Quotes New

Audio

Forum

Read

Contests


Write

Sign in
Wohoo!,
Dear user,
মেঘমঞ্জরী
মেঘমঞ্জরী
★★★★★

© Sayandipa সায়নদীপা

Horror

29 Minutes   527    57


Content Ranking

ঘটনা ১


তীব্র একটা আঁশটে গন্ধ অনেকক্ষণ থেকেই নাকে ধাক্কা দিচ্ছিল সাত্যকীর। শুয়ে থাকা আর সম্ভব হলোনা, বিছানায় উঠে বসলো সে। নাইট ল্যাম্পের আলোয় বিচ্ছুরিত হতে থাকা দেওয়াল ঘড়ি জানান দিচ্ছে ঘন্টা দুয়েক আগেই তারিখ পাল্টেছে। হাসলো সাত্যকী, কদিন আগে অবধিও এই সময়টা কানে ফোন নিয়ে কাটতো আর আজ এতক্ষণে একঘুম হয়ে গেল। খোলা জানালা দিয়ে কুলকুল করে বাতাস ঢুকছে, পাশেই পুকুর, হয়তো আঁশটে গন্ধটার উৎস ওটাই। দুলাল বাবুকে জিজ্ঞেস করতে হবে এই পুকুরে মাছ আছে কিনা! বিছানা থেকে নেমে বাথরুমের কাছে যাওয়ার আগেই জানালা দিয়ে চোখ পড়লো বাইরে… আজ বোধহয় পূর্ণিমা, আকাশে গোল চাঁদ, জ্যোৎস্না গিয়ে ঠিকরে পড়ছে পুকুরের জলে আর সেই পুকুরের ধারেই দুই বাহু প্রশস্ত করে দাঁড়িয়ে সাত্যকীর নীল পরি। মুগ্ধ হয়ে তাকালো সাত্যকী, এই মায়াবী পরিবেশে নীল রাত পোশাকটা শ্যারেনকে মানিয়েছে বেশ, বাইরের কুলকুল করে বয়ে চলা ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটায় সেটা উড়ছে পতপত করে, সেই সঙ্গে উড়ছে শ্যারেনের মখমলের মত লম্বা চুলগুলোও। এরপর আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা নেই সাত্যকীর, বাইরে বেরিয়ে এলো সে।


বাইরের দরজায় কেউ যেন অমানুষিক শক্তিতে ধাক্কা দিয়ে চলেছে অনবরত; ঘুমটা ভেঙে গেল শ্যারেনের, ধড়পড় করে উঠে বসলো সে। জানালা দিয়ে একরাশ আলো এসে ধাঁধিয়ে দিলো চোখ। অনেক বেলা হয়ে গেছে তার মানে! পাশে দেখলো সাত্যকী নেই, বাথরুমে গিয়েছে হয়তো। বিছানা থেকে নেমে গুটিগুটি পায়ে বাইরের দরজার কাছে এলো শ্যারেন, বুকটা ঢিপঢিপ করছে। এখানে কে এসে ডাকতে পারে ওদের! আস্তে করে দরজার ছিটকিনিটা খুলে আগে একবার উঁকি দিয়ে দেখবে ভাবলো শ্যারেন, কিন্তু সেটা আর সম্ভব হলো না। ছিটকিনিটা খোলা মাত্রই হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল কয়েকজন লোক। আতঙ্কে কয়েক পা পিছিয়ে গেল শ্যারেন, তারপরেই লক্ষ্য করলো আগন্তুকেরা তার অপরিচিত নয়… তারই বাবা, জ্যেঠু, আর তাদের দোকানের দুজন পুরোনো বিশ্বস্ত কর্মচারীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে আয়ান, শ্যারেনের বাবার পছন্দ করা পাত্র। 

“চলো হামারে সাথ” , বাবার বজ্রগম্ভীর কন্ঠ; শ্যারেন প্রতিবাদ করে উঠলো, “কভি নেহি, আয়াম ম্যারেড নাও। ইউ কান্ট ডু এনিথিং। সাত্যকী… সাত্যকী…”

শ্যারেনের বারবার ডাকা সত্ত্বেও সাড়া দিলো না সাত্যকী, শ্যারেন পাগলের মতো গোটা ঘরে খুঁজে দেখলো। কোথাও নেই সাত্যকী।

“কিঁউ রাত বিতাকে ভাগ গ্যায়া না তুমহারা আশিক?” চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বললো আয়ান। চমকে উঠলো শ্যারেন, “নেহি ইয়ে নেহি হো সকতা… সাত্যকী… সাত্যকী…”

সাড়া দিলো না কেউ।


ঘটনা ২ 


“ওয়াও বাবা ইউ আর গ্রেট।”

“হেঃ হেঃ বলেছিলাম না বাড়িটা দেখলে চমকে যাবি, কেমন দেখছিস?”

“ইটস অসম, পুরো সেই গ্রিটিংস কার্ডের ছবি গুলোর মতন। শুধু পাহাড় আর ঝর্ণাটা থাকলেই…”

“তার বদলে কিন্তু একটা বিশাল পুকুর আছে।”

“সত্যি বাবা…!”

“একদম।”

“মা শুনছো পুকুরও আছে এখানে…” মেয়ের উচ্ছাসের কোনো প্রতিক্রিয়া জানালেন না সুনন্দা, আগের মতোই গম্ভীর মুখে ঢুকে পড়লেন ঘরের ভেতর। মনে মনে একটু আহত হলো বিনি, বাবা এতো কষ্ট করে এতো সুন্দর ঘরটা খুঁজে পেতে ভাড়া নিলো আর মা এরকম ব্যবহার করছে! 

“তুই সব ঘুরে দেখে আয়, আমি ভেতরে চললাম।” মেয়েকে কথাটা বলেই ঘরে ঢুকে গেলেন আনন্দ। সুনন্দা একটা সোফায় বসে আছেন গুম হয়ে। আনন্দ গিয়ে বসলেন তাঁর পাশে, “এখনো রেগে আছো?” উত্তর দিলেন না সুনন্দা, আনন্দই আবার বললেন, “রাগ কোরোনা সু, আমি বিনিকে জানতে দিতে চাইনা কিছু।”

“আমি জানতে দিতে বলিনি কিন্তু অন্য বাড়ি নিলে কি ক্ষতি হয়ে যেত?”

“আমার সামর্থ্য যা তাতে এতো বড় বাড়ি পেতে আর!”

“প্রশ্ন তো সেটাই, এতো কম টাকায় এতো সুন্দর বাড়ি কেন ভাড়া দিচ্ছে?”

“দুলাল বাবু তো বললেন ওদের টাকার দরকার নেই, জাস্ট বাড়িটা ফাঁকা ফেলে রাখতে চায়না তাই…”

“আচ্ছা আমি সব মেনে নিলাম কিন্তু কি ক্ষতি হত যদি একটু ছোটো বাড়িই নিতে!”

“বিনি পারতো সেরকম বাড়িতে থাকতে? আর বললাম তো আমি ওকে জানতে দিতে চাইনা যে ওর বাবার চাকরিটা আর নেই।”

“আমার যে খুব ভয় করছে… তনু বলছিলো…”

“প্লিজ সু, জানি তনু তোমার বোন কিন্তু তুমি নিজেই ভালো করে জানো তিলকে তাল করা তার অভ্যেস তাই সে কি বললো না বললো তাতে প্লিজ এতো গুরুত্ব দিও না।”

“কিন্তু যা রটে তার কিছু তো ঘটে।”

“উফফ সু এখন এসব ছাড়ো আর প্লিজ এক কাপ চা খাওয়াও না।”


“নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে, চুপিচুপি বাঁশি বাজে বাতাসে বাতাসে…” 

ঘুমটা ভেঙে গেল আনন্দর, কতদিন পর গান গাইছে সুনন্দা। বিয়ের পর প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে সুনন্দার গান না শুনলে তার ক্লান্তিই যেত না। তারপর সব পাল্টে গেলো আস্তে আস্তে, সংসারের চাপে সুনন্দার গলার গানও হারিয়ে গেল। কিন্তু আজ এতো দিন পর আবার সুনন্দাকে ওর প্রিয় গানটা গাইতে শুনে যেন ক্ষণিকের জন্য নিজের সমস্ত দুশ্চিন্তা, মনের সব ক্লান্তি ভুলে গেলেন আনন্দ। পাশের ঘরেই বিনির সাথে শুয়েছে সুনন্দা, ওর কাছে যেতে বড্ড ইচ্ছে করছে। বিছানা থেকে নেমে তাই রুম স্লিপার জোড়া পায়ে গলালেন আনন্দ আর তখনই একটা আঁশটে গন্ধ এসে ঝাপটা মারলো তার নাকে; জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন তিনি… আকাশের বুকে একফালি চাঁদকে ঘিরে জ্বলছে অসংখ্য তারা আর তার ঠিক নীচেই গভীর সাগরের মত কালচে জল নিয়ে স্থির হয়ে আছে পুকুরটা। আঁশটে গন্ধটা বোধহয় ওখান থেকেই আসছে।


 ভোর পাঁচটার দিকে ঘুম ভেঙে গেল সুনন্দার। আনন্দ ডেকে দিতে বলেছিল তাকে, একটা চাকরির ব্যাপারে একজনের বাড়ি যাওয়ার কথা। এখান থেকে ভদ্রলোকের বাড়ি অনেকদূর, বাসে করে যেতে হবে তাই সক্কাল সক্কাল বেরোনোই ভালো। আনন্দর ঘরে এলেন সুনন্দা, কেউ নেই ঘরে, বাথরুমও তো ফাঁকা… তাহলে কোথায় গেল আনন্দ! গোটা ঘরে কোত্থাও নেই সে, বাইরে বেরিয়ে বেশ কয়েকবার তার নাম ধরে ডাকলেন সুনন্দা কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। এদিক ওদিক খুঁজে না পেয়ে সুনন্দা ছুটলেন বাড়ির পেছনের দিকে; বুকের মধ্যে ড্রাম পেটার শব্দ হচ্ছে তার। তনু কি কি যেন সব বলেছিলো…! 


