Read #1 book on Hinduism and enhance your understanding of ancient Indian history.
Read #1 book on Hinduism and enhance your understanding of ancient Indian history.

গুলাল আবু বকর ‹›

Comedy Classics Children


3  

গুলাল আবু বকর ‹›

Comedy Classics Children


হাসি পেলে হাসুন, কিম্বা....১৫

হাসি পেলে হাসুন, কিম্বা....১৫

10 mins 160 10 mins 160

      ★ সিংহ এবং হরিণটি ★

বিগত দিনগুলোতে এত কিছু বিষয়ে লেখালেখি করলুম অথচ অতি নগণ্য কিছু লিখলুম পরিবেশের একশ্রেণীর বিশেষ বন্ধু সম্পর্কে। শুধু বন্ধু বলা ঠিক হবে না, অপরিহার্য বন্ধু তারা। পশুসমাজ হলো সেই বিশেষ বন্ধু জাতি। সেজন্যই আমাদের কাছে তারা হলো পশুসম্পদ। তাদের নিয়ে একেবারে কিছু না লিখলে অবিচার করা হবে হয়তো। তাদের সেই কষ্টের কথা কোনো লেখায় তুলে ধরতে পারলে ভালো হতো জানি কিন্তু এখন সেটা আমাদের নিজেদের কষ্ট পাওয়ার কারণ হয়ে পড়তো এবিষয়ে সন্দেহ নেই।  

       একবার এক জঙ্গলে এক সকালে সবাই দেখলো সাজানো একটা নতুন স্টোর খোলা হয়েছে। যার মালিক একটি খরগোশ কিন্তু কেউই এখনো এটা জানে না।। সবাই দেখলো দরজার ওপর লেখা রয়েছে—

“my deer customer,

এখানে সকলপ্রকার দ্রব্য পাবেন, সঙ্গে পাবেন একটি করে মাস্ক ফ্রি!”

কেনাকাটার জন্য সকাল সকাল বড় লাইন পড়ে গেলো। লাইনে দাঁড়িয়ে সবাই অপেক্ষা করছে। প্রথমে হাতি, তারপর সিংহ তারপর গণ্ডার... এইরকমভাবে সব দাঁড়িয়ে।

সবার শেষে একটি হরিণ এসে দোকানের নোটিশ পড়ে দেখে গোঁতাগুঁতি করে সবচেয়ে আগে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অন্যদের সাথে তার তর্ক বেঁধে গেলো। হরিণের যুক্তি হলো, দরজার ওপর কি লেখা রয়েছে সবাই পড়ে দেখুক। কথাটা তাকেই উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছে।

তর্কের তখনো মিমাংসা হয়নি ইতিমধ্যে দোকানের মালিক সেই খরগোশ সেখানে উপস্থিত। এবার তর্কাতর্কির মধ্যে ভিড় ঠেলে দরজার দিকে এগোতে গেলে গণ্ডার তাকে মারলো এক লাথি। সেই লাথি খেয়ে খরগোশ দোকানদার ছিটকে পড়লো গিয়ে পঁচিশ হাত দূরে। গায়ের ধুলো ঝেড়ে উঠে আর একবার চেষ্টা করলো দোকানের দরজার কাছে যেতে। এবার সিংহ গেলো রেগে। গজগজ করতে করতে বলল, 

— সেই সকাল থেকে আমরা সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, আর তুই এখানে চিটিংবাজি করে ঢুকতে চাইছিস?

এই বলে তাকে মারলো আর এক লাথি। খরগোশ এবার উড়ে গিয়ে পড়লো পঞ্চাশ হাত দূরে। তার কোমরে গেল লেগে । কোমর ধরে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে খরগোশ চেঁচিয়ে বলে উঠলো,

— দূর দূর! তোরা সবাই বাড়ি ফিরে যা। আজ আর মোটেও দোকান খুলবো না।

এবার সকলে একযোগে হাঁ হাঁ করে উঠলো,

— তুই যে এই দোকানের মালিক, আগে বলিসনি কেন!

খরগোশ প্রতিবাদ করে বললো,

— দোকানের মালিককে বুঝি অন্য সবাইকে জানিয়ে দোকানে ঢুকতে হয়?

