Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Suroshri Paul

Drama Tragedy


4.6  

Suroshri Paul

Drama Tragedy


রাণী আছে রাজ্য কই?

রাণী আছে রাজ্য কই?

6 mins 2.3K 6 mins 2.3K

"আরে ধর ধর ধর! মেয়েটা পরে গেল যে! হঠাৎ হলটা কি!", সুভাষিণী ম্যাডামের আর্তস্বরে সম্বিৎ ফিরলো পাশের রুমে বসে থাকা শ্রাবনবাবুর। শ্রাবনবাবু, অর্থাৎ শ্রাবণ ভট্টাচার্য, বাংলায় পি.এইচ.ডি. করেও এক বেনামি সরকারি প্রাইমারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, যিনি কিনা চিরকালের আনমনা ও ভবঘুরে,এতক্ষন বাইরের জানালার দিকে তাকিয়ে বসন্তের সোনালী রৌদ্রের ঔজ্জলতায় উত্তপ্ত কালচে মাটি কিভাবে হাজার আলোর মাঝেই এক পশলা বর্ষাকে বুকে জড়িয়ে ধরে এক উদ্দাম অথচ শান্ত উৎসবে মেতে উঠেছে, সেই সুখই আস্বাদন করছিলেন। বাইরের এত হইহই-এর কারণ বুঝতে না পেরে তিনি পাশে ক্লাস ফাইভের ঘরে উঁকি মারতে গিয়ে দেখলেন ততক্ষনে একরকম গণসমাবেশ তৈরি হয়েছে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কোলাহলে। পাশে দাঁড়ানো গ্রুপ-ডি কর্মচারী গণেশের থেকে জানতে পারলেন ওই ক্লাসেরই একটি মেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে। কারণ জানতে চাইলে গণেশ চুপ হয়ে যায়, তার জানা নেই। চারিদিকের ভাবগতিক বোঝার জন্য তিনি আশেপাশে তাকাতে থাকেন। তিনি খেয়াল করলেন বেশ কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকা বাচ্চাটিকে ঘিরে কেউ দাঁড়িয়ে কেউ বসে রয়েছে। মেয়েটির মনে হলো হালকা হালকা জ্ঞান ফিরছে, সে চোখদুটি ম্লানভাবে তাকিয়ে রয়েছে অসহায়ের মতো, চারিদিকের এত কলরব তাকে ক্রমশ ভীত করে তুলছে। এদিকে কেউ তার চোখে মুখে জলের ছিটে দিচ্ছে, কেউ আবার হাত-পা ঘষে যাচ্ছে অনবরত --- অথচ কেউ তাকে একবার জিজ্ঞাসা করছেনা তার কোথায় সমস্যা হচ্ছে। এতকিছুর মাঝে হঠাতই ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন শ্রাবনবাবু; একেবারে মেয়েটির সামনে এসে দাঁড়ালেন এবার নিস্পলক চিত্তে। তাকে দেখে একটু অবাক হলেও সরে গিয়ে তাকে জায়গা করে দিলেন দুজন শিক্ষক। মেয়েটির শুকনো মুখের দিকে কিছুক্ষন