পুকুরের ধারে বেওয়ারিশ অবস্থায় পড়ে আনন্দর রুম স্লিপার জোড়ার একটা; কিন্তু আনন্দ কোত্থাও নেই। আর্তনাদ করে উঠলেন সুনন্দা… নানাআআআআ….


                  ★★★★★

                      ১

  

“দিদি আসবো?” দরজার কাছ থেকে ক্ষীণ কন্ঠস্বরটা ভেসে আসতেই মুখ তুলে তাকাল শ্যারেন আগরওয়াল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বছর ছাব্বিশের একটা ছেলে, ওর নাম হেমন্ত, এই আগরওয়াল এম্পোরিয়ামের সব থেকে প্রবীণ, সব থেকে বিশ্বস্ত কর্মচারী রমানাথ জোশির ছোটো ছেলে। 

“আয়।” শ্যারেনের অনুমতি পেয়ে ভেতরে ঢুকলো হেমন্ত, তারপর খুব সন্তর্পণে দরজাটা ভেজিয়ে দিলো। ভ্রু কুঁচকালো শ্যারেন, এই অহেতুক সতর্কতার কারণ কি! মুখে কিছু বললোনা সে, শুধু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো হেমন্তের দিকে, ছেলেটা ঢোঁক গিলছে বারবার, জিভ দিয়ে ঠোঁট চাঁটছে। ওকে দেখলেই বোঝা যাচ্ছে ভীষন টেনশনে আছে।

 “কিরে কি বলবি বল।” নীরবতা ভাঙতে হলো শ্যারেনকেই।

  “দিদি…”

  “কি?”

  “আমার কিছু টাকা ধার চাই, প্লিজ দিদি না বোলো না।”

  “কত টাকা?

কিরে চুপ করে গেলি কেন? কত টাকা বল।”

  “এই হাজার কুড়ি ধর।”

  “কুড়ি হাজার! কি করবি এতো টাকা নিয়ে? ব্যাপারটা কি বলতো?”

  “দিদি প্লিজ তুমি না বোলোনা।”

  “হ্যাঁ না এর কথা হচ্ছেনা হেমন্ত, তোর হঠাৎ এতো টাকার দরকার পড়ল কেন সেটাই জানতে চাইছি।”

 “তোমাকে আমি সব বলবো দিদি কিন্তু তার আগে তোমাকে কথা দিতে হবে যে এই কথাগুলো তুমি আর কাউকে জানাবেনা।”

 “ঠিক আছে। এবার বল।”

 “দিদি আমি বিয়ে করবো।”

 “সে তো আমি জানি। কিন্তু তার জন্য এভাবে…”

 “তুমি বুঝতে পারছোনা ব্যাপারটা। আমি বাবার ঠিক করা মেয়েকে বিয়ে করতে পারবোনা, আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি আর তাকেই বিয়ে করবো।”

 “অন্য কাউকে? কে সে?”

 “আছে একজন। কিন্তু সে মাড়য়ারি নয়, বাঙালি।”

 “চাচাজি জানেন এ কথা?”

 “জানলে তার পরিণতি কি হবে সেটা তুমি ভালোই জানো দিদি।”

হেমন্তের কথা শুনে কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে গেল শ্যারেন, আচমকা বুকের ভেতরটা কেমন চিনচিন করে উঠলো। 

 “কি হলো দিদি?”

 “কিছু না। তা তোর এখন প্ল্যান কি? ডিটেলে বল সব।”

 “দিদি তুমি তো জানোই বাবা আমার বিয়ের সব ঠিকঠাক করে ফেলেছেন, আমার কোনো আপত্তিই শুনতে রাজি নয় বাবা। তাই আমি ঠিক করেছি আমি আর বিনীতা কাল রাতেই গিয়ে মহামায়ার মন্দিরে বিয়েটা সেরে ফেলবো।”

 “বিয়েটা হয়ে গেলেই চাচাজি মেনে নেবেন?”

“বাবা কি আর এতো সহজে সব মেনে নেওয়ার লোক দিদি! তাই তো আমার টাকার দরকার।”

 “মানে?”

 “এই শহর ছাড়িয়ে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে একটা চটি জায়গা আছে, ওখানে একটা বাড়ি ঠিক করেছি সেখানেই গা ঢাকা দিয়ে থাকবো কিছুদিন। তারপর একটা কাজের বন্দোবস্ত করতে পারলে…”

“জায়গাটার নাম কি?

কিরে চুপ করে আছিস কেন? ভয় পাচ্ছিস পাছে সবাইকে সব বলে দিই? হেমন্ত এতদূর যখন বললি তখন কি তোর মনে হয়না আটকাতে চাইলে ওই জায়গার নাম না জানলেও আমি তোকে আটকে দিতে পারি।”

“না দিদি তা নয়, মানে… জায়গাটার নাম সিমন্তপুর।”

“কি বললি!”

“এই জন্যই নামটা শুরুতে বলতে চাইনি দিদি।”

কিছুক্ষণ গুম হয়ে যায় শ্যারেন, সিমন্তপুরের নাম শুনলেই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা ছবির মতো বাড়ি, সামনে সাজানো বাগান, পেছনে শান বাঁধানো পুকুর আর… শ্যারেনের স্বপ্নের সংসার, যে স্বপ্ন কোনোদিনও সত্যি হয়নি।


                      ২


 রাত প্রায় দশটা, দুপাশে জঙ্গল ফেলে রেখে গাড়ি ছুটছে। স্টিয়ারিং এ বসে শ্যারেন। হুহু করে ঠান্ডা বাতাস এসে লাগছে চোখে মুখে। আকাশের আনাচে কানাচে উড়তে থাকা কালো মেঘ গুলোও জমাট বেঁধে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামিয়েছে। শ্যারেনের বুকের ভেতর একটা অস্বস্তি, একটা অব্যক্ত যন্ত্রনা যেন মাথায় চিনচিনে ব্যাথা ধরাচ্ছে। কালকে হেমন্তের কাছে ওই বাড়ির ঠিকানাটা জানা অবধি একমুহূর্তও যেন শান্তিতে থাকতে পারেনি শ্যারেন, বেশ অনেক বছর আগের তিক্ত স্মৃতিগুলো যেন আবার আঁচড়ে কামড়ে ধরছে ওকে। অন্য পুরুষের সাথে রাত্রিবাস করে আসা একটা মেয়েকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে আয়ানও, শ্যারেনেরও ক্ষমতা ছিলো না নতুন করে কাউকে ভালোবাসার তাই বাবার ব্যবসার দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে আজ এতো বছর একলাই কাটিয়ে দিয়েছে ও। প্রাণপণে ভুলতে চেষ্টা করেছে সব স্মৃতি কিন্তু পেরেছে কই? পারেনি বলেই হয়তো আজ এতো রাত্রিরে গাড়ি নিয়ে ছুটে চলেছে আবার সেই অতীতের মুখোমুখি হতে। ওর যেন দৃঢ় বিশ্বাস মেঘমঞ্জরীর কোলে আবার সেই পুরোনো দৃশ্যেরই পুনরাবৃত্তি হবে। সেই অদেখা বিনীতা নামের মেয়েটার জন্য বারবার কেঁপে উঠছে ওর বুক।


রেলগেট পড়েছে সামনে, গাড়িটা থামাতে হলো। এপ্রান্ত সেপ্রান্ত সবই খাঁ খাঁ করছে, জনপ্রাণীর চিহ্ন মাত্র নেই কোথাও। কটা বাজে কে জানে! এটাই হয়তো লাস্ট ট্রেন। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো বারবার এসে সামনের কাঁচটা ভিজিয়ে দিচ্ছে,ওয়াইপার জোড়াও অক্লান্ত ভাবে তাদের কাজ করে চলেছে। শ্যারেন ভাবে মানুষও এমন যন্ত্র হলে ভালো হতো, না থাকতো কোনো কষ্ট না কোনো যন্ত্রনা। ট্রেন ছুটছে দুর্বার গতিতে, হয়তো আগেই লেট করেছে তাই গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া এখন বেশি। ঠক ঠক… জানালার কাঁচে হঠাৎ শব্দ হতেই চমকে উঠে ঘুরে তাকাল শ্যারেন। অন্ধকারে পরিষ্কার বোঝা না গেলেও শ্যারেন আন্দাজ করতে পারলো আলখাল্লার মতো উলোঝুলো একটা পোশাক পরে এসে দাঁড়িয়েছে কেউ। বিদ্যুৎ চমকালো হঠাৎ… সেই আলো লোকটার গায়ে পিছলে পড়া মাত্রই শ্যারেন দেখতে পেল ওর কোটরাগত চোখ দুটো, পান খাওয়া দাঁত নিয়ে লোকটা হাসছে ওর দিকে তাকিয়ে। উফফ কি বিভৎস, বুকটা ধক করে উঠলো ওর। পিঁ পিঁ শব্দে গেট উঠে যাচ্ছে আস্তে আস্তে, স্টিয়ারিং এ হাত রাখল শ্যারেন তারপর হুশ করে বেরিয়ে গেল ওখান থেকে। বুকের ধুকপুকুনিটা যেন কমছে না এখনও। হয়তো কোনো পাগল লোক হবে কিন্তু তাও একটা ভয় যেন ওকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে।


