকে ভেসে আসে একটা ডাক শু...ভা...য়ু। না না, কে যেন বলে ওঠে সে রাজ। রাজেশ সিং। বাড়ি বিহারের মধুবনীতে।


টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায় রাজ। খুব চেষ্টা করেও বাড়ির কথা মনে পড়ে না। বহুদিন সে বাড়ি ছাড়া । ঠিক কি হয়েছিল মনে নেই আর। কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছিল। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে কাজ খুঁজতে এসেছিল এখানে। না না, সে তো ... !! মেয়েটা কে ছিল !! সুমি নামটা বড্ড চেনা।


শরীরটা কেমন লাগছে। এমন সময় চেঞ্জিং রুমে আসে অশোক। ওকে ও ভাবে দেখে বলে -''ক‍্যায়া হুয়া রে ?''


-''কুছ নেহি ভাই, তবিয়ত থোরা ঠিক নেহি হ‍্যায় রে। চল। '' দু জনেই বেরিয়ে আসে লবিতে।


একটা কল আছে ২১০ রুমের। ওকে বসতে বলে অশোক এগিয়ে যায়।


রাজ মাথা চেপে টুলে বসে থাকে। কিছু ভাবতে গেলেই মাথায় যন্ত্রণা করে উঠছে।


সুমি ফোন করেছিল কলকাতায় ওর বন্ধু বর্ষাকে। শুভায়ুর গল্পটা শুনে চমকে উঠেছিল। না, ওর খবর এখন আর কেউ রাখে না কলকাতায়। সবাই ভুলতে চায় ওর মত খুনিকে। সুমিও প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি। কিন্তু বর্ষা তো মিথ্যা বলবে না আর !!


(৩)



পেলিং থেকে বেরিয়ে গাড়িটা পিক-আপ নিচ্ছিল না প্রথমে, বারবার স্টার্ট বন্ধ হতে হতে মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে পরেছিল রিমির গাড়ি। ঠিক তখনি স্পন্দনের গাড়িটা এসে পাশে দাঁড়িয়েছিল। ওর বন্ধু ভালোই কাজ করেছে। স্পন্দন বলল, -''এনি প্রবলেম ম‍্যাম? নিড হেল্প !!''


রিমির উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে নেমে আসে গাড়ি থেকে। ততক্ষণে বনেট খুলে রিমি দেখে নিয়েছে। মেকানিক ডাকতেই হবে। তেলে কেরোসিন মেশানো ছিল মনে হয়, কেরোসিনের গন্ধ বার হচ্ছে।


সব দেখে স্পন্দন বলল -''আমি উত্তরে যাচ্ছি। আপনাকে বললে কোনো লোকালয়ে ছেড়ে দিতে পারি। মেঘ করে এসেছে। বৃষ্টি নামতে পারে। এ পথে তো আর ট্যাক্সি পাবেন না আপনি !!''


রিমি ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখে টাওয়ার নেই। পাহাড়ে এটা হয়। গাড়িতে সারা সপ্তাহের বাজার রয়েছে। এখনো ঘণ্টা খানেকের পথ। অথচ দিনের আলো মরে এসেছে, গাড়িও কম এপথে। অসহায়ের মত ও এদিক ওদিক তাকায়। তারপর গাড়ি লক করে স্পন্দনকে বলে,

-''চলুন, চাবিটা সামনে একটা গ্যারেজ আছে ওদের দিতে হবে। ওরা এসে নিয়ে যাবে গাড়িটা...''


ওঁর গাড়ির সব জিনিস তুলে স্পন্দন গাড়ি ছুটিয়ে দেয় উত্তরের দিকে। নিজের নাম বলে, রিমিও ভদ্রতার খাতিরে নিজের নাম জানায়। বলে সে একটা রিসার্চ এর কাজে ব্যস্ত রয়েছে আপাতত।টুকটাক বেশ কিছু কথা হয়। স্পন্দন ইচ্ছা করেই ওদের বাংলোর রাস্তাটা পার করে এগিয়ে গেছিল। রিমি বলায় দাঁড়িয়ে যায়। মেয়েটা ধন্যবাদ বলে নেমেই যাচ্ছিল। স্পন্দন বলল,

-'' এই বাংলোতে থাকেন আপনি !! আমি তো কাল পাখির ছবি তুলতে তুলতে এখানে এসেছিলাম। আপনাদের বাগানে একটা বিশেষ ধরনের পাখি ছিল। কিন্তু দারোয়ান ঢুকতেই দিল না। ''


রিমি অস্বস্তিতে পড়ে গেছিল। এত বাজার নিয়ে হেঁটে ওঠাও প্রবলেম। বাধ্য হয়ে বলে,

-''আসুন ভেতরে। তবে আমরা সবাই ব্যস্ত খুব। একটা বড় রিসার্চের কাজ চলছে। কেউ হয়তো সময় দেবে না। ''


-''আপনাকে ভেতরে নামিয়ে আমি কয়েকটা পাখি পেলে ছবি তুলে চলে যাবো।'' গাড়ির হর্নে দারোয়ান বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। রিমিকে দেখে গেট খুলে দিল। চড়াই পথে গাড়ি ঘুরে ঘুরে উঠে এলো গাড়ি বারান্দায়। একটি কাজের লোক এগিয়ে এসেছিল। রিমি লোকটাকে সব নামিয়ে নিতে বলল। ভেতর থেকে ততক্ষণে এক সাদা চুল দাড়িতে ঢাকা বৃদ্ধ বেরিয়ে এসেছে। রিমি তাকে দেখেই বলল,

-'' গাড়ির তেল নিয়েছিলাম আজ, এখন দেখছি তেলে কেরোসিন ছিল। গাড়িটা মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেলো। ফোন কাজ করছিল না। এই ভদ্রলোক নিয়ে এলেন আমায়।''


বৃদ্ধর অন্তর্ভেদী দৃষ্টির সামনে নিজের বোকা বোকা লুকটা ফুটিয়ে স্পন্দন নিজের পরিচয় দিল। দিনের আলো প্রায় শেষ। পাখির কূজনে মুখরিত বাংলোর বাগান। স্পন্দন সেদিকে তাকিয়ে বলল,

-''ভেবেছিলাম পাখির ফটো তুলবো, কিন্তু অন্ধকার হয়ে গেলো। অন্য কোনো দিন না হয়....''