       এখানে হয়েছে কি, হরিণের সাথে হই হট্টগোলে খরগোশের পরিচয় জানার কারোরই ধৈর্য্য ছিলো না। আবার হরিণের ঘাড়ে সব দোষের দায় চাপানো যায় না। নোটিশে স্পষ্টতই dear এর জায়গায় deer করা হয়েছে। 

এই গল্প থেকে এতক্ষণে যা বোঝা গেলো তা হলো, বিশেষ ক্ষেত্রে আগে থেকে পরিচয় দেওয়া দরকার হয়।

"গোঁফকে বলে তোমার আমার- গোঁফ কি কারও কেনা ?

গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, তাই দিয়ে যায় চেনা ।"

সুকুমার রায়ের রচনা ‘গোঁফচুরি’, কবিতাটির নাম শোনেননি এমন রসিক পাঠক পাঠিকার সংখ্যা নিশ্চয়ই কম।

কিন্তু শুধু গোঁফ দিয়ে চিনতে চেষ্টা করলে ধুন্ধুমার বেঁধে যাবে। ঐভাবে নাম নিয়েও একইকথা বলা যায়। এভাবে পরিচয় খুঁজতে গিয়ে ভিরমি যাতে কেউ না খান, সেজন্য এখানে কিছু উদাহরণ দিয়ে রাখছি।

       কয়েকটি সিংহশাবক একটি গুহার পাশে খেলা করছিলো। সিংহ-মা তাদের পাহারায় সেখানে বসে ঝিমোচ্ছিলো। সেই সময় সিংহ-বাবা শিকার সেরে গুহায় ফিরে আসছিলো। গুহার সামনে বাচ্চাদের খেলতে দেখে সিংহ-বাবা অনেক খুশি হলো। কাছাকাছি চলে আসার পর সে বাচ্চাদের একসাথে জড়ো করে জানতে চাইলো,

— সোনার বাচ্চারা, এখন আমায় শোনাও তো দেখি তোমাদের প্রিয় খেলোয়াড়ের নাম কি.....!

বাচ্চারা সমস্বরে বলে উঠলো,

— খুব সহজ বাবা, Lion-el messi.

বোঝা গেলো তাদের বাবা একথা শুনে খুব খুশি হয়েছে। প্রসঙ্গত বলে রাখি lionel ইংরেজি শব্দের অর্থ বাংলায় ‘সিংহশাবক’ বোঝায়।

— বাঃ, সব বাহাদুর বাচ্চা! ফুটবল তোমাদের প্রিয় খেলা, তাই না... এখন তাহলে বলো, প্রিয় ফুটবল কোচ কাকে করবে?

বাবার কাছে একথা শুনে আবার সকলে হৈ হৈ করে বললো,

— Lion-el scaloni. জানো বাবা, ইনি আর্জেন্টিনার কোচ।

— খুব ভালো, আরেকবার খুশি হলুম নামটা শুনে। খেলা ছাড়া আর কি কি ভালো লাগে তোমাদের?

বাচ্চাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়টা বললো,

— বাবা, আমাদের গান শুনতে খুব ভালো লাগে।

— ও আচ্ছা...তা_তো ভালো কথা! মনের মতো কোনো গায়ক টায়ক আবার আছে নাকি?

— কেন থাকবে না বাবা, আছে। তার নাম Lion_el Richie. উনি আমেরিকায় পপ গান করেন। আরেকজনের নাম বলবো?

— হ্যাঁ হ্যাঁ বলোনা, অসুবিধা নেই।

— উনি খুব ভালো vibraphone বাজাতেন, নাম Lion_el Hampton.

— বাচ্চারা শোনো, আজ আমি খুব খুশি হয়েছি তোমাদের চয়েস দেখে। চলো তাহলে, কালকে সবাইকে জঙ্গলটা একটু ঘুরিয়ে নিয়ে আসি।

       দুই শিংওয়ালা একটা হরিণ একবার এক সিংহের মুখ থেকে কীভাবে রক্ষা পেয়েছিলো সেকথা এবার জমিয়ে বলবো। প্রোপেন বার্নার ব্যবহার করে আগুন জ্বালিয়ে গরম বাতাস ভরে আকাশে ওড়ানো হয় যেসব বেলুন, সেইরকম একটি উড়ে যাওয়া আরোহী বিহীন বেলুনের বার্নার অকার্যকর হয়ে আগুন নিভে গেলো। তারপর ক্রমশ চুপসে গিয়ে দিকভ্রষ্ট হয়ে ভাসতে ভাসতে এক জঙ্গলের উপর চলে এলো। 