মেঘমঞ্জরীর সামনে যখন শ্যারেন পৌঁছাল শেষমেশ ততক্ষণে বৃষ্টি ধরে গেছে, হিমেল হাওয়ার সাথে সোঁদা গন্ধটা এসে ঝাপটা মারছে নাকে, চারিদিক নিস্তব্ধ। আজ প্রায় বছর সাতেক পর শ্যারেন আবার দাঁড়িয়ে মেঘমঞ্জরীর সামনে; এই অঞ্চলটা দিয়ে এই সাত বছর অনেকবার যাতায়াত করতে হলেও এই বাড়িটার থেকে বরাবর দূরত্ব বজায় রেখেছিল সে, হয়তো আসার প্রয়োজনও ছিলোনা কিন্তু তার থেকেও বড় কথা আসতে ইচ্ছে হয়নি কখনও। এতবছরেও এলাকাটার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি, বাড়িটাও আছে সেই আগের মতোই, এই অন্ধকারে মনে হচ্ছে যেন কোনো রূপকথার স্থাপত্য। সবুজ বেড়ার মাঝে থাকা বাঁশের গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো শ্যারেন। গেটে তালা দেয়নি হেমন্তরা, সেই রাত্রে তো শ্যারেনরাও দেয়নি। গেট থেকে একটা মোরাম রাস্তা চলে গেছে বাড়িতে ঢোকার মূল দরজা অবধি, দুপাশে ফুলের বাগান, রাতের অন্ধকারে ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা কি ফুল। দরজায় কড়া নাড়তে গিয়েও থমকে গেল শ্যারেন, এ কি করছে ও! একটা নব বিবাহিত দম্পতিকে এতো রাত্রে অকারণে এসে বিরক্ত করছে! সবাই সাত্যকী হয়না, হেমন্তকে তো শ্যারেন সেই জন্ম থেকে থেকে দেখে আসছে, হেমন্তের ওপর এরকম সন্দেহ করার আদৌ কি কোনো কারণ আছে! নাহ এই রাত্রিবেলায় এতদূর গাড়ি ছুটিয়ে না এলেই হতো, এরকম হঠকারী সিদ্ধান্তের জন্য এখন নিজের ওপরেই রাগ উঠতে লাগলো শ্যারেনের। এতো রাত্রে আবার ড্রাইভ করে ফিরে যেতেও যেন সাহসে কুলচ্ছেনা এখন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাগানটার দিকে তাকালো শ্যারেন, বাগানের ধার ঘেঁষেই একটা রাস্তা চলে গেছে বাড়ির পেছন দিক অবধি। খানিকটা অন্যমনষ্ক হয়েই সেই পথ ধরল শ্যারেন। আকাশের মেঘ কেটে গিয়ে এখন উঁকি দিচ্ছে তারারা, চাঁদের দেখা না মিললেও একটা স্নিগ্ধ সোনালী আভা ওপর থেকে এসে মায়াময় করে তুলছে পরিবেশটাকে। সেই মায়াবী আলোয় শ্যারেন স্পষ্ট দেখতে পেল হেমন্ত দাঁড়িয়ে রয়েছে পুকুরের ধারে, ওর হাত পা নাড়া থেকে শুরু করে ওর সমস্ত অঙ্গভঙ্গি কেমন যেন অস্বাভাবিক ঠেকছে। ভ্রু’টা কুঁচকে গেল শ্যারেনের, এতো রাত্রে হেমন্ত কি করছে ওখানে! ওর কাছে যাবে কি যাবেনা ইতস্তত করছিল শ্যারেন, আর তখনই দেখলো হেমন্ত এক পা এক পা করে ধাপ বেয়ে জলের দিকে নামতে শুরু করেছে। বুকটা ধক করে উঠলো শ্যারেনের, হেমন্ত তো সাঁতার জানেনা। ওদের মধ্যে দূরত্ব খুব একটাও বেশি নয়। “হেমন্ত…” চিৎকার করে ডাকলো শ্যারেন, তারপর ছুটলো হেমন্তের দিকে। শ্যারেনের আচমকা ডাকেই বোধহয় চমকে উঠলো হেমন্ত, আর বৃষ্টিভেজা ঘাটে পা স্লিপ করে সশব্দে পড়লো জলে…


বাঁধানো ঘাটে বসে হাঁপাচ্ছে ওরা দুজন, হেমন্তের গা জলে ভিজে জবজব করছে আর শ্যারেনের সারা শরীর ভিজে গেছে ঘামে। সেকেন্ডের ভগ্নাংশে যেন ঘটে গেল সব কিছু, এখনও সব কিছু দুঃস্বপ্নের মত মনে হচ্ছে, কেউ কোনো কথা বলতে পারছেনা ওরা। মোক্ষম সময়ে জল থেকে বাড়ানো হেমন্তের হাতটা যদি শ্যারেন না ধরতে পারতো তাহলে…


স্টোভে তিন কাপ চা চড়িয়েছে বিনীতা, শ্যারেন বসে আছে মাদুরের ওপর, ভেতরের ঘর থেকে জামা পাল্টে বেরিয়ে এলো হেমন্ত। শ্যারেন জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকালো ওর দিকে। 

“দিদি বিশ্বাস করো রাতে আচমকা ঘুম ভেঙে যেতে দেখলাম বিনি পাশে নেই, তারপর ঘরের জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম বিনি পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে। সেই দেখে আমিও…”

 “কিন্তু হেমন্ত বিনি তো বলছে সে একবারও ঘুম থেকে ওঠেনি রাতে আর তাছাড়া আমি তো দেখলাম তুই একা পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করছিলি।”

  “কিন্তু দিদি..”

  “আমি একটা কথা বলতে চাই তোমাদের।” হেমন্তকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বললো বিনি।

  “কি কথা?” একসাথে জিজ্ঞেস করলো শ্যারেন আর হেমন্ত।

  “হেমন্ত যা বলছে তার কারণটা কিছুটা হলেও হয়তো জানি আমি।”

“মানে?”

“এই মেঘমঞ্জরী যে আমার খুব চেনা… বেশ কয়েক বছর আগে এখানেই কাটিয়ে গিয়েছিলাম আমার জীবনের বিভৎসতম কয়েকটা দিন।”

  “মানে? কিভাবে?”

  “হুম… এই বাড়িটাই তো আমার জীবনটা ওলটপালট করে দেয়। আমার বাবা…”

  “কি হলো বিনি? কাঁদছো কেন? বলো আমাদের সব।”

  “আমার বাবা একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন, সেখানে একজন উর্দ্ধতন অফিসারের সাথে ঝামেলা হওয়ায় বাবার চাকরিটা চলে যায়। আমরা যে ফ্ল্যাটে থাকতাম তার খরচ বহন করা আর বাবার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিলনা, এদিকে বাবা চাননি যে ওনার চাকরি যাওয়ার ব্যাপারটা আমি জানতে পারি। এই অবস্থায় হঠাৎ করে এই বাড়িটার সন্ধান পান বাবা, এতো সুন্দর বাড়ি অথচ ভাড়া খুব কম। বাবা লুফে নেন প্রস্তাবটা, বাড়ির মালিক বলেন তাদের এমনিতে টাকার দরকার নেই কিন্তু বাড়িটা ফাঁকা রাখতে চান না তাই… বাবা অবিশ্বাস করেননি ওনাকে। কিন্তু আমার মাসি আমার মাকে বলে অন্য কথা।”

  “কি কথা?”

  “মাসি বলেন যে তিনি শুনেছেন এই বাড়িটার নাকি দোষ আছে, তাই কেউ টিকতে পারেনা এখানে। কিন্তু আমার বাবা এসব কুসংস্কার মানতেন না; মায়ের বারণ অগ্রাহ্য করেই তিনি আমাদের এনে তোলেন এখানে। আর তারপরেই…”

  “কি?”

  “প্রথম দিন রাতেই বাবা নিখোঁজ হয়ে যায়। ওই পুকুরটার পাড়েই বাবার রুম স্লিপারগুলোর একটা পড়ে থাকতে দেখে মা। বাবাকে খোঁজার জন্য কোনো লোক পুকুরে নামতে রাজি হয়নি, এবং আশ্চর্যজনকভাবে বাবার দেহটাও ভেসে ওঠেনি জলে। তাহলে বাবা কোথায় গেলেন? মা এরপর পাগলের মত হয়ে যায়, আমরা এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাই কিন্তু মা আর...”

“ডোন্ট মাইন্ড বিনি বাট এর থেকে কিন্তু কিছুই প্রমাণ হয়না। তোমার বাবা হয়তো…”

“আর মাসি যে গুজব শুনেছিল?”

“তাহলে সাত্যকীদার কেন কিছু হলো না!”

“কে সাত্যকী দা?” বিনির প্রশ্নে একটা ঢোঁক গিললো হেমন্ত, বেফাঁস কথাটা বেরিয়ে গেছে মুখ দিয়ে। 

“দিদি…” শ্যারেনকে ডাকলো হেমন্ত, চমকে উঠলো শ্যারেন। বোধহয় অন্যমনষ্ক হয়ে পড়েছিল।

“দিদি বিনিকে বলবো সব?”

“কি?”

“তোমার আর এই বাড়িটার কথা…” আবার যেন চমকে উঠলো শ্যারেন, তারপর মাথাটা মৃদু নেড়ে সম্মতি জানাল। হেমন্ত বিনিকে সব বললো যতটুকু ও জানতো। অবাক হয়ে পুরোটা শুনলো বিনি তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, “আর ইউ শিওর ওই সাত্যকী বাবু ঠিক আছেন?” বিনির কথা শুনে হেমন্ত আর শ্যারেন দুজনেই চমকে উঠে ওর মুখের দিকে তাকাল।

 “মানে তোমাদের এবসার্ড লাগেনি, ছয় বছরের সম্পর্কের পর একটা লোক রাতারাতি এভাবে পাল্টে গেল কি করে! পরের দিন তো দিদি তাকে খুঁজেই পায়নি, তাহলে…!”