বৃদ্ধ নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন,

-''আমরা একটা প্রয়োজনীয় রিসার্চ করছি বলে বাইরের লোক। অ্যালাও করি না। একটু রিস্ক হয়ে যায়। ''


এরপর আর দাঁড়ানো যায় না। তবু স্পন্দন বোকা বোকা হাসি দিয়ে বলল,

-''আসলে পাখি আমার দুর্বলতা, আপনাদের বাগানে প্রচুর বিদেশী পাখি আসে।''


-''ট্রাউট মাছের উপর একটা রিসার্চ চলছিল, মাছ রয়েছে প্রচুর , তাই হয়তো। আপনি কফি খেয়ে যান। ভেতরে আসুন। ''


ডক্টর হোরের এই আহ্বান লুফে নেয় স্পন্দন। যতটুকু সময় বেশি থাকা যায় এখানে!!


বারান্দার এক পাশে বেতের সোফা সাজানো। সেখানেই বসায় ওকে ডক্টর হোর। দু চার কথার মধ্যেই কাজের লোক কফি নিয়ে আসে। রিমি সেই যে ভেতরে গেছে আর আসেনি বাইরে। কফি শেষ করে স্পন্দন উঠে পড়ে। মেঘ কেটে আকাশ জুড়ে তারার চাঁদোয়া, আধ ফালি চাঁদ উঠেছে এক কোনে। বাগানটা বড্ড সুন্দর। এসব দেখতে দেখতে ও বেরিয়ে আসে। প্রথম দিন ভালোই এগিয়েছে ওর কাজ। সুব্বাজির বাড়ি পৌছতে বেশ রাত হয়েছিল। এই সব পাহাড়ি গ্ৰামে সবাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। তবে সেদিন সান্দাকফু থেকে ট্রেক করে একটি দল নেমেছিল বলে সবাই জেগে ছিল। খাওয়ার পর স্পন্দন ওর ল্যাপটপটা নিয়ে বসল। অনেক দরকারি কাজ করল গভীর রাত অব্দি।


(৪)


চোখ খুলতেই এক উজ্জ্বল বেগুনী রঙের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল যুবকের । আবার চোখ বন্ধ করলেও মস্তিষ্কের ভেতর প্রতিটা কোষে কোষে এক ধরণের তরঙ্গের ছোঁওয়া রয়ে গেছিল। বন্ধ চোখেও আবছা বেগুনী আলোর রেশ রয়ে গেছে যেন। শরীরে একটা মৃদু কম্পন অনুভূত হল। মনটা অকারণেই খুশি খুশি হয়ে উঠল। আর চোখ জুড়ে নেমে এলো ঘুম। আস্তে আস্তে নরম বিছানায় পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে গেল যুবক।


কাচের ঘরের বাইরে থেকে এতক্ষণ ওঁর প্রতিটা নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করছিলেন বৃদ্ধ। সাদা ধপধপে চুল, দাড়ি, সাদা লং গাউনে যাকে দেখলে যে কেউ চার্চের ফাদার বলে ভুল করবে। ক্রুসের চেনের বদলে ওনার গলায় ঝুলছিল একটা স্টেথোস্কোপ যা বলে দেয় উনি ডক্টর, ডক্টর অপ্রতুল হোর। ঐ যুবক ঘুমিয়ে পড়তেই উজ্জ্বল বেগুনী আলো বন্ধ করে মৃদু নীল আলো জ্বালিয়ে দিয়ে ঘরে ঢুকলেন ডক্টর হোর। পাশেই একটা মেশিন, প্রথম দেখে মনে হয় ইউএসজি মেশিন যার থেকে আবার ইসিজির তারের মত বহু সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম তার বেরিয়ে এসেছে। ঘরের ভেতর একটা মিষ্টি গন্ধ। সূক্ষ্ম তার গুলো যুবকের চুলের ফাঁকে ফাঁকে গুজে দিলেন উনি। কয়েকটা বুকে এবং শরীরের অন্যান্য অংশেও লাগিয়ে দিলেন। ঘুমন্ত যুবককে দেখতে অনেকটা মেডুসার মত মনে হচ্ছিল। যেন বেশ কয়েকটা সাপ কিলবিল করছে মাথায় চুলের বদলে। এবার মেশিন অন করতেই কিছু লেখা ফুটে উঠল মনিটারে। বৃদ্ধ ভদ্রলোক কয়েকটা বোতাম টিপে কিছু ইন্সট্রাকশন লিখলেন। মেশিনের গায়ে বিপবিপ আওয়াজ করে কিছু লাল নীল সবুজ আলো জ্বলে উঠল। স্ক্রিনে বেশ কিছু প্যারামিটার দেখাচ্ছিল। এবার উনি একটা নতুন মেশিন লাগালেন এই মেশিনের সাথে। ঐ যুবকের মাথার কাছের বড় সাদা বোর্ডটায় টিভির পর্দার মত ছবি ফুটে উঠল। কিছু বোতাম টিপে উনি ডেট আর টাইম সেট করলেন। তারপর মন দিয়ে সাদা বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।