তার ঠিক নিচে সেসময় কচি মকমকে ঘাসের ওপর চরে বেড়াচ্ছিলো কয়েকটা হরিণ। তাদের কারোরই হুঁশ ছিলোনা যে মাথার উপর থেকে কিছু একটা নিচের দিকে নেমে আসছে। কাপড়ের তৈরি বেলুনটি যখন একটি হরিণের শিঙের ওপর পড়ে জড়িয়ে গেলো তখন সবাই একসাথে ভ্যাবাচাকা খেয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিলো। মূহুর্তে কে যে কোথায় গেলো, কেউ কারো খোঁজ রাখলো না। শিঙে জড়ানো হরিণটি যত দৌড়োয় বেলুনটি তার শিঙে তত বেশি আটকে যেতে থাকে, খানিক বাদে চোখমুখ সব ঢাকা পড়ে যায়। দৌড়ের চোটে খোঁচাখুঁচি লেগে আর ডালপালা গুঁজে গিয়ে ছোট একটি জায়গায় ছিঁড়ে যায় যেখান দিয়ে সে দেখতে শুরু করে। দৌড়তে দৌড়তে একসময় সে বুঝতে পারে অনেক দূরে কোথাও চলে এসেছে। কিন্তু এটা জানেনা যে এক সিংহের গুহার কাছাকাছি সে চলে এসেছে। ক্ষুধার্ত হয়ে সেই সিংহ সবেমাত্র মনস্থ করেছে শিকারে বের হবে বলে। সামনের দৃশ্য দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না সেই সিংহ। ঘাবড়ে গিয়ে নিজের গুহার প্রবেশপথ সে ভুলে গেলো, লাফিয়ে গিয়ে লুকিয়ে পড়লো এক ঝোপের পিছনে। সেখান থেকে চোখ গোল গোল করে গোপনে দেখে যে, এক আজব জন্তুর উদ্ভব হয়েছে তার সাম্রাজ্যে। মাথার দিকটা রঙচঙা উঁচু মতো আর পিছন দিকটা তুলনায় নিচু। এ ঘটনা দেখে হরিণ ভাবলো, ‘ব্যাপার কি! তার নিজের শরীর তো এতক্ষণ আস্ত থাকার কথা নয়। চলে যাওয়ার কথা সিংহের হা-এর মধ্যে।’ এমনিতেই তার নিজের হার্টখানা কয়েকদিন ধরে সামান্য ধড়ফড় করছিলো। শরীর এখনও খানিকটা দুর্বল ঠেকছে। ‘আর এখন দেখছি একেবারে পশুরাজের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে আছি!’

অপরদিকে সিংহ ভেবেছিল, ‘এটা তার থেকে নিশ্চয়ই শক্তিশালী কেউ হবে, সুতরাং এখনই নিজের শক্তি দেখিয়ে লাভ নেই, পরে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থায় যেতে হবে।’ 

বাঘ, সিংহ যখন শিকারে যায় তখন ফোকটে মাংস পাওয়ার লোভে তক্কে তক্কে থাকে যারা তারা হলো ফেউ। সেইরকম একটা ফেউ দূর থেকে এসব ঘটনা গভীরভাবে লক্ষ্য করলো, তারপর দ্রুত সিংহের কাছে দৌড়ে গিয়ে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে চুপিচুপি কি যেন একটা বললো। বোঝা গেলো, তার কথাটা সিংহের মনে ধরেছে। নতুবা ফেউয়ের এতবড় সাহস নেই যে, সে সিংহের কানের কাছে মুখ নিয়ে কথা বলে! সিংহের এই মন্তব্য থেকে সেটা পরিষ্কার হলো,

— ব্যাটা, এতদিনে তোর কাছ থেকে এই প্রথম একটা যুৎসই বুদ্ধি পেলাম। এরপর আমি যখন সভা ডাকবো তুই এবার থেকে সামনের সারিতে এসে বসবি।

ফেউ আহ্লাদে গদগদ হয়ে গেলো,

— যাই বলো মামা, এই তুমি আমায় এতদিনে একখানা যোগ্য সম্মান দিলে। এই কৃতজ্ঞতা আমি জীবনে ভুলবো না। বাঘ, হাতি, গণ্ডার... এই গণ্ডমূর্খদের কোনো যোগ্যতা নেই, মিটিংয়ে এসে শুধু গাধার মতো হৈচৈ চেঁচামেচি করে।...আর একটুও দেরি নয়, চলো মামা ওকে তাড়া করি, ভেবেছে উল্টোপাল্টা ভোল ধরে এসে আমাদের চোখে ধুলো দেবে। ঘুঘু দেখেছে শুধু, ফাঁদ তো দেখেনি!