“কি বলছ কি বিনি?” হেমন্ত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো।

  “আমার যেটা খটকা লাগলো সেটাই বললাম।

যাইহোক এই বাড়িতে আর নয় আর তার জন্য যদি আমাদের আলাদাও হতে হয় তাই সই।”

  “কিন্তু বিনি আমি আলাদা হতে চাইনা, আমার বাবা কিছুতেই মেনে নেবেন না।” 

  “আর একসাথে থাকতে গিয়ে তোমার কোনো ক্ষতি হয়ে গেলে তখন!”

   “বিনীতা ঠিকই বলছে হেমন্ত, জেদ করিসনা প্লিজ।” বলল শ্যারেন।

   “ঠিক আছে আমরা নাহয় এখান থেকে চলে গেলাম কিন্তু তোমরা একটা কথা ভেবে দেখেছ কি আমরা যাওয়ার পর আবার কেউ আসবে নিশ্চয় এবাড়িতে থাকতে। তার কি হবে? বিনির বাবার সাথে যা ঘটেছিল বা গুজব তো তার আগেই ছড়িয়েছে মানে এসব যদি সত্যি হয় তাহলে আরও অনেক লোকই হয়তো…”

  “কিন্তু আমরা কি করতে পারি?”

  “কিছু তো করতেই হবে বিনি, এভাবে পালিয়ে যাব ভয়ে? আমি সেটা পারবো না। আমার যদিও এসবে বিশ্বাস নেই খুব একটা কিন্তু তাও আজ আমার নিজের সাথেই যা হলো…”

   “একমাত্র বাড়ির মালিকই পারেন এই রহস্যের সমাধান করতে। তাই না দিদি?”

   “ঠিক বলেছ বিনীতা কিন্তু বাড়ির মালিক কি এতো সহজে সব বলে দেবেন! নিশ্চয় না। তিনি কিচ্ছু বলবেন না।”

   “তাহলে?”

   “শ্যারেনদি, বিনি আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে।”

   “কি?”

   “আমার এক বন্ধু আছে সার্থক, ওর এক দাদু এসব অতীন্দ্রিয় বিষয় নিয়ে চর্চা করেন। আমরা তার সাহায্য নিলে কেমন হবে?”

   “উনি তান্ত্রিক?”

   “আরে না না, ওসব কিছু না। উনি অন্যরকম ভাবে সাধনা করেন, ঠিক তান্ত্রিক নন কিন্তু তন্ত্র বিদ্যাও জানেন। শুনেছি তিব্বতের কোন পাহাড়ী সাধুর কাছে নাকি দীক্ষা নিয়েছিলেন।”

   “উনি সাহায্য করবেন আমাদের?”

   “জানিনা কিন্তু অনুরোধ তো করতেই পারি।”

   “ঠিক আছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ভোর হবে, তোরা আমার সাথে চল। তোদের ওখানে নামিয়ে দিয়ে আমি একটা কাজে যাবো।”

   “কি কাজ দিদি?”

   “আছে একটা কাজ।”


                      ৩


সবে সকাল সাড়ে সাতটা বাজে। সার্থকদের বাড়িতে হেমন্ত আর বিনিকে নামিয়ে দিয়েই চলে গেছে শ্যারেন। সার্থকদের বাড়ির ড্রয়িং রুমের একটা সোফায় গুটিসুটি হয়ে বসে আছে ওরা, এতো সকাল সকাল লোকের বাড়ি এলে কেমন যেন লাগে। রান্নাঘর থেকে খুটখাট আওয়াজ ভেসে আসছে, সার্থকের মা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন অতিথি আপ্যায়নের জন্য। একটা ট্রাউজার আর গেঞ্জি গলিয়ে উস্কোখুস্কো চুল আর আলুথালু চোখ মুখ নিয়ে সামনের একটা সোফায় বসে আছে সার্থক, মাঝে মাঝে চোরা দৃষ্টি চালিয়ে দেখে নিচ্ছে হেমন্ত আর বিনিকে, কিন্তু কথা বলছে না কেউই। 

প্রায় আধ ঘন্টা বসার পর ওই ঘরে ঢুকলেন একজন বয়স্ক করে মানুষ, পরনে শুধু একটা কমলা ধুতি। সার্থক হেমন্তদের উদ্দেশ্য করে ক্ষীণ গলায় বললো, “দাদু।” বিনি গিয়ে প্রণাম করলো ভদ্রলোককে, দেখাদেখি হেমন্তও। বিনির মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে হেমন্তের মাথায় যেই হাত রাখলেন তিনি আর সঙ্গে সঙ্গে একটা বিদ্যুৎ প্রবাহ খেলে গেল তার শরীরে। দু’পা পিছিয়ে এসে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালেন হেমন্তের দিকে, তারপর বললেন, “কাকে ছুঁয়েছিলি তুই?”

হেমন্ত কিছু বুঝতে না পেরে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। বিনি আর সার্থকও যথেষ্ট অবাক হয়েছে; সার্থক বললো, “কি হয়েছে দাদু?”

“দাদা রে তোর এই বন্ধুটির শরীরে যে আমি খারাপ গন্ধ পাচ্ছি। ও হয় কোনো খারাপ জিনিস ছুঁয়েছিল বা খারাপ কাউকে ছুঁয়েছিল।”

বিনি হাত জোড় করে বললো, “দাদু আমি নিশ্চিত পারলে আপনিই পারবেন আমাদের সাহায্য করতে, আমার স্বামীকে বাঁচাতে।”

  “আগে কি হয়েছে সব খুলে বল আমায়।” 

হেমন্ত আর বিনি যতটা সম্ভব সব কিছু বিস্তারিত ভাবে বলার চেষ্টা করলো। মন দিয়ে ওদের কথা শুনলেন ত্রিলোকেশ, তারপর চোখ বন্ধ করে কিছু যেন ভাবলেন খানিক্ষণ। হেমন্ত কিছু বলতে যেতেই সার্থক ইশারায় তাকে চুপ করে থাকতে বললো। বেশ কিছুক্ষণ ওভাবে থাকার পর চোখ খুললেন ত্রিলোকেশ, তার চোখ দুটো ইতিমধ্যেই লাল হয়ে উঠেছে। তিনি এবার হেমন্তের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এর সমাধান করা তো আমার কাজ নয় দাদা, তোমরা কোনো তান্ত্রিকের সাহায্য নিতে পারো।”

  “না দাদু ওসব তান্ত্রিক টান্ত্রিক জানিনা। আপনি ওকে দেখেই বুঝে গেলেন কিছু একটা গন্ডগোল আছে তারমানে পারলে আপনিই পারবেন আমাদের এই বিপদ থেকে মুক্ত করতে। আমি কোনো অজুহাত শুনবোনা দাদু, আপনার এই নাতনিটার কথা আপনাকে রাখতেই হবে।” কাতর গলায় অনুরোধ করলো বিনি।

  স্বল্প হেসে ত্রিলোকেশ বললেন, “এমন করে বললে ফেরাই কি করে! কিন্তু আমি কি পারবো কিছু করতে!”

   “ঠিক পারবেন দাদু, আমি সার্থকের মুখে অনেক শুনেছি আপনার ক্ষমতার কথা।” বললো হেমন্ত।

   “আচ্ছা বেশ, আমি যাবো। আজই যাবো গিয়ে সব দেখে শুনে এসে তারপর কিছু সমাধান করতে পারি নাকি সে ব্যবস্থা করবো।”

  “সত্যি বলছেন দাদু আজই যাবেন! কখন যাবেন বলুন।” 

   “হুম আজই যাবো কিন্তু তার আগে তোমাদের একটা কাজ করতে হবে।”

   “কি কাজ?”

   “ওই বাড়ির মালিককে কোনো অজুহাতে ওখানে ডাকো। বিনি দিদিভাই ঠিকই বলেছে এই রহস্যের কিছু হদিস তাঁর কাছে নিশ্চয় থাকবে।”



   সাত্যকীর বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো শ্যারেন। সেই কলেজে পড়াকালীন সব বন্ধুবান্ধবদের সাথে এসেছিল একবার তারপর আর কোনোদিনও আসা হয়নি। অথচ একটা সময় অবধি নিত্যদিন এই বাড়িতে থাকার স্বপ্ন দেখছে সে, বাড়ির মানুষগুলোকে নিজের বলে ভেবে এসেছে। এটা তো আসলে ওর শ্বশুরবাড়িই, সংসার নাই বা করা হলো তাও আজও তো ও সাত্যকীরই স্ত্রী। সেই মহামায়ার মন্দিরে ওর সিঁথিতে সিঁদুর ওঠার সময় থেকে ও সাত্যকীর স্ত্রী, আজ সে পরিচয় নাই বা থাকলো তাও ও মনে মনে তো জানে যে ও বিবাহিতা। শ্বশুরবাড়ির লোকের নাম বা তাদের ঠিকানা কোনোটাই এতো বছরে একটুও মলিন হয়নি ওর স্মৃতি থেকে; শুধু শ্যারেনের ভাগ্যের মতোই জায়গাটার চরিত্রও পাল্টেছে তাই লোকের সাহায্য নিতে হলো পৌঁছাতে। কলিংবেলে একবার চাপ দিতেই দরজা খুলে গেল, একটি কম বয়সী বিবাহিতা মেয়ে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, “কাকে চাই?” 

মুহূর্তের জন্য উত্তরটা যেন ভুলে গেল শ্যারেন, এই কি তবে সে যে ওর জায়গা দখল করে বসেছে এখন! ওর থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে মেয়েটি আবার জিজ্ঞেস করলো, “কাকে খুঁজছেন?”

  “সা… সাত্যকী আছে?” নামটা উচ্চারণ করতে গিয়ে জিভটা যেন জড়িয়ে গেল শ্যারেনের। এদিকে নামটা শোনা মাত্রই মুখটা শুকিয়ে গেল মেয়েটারও। 

  “ছোটো বৌমা কে গো?” ভেতর থেকে একটা আওয়াজ ভেসে এলো।

  “ম… মা… একজন মেজদাভাইয়ের খোঁজ করছেন…”

মেজদাভাই! তারমানে এ সাত্যকীর নয়, ওর ভাই সপ্তকের স্ত্রী! 