কিছুক্ষণ ঝিরঝির করলেও ধীরে ধীরে বোর্ডের গায়ে ফুটে উঠল একটা বিরল দৃশ্য। মধ্য রাতের সল্টলেক। একটি মেয়েকে জোর করে গাড়িতে তুলছে যুবকটি। নাকে কিছু চেপে ধরতেই অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল মেয়েটি। ওকে একটা ঝোপের ধারে গাড়ি থেকে টেনে নামাল যুবক। তারপর ..... এমনি আরও কয়েকটা ঘটনা।


বৃদ্ধ এবার আবার একটা ডেট আর টাইম সেট করলেন। একটি কিশোর কিশোরীর ছবি। ছোট্ট একটা পুকুরে সাঁতার কাটছে দু জন। যুবকটি যে ঐ কিশোর বোঝা যাচ্ছে। একটু পরেই সিক্ত বসনে কিশোরী উঠে এলো। একটা ঝোপের ধারে ভেজা কাপড় ছাড়তে ছাড়তে উঃ করে আওয়াজ করে বসে পড়ল। কিশোর উঠে এসেছে ততক্ষণে, ভয়ে ভয়েই উঁকি মেরেছে ঝোপের মধ্যে। কিশোরীটিকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে চারপাশটা একবার দেখে ঢুকে পড়ল ঝোপের ভেতর। খিলখিল করে হাসির শব্দ। কিশোরী আকর্ষণ করছে কিশোরকে। কিশোরটি পালিয়ে আসতে চাইছে কিন্তু পারছে না। উত্যক্ত করছে মেয়েটি। অবশেষে এক আদিম খেলায় মত্ত হল দুজনে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডক্টর হোর আবার ডেট টাইম বদলে দিলেন। একের পর এক দৃশ্য ভেসে উঠছে সাদা বোর্ডে।


এক ছোট্ট শিশুকে কাজের মাসী স্নান করাতে করাতে গোপনাঙ্গ মর্দন করছে ধীরে ধীরে। কখনো তেল মাখাতে মাখাতে এক নোংরা হাত খেলা করছে শিশুর শরীরে। বিরক্ত শিশু কাঁদছে। কিন্তু ছাড়া পাচ্ছে না।


একে একে উনি সব ছবি মুছে দিলেন। এবার কিছু ছবি পেস্ট করলেন তিনি। একটা সুন্দর বাগানে খেলছে শিশুর দল। এই শিশুটিও রয়েছে। ও বড় হচ্ছে এক সুন্দর পরিবেশে। সেই কিশোরের হাতে রাখী বাঁধছে কিশোরী। দু জনে পুকুর ঘাটে বসে গল্প করছে। যুবকটি বাসে মেয়েদের সিট ছেড়ে দিল। শপিং মলে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে মাথা নামিয়ে নিলো। পথে ঘাটে ভালো ব্যবহার করছে মেয়েদের সাথে। এমন আরও ছোট ছোট বহু ঘটনা একের পর এক ভেসে উঠছিল বোর্ডের গায়ে। এবার উনি দুটো হেডফোন গুঁজে দিলেন ছেলেটির কানে। ছোট্ট স্পিকারটা নিয়ে বৃদ্ধ ডক্টর বলতে শুরু করেছেন,

- ''বিকাশ, বিকাশ শুনতে পাচ্ছ ?''


ঘুমন্ত যুবক মাথা নাড়ল খুব আস্তে। উনি বললেন,

-''তুমি বিকাশ, বাড়ি মধ‍্যমগ্ৰামে, মেয়েদের তুমি সন্মান করো বরাবর। মেয়েদের সাথে বেশি কথা বলো না। মেয়েরা ফুলের মত নরম। ওদের দুঃখ দিতে নেই। তুমি সবার উপকার করো তাই সমাজ তোমায় ভালবাসে। এবার তুমি এসেছ চাকরী খুঁজতে। তোমার একটা কাজ দরকার। তুমি বিকাশ......''


কথা গুলো মৃদু ভাবে রিপিট হতে থাকল মেশিনের স্পিকারে।


ডক্টর হোর উঠে একটা ইনজেকশন রেডি করলেন। সেটা যুবকের শিরায় পুশ করে একটু মনিটারিং করলেন কিছুক্ষণ। তারপর কাচের ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলেন। পাশে আরও তিনটে কাচের ঘর, একই রকম মেশিন। আরও দু জন শুয়ে রয়েছে। একটি ঘরের দরজায় একটা সবুজ আলো জ্বলছিল দপদপ করে।


উনি আলোটা অফ করে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এলেন। দরজা খুলে বার হতেই একটা কাঠের বড় হল ঘর। তিনদিক কাঁচের। বাইরে সবুজ পাহাড়ের পেছনে শ্বেত শুভ্র তুষার ধবল গিরিরাজ হিমালয় দাঁড়িয়ে।


বিকেলের শেষ রোদ কাচের ভেতর দিয়ে মেঝেতে এসে পড়েছে। সেই রোদ গায়ে মেখে ডক্টর হোর বারান্দায় এসে একটা ইজি চেয়ারে বসলেন। তবে চুল দাড়ি সাদা এবং চেহারায় বয়সের ছাপ থাকলেও ওনার চলা ফেরায় নেই তেমন বয়স-কালীন আরষ্ঠতার ছাপ। পাশের ঘরটা ওনার ল্যাব, দুটো সাদা লংকোট পরিহিতা মেয়ে ও একটি ছেলে সেখানে কাজ করছে। কাচের জানালার ফাঁক দিয়ে ওনাকে দেখতে পেয়ে কোয়েনা এগিয়ে এলো। রিমঝিম আর ঋভান কাজেই ব্যস্ত।


কোয়েনাকে দেখেই এক স্নিগ্ধ হাসির পরশ ছড়িয়ে পড়ল বৃদ্ধর মুখে। বললেন,

-''কাজ প্রায় শেষ। কাল ভাবছি রিলিজ করবো একটাকে .....''