চেয়ে থেকে তার সামনেই হাঁটু গেড়ে বসলেন সবার প্রিয় "শ্রাবন স্যার"। আলতো করে মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, " কি, পেটের সমস্যা বুঝি? কাল রাতের খাবার হজম হয়নি নাকি আজ কিছু খেয়ে আসোনি?" সেই মুহূর্তের জন্য কথা বলতে অপারক মেয়েটি হ্যা-সূচক মাথা নাড়ে এবং পরে জানায় তার আজ সকাল থেকেই বমি-বমি ভাব হচ্ছে। এরপর তাকে সমস্ত রকম সেবা-শুশ্রূষা করে ওষুধ খাইয়ে কিছুটা হলেও সুস্থবোধ করাতে সক্ষম হয় শিক্ষকমন্ডলী। কিন্তু উঠে এলো এক নতুন ঝামেলা। মেয়েটিকে তার বাড়ি কোথায় জানতে চাওয়া হলে সে যেই জায়গার কথা বলে তা স্কুল থেকে খুব বেশি দূরে না হলেও হাইরোডের থেকে অনেকটা ভিতরে। তাই কে তাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে এই নিয়ে যখন এক বড়সড় আলোচনা চলছে, তখনই সবার পিছনে থাকা ছোটখাটো চেহারার শ্রাবনবাবু তার হালকা স্বরে বলে ওঠেন, "আমি পৌঁছে দেবো"। সবাই একটু হকচকিয়ে গেল এই দেখে যে লোকটা কখনো কারোর সাতেও থাকেনা কারোর পাঁচেও থাকেনা, সেই ব্যক্তিই কিনা আজ একটি ছাত্রী যার কোনো আসন্ন বিপদ নেই তার জন্য এত উদ্বিগ্ন হচ্ছেন! তবে তিনি রোজ স্কুল স্কুটি করে আসতেন তাই তাকে সহজেই পৌঁছে দিতে পারবে এই ভেবে কেউ আর বেশি কথা বাড়ালো না। কিছুক্ষনের মধ্যেই শ্রাবনবাবু দশ বছরের ওই ছোট্ট মেয়েটিকে নিয়ে স্কুলের গেট পেরিয়ে রাস্তায় নামলেন। কাছেই দাঁড় করানো স্কুটিতে মেয়েটিকে বসিয়ে যখন নিজের হেলমেটটা পরে গাড়ি চালাতে যাবেন, এমন সময়েই হঠাৎ তার চোখ পড়ল গাড়ির বাঁদিকের আয়নাটায়। বাচ্চাটির মুখ দেখা যাচ্ছে; শুকনো মুখ, চোখের তলায় জমা কালি, ক্লান্ত অথচ উজ্জ্বল দুই চোখ, এই সবের মধ্যেই তিনি যেন এক পটু শিল্পীর তৈরি করা কোনো অপরূপ সৃষ্টির ছোঁয়া ও স্নিগ্ধতা অনুভব করেন বারবার। গাড়ির চাবি আর বের করা হলোনা, পকেটেই রয়ে গেল সেইদিনের জন্য। তিনি নেমে পড়ে পিছন ফিরে মেয়েটিকে উষ্ণ স্বরে বললেন, "কিরে মুক্তা, রিকশায় চড়ে বাড়ি ফিরবি নাকি আজ?" মেয়েটি মুখে কিছু বললো না ঠিকই, তবে তার মুখের একগাল স্বতঃস্ফূর্ত হাসিই সবটা বুঝিয়ে দিতে যথেষ্ট ছিল শ্রাবনবাবুকে। 