ভেতর থেকে একজন বয়স্ক মহিলা বেরিয়ে এলেন, তাঁকে দেখলেই বোঝা যায় অনেক ঝড় বয়ে গেছে তাঁর ওপর দিয়ে; শ্যারেন এনাকে চেনে খুব ভালো করে, সাত্যকীর মা। ভদ্রমহিলা চশমার ফাঁক দিয়ে কিছুক্ষণ দেখলেন শ্যারেনকে, তারপরেই হঠাৎ তাঁর চোখ মুখ পাল্টে গেল, চিনতে পেরেছেন বোধহয় ওকে। ক্ষিপ্র গতিতে ওর সামনে গিয়ে তিনি খামচে ধরলেন ওর জামা, “বল আমার ছেলে কোথায়? বল… বল…” শ্যারেন হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মহিলা ওর জামা ধরে ক্রমাগত ঝাঁকাতে থাকলেন আর বলতে থাকলেন, “ফিরিয়ে দে আমার ছেলেকে, কেন কেড়ে নিলি তাকে! আমি তো তোদের বাধা দিইনি তবে কেন এমন করলি তোরা? তার কি মায়ের কথা একবারও মনে পড়ে না? তোর ছবি নিয়ে তখন দেখাতো আমায়, তোর কথাই ভাবত… আমি তো না বলিনি তখন… কিন্তু তুই কেন কেড়ে নিলি আমার ছেলেটাকে? 

তুই আজ কেন এসেছিস এখানে! কেন এসেছিস বল? সে তো এলোনা…” এসব বলতে বলতে ঝরঝর করে কাঁদতে শুরু করলেন সাত্যকীর মা।

  “আপনিই মেজদাভাইয়ের...?” জিজ্ঞেস করলো সপ্তকের স্ত্রী, তার চোখে মুখে বিস্ময়। সাত্যকীর মায়ের অবস্থা দেখে মুখে কোনো কথা আসছিল না শ্যারেনের, এবার সে সপ্তকের স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ গলায় বললো, “আমাদের বিয়ের পরের দিনই সাত্যকী আমাকে ছেড়ে চলে আসে… তারপর আর এই সাত বছর আর কখনো যোগাযোগ হয়নি আমাদের… আমি ভেবেছিলাম ও নিশ্চয় বাড়িতে চলে এসেছে, কিন্তু…!”

   “দাদাভাই বাড়ি আসেননি, আমি বিয়ের পর থেকে এই ঘটনা শুনছি যে আপনার সাথে বেরিয়ে যাওয়ার পর দাদাভাই আর কোনোদিনও বাড়ি ফেরেননি। এদিকে আপনি বলছেন আপনার সাথেও যোগাযোগ নেই, তাহলে দাদাভাই গেলেন কোথায়?”



                      ৪


মেঘমঞ্জরীর কম্পাউন্ডে পা রাখা মাত্রই উফফ করে একটা শব্দ করে উঠলেন ত্রিলোকেশ। হেমন্ত কিছু না বুঝেই সাহায্যের জন্য এগিয়ে যেতে গেলে তাদের হাত নেড়ে থামতে ইশারা করলেন তিনি। তারপর মুখ বিকৃত করে বললেন, “ভয়ানক জায়গা এটা, এখানে কোনো মানুষ টিকতে পারেনা। তোমরা কেউ পাচ্ছনা গন্ধটা?” সবাই নাক টেনে গন্ধ পাওয়ার চেষ্টা করলো, আসলে এখানের বাতাসে সবসময়ই একটা অদ্ভুত আঁশটে গন্ধ ভাসে, গন্ধটা এতই ক্ষীণ যে মনোযোগ আকর্ষণ করেনা কারুর বা করলেও সবাই পুকুরের গন্ধ ভেবে আমল দেয়না তাকে। কিন্তু ত্রিলোকেশ তো আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মত নন তাই তিনি ঢুকেই টের পেয়েছেন এই গন্ধের অস্বাভাবিকতা।

“ভেতরে আসুন দাদু।” ত্রিলোকেশকে ডাকলো বিনি। তিনি বললেন, “নারে দিদিভাই, ভেতরে যাওয়ার আগে পুকুরটা দেখা দরকার, তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে যত গন্ডগোল সব ওখানেই আছে।” 

ওরা সবাই বাগানের রাস্তা ধরে এগোতে লাগলো পুকুরের দিকে। পুকুরের কাছাকাছি যত এগিয়ে আসছিল ত্রিলোকেশের চোখ মুখ ততই কুঁচকে যাচ্ছিল বেশি করে। অবশেষে পুকুরের সামনে পৌঁছে চোখ বন্ধ করলেন তিনি, মাথার দুপাশের রগগুলো দপদপ করতে শুরু করলো তাঁর। অনেকক্ষণ ওভাবে স্থির থাকার পর চোখ খুললেন তিনি, উশখুশ করে এতক্ষণ সময় গুনতে থাকা ছেলেমেয়েগুলো এবার নড়েচড়ে উঠলো কিন্তু কেউই কোনো কথা বললো না। পুকুরের দিকে আবার কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন ত্রিলোকেশ, তারপর হেমন্তের দিকে ঘুরে বললেন, “বাড়ির মালিক আসছেন?”

  “হ্যাঁ দাদু। আমি বলেছি আমার বাড়িটা খুব পছন্দ হয়েছে তাই এডভান্স দিয়ে এক বছরের কন্ট্র্যাক্ট করতে চাই।”

  “হুম। তিনি এলে আগে তাঁর কথা শুনতে হবে।”

  “কেমন বুঝছেন দাদু?”

  “এখনো কিছু ঠিক বলতে পারছিনা তবে এটুকু বুঝেছি এখানে তার বাস দীর্ঘদিনের, খুব শক্তিশালী হয়ে উঠেছে সে। তাকে হারানো খুব সহজ হবে না…” শেষের কথাগুলো খানিকটা স্বগতোক্তির স্বরে বললেন ত্রিলোকেশ।



   বাঁশের গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন দুলাল চ্যাটার্জি। কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে তার, এ বাড়িটার কাছে এলেই অস্বস্তিটা হয় তার কিন্তু আজ যেন আরও বেশি করে কেমন লাগছে। ওই হেমন্ত বলে ছেলেটা বাড়িটা একেবারে এক বছরের জন্য নিতে চায়, ওর কিছু হয়নি কাল! ও ঠিক আছে! 


  দরজায় কড়া নাড়ার আগেই খুলে গেল সেটা, হেমন্ত একটা বাঁকা হাসি হেসে বললো, “ভেতরে আসুন দুলাল বাবু।” একটা ঢোঁক গিলে ওর পেছন পেছন ঢুকলেন দুলাল চ্যাটার্জি। একটা মাদুর দেখিয়ে হেমন্ত তাকে বসতে অনুরোধ করলো, “চেয়ার তো নেই একটু কষ্ট করে মাটিতেই বসতে হবে তাই।”

  “না না ঠিক আছে।” মাদুরে বসলেন দুলাল বাবু। আর সঙ্গে সঙ্গে চা নিয়ে ভেতরে ঢুকলো বিনি। হেমন্ত বললো, “আমার স্ত্রী বিনীতা। আপনি হয়তো ওকে চেনেন না কিন্তু ও আপনাকে চেনে ভালো করেই।”

  “আমাকে চেনে!”

  “হ্যাঁ, আর ও আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চায়। 

বলো বিনি।”

  “দুলাল বাবু আমার বাবা কোথায় আপনি জানেন?”

  “মানে!”

  “হুম। বলছি দুলাল বাবু আমার বাবার নাম ছিল আনন্দ সিনহা। আপনার এই বাড়িতে এসেই আমার বাবা নিখোঁজ হয়ে যান, আপনি নিশ্চয় জানবেন আমায় বাবা কোথায়।”

 চমকে উঠলেন দুলাল চ্যাটার্জি, “কি উল্টোপাল্টা বলছেন আপনি! আ… আপনার বাবা কোথায় আমি কি করে জানবো!’

   “আচ্ছা ওর বাবা কোথায় সেটা নাহয় জানেন না কিন্তু আমার স্বামী কোথায় সেটা তো নিশ্চয় জানেন। আমার স্বামীর নাম সাত্যকী চক্রবর্তী।” কথাগুলো বলতে বলতে ঘরে ঢুকলো শ্যারেন। ওকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠলো দুলাল চ্যাটার্জি। 

  “কি দুলাল বাবু চিনতে পারছেন আমায়?” শ্লেষ মিশ্রিত গলায় বলল শ্যারেন। দুলাল চ্যাটার্জি ঘামছেন ক্রমাগত, গলাটা শুকিয়ে যাচ্ছে তাঁর। 

এরপর ঘরে ঢুকলেন ত্রিলোকেশ। তিনি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “আর কিছু লুকিয়ে লাভ নেই দুলাল বাবু। বলে দিন আপনি যা যা জানেন। একটা এরকম বাড়ি বারবার ভাড়া দিয়ে কত লোকের ক্ষতি করেছেন সে বিষয়ে কোনো ধারণা আছে?”

 “কি উল্টোপাল্টা বলছেন আপনারা? আমাকে চক্রান্ত করে ডেকে এনেছেন এখানে…!”