-''কথা হয়েছে, একটা হোটেলে পাঠিয়ে দেবো। তার আগে কয়েকদিন ওয়াচ করতে হবে একটু।''

কোয়েনা বসে পড়ে ওনার পায়ের কাছে।


কোয়েনার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন উনি। চারদিকে বরফ ঘেরা শৃঙ্গের মাঝে একটুকরো সবুজ পাহাড়ের মাথায় এই পাথর আর কাচের ব্রিটিশ বাংলো, ছাদটা লাল টিনের। চারদিকে রংবেরঙের ফুলের গাছ আর সবুজ ঘাসের ঢাল। ঢালু পিচের রাস্তা সাপের মত এঁকেবেঁকে নেমে গেছে বেশ কিছুটা নিচের দিকে। বড় গেট পার করে নিচের রোডে মিশেছে।


বহুদূর থেকে ছবির মত সুন্দর বাংলোটা চোখে পড়ে। বড় বড় করে গেটে লেখা রয়েছে সতর্কীকরণ। প্রাইভেট প্রপার্টি। প্রবেশ নিষেধ। তিনজন গোর্খা দারোয়ান পালা করে পাহারা দেয় চব্বিশ ঘণ্টা। পেলিং থেকে উত্তরে যেতে অনেকেরই চোখে পড়ে বাংলোটা। এর বেশি লোকাল লোকেরাও তেমন জানে না। সবাই জানে এক বৃদ্ধ ডাক্তার ওনার দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে ওখানে থাকেন। এছাড়া দুটি লোকাল ছেলে মেয়ে ওখানে কাজ করে। ভেতরেই রয়েছে ওদের থাকার ব্যবস্থা। গাড়ি ওনারা নিজেরাই চালায় প্রয়োজনে।


সপ্তাহে একবার একটি মেয়ে পেলিং থেকে সব বাজার করে আনে। ডক্টর ভদ্রলোক আর প্র্যাকটিস করেন না। তবে ছেলে মেয়ে গুলো কি করে কেউ জানে না! দশ বছর আগে ভদ্রলোক একাই এসেছিলেন বাংলোটা কিনে থাকতে। বেশ কয়েক মাস পর একটি মেয়ে আসে। তারপর একেএকে ছেলেটি ও অন্য মেয়েটি এসেছিল। তবে পাহাড়ের মাথায় এই বাংলো নিয়ে লোকাল লোকেদের কৌতূহল খুব কম। কারণ একে শহর বা লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন জায়গাটি।আর শান্তিপ্রিয় বৃদ্ধকে কেউ ঘাটাতে চায় না। পাহাড়ের মানুষরা এমনিতেই শান্তিপ্রিয়। সিকিমের এই অঞ্চলে তেমন কোনো অপরাধ হয় না। তাই ওদের কেউ বিরক্ত করে না সেভাবে।


(৫)


বিকাশ গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। এই রকম সুন্দর পাহাড় ও আগে দেখেছে কিনা মনে পড়ে না। মনে ওর অনেক কিছুই পড়ে না আর। বাড়ির কথা, মায়ের কথা কিছুই মনে নেই। ওর নাকি বড় এক্সিডেন্ট হয়েছিল। আপাতত ও একটা কাজ পেয়েছে ডেলোর কাছে রামধুরায়। হোটেলের কাজ। সেখানেই যাচ্ছে। যে মেয়েটি গাড়ি চালাচ্ছে তাকেও আগে দেখেছে বলে মনে পড়ে না।


ছোট হাসপাতালটায় চোখ খুলে এক মহিলাকে দেখেছিল, সে নাকি ওর মা, তারপর কয়েকদিন এই মেয়েটা আর একটা ছেলেকে দেখেছিল। এরপর এরাই নাকি কাজটা খুঁজে দিয়েছে। বেশি কিছু মনে করতে গেলেই মাথায় চাপ লাগে।


রামধুরা জায়গাটায় আগে এসেছে বলে মনে পড়ে না বিকালের। তবে জায়গাটা বেশ সুন্দর। একটা ঝর্ণা রয়েছে রিসর্টের পাশেই। একটা বড় সাদা পাহাড় চুড়া দেখা যায় সামনে। কাজটাও ভালো। রিশিপসনে বসার কাজ। বিকেলের পর ও ফ্রি, এখনো নাইট পরেনি। ও তো অনেক নার্ভের ওষুধ খায়, ঘুমের এখন প্রয়োজন। , তাই নাইট আপাতত নেই ওর। সেই সব অলস বিকেলে ওর বড্ড মন কেমন করে। কোথাও চলে যেতে ইচ্ছা করে। আবছা ছবি গুলো কেমন মিলেমিশে যায় , ওর কিছুই মনে পড়ে না। ওর যে দুর্ঘটনা ঘটেছিল তাও তেমন মনে পড়ে না। মা ফোন করে মাঝে মাঝে। তবে বাড়ি যেতে বলে না কখনো। বেশি এসব নিয়ে ভাবলে মাথায় চাপ পড়ে, খুব কষ্ট হয় মাথার ভেতরে। যন্ত্রণাটা কমতেই চায় না।


