Suroshri Paul

Drama Tragedy


4.1  

Suroshri Paul

Drama Tragedy


ইচ্ছেপূরণ

ইচ্ছেপূরণ

3 mins 1.3K 3 mins 1.3K

মিনির বয়স তখন কতই বা আর হবে, আট কিংবা নয়। নববর্ষের দিন বাবার সাথে ঘুরতে গিয়ে মিনি যখন জেদ ধরল যে তার খেলনার দোকানের সবচেয়ে বড় পুতুলটা চাই, তখন স্বরূপবাবু একটু ধমক দেওয়ার সুরেই বললেন, "মিনি, বাইরে বেরোলেই এমন বায়না করার অভ্যাসটা না ছাড়লে কিন্তু এবার আমি খুব বকবো। এইতো একমাস আগেই একটা সুন্দর পুতুল তোমার দিম্মা তোমাকে উপহার দিলো, আর তুমি কি করলে? দুদিনের মাথাতেই অমন একটা ভালো খেলনার হাত-পা সব আলাদা করে ফেললে!" মিনি তার বাবার চিরকালের "আদুরে পরী"; হ্যাঁ, আহ্লাদ করে মিনিকে ওই নামেই ডাকতেন স্বরূপবাবু। সেই আহ্লাদী বাবার আদুরে মেয়ে হঠাৎ এত কড়া কথা শুনে যেন আর নিজেকে সামলাতে পারেনা, অভিমান ভরা চোখের কোণে জল টলমল করতে থাকে। এবার মাঝরাস্তার মধ্যেই চিৎকার করে কেঁদে ওঠে মিনি, "হ্যাঁ, সব তো আমারই দোষ, আমিই তো সব নষ্ট করি। একটা পুতুলই তো ভেঙেছে, সেই কথা তুমি এখনো মনে রেখেছো! কিছু কথা তো ভুলে গেলেই পারো, বাবা!"


দশ বছরের ওপর সময় কেটে গেছে। কদিন পরেই মিনির উনিশে পা পড়বে। এখন বড় হচ্ছে মিনি, যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে দারুন রেজাল্ট নিয়ে ভর্তি হয়েছে সে। সাহিত্যচর্চা, লেখালেখিও এগোচ্ছে তুখোড় গতিতে। কদিন আগেই তার একটি লেখা দেশ পত্রিকায় প্রকাশের জন্য মনোনীত হয়েছে। এই খবর বাড়িতে জানাজানির পর থেকেই যেন উৎসাহ, বাহবা আর ভালোবাসায় ভরে গেছে তার চারপাশটা। সে নিজেও উত্তেজিত একটু মনে মনে, কেন না সে জানে তার এই লেখার হাত পুরোটাই পাওয়া তার বাবার থেকে, যার গত দুই-তিন দশকের সব লেখা হয়তো ডাইরির পাতায়-পাতায় কোনো না কোনো উইপোকার ভোগ্য হচ্ছে। "বাবার পছন্দ হবে তো লেখাটা? পড়ে কি বলবে বাবা? আচ্ছা, ছোটবেলার মতো আদর করবে আবার আনন্দে? কিন্তু যদি বাবার লেখাটা ভালো না লাগে!", হাজারো এমন চিন্তার ঘোরে কলেজ থেকে বাড়ি ফেরে মিনি, এই আশায় যে এতক্ষনে নিশ্চই সবার লেখাটা পড়া হয়ে গেছে। যা ভেবেছে ঠিক তাই,তাকে ঢুকতে দেখে ঘরের সবার মুখের হাসি দেখে সে ভালোই বুঝল যে পাঠকমন্ডলী খুব একটা অসন্তুষ্ট নয়। একমাত্র তার বাবার মুখের ভাবই রোজের মতো স্বাভাবিক, কোনো আলাদা উচ্ছাসের চিহ্ন নেই। "তাহলে কি যা ভয় পাচ্ছিলাম তাই হলো, বাবার কি লেখা ভালো লাগেনি?", মিনির এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার আগেই তার মা চা গরম করতে করতে বললো,"তোর বাবার কোয়ার্টেরলি চেকআপের ডেট পড়েছে কাল, বুঝলি। সকাল সকাল উঠে পড়িস কিন্তু মা।" এ নতুন কোনো খবর নয়, গত দুই বছর ধরে এমন অনেকবারই যেতে হয় বাবাকে। বাথরুমে মুখ ধুতে ধুতে মিনি শুধু বললো,"আচ্ছা, ঠিক আছে।" কিছুক্ষন পর যখন ও বিছানায় মায়ের পাশে গিয়ে বিষণ্ন মুখে বসল, মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ওর মা বাবাকে বলল,"এই, কিগো! একটু আগে যে মেয়ের লেখা গল্প এত স্বাদ করে পড়লে, তা ওকে বলো তোমার কেমন লাগলো?" সোফায় বসে তখন পেপার পড়ছিলেন স্বরূপবাবু। মিনির মায়ের এই কথা শুনে কেমন যেন একটা অবাক দৃষ্টিতে তাকালেন মিনির দিকে চেয়ে। তিনি বেশ সচকিত হয়েই জিজ্ঞেস করলেন,"মাম্মাম লিখেছে! গল্প নাকি কবিতা? এতক্ষনে বলছো তুমি আমায় এই আনন্দের কথাটা? কই আগে বলোনি তো!"

    রাত দুটো বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। মিনি বেশির ভাগ দিনই এই সময় ঘরের দরজা বন্দ করে লিখতে বসে তার প্রিয় ডাইরি খুলে, যেটা তার বাবা তাকে তার ষষ্ঠাদশ জন্মদিনে উপহার দিয়েছিল। তবে আজ যেন তার আর কলম চলছে না, পাতায় খালি হিজিবিজি দাগ কাটা। অনেক কষ্টে শেষে সে দু-লাইন লিখলো, "সব ইচ্ছেপূরণ তৃপ্তি দেয়না, কিছু কিছু মনের ভার বাড়িয়ে চলে...প্রত্যেক মুহূর্তে, আজীবন।" কিন্তু চোখ থেকে টুপ করে বড় এক ফোঁটা জল এক্কেবারে ডাইরির মাঝখানটায় পরে ওইটুকু লেখাটাও দিলো ঘেঁটে।

     বাইরে ড্রয়িংরুমের টেবিলটায় তখনো একগাঁদা কাগজপত্রের ভিড়। সবার উপরে ছড়িয়ে রয়েছে কয়েকটি রিপোর্ট। একটার উপরে বড় বড় ইংরেজি অক্ষরে লেখা.......

    Patient Name- Mr. Swarup Sen

Diagnosed Report - Dementia;

                  Alzheimer's Mid-stage   


          


Rate this content
Log in