 “চক্রান্ত করে বাড়িটা ভাড়া দেওয়া তো আপনার কাজ।”

 “দেখুন দুলাল বাবু আপনি যদি সব খুলে বলেন তাহলে দাদু আমাদের সাহায্য করতে পারবেন। আচ্ছা আপনার কি ভালো লাগে আপনার বাড়িতে এভাবে…”

 “আপনি নির্ভয়ে সব বলুন দুলাল বাবু। আমি কথা দিচ্ছি কোনো ক্ষতি হবেনা আপনার।” ত্রিলোকেশের কথায় মুখ তুলে একবার তাঁর দিকে তাকালেন দুলাল চ্যাটার্জি, তারপর দু’মিনিট কি যেন একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “আপনি কি তান্ত্রিক?”

  “না। তবে অতিপ্রাকৃতিক বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করা আর তার সমাধানের চেষ্টা করা আমার কাজ। তাই আমাকে বলতেই পারেন সব কিছু।”

 “কিন্তু আমি যদি বলতে যাই তখন না জানি ও কি ক্ষতি করে দেবে আমার!”

 “আপনার ভয় নেই আমি আমাদের সকলের সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছি ইতিমধ্যেই। তাই নির্ভয়ে বলুন, কোনো ক্ষতি হবেনা আপনার। ভরসা রাখুন।”

আবার ঢোঁক গিললেন দুলাল চ্যাটার্জি, তার মনে দোলাচল। একগ্লাস জল চাইলেন তিনি, তারপর জল খেয়ে বললেন, “এসব বলতে গেলে পারিবারিক কেচ্ছার কথা বেরিয়ে যাবে। কি করে বলবো আমি!”

 “এতগুলো মানুষের জীবন নষ্ট করে আপনি এখনও আপনার পারিবারিক কেচ্ছার কথা ভাবছেন! ছিঃ..” চিৎকার করে উঠলো বিনি।

 “আচ্ছা আচ্ছা আমি বলছি সব। আসলে আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারিনা, তাও চেষ্টা করছি যতটা সম্ভব গুছিয়ে বলার। 

  এই ঘটনার সূচনা হয় আমার দাদুর হাত ধরে। আমার দাদুর বাবা ছিলেন শ্রীকান্তপুরের জমিদার, আপনারা হয়তো জায়গাটার নাম শোনেননি কেননা এখন ওখানটা ভেঙে গিয়ে আলাদা আলাদা নাম পেয়েছে। যাইহোক, যে সময়ের কথা বলছি সে সময় এক এক করে সব জমিদাররা ক্ষমতা হারাতে শুরু করলেও আমার দাদুর বাবা নিজের বুদ্ধি আর বিচক্ষণতার জেরে বহাল তবিয়তেই জমিদারি সামলাচ্ছিলেন। ওনার ছিল তিন ছেলে, তিন ছেলেকেই উনি উচ্চ শিক্ষা দিয়েছিলেন যাতে তার অবর্তমানে ছেলেরাও দক্ষতার সঙ্গে জমিদারি সামলাতে পারে। কিন্তু মানুষের সময় সবদিন সমান থাকেনা, আমার দাদুদের ভাগ্যেও বিপর্যয় নেমে এলো। হঠাৎ করে কলেরায় মারা পড়লেন দাদুর দুই দাদা, বেঁচে গেলে শুধু দাদু। এদিকে দুই ছেলেকে হারিয়ে আমার বড়বাবাও দিশেহারা হয়ে পড়লেন, দোর্দণ্ডপ্রতাপ মানুষটার মনটা দুর্বল হয়ে গেল। সবেধন নীলমণি আমার দাদুকে এবার তিনি শাসনে রাখতে ভুলে গেলেন, শুধু আদর আহ্লাদ দিয়ে এমন করলেন যে অল্প বয়সেই দাদুর চারিত্রিক অধঃপতন ঘটতে লাগলো। যৌবনে বিভিন্ন নেশার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন তিনি, এমনকি তার মধ্যে সুন্দরী রমণীর নেশাও বাদ ছিল না। দাদু যখন পুরোপুরি অধঃপতনে গেছেন তখন বড়বাবার টনক নড়ল, তিনি আবার একটু একটু করে রাশ টানার চেষ্টা করতে লাগলেন। দাদু আর যাইহোক নিজের বাবাকে যমের মত ভয় করতেন তাই বাবা কিছু বারণ করলে প্রকাশ্যে আর সে জিনিস করতেন না। তারপর দাদুর বিয়ে হলো, এদিকে বড় বাবাও অথর্ব হয়ে পড়লেন, তখন জমিদারির দায়িত্ব এলো দাদুর হাতে। নেহাত মন্দ কাজ করছিলেন না তিনি, মোটামুটি সব স্থিত হয়েও এসেছিল কিন্তু এরই মাঝে বড় বাবা মারা গেলেন। দাদুর দিকে নজর রাখার আর কেউ রইল না, এবার সম্পূর্ণ তার একার রাজত্ব। বড় বাবা মারা যাওয়ার কয়েক বছর পর অবধিও সব ঠিক ছিল কিন্তু তারপর…”

  “তারপর কি?”

   “তারপরেই হঠাৎ দাদুর নজরে এলো নয়নিকা, বায়োস্কোপের এক অভিনেত্রী। দাদু বায়োস্কোপ পাগল ছিলেন আর …”

দুলাল চ্যাটার্জি কথা শেষ করার আগেই দুম করে ঘরের দরজাটা খুলে গেল, এক ঝাঁক ধুলো ভর্তি হাওয়া এসে ঘরময় ভরে গেল। সেদিক থেকে সবার দৃষ্টি পড়তে না পড়তেই জানালার পাল্লাগুলো সব সশব্দে খোলা আর বন্ধ হতে লাগলো, বিনির নতুন সংসারের সম্বল স্বল্প কটা বাসন সশব্দে পড়তে লাগলো ঠুং ঠাং করে… সব মিলিয়ে এক বিশ্রী অবস্থা, সবার কানে তালা ধরে যাওয়ার জোগাড়। দুলাল চ্যাটার্জি কাঁপছেন ঠকঠক করে, অবাক বাকি সবাইও। বিভৎস শব্দে কারুর কথা শোনা ভার, তাও ত্রিলোকেশ বললেন, “দুলাল বাবু আপনি বলতে থাকুন, একদম ভয় পাবেন না। আপাতত ও আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবেনা, তবে শিগগির বলুন কেননা বেশিক্ষণ ওকে আটকে রাখা সম্ভব হবে না।” 

দুলাল চ্যাটার্জি তাও চুপ করে রইল। “কি হলো বলুন, চুপ করে আছেন কেন?” ধমকে উঠলেন ত্রিলোকেশ। ধমকে কাজ হলো, জগ থেকে আরও খানিকটা জল খেয়ে আবার বলতে শুরু করলেন দুলাল চ্যাটার্জি, “আমার দাদু সিমলা গিয়ে এক সাহেবের কটেজ দেখে ভারী মুগ্ধ হয়েছিলেন তাই অনেক খরচা করে এখানের এই বাড়িটা বানান। নাম রাখেন “মেঘমঞ্জরী”। মাঝে মাঝে এখানে এসে থাকতেন...”

 “কি হলো? তারপর বলুন।”

 “হুঁ বলছি। ভয় লাগছে খুব।”

 “আপনাকে তো বলছি কোনো ভয় নেই। বলুন তারপর কি হলো।”

 “বিয়ের পরও দাদুর চরিত্রের দোষ পুরোপুরি যায়নি, খারাপ মেয়ে মানুষের কাছে যাতায়াত করতেন। কিন্তু এবারের ব্যাপারটা গুরুতর। নয়নিকা নামের ওই অভিনেত্রীকে সবার অলক্ষ্যে এনে তুললেন এই বাড়িতে। এরপর এখানেই পড়ে থাকতেন বেশিরভাগ সময়; এর ফলে জমিদারির অবস্থা পড়ে এলো, টাকা এদিক ওদিক হতে থাকলো। আর অন্যদিকে ঠাকুমারও মনে সন্দেহ জাগলো, তিনি নিরক্ষর হলেও কি হবে একেবারে বোধ বুদ্ধিহীন ছিলেন না। গোপনে তিনি অনুসন্ধান করে জানতে পারলেন সব। স্বভাবতই তিনি মেনে নিলেন না এই অনাচার, দাদুর সাথে বিরোধ বাধলো তার। ঠাকুমার বাবাও একজন প্রতাপশালী লোক ছিলেন, তিনিও জামাইকে শাসালেন। এদিকে আবার ওই সময় নয়নিকার গর্ভে এলো দাদুর সন্তান। সেও চায়না তার সন্তান জারজ বলে পরিচিত হোক, তাই সে জোর করতে থাকলো দাদুকে বিয়ে করার জন্য। দাদুর সাথে তারও জোর বিরোধ বাধলো, সে বিভিন্ন ভাবে দাদুকে শাসাতে থাকলো। এদিকে দাদু জানেন নয়নিকাকে বিয়ে করলে তার সমূহ বিপদ; আমার বড় জ্যেঠু ততদিনে বেড়ে উঠেছেন কাজেই ঠাকুমার পক্ষে প্রজাদের সাহায্য নিয়ে দাদুকে সরিয়ে জ্যেঠুকে জমিদারির দায়িত্বে বসানো কোনো অসম্ভব ব্যাপার নয়, বরং দাদু নিশ্চিত যে নয়নিকা থাকলে এটাই হবে। সুতরাং দাদু মনে মনে এক ছক কষলেন। একদিন পরিকল্পনামাফিক এই বাড়িতে এসে ঠাকুরকে সামনে রেখে নয়নিকার সিঁথি রাঙিয়ে দিলেন। নয়নিকাও ভারী খুশি, তার ছেলে এবার পিতার নাম পাবে। কিন্তু দাদুর ছিল অন্য প্ল্যান, এভাবে পুনরায় নয়নিকার বিশ্বাস অর্জন করে একদিন রাত্রে দিলেন তার খাবারে বিষ মিশিয়ে। ফলে যা হওয়ার তাই হলো, কিছুক্ষণ পরেই নয়নিকা ছটফট করতে করতে মারা গেল, শেষ হয়ে গেল তার গর্ভস্থ সন্তানও। দাদু এবার ওর দেহটাকে একটা পাথরের সঙ্গে বেঁধে ফেলে দিলেন পুকুরের জলে। কেউ জানতে পারলোনা একটা জলজ্যান্ত মানুষ কোথায় উধাও হয়ে গেলেন।

কিন্তু এসবের মাঝেও আরও কিছু বাকি ছিল… ভয়ঙ্কর কিছু।”

  “কি সেটা?”