সেদিন শিলিগুড়ি যেতে হয়েছিল বিকাশ কে ম্যানেজারের সাথে । শহরটা ওর খুব চেনা লাগছিল। ম্যানেজার ওকে একটা বড় দোকানে নিয়ে গেছিল, সব পাওয়া যায় সেখানে। বিকাশের মনে হচ্ছিল সে আগেও এসেছে ঐ জায়গায়। বেশ অন্যরকম লাগছিল নিজেকে।


ফেরার পথে ও ঘুমিয়ে পড়েছিল । ঘুম ভাঙল রামধুরায় পৌঁছে।


রিসর্টে একটা নতুন বোর্ডার এসেছে। লোকটা বেশ মজার। বিকাশ কে দেখেই বলেছিল ওনার এক ভাইয়ের বন্ধুর মতো দেখতে বিকাশ। মোবাইলে ওনার ভাইয়ের বন্ধুর ফটো দেখিয়ে বলেছিল -''ওর নাম জানো ? ''


বিকাশ এক মনে ফটো গুলো দেখছিল। সব ওর নিজের ফটো মনে হচ্ছিল। কয়েক জন বন্ধুর সাথে দাঁড়িয়েছিল ওর মত দেখতে ছেলেটা। লোকটা চিনিয়ে দিচ্ছিল, ছেলেটির বন্ধুদের। নাম গুলো খুব চেনা। একটা মেয়ের ফটো দেখিয়ে লোকটা বলল,

-''এর নামটা ....ঠিক মনে পড়ছে না। জানো? মেয়েটাকে কে যেন ধর্ষণ করে খুন করেছিল! ছেলেটা ধরা পড়েও পালিয়ে গেছিল।চেনো ছেলেটাকে ? ''


সেই মাথার যন্ত্রণাটা ফিরে এসেছিল। দপ দপ দপ..... দু হাতে মাথা চেপে ধরেছিল বিকাশ। গেস্টের রুমের বড় সোফাতে বসে পড়েছিল ও। আবার সব ধোওয়া ধোওয়া সাদাটে আর ধুসর রঙ চারপাশে। কানের কাছে কেউ ডাকছে,

--- বিকাশ, তুমি জেগে ওঠো। একটা ঘুম নেমে আসে দু চোখ জুড়ে।


(৬)


চারটা কেস খুঁজে পেয়েছিল জয়। ছেলেগুলো ওদের অতীত ভুলে গেছে। অথবা দারুণ অভিনেতা। ওদের ঠিকানাও বদলে গেছিল। প্রমাণ ছাড়া ধরাও যাবে না। বিকাশের হাতের ছাপ নিয়েছিল। প্রতিটা আঙ্গুলের মাথা থেঁতলে গেছিল নাকি দুর্ঘটনায়। ছাপ মেলেনি। ডিপার্টমেন্ট বলেছিল দেরী না করে লোকাল পুলিশের সাহায্য নিতে।


জোরে জোরে হর্ন দেয় পুলিশের প্রথম গাড়িটা। দারোয়ান গেট খুলে দিতেই তিনটে গাড়ি পর পর গিয়ে ঢোকে ডক্টর হোরের বাংলোয়। প্রথম গাড়ি থেকে দু জন অফিসার নেমে আসেন। প্রথম ঘরটাতেই মুখোমুখি দেখা হয় ডক্টর হোরের সঙ্গে। বাকি দুটো গাড়ির কনস্টেবলরা ততক্ষণে ঘিরে ফেলেছে বাড়িটা।


-''আমাদের কাছে সার্চ ওয়ারেন্ট আছে। আপনি এখানে অবৈধ কিছু করছেন বলে প্রশাসন মনে করছে। আমরা এই ল্যাব পরীক্ষা করে দেখবো । ''

ইংরেজিতে সিকিমিজ অফিসারটি ভাবলেশহীন মুখে বলে ওঠে। ডক্টর হোরের দাড়ি গোঁফের আড়ালে ঢাকা পড়া মুখের অভিব্যক্তি বোঝা যায় না ঠিক। ততক্ষণে দু জন সরকারী বিশেষজ্ঞ নেমে এসেছেন। পাশের ঘরেই ওনার ল্যাব। দুটি মেয়ে কাজ করছে। বহুক্ষণ সব পরীক্ষা করেও সন্দেহ জনক কিছুই পায় না ওরা। ট্রাউট মাছের তেল ও মৌমাছির মধু থেকে কিছু স্নায়ুর ওষুধ বানানো হচ্ছে। বাড়িটার প্রতিটা ইঞ্চি পরীক্ষা করে পুলিশ। একতলা দোতলা প্রতিটি কোনা, মেঝের কার্পেট তুলে, আলমারি ফটো ফ্রেম সরিয়ে, বাথরুম রান্নাঘর এমনকি চাকরদের আউট-হাউজ কিছুই বাদ যায় না। কেউ কোনো বাঁধা দেয় নি ওদের।


অফিসার বলে -''আপনার ছেলে কোথায়?''