 

      রিকশা ডাকা হলে শ্রাবনবাবু মেয়েটিকে যত্ন করে বসিয়ে নিজে পাশের এক দোকান থেকে একটি ম্যাংগো ড্রিংক কিনে তার হাতে ধরিয়ে নিজেও উঠে পড়লেন। তিনি ভেবেছিলেন রিকশা চলতে শুরু করলে হয়তো তার পাশে বসে থাকা, নিভে যাওয়া প্রাণটি জীবন্ত বাতাসের দোলায় নিজেও কিছুটা জেগে উঠবে, হেসে উঠবে! সে হাসলো ঠিকই, তবে সেটা রাস্তার যানজটের উদ্দামতা দেখে নয়, তার মাস্টারমশায়ের দিকে তাকিয়ে। শ্রাবনবাবু তাকে জিজ্ঞেস করায় সে প্রসন্ন মনে বলে উঠল, "স্যার, নামটা যে আমার বড়ই পছন্দ হয়েছে, কিন্তু আপনি আমায় মুক্তা বলে ডাকলেন কেন? ওটা তো আমার আসল নাম নয়।" তার এই প্রশ্ন শুনে শ্রাবনবাবুর কিন্তু মুখের ভাবে কোনো পরিবর্তন হলোনা। বরং একটু হেসে তিনি অন্য দিকে তাকালেন। মনে হলো তিনি জেনি নিজের মনেই বলছেন, "ঝিনুকের আড়ালে যে বন্দি, মুক্তা তো তাকেই বলি!" এতকিছু কথা মেয়েটি কিছুই বুঝলোনা, তবুও তার মাস্টারমশাই খুশি হয়েছে ভেবে সে নিজেও মিষ্টি করে হাসলো। এরপর রীতিমতো গল্পের আসর জমে গেল গুরু-শিষ্যের মাঝে। নানান কথা হতে হতে শ্রাবনবাবু মুক্তাকে জিজ্ঞাসা করে তার বাড়িতে কে কে রয়েছে। এর উত্তরে সে বলে, "আমি তো গত চার বছর ধরে আমার দাদু-দিদার কাছেই থাকছি। বাড়িতে মানুষ বলতে আমরা এই তিনজনই আছি। কিন্তু সদস্য আরেকজন আছে, মিনু। জানো তো স্যার, মিনু না মাছের কাঁটা খেতে খুব পছন্দ করে!"

- "আর তোর মা-বাবা?"

-"বাবা তো সেই কবে চলে গেছে ছোটমা কে বিয়ে করে। আর মা, সেও তো চলে গেছে..."

-"তুই মায়ের সাথে থাকিসনা কেন? আর তোর বাবা তোকে রাখতে চায়নি?"

-"বাবা বিয়ে করার পরের দিন একবার ঘরে এসেছিল, মায়ের বিয়ের গয়না ফেরত নিয়ে ছোটমাকে দেওয়ার জন্য। মা রাজি হয়নি। তারপর কি হয় আমি জানিনা, বাবা আমাকে সেদিন ঘর থেকে বের করে দিয়ে ভিতর থেকে শিকল টেনে দিয়েছিল। মায়ের চিৎকার শুনতে পেয়েছিলাম শুধু, এক ঘন্টা পর যখন বাবা বেরিয়ে এলো তার হাতে একটা থলি ছিল, তার ভিতরে কিছু গয়না। আমি ছুটে মায়ের কাছে গিয়েছিলাম, কিন্তু তখন চারিদিকের সবকিছুই শান্ত। শুধু মায়ের মুখ দিয়ে অনবরত হালকা গোঙানির শব্দ হচ্ছিল, আমি ভয় পেয়ে পাশের বাড়ির চাচাজানকে ডেকে দিয়েছিলাম। তিনিই পরে মাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেন। পরে যখন মায়ের থেকে জানতে চাই, মা বলে তার পেটে আমার যে ভাই বা বোন রয়েছে, বাবার রূঢ় ব্যবহারে সেও নাকি দুঃখ পেয়ে খুব কাঁদছিল। তাই জন্যেই মায়ের তখন খুব কষ্ট হচ্ছিল। 