  “নয়নিকার বাবা ছিলেন একজন পিশাচসিদ্ধ তান্ত্রিক, সমাজের সব বন্ধন ছিন্ন করলেও মেয়ের ভালোবাসার বাঁধন তিনি সম্পূর্ণ ছিন্ন করতে পারেননি। তাই দীর্ঘদিন নিরুদ্দেশ থাকার পর হঠাৎ একদিন এখানে মেয়ের সাথে দেখা হয়ে যায় তাঁর, সেই থেকে মাঝে মাঝেই দেখা করতেন তারা। দাদু এই ঘটনা জানতেন না, জানলে হয়তো পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারতো। যাইহোক যখন এসব ডামাডোল চলছিল তখন নয়নিকার বাবা মেয়েকে কিসব মন্ত্র দিয়ে যান যাতে কোনোরকম দুর্ঘটনা ঘটলেও মেয়ের অশরীরী আত্মা বদলা নিতে পারে। আসলে তান্ত্রিক তো তাই বোধহয় মেয়ের পার্থিব শরীরটাকে বাঁচানোর চেয়েও অপার্থিবটাকে রক্ষা করা তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল। ভবঘুরে মানুষ ছিলেন তিনি, এ শ্মশান সে শ্মশান ঘুরে বেড়ানো ছিল তার কাজ। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে জেনে নিশ্চিন্ত মনে তিনি চলে যান অন্যত্র।”

  “তারপর?”

  “তারপরেই শুরু হয় সব ভয়ঙ্কর ঘটনা… দাদু হঠাৎ করে একদিন রাত্রে রক্ত বমি করতে করতে মারা যান, ডাক্তার ডাকারও সময় পাওয়া যায়নি। প্রথমে সবাই ভাবে যে কোনো রোগের কারণে হয়তো এমন হয়েছে। যাইহোক, এর কিছুদিন পরে আমার বড় জ্যেঠু এই বাড়িতে ঘুরতে আসেন, ওনার ইচ্ছে ছিল বাড়িটাকে নিয়ে কিছু একটা করবেন কেননা ততদিনে জমিদারির আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। কিন্তু এখানে আসার পর জ্যেঠুও সেই একই রকমভাবে রক্ত বমি করতে করতে মারা গেলেন। ঠাকুমা প্রমাদ গুনলেন, ওনার স্পষ্ট মনে হতে লাগলো সবার অলক্ষ্যে কিছু একটা ঘটে চলেছে যা কেউ ধরতে পারছেনা। এবার ঠাকুমা আমার পরিবারের প্রবীণ পুরোহিতের কাছে গেলেন, তিনি বললেন আমাদের পরিবারের ওপর অশুভ শক্তির নজর পড়েছে। সুতরাং বিধান হিসেবে একটা বড়সড় যজ্ঞের আয়োজন করা হলো কিন্তু যজ্ঞ চলাকালীন পুরোহিত মশাইয়ের মুখ দিয়ে রক্ত উঠে তিনিও মারা গেলেন। এই ঘটনায় ঠাকুমা সুদ্ধ বাড়ির সকলে ভীষন ভয় পেয়ে গেল, কেউ বুঝে উঠতে পারলোনা কি হচ্ছে ব্যাপারটা। চাকর বাকররা সব এক এক করে ছেড়ে যেতে শুরু করলো।

এদিকে, আমার দাদুর সবসময়ের সঙ্গী ছিলেন, শম্ভুনাথ। দাদু মারা যাওয়ার পর তিনি কাশি চলে গিয়েছিলেন। সেখানে হঠাৎ কাকতলীয়ভাবে তাঁর দেখা হয় নয়নিকার বাবার সঙ্গে, তন্ত্র সাধনা ছেড়ে এখন তিনি এমনি সাধুদের সঙ্গে থাকেন। শম্ভুনাথ তাকে না চিনলেও তিনি ঠিকই চিনলেন শম্ভুনাথকে। এসে জানতে চাইলেন নিজের মেয়ের কথা; শম্ভুনাথ কি উত্তর দেবে তাঁকে! সে প্রথমে সুকৌশলে এড়িয়ে গেল ব্যাপারটা কিন্তু বৃদ্ধ তান্ত্রিকও এতো সহজে ছাড়ার পাত্র নন, তিনি রোজ এসে হানা দেন। এদিকে দাদুর সঙ্গে পড়ে শম্ভুনাথ অনেক পাপ করেছে জীবনে, এখন কাশিতে গিয়ে তার মনে একটু একটু করে অনুশোচনা জাগছিল তাই শেষমেশ একদিন সব সত্যি বলে দেয় বৃদ্ধকে। সব শুনে বৃদ্ধ তাঁর হতভাগ্য মেয়ের কথা ভেবে চোখের জল ফেলেন কিন্তু সেই সঙ্গে শিউরে ওঠেন এই কথা ভেবে যে মৃত্যুর পরেও তাঁর মেয়ের আত্মা তো মুক্তি পাবেনা, প্রতিশোধ স্পীহায় নিয়মিত দগ্ধ হবে সে। বৃদ্ধ শম্ভুনাথের কাছে জানতে চাইলো দাদুর কথা, যখন শুনলো দাদু মৃত তখন সে প্রমাদ গুনলো। শম্ভুনাথকে জানালো আমাদের পরিবারের সমূহ বিপদের কথা। শম্ভুনাথ বৃদ্ধকে নিয়ে তড়িঘড়ি শ্রীকান্তপুরে ফিরে এসে শুনলেন একের পর এক দুঃসংবাদ। বৃদ্ধ তান্ত্রিক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শুধু, আত্মাকে পিশাচে পরিণত করে বন্দি করার কৌশল জানলেও তাকে মুক্ত করার উপায় ছিল তার অজানা। তাও তিনি শেষ চেষ্টা করতে এসেছিলেন এখানে কিন্তু নিজের তৈরি পিশাচিনির হাতেই বৃদ্ধকে মরতে হয়। তবে মরার আগে বৃদ্ধ বলে যান যে প্রতি বছর নয়নিকার পিশাচের কাছে একটা করে বলি দিতে হবে, তবে এই বলি অন্যরকম। কোনো স্ত্রীর কাছ থেকে তার স্বামীকে বা কোনো প্রেমিকার কাছ থেকে তার প্রেমিককে কেড়ে নিয়েই ও শান্ত হবে। যে ওর বলি হবে তার প্রিয়জনকে ছটফট করে কাঁদতে দেখেই ওর শান্তি। যেহেতু ও নিজে ভালোবেসে ঠকেছে তাই অন্য কাউকে একই ভাবে কষ্ট পেতে দেখলে, যন্ত্রণার আগুনে পুড়তে দেখলে ও তৃপ্তি পাবে। আর যদি সময় মত বলি না পায় তাহলে আমাদের পরিবারের কোনো না কোনো সদস্য ওর শিকার হবে।”

  “ওহ মাই গড! আই কান্ট বিলিভ।”

  “কিন্তু এটাই সত্যি শ্যারেন ম্যাডাম। দু’বার আমরা কাউকে পাঠাইনি এই বাড়িতে আর সেই দুবারে আমার ছোটো কাকা আর জ্যেঠতুতো দাদা মারা যায় ওই একই ভাবে। 

জানি আপনারা আমাকে অপরাধী ভাবছেন, ভাবছেন কি নিষ্ঠুর আমি তাই না? কিন্তু বিশ্বাস করুন নিজের পরিবারকে বাঁচাতে… আগে সহজেই ভাড়াটিয়া পেয়ে যেতাম কিন্তু ক্রমে বাড়িটার বদনাম রটতে শুরু করলো, কতদিন আর সব চাপা থাকে! তাই এবার আমরা এখান থেকে দূরের জায়গাগুলোয় বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করলাম। অনেক লোক ফোন করতো, কেউ সব জানতে পেরে গেলে আর আসতো না, আবার কেই খোঁজ খবর না করে চলে আসতো। লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাড়িটাকে এতো বছর ধরে নিয়মিত পরিচর্যায় রাখতে হয়েছে… উফফ… আপনারা হয়তো বিশ্বাস করবেন না কিন্তু ভেতরে ভেতরে গুমরে মরতে থাকি প্রতিমুহূর্তে, মনে হয় এই পাপের জন্য তো নরকেও ঠাঁই হবেনা আমাদের।”

  “হুম, যত দিন গেছে তত শক্তিশালী হয়েছে ও। যত মানুষকে ওর শিকার বানাতে পারছে ততই ওর শক্তি বাড়ছে ক্রমশ।”

  “তাহলে দাদু এর থেকে মুক্তির কি উপায় নেই কিছু?”

  “উপায় কেন থাকবে না দাদা, উপায় আছে, কিন্তু সে উপায় বড় কঠিন। আমার কটা দিন সময় লাগবে কিভাবে কি করতে হবে সেই ব্যবস্থা করতে, ভেবে চিন্তে কিছু করতে হবে।”

  “কিন্তু তার মধ্যেই যদি ও আমার পরিবারের কোনো ক্ষতি করে?”

  “ভয় পাবেন না দুলাল বাবু, এই পাথরটা রাখুন। এটা আজ বাড়ি গিয়ে ঘরের ঠিক মধ্যস্থলে রেখে দেবেন, আশা করি ও আপনার বাড়িতে প্রবেশ করতে পারবেনা। কিন্তু এখন আমাদের কাছে চ্যালেঞ্জ হলো যে ওর এই নিজের বাসস্থান থেকে কিভাবে ওকে সরানো যায়!