-''একটা কাজে বাইরে গেছে।''


বিধ্বস্ত দলটির প্রতিনিধিকে ডক্টর হোর বলেন -''সরকারের কাছে প্রোজেক্ট জমা দিয়ে সাহায্য চেয়েছিলাম এই রিসার্চের। বহুদিন লাল সুতোর ফাঁদে আটকা থাকলেও অনুমতি দিয়েছিল কেন্দ্র। তবে অর্থ দেয় নি। একটা বিদেশী কোম্পানির সাহায্যে কাজ করছি। সরকার তাতেও সন্দেহ করছে। এটাই দুঃখ। তবে আমি জানি যা করছি দেশের ভালোর জন্য করছি। যে দিন আমার রিসার্চ শেষ হবে বিশ্ব উপকৃত হবে। সারা বিশ্বে এক আলোড়ন সৃষ্টি হবে। ''


একে একে পুরো দলটা বেরিয়ে যায়। বেশ কিছুটা দূরে একটা ওবি ভ্যানের মত গাড়িতে অপেক্ষা করছিল স্পন্দন। ওর ল্যাপটপে পরিষ্কার ফুটে উঠেছে ডক্টর হোরের অন্দর মহল। ছটা ক্যামেরা ঠিকঠাক বসিয়ে দিয়েছে ঐ অফিসার। মনে হয় না কেউ বুঝতে পেরেছে। ওর পাশে রয়েছে ওর বন্ধু জয়, ও একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। ডক্টর হোরের রিসার্চের বিষয় নিয়ে কেন্দ্রর কাছে খবর ছিল এক বছর ধরেই। চুপচাপ একবছর ধরে লক্ষ‍্য রাখা হয়েছিল এই বাংলোর উপর। তাতে উঠে এসেছে বহু চাঞ্চল্যকর তথ্য। এমন কিছু ক্রিমিনাল কে এ বাড়িতে ঢুকতে দেখা গেছে যারা কেউ জেল পালানো, কেউ বা টাকার জোরে খালাস পাওয়া, কেউ সন্ত্রাসবাদী। এর কিছুদিন পর একবার রেড করে সন্দেহ জনক কিছুই পাওয়া যায় নি। তবে তিনজন ক্রিমিনালকে এই সিকিমেই বিভিন্ন হোটেলে কাজ করতে দেখা গেছে। তবে তাদের নাম পরিচয় সব আলাদা এবং তাদের স্বভাবেও বদল এসেছে। দেখতে এক হলেও উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে তাদের গ্ৰেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এরপর কেসটা এসেছিল আইবি তে। স্পন্দন গত তিন মাস ধরে কেসটা দেখছে। কিন্তু এত নিখুঁত কাজ, ফাঁক খুঁজেই পাচ্ছিল না ও। এরপর ও সাহায্য নিয়েছিল জয়ের। জয় একজন বড় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। ও শুরু করেছিল অন‍্যদিক দিয়ে। ও বিভিন্ন হোটেলে কর্মরত ছেলে গুলোকে ফলো করেছিল প্রথমে। ওদের স্টাডি করে ও জানিয়েছিল ছেলে গুলোর অতীতকে মুছে ফেলা হয়েছে ওদের জীবন থেকে। ওরা জানেই না ওরা কি করেছিল। এ যেন এক পুনর্জন্ম। ও বহুভাবে চেষ্টা করেও ওদের স্মৃতির সেই ঘরে পৌছাতে পার নি যেখানে লুকিয়ে রয়েছে ওদের অতীত। তবে ডক্টর হোরের বাড়িতেই ওদের উপর কিছু প্রয়োগ করা হয়েছিল। ডক্টরের বাড়িতে ওদের প্রবেশের তিন মাসের মত ওদের কোথাও দেখা যায় নি। এই সময়টাই ভাইটাল। আপাতত তিনটে ছেলেকে স্টাডি করার সুযোগ পেয়েছিল জয়। তিনজনের অপরাধ প্রায় এক কেউ ধর্ষক, কেউ খুনি, কেউ আরও বড় অপরাধী। ওরা সবাই সাজা প্রাপ্ত, কেউ আবার প্রমাণের অভাবে বা টাকার জোরে বেরিয়ে এসে হারিয়ে গেছিল।


আপাতত ছটা ক্যামেরা মনিটারিং করতে করতে ঝিমুনি এসে যাচ্ছিল ওর। জয়ের ডাকেই মণিটারের দিকে তাকিয়েছিল স্পন্দন। ভেতরের ঘরের আর ল্যাবের প্যাসেজের মাঝে যে দেওয়াল আলমারি তার নিচের তাকটা সরিয়ে একটা সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেছিলেন ডক্টর হোর। আধ ঘণ্টা হাতে হাত রেখে বসে ছিল ওরা, ওনার সাথে ঐ ছেলেটিও উঠে এলো নিচ থেকে। যতক্ষণ পুলিশ ছিল ছেলেটিকে দেখেনি কেউ। মৃদু স্বরে কথা বলতে বলতে ওরা একতলার ল্যাবে গিয়ে ঢুকেছিল।


স্পন্দন লাফ দিয়ে উঠেছিল। জয়কে বলেছিল মনিটার সামলাতে। সে তখনি একবার ঢুকতে চেয়েছিল ঐ পাতাল ঘরে। রহস্যর আসল চাবি রয়েছে ওখানেই। জয় বলেছিল-"একা যাবি? আরেকবার রেড করানো যায় কিন্তু। ''


-''অত দেরি করলে ওরা সব প্রমাণ নষ্ট করে ফেলবে। তুই বিপদ বুঝলে ফোর্স নিয়ে আসবি। আর কাজটা আমাদের দু জনকেই করতে হবে। বেশি লোক জানলে চলবে না।''