কিন্তু স্যার, আমার মনে হয় মা মিথ্যা বলতো। মায়ের কষ্ট একদিনের ছিলনা, মা সেদিনের পর থেকে রোজই কষ্টে থাকতো। ভালো থাকলে কি আর কারোর শরীর ভাঙতে শুরু করে! আমারো তখন আর কথা বলতে ভালো লাগতো না, তাই মায়ের সামনে চুপটি করে বসে থাকতাম। মা খালি বলতো, আমার যেন বোন না হয়, ভাই হয়; তবেই নাকি আমাদের সংসারে সুখ ফিরে আসবে। কিন্তু ভাই হয়নি, বোনই হয়েছিল। আমার খুব আনন্দ হয়েছিল সেদিন, বোনকে পুরো আমার মতো দেখতে! মা মনে হয় খুশি হয়নি, তাই তো বোনকে প্রথম কোলে নেওয়ার পরেও মা একবারো ওর দিকে ঠিকভাবে তাকায়নি। আমি ভেবেছিলাম আর বোধহয় গল্প করার সঙ্গীর আমার কোনোদিনও অভাব হবেনা, ভালো থাকব আমি, কিন্তু ওর সঙ্গ আমি শুধু আট মাস অব্দি পেয়েছিলাম। মা একদিন ওকে সাথে নিয়ে বাজারে গিয়েছিল, ফিরেছিল সেই সন্ধ্যাবেলায়, একা। আমি যখন বোনের কথা জিজ্ঞাসা করলাম, মা বলল, "বিক্রি করে দিয়েছি। টাকাও পেয়েছি অনেকগুলো।" মাকে সেদিন দ্বিতীয়বার আর শেষবারের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে দেখেছিলাম আমাকে জড়িয়ে। পরের সপ্তাহে মা আমায় দাদুর বাড়ি রেখে যায়, আর আসেনি আমাকে দেখতে, ঘরে নিয়ে যেতে। দিদার মুখে পরে শুনেছিলাম মা নাকি আরেকটা বিয়ে করেছে, আমার নাকি একটা ফুটফুটে ভাইও হয়েছে! মা মনে হয় এখন বেশ খুশি, ভাই হয়েছে তো, সংসারে নিশ্চই সুখ ফিরে এসেছে। তবে আমিও কিন্তু খারাপ নেই, দিব্যি ভালোই আছি।"

একনাগাড়ে এত কথা বলে মুক্তা বেশ হাঁপিয়ে গেছে, দম নিল এইবার শান্তিতে। শ্রাবনবাবু কি বলবেন ঠিক ভেবে পেলেন না, শুধু তিনি লক্ষ করলেন এই সমস্ত কাহিনীর বর্ণনা দেওয়ার পরেও কিন্তু ওইটুকু বাচ্চা মেয়েটির মুখে চোখে দুঃখের লেশমাত্র নেই; খুব স্বাভাবিকভাবেই তাকিয়ে আছে তার দিকে।তার সকল চিন্তা ভাবনার ঘোর কাটিয়ে দিয়ে মুক্তা আবারও বলে উঠলো, এবার একটু উচ্চস্বরে, "স্যার, আমার বাড়ি চলে এসেছে। আজ আসি তাহলে, কেমন?" শ্রাবনবাবু হঠাৎ চারপাশে তাকিয়ে বুঝলেন, রিকশা থেমে গিয়েছে।

- "আচ্ছা আয়। সাবধানে যাস।", থেমে থেমে বললেন তিনি। মুক্তা রিকশা থেকে নেমে বাড়ির দিকে হাটতে শুরু করলে পিছন থেকে আরেকবার শ্রাবনবাবুর গলা শোনা গেল, "ওই, তোর ভাল নামটা বলে গেলিনা তো!"

সে এবার থেমে, এক মুহূর্তের জন্য পিছন ফিরে যতটা সম্ভব চেঁচিয়ে বলে উঠলো, যাতে তার মাস্টারমশাই তার আওয়াজ শুনতে পায়, "আমি রাণী স্যার,.... রাণী!"


আকাশে তখন মেঘ জমেছে কালো, চারিদিকে প্রায় প্রায় অন্ধকার জমাট বেঁধে এসেছে। মনে হচ্ছিল ঘোর বর্ষায় সব ভেসে যাবে! কিন্তু দক্ষিণের মিঠে বাতাসের ছোয়ায় অনেকটা ধোঁয়াশা কেটে গেল। দু-এক পশলা বৃষ্টি যাও বা হল, তাও যেন এই রাণীর রাজ্যের মতোই বাষ্পীভূত হয়ে গেল; ক্ষনিকের মধ্যেই।


**পুনশ্চ - লেখাটি, গল্প হলেও সত্যি।

 

                


Rate this content
Log in

More bengali story from Suroshri Paul

Similar bengali story from Drama