                      ৫


“কি বাড়িটা পছন্দ হয়েছে?”

“ইটস অসম ডিয়ার, নামটা তো আরও সুন্দর, ‘মেঘমঞ্জরী’”।

“হুম বেশ আর্টিস্টিক নাম।

এখানে একটা পুকুরও আছে, দেখবে?”

“শিওর।”

পুকুরের ধারে এলো ওরা দুজন, ঝলমলে রোদ পড়ে অপূর্ব লাগছে জলটা। মেয়েটা আবদারের সুরে বললো, “চলো না পা ডুবিয়ে বসি।”

আঁতকে উঠলো ছেলেটা, “এই রোদে! পাগল নাকি! মাথা ধরে যাবে তো। নানা সন্ধ্যেবেলায় বরং বসবো, এখন ঘরে চলো।”


  সন্ধ্যেবেলায় আর পুকুরের ধারে বসা হয়নি ওদের, মেয়েটা ক্রমাগত বলে যাচ্ছিল একটা আঁশটে গন্ধ যেন এসে লাগছে ওর নাকে। ছেলেটা তখন আমল দেয়নি ওর কথায়, কিন্তু এখন রাত্রে ঘুম ভেঙে যেতে ছেলেটারও মনে হলো সত্যিই একটা আঁশটে গন্ধ যেন ভাসছে বাতাসে। ছেলেটা মুখ বিকৃত করে বিছানা ছাড়লো, বাথরুমের দিকে যেতে গিয়ে হঠাৎ তার নজর পড়লো জানালার দিকে, আশ্চর্য মেয়েটা এতো রাত্রে পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে কি করছে। তবে যাই করুক এই চাঁদনী রাতে ওর চাঁদকে এরকম প্রকৃতির কোলে দেখতে অপূর্ব লাগছে ছেলেটার। সে গুটিগুটি পায়ে পেছনের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। তার চাঁদ তাকে ডাকছে, এ ডাক উপেক্ষা করার সাধ্যি কি তার আছে! ছেলেটা কাছে আসতেই মেয়েটা ঘুরে দাঁড়ালো ওর দিকে, তারপর ভরা জ্যোৎস্নার মত উচ্ছল হাসি নিয়ে মাথা রাখলো ওর বুকে। কিন্তু একি মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গেই আবার ছিটকে সরে গেল কেন! ছেলেটা অবাক হয়ে দেখছে মেয়েটাকে, মেয়েটার চোখ মুখ কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছে আস্তে আস্তে, শরীরের চামড়াটা গলতে শুরু করেছে হঠাৎ, বিকৃত হয়ে আসছে ওর শরীর… হতভম্ব ছেলেটা এবার কাঁপতে শুরু করেছে, ওর বোধ বুদ্ধি যেন আর কিছুই কাজ করছেনা। পিশাচিনীটা ওর কঙ্কালসার হাতটা বাড়িয়ে চেপে ধরল ছেলেটার গলা, ওর আঙুলগুলো ক্রমশ বসে যাচ্ছে ছেলেটার গলায়, দম বন্ধ হয়ে আসছে তার, সব বোধহয় শেষ হয়ে গেল…


  আঁ… আঁ… আঁ… আর্তনাদ করে ছেলেটার গলাটা হঠাৎ ছেড়ে দিল পিশাচিনীটা। ছেলেটা দেখলো পিশাচিনীটার পেছনে কখন যেন নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে মেয়েটা, ওর চোখে মুখে যেন আগুন জ্বলছে, মেয়েটার এই রূপ ছেলেটা আগে কখনো দেখেনি। মেয়েটা পেছন থেকে পিশাচিনীর শরীরে আমূল বিদ্ধ করে দিয়েছে একটা ছোট্ট শলাকার মত জিনিস; পৈশাচিক আর্তনাদে মুখরিত হচ্ছে আকাশ বাতাস, ছটফট করছে পিশাচিনীটা, মাঝে মাঝে যেন তার শরীরে আগুন জ্বলে উঠছে, ধোঁয়ার মত কি যেন বেরোচ্ছে তার শরীর থেকে, সেই সঙ্গে বিশ্রী একটা গন্ধ। ছটফট করতে করতেই

 পুকুরের জলে পড়ে গেল সে, বন্ধ হলো আর্তনাদ, আবার নিস্তব্ধ হলো চারিপাশ। 

“সার্থক…” ছেলেটার দিকে ছুটে এলো মেয়েটা, ওর গলায় হাত রাখলো আলতো করে। সার্থকের গলাটা এখনো লাল হয়ে আছে, পাঁচটা আঙুলের দাগ স্পষ্ট, ঢোঁক গিলতেও যেন কষ্ট হচ্ছে। হঠাৎ মেয়েটা ওর গলা থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল চট করে; সার্থক চমকে উঠে দেখলো সেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন ত্রিলোকেশ, হেমন্ত, বিনি, শ্যারেন এবং দুলাল চ্যাটার্জিও। ত্রিলোকেশ হতাশ গলায় বললেন, 

“এই মন্ত্রপুত বিভূতিটা ওর শরীরে দিতে পারলি নারে দাদা, ওটাও যদি দিতে পারতিস তাহলে একেবারে নিশ্চিত হতে পারতাম।”

 “সরি দাদু আসলে আমি হঠাৎ এতো কাছ থেকে এরকম দেখে…”

 “বুঝতে পারছি দাদা, ঘাবড়ানোটাই স্বাভাবিক। সত্যি বলতে তোদের এই বিপদের মুখে ঠেলতে আমারও যে কম ভয় করছিল তা নয় কিন্তু আর কোনো উপায়ও তো ছিলোনা। যাইহোক, বৃষ্টি দিদিভাই তুমি কিন্তু চমৎকার কাজ করেছো।”

 “থ্যাংক ইউ দাদু।”

  “আপনাদের সাথে বৃষ্টি দিদিভাইয়ের পরিচয় করিয়ে দিই, বৃষ্টি দিদিভাই খুব শিগগির আমাদের পরিবারের একজন স্থায়ী সদস্য হতে চলেছেন।” ত্রিলোকেশের কথাটা শুনে বৃষ্টি মুচকি হেসে লজ্জায় মুখটা নামিয়ে নিল, সার্থকের মুখেও এতক্ষণ পরে হাসি ফুটলো।

  “দাদু আর ও কোনোদিনও কারুর ক্ষতি করতে পারবে না?” জিজ্ঞেস করলো বিনি।

 “যতক্ষণ শলাকাটা ওর শরীরে আছে ততক্ষণ তো নয়ই। ওটা আমার গুরুদেবের কাছ থেকে প্রাপ্ত মন্ত্রপুত শলাকা, আমার গুরুদেব যেখানে থাকতেন সেখানে শয়তানকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য এই মন্ত্রপুত শলাকা ব্যবহার করেন পুরোহিতদেরা। আমাকে কয়েকটা দিয়েছিলেন গুরুদেব, এই নিয়ে দুটো কাজে লেগে গেল। এবার দেখা যাক বাকি গুলো আর কখনও লাগে কিনা।”

  “আমার পরিবারের ওপর আর কোনো বিপদ হবে না তো?”

  “আশা করা যায় তাই। তবে আমার একটা প্রস্তাব আছে দুলাল বাবু।”

  “কি প্রস্তাব?”

  “আপনি এই পুকুরটা বুজিয়ে ফেলুন, আর বাড়িটাও ভেঙে দিন। পরিবর্তে এখানে অন্য কিছু তৈরি করুন।”

  “অন্য কিছু কি তৈরি করবো!”

  “আঙ্কল আমার মনে হয় এরকম একটা জায়গায় পার্ক তৈরি হলে বেশ হবে। পার্কের সৌন্দর্য সবাইকে এই ভয়ঙ্কর স্মৃতিটা ভুলতে সাহায্য করবে।”

  “বলছো! তবে তাই চেষ্টা করবো নাহয়।”


*****************************************************************

শেষ?


পশ্চিম আকাশের রক্তিম আভাটা পুরোপুরি মেটেনি এখনো, কিন্তু আশেপাশে সন্ধ্যে নামছে একটু একটু করে। “মেঘমঞ্জরী” পার্কের একটা বেঞ্চে বসে এক প্রেমিক যুগল প্রেমালাপে মত্ত…


“এই পার্কটা কি দারুণ না?”

“হ্যাঁ গো।” 

“প্রেম করার জন্য এক্কেবারে আইডিয়াল।

হেঃ হেঃ…”

“ধ্যাৎ তুমি না!” মেয়েটা লজ্জা পেয়েছে দেখে ছেলেটা আরও দুস্টুমি করে তাকে কাছে টানার চেষ্টা করলো, আর তখনই মেয়েটার নজরে পড়লো কিছু, “এটা কি গো!” 

এই বলে মাটি থেকে যে জিনিসটা তুললো সেটা একটা ছোট্ট শলাকার মত জিনিস কিন্তু তার গায়ে বিচিত্র সব ছবি খোদাই করা। ভ্রু কুঁচকে গেল মেয়েটার, “এটা কি হতে পারে বলোতো?”

“চুলের কাঁটা?”

“তাই কি? মনে তো হচ্ছে না সেরকম...”

কুড়িয়ে পাওয়া বস্তুটা নিয়ে যখন ওরা গবেষণায় ব্যস্ত তখন ওদের অলক্ষ্যে মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো একটা কঙ্কালসার হাত, নিঃশব্দে সে ধরে ফেললো ছেলেটার পা। ছেলেটা ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই হ্যাঁচকা একটা টান, তারপর?

 সব অন্ধকার...

#horror #bhoy #meghmanjari

Rate the content


Originality
Flow
Language
Cover design

Comments

Post

Some text some message..