পাহাড় বেয়ে উঠতে শুরু করে। রাস্তাটা ওর চেনা। এই পথে এর আগেও ও ঢুকেছে। কাঁটাতারের ঘন বেড়া আর গেটের গার্ড ছাড়া ভেতরে তেমন কোনো পাহারা নেই, কয়েকটা লুকানো টিভি ক্যামেরা রয়েছে বাড়ির চারদিকে। পাইন গাছ আর রডোডেনড্রন ছাড়া বড় কোনো গাছ নেই আশেপাশে। ট্রাউট মাছ চাষের জন্য যে ঝর্ণার জল বাগানে ঢুকছে সেই পথে স্পন্দন ঢুকে পড়ে বাগানে। বুকে হেঁটে মাছের চৌবাচ্চা দুটো পার করে ফুলগাছের আড়ালে লুকিয়ে ক্যামেরার মুভমেন্ট লক্ষ‍্য করে নিলো সে। দুটো ক্যামেরা পাঁচ সেকেন্ডের জন্য দুধারে ঘুরতেই ও পৌঁছে গেছিল বাড়ির পেছনে, এই ড্রেন পাইপটা দিয়েই আগের বার ছাদে উঠেছিল। এবার ছাদে না উঠে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির মুখের গরাদ বিহীন জানালার কাছে নেমে পড়ল। বাড়ির ভেতর দুটো ক্যামেরা রয়েছে ডক্টর হোরের লাগানো। একটা হলে, একটা ল্যাবে। আপাতত ও নিজের লাগানো ক্যামেরার আওতায়। কানে লাগানো ইয়ার ফোনে জয়ের গলা ভেসে এলো -''সাবধান, কেউ সিঁড়ির দিকেই আসছে। ''

স্পন্দন চট করে একটা বড় পর্দার পিছনে লুকিয়ে পড়ে। আলমারিটা ওর দশ হাতের মধ্যে। এর মধ্যে আর কেউ নিচে নামে নি এখনো, নামলে জয় জানাবে।

(৭)

কোয়েনা নিজের রুমের দিকে চলে যেতেই স্পন্দন ঢুকে পড়ল ঐ আলমারির ভেতর। দরজাটা বন্ধ করে নিচের তাকে চাপ দিতেই সরে গেলো ওটা। ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গেছে নিচের দিকে একটা হাল্কা নীল আলোয় ছায়া ময় পথে ও নেমে গেল বেশ কিছুটা, প্রথমেই একটা বড় ল্যাব, তার পাশে কাঁচের চারটে ঘর, হাসপাতালের কেবিনের মত। চারটে ঘরে চারটে বেড, দুটোয় শুয়ে রয়েছে দুই কুখ্যাত ক্রিমিনাল,দুটো বেড ফাঁকা। 

প্রথম জন অন্তত কুড়িটা খুন করেছে, নাম প্রাঞ্জল, কিন্তু ঘরে একটা মৃদু মিউজিক চলছে, আর মনিটার জুড়ে অদ্ভুত কিছু প্যারামিটারের ওঠা নামা। পাশের ঘরের কাচের দরজা ঠেলে ঢুকতে গিয়েই যেন ইলেকট্রিক শক খেলো স্পন্দন। ছেলেটা মোস্ট ওয়ান্টেড আরিফ, টেরারিষ্ট.... সন্ত্রাসবাদী। অবশ্য ঘরে মৃদু মিউজিকের সাথে চলছে ধারাভাষ্য। অদৃশ্য বক্তা বলে চলেছে,

"তুমি আর্য, বাড়ি ব‍্যান্ডেল।"

ঘুমন্ত ছেলেটিও মাঝে মাঝে অস্ফুটে বলে চলেছে, -''আ...র....য..... ব‍্যা...ন...ডে....ল।"

অদ্ভুত ধরনের মেশিন গুলো। কত তার লাগানো ওদের মাথায়।

-''হীরক রাজার দেশে সিনেমাটা দেখেছিলে ? মগজ ধোলাই যন্ত্রর নাম শুনেছ ?"


চমকে উঠে পেছন ঘুরতেই ডক্টর হোরের মুখোমুখি হয় স্পন্দন। ফ্রাকশন অফ সেকেন্ডে ওর হাতে উঠে আসে একটা অটোমেটিক রিভলভার। মনে মনে ভাবে এই ঘরে কি সিগন্যাল আসছে না !! জয় তো খবর দিল না কেউ নামছে!!


-''তোমার হাতের যন্ত্রটি একটি খেলনা, আপাতত ওটা পকেটে রাখো। আর তোমার বন্ধু সেটাই দেখছে যা আমরা দেখাচ্ছি। তোমাদের লাগানো ক্যামেরা গুলো এখন আমরাই কনট্রোল করছি।"

ডক্টর হোর পাশের ল্যাবের দরজা খুলে ঢুকে পড়েন। পেছন পেছন ঢোকে স্পন্দন।


-''আমি বেআইনি কিছু করছি না। তবে মানুষের ব্রেনকে কনট্রোল করার যন্ত্র আমি তৈরি করেছি নিজের চেষ্টায়। জানি বাইরের বিশ্বে এই আবিষ্কারের খবর ছড়ালে দু রকম প্রতিক্রিয়া হবে। একদল আমায় মাথায় তুলে নাচবে। তারা চাইবে আমি এই যন্ত্রের সাহায্যে সমাজের নোংরা সাফ করি যদিও তারা সংখ্যায় অনেক কম।দ্বিতীয় দল চাইবে এই ক্ষমতাকে নিজের অধীনে নিয়ে পুরো মনুষ্য সমাজের উপর রাজত্ব করতে। এই সমাজের কালো মানুষ গুলো আমায় কিনে নেবে নয়তো জোর করে আমার মগজ ধোলাই করে আমায় ওদের দাশ বানিয়ে ফেলবে। তাই অতি গোপনে আমায় সমাজের আবর্জনা সাফ করতে হচ্ছে। প্রথমেই আমি বেছে নিয়েছি এই নরকের কিট গুলোকে। আইন এদের সঠিক শাস্তি কখনোই দিতে পারে নি। আমি এদের ভেতরের অসুরকে মেরে এদের নতুন মানুষ করে তুলেছি। এদের অতীত কে মুছে এক সুন্দর জীবন দিয়েছি বা দিচ্ছি।''

শুনতে শুনতে স্পন্দন বলে উঠল,

-''অতীত মুছে দিয়েছেন বুঝলাম। ভবিষ্যতে আবার যদি এরা হিংস্র হয়ে ওঠে ?''

-''না, এদের রক্তে এবং হরমোনে বদল এনেছি আমি। যেই হরমোনের ক্ষরণে ওরা উত্তেজিত হয়ে উঠত তাকে বদলে দিয়েছি। পরীক্ষা করে দেখেছি ওরা আর অমন করবে না। রাগ লোভ কাম ক্রোধ এগুলো আর নেই ওদের ভেতর।''

-''তাই বলে ওরা এভাবে খোলা সমাজে ঘুরে বেড়াবে ?''

-''সংশোধনাগারে কি ওদের বদলানোর চেষ্টা করা হয় না ? আমিও সেটাই করেছি।'' ডক্টর হোর স্পন্দনের চোখে চোখ রেখে বলেন।

-''কিন্তু সংবিধান সেই অধিকার দেয় নি আপনাকে। ''

-''কোন সংবিধান ? সমাজের এই নোংরামি বন্ধ করতে পেরেছে সংবিধান? দোষীকে শাস্তি দিতে পেরেছে ঐ সংবিধান?''

-''তাই বলে মগজ ধোলাই !! আজ না হোক কাল যে আপনি বদলে যাবেন না অথবা আপনার ল্যাবের কেউ এই ফরমুলা কোনো কালো হাতকে বিক্রি করে দেবে না তার নিশ্চয়তা কোথায় ?''

স্পন্দনের প্রশ্নে চোখ জ্বলে ওঠে ডক্টর হোরের। বলেন'

-''আমার ল্যাবে যারা কাজ করে সবার ব্রেনের কন্ট্রোল আমার হাতে। ওরা আমার ছেলে মেয়ে। আর আমি এই ফরমুলা বিক্রির কথা ভাবতেও পারি না। সেভাবে ভাবলে আমি পৃথিবীর রাজা হতে পারি। কিন্তু আমি পৃথিবীর আবর্জনা সরিয়ে ওকে বাসযোগ্য করে তুলতে চাই। সবে কয়েক জনকে বদলেছি। এখনো প্রচুর কাজ বাকি। ''

হেসে ফেলে স্পন্দন। রিভলভারটা বৃদ্ধর দিকে তাক করে বলে,

-''আই বি আর কয় টাকা মায়না দেয় আমাদের, বলুন!! আপনাকে যদি বিদেশী শক্তির হাতে তুলে দিতে পারি আমি এই দেশের রাজা হয়ে যাবো জানেন। আপনার উপর শুধু দেশের হয়ে নয়, বিদেশের অনুরোধেও নজর রেখেছিলাম। এবার জমবে আমাদের আসল খেলা।''

হঠাৎ ঘাড়ের কাছে পিনের মত কিছু ফোটে স্পন্দনের। ঘুম নেমে আসে ওর চোখ জুড়ে।

বৃদ্ধ বলে ওঠেন,

-''লোভ!! এই ঘরে বসে লোভের আলোচনা সহ্য করবেনা আমার যন্ত্র।এবার ঘুমাও।''

দুটো কাচের ঘরে শুয়ে রয়েছে স্পন্দন আর জয়। বোর্ডে ফুটে উঠেছে কলকাতার এক হোটেলের মিটিং এর ছবি। টাকার বিনিময়ে ওরা সব জানাবে ঐ বিদেশী মিলিত শক্তিকে। সবটা মুছে দিলেন ডক্টর হোর। এখানে ঢোকার পরের স্মৃতিও মুছে দিলেন। বোর্ড জুড়ে এখন ট্রাউট মাছের ছবি। ওদের তেল দিয়ে ওষুধ তৈরি হচ্ছে। মৌমাছির মধু থেকে ওষুধ আর ইনজেকশন তৈরি হচ্ছে। এরপর জ্ঞান ফিরলে এগুলোই মনে থাকবে ওদের।

আস্তে আস্তে ডক্টর হোর উপরে উঠে এলেন, বারান্দার ইজিচেয়ারে এসে বসলেন। নির্লোভ মানুষের বড়ই অভাব দেশে। এরাও বিক্রি হয়ে গেছিল!! কে জানে কত দিন লাগবে নতুন করে এই সমাজকে গড়তে। একেক সময় মনে হয় পৃথিবীর প্রতিটা লোকের মগজ ধোলাই করতে হবে বোধহয়। তবেই পৃথিবীটা সুন্দর হয়ে উঠবে। লোভ কাম ক্রোধ এগুলোকে মুছে দিতেই হবে সবার জীবন থেকে। আর মুছতে হবে অতীতের কিছু ভয়ানক তিক্ত স্মৃতি। ভরে দিতে হবে সুন্দর স্বপ্ন, আর নতুন জীবনের হাতছানি। আপাতত এই দু জনের ব্রেনের কনট্রোল ওনার হাতে। এবার এরাই আরও লোক জোগাড় করে আনবে কোয়েনা, ঋভান আর রিমির মত।

একে একে জেগে উঠছে পাখির দল। ওদের কলতানে মুখরিত ওনার বাগান। তুষার ধবল হিমালয়ের চুড়ায় শুরু হয়েছে সিঁদুর রঙের খেলা, বৃদ্ধ সেদিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখছিলেন এক নতুন পৃথিবীর।


(সমাপ্ত)

অপরাধ রহস্য বিজ্ঞান

Rate the content


Originality
Flow
Language
Cover design

Comments

Post

Some text some message..