সিংহ ফেউকে বলে,

— ভাগ্নে, জলদি আমার পিঠে চড়ে বস্, এখনি যাবো নয়তো কখনো নয়... তারপর ওর হাড়গোড় আলাদা করে দু’জনে কচমচ করে...

— মামা, এখনও তুমি ভয় পাচ্ছো নাকি, ‘কখনো নয়’ কথাটা আবার বললে কেন? লেফট রাইট করে চলো এবার দৌড় শুরু করা যাক।

— না না, ভয় কিসের, আমার ডেরায় আমাকে ডরাবার মতো কে আছে শুনি! শুধু বলছিলাম, ওর মুখটা অন্ততঃ যদি একটু ঠাওর করতে পারতাম ..। আচ্ছা, কোনোরকম রিস্ক হয়ে যাবে না তো ভাগ্নে?

— তোমার পিছন পিছন ঘুরে অভিজ্ঞতা কি আমার কম হলো মামা! তোমার কোনো ভয় নেই, পাশেই আমি তো আছি।

— যেমনটা তুই বলছিস তাহলে, চল্ শুরু করি..লেফট রাইট লেফট রাইট...

এরপর এক লাফ মেরে ফেউ সিংহের পিঠে চড়ে বসলো।

বেগতিক দেখে হরিণ এবার প্রমাদ গুনলো। অতি দ্রুত সেখান থেকে সটকে পড়ার জন্য সে মারলো এক লাফ, তারপর তাকে আটকায় কে! মাথায় কাপড় জড়ানো থাকায় ছুটতে তার অসুবিধা একটু হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেটা খুলে ফেলার চেষ্টা করলে একেবারে হাতেনাতে ধরা খেয়ে যেতে হবে। আর সেক্ষেত্রে সিংহমশাই অ্যাডভান্টেজ পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে তার ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। দৌড়তে দৌড়তে একটা চালাকি বুদ্ধি তার মাথায় খেলে গেলো। সে বুঝতে পারলো, বাঁচার জন্য এছাড়া অন্য রাস্তা খোলা নেই। ডাবলডেকার বাসের মতো পিছনের দুটো তার কাছাকাছি প্রায় এসে পড়েছে।

সিংহ ততক্ষণে চেঁচিয়ে বলছে,

— ভাগ্নে, দাঁও প্রায় হাতের মুঠোয়... আমার কানদুটো আরও টাইট করে ধর্... না হলে ডিগবাজি খেয়ে উল্টে যাবি।

— খুব টাইট করে ধরেছি মামা, ভয় হচ্ছে তোমার কান উপড়ে গিয়ে আমার হাতে না উঠে আসে!

— দূর ব্যাটা, ছ্যাবলামি করিস না। ঠেকায় পড়েছি তাই...না হলে তোর সাধ্য কী ছিলো আমার কান ছুঁয়ে দেখবি!

এসময় হঠাৎই থমকে দাঁড়ায় সেই হরিণ। আর পেছন ঘুরে সাহসে ভর করে চিৎকার দেয়,

— এ্যাই ব্যাটা... ক্যাবলা পাঁঠা, আজ আবারও বেগড়বাঁই করেছিস! এইটুকুন মাংস আছে ওর গতরে, তুই কাকে ধরে এনেছিস? তোকে বলেছি, হাতি গণ্ডার ছাড়া আমার চলে না। আজকে তোদের দুজনকে দিয়েই নাস্তা করবো, আয়!

হুংকার শুনে পিলে চমকে গেলো সিংহের। সে এমন জোরে ব্রেক কষলো যে ডাবলডেকার হয়ে বসে থাকা ফেউ প্রায় উল্টে পড়ে যায় আরকি। তার দুই হাতে শক্ত করে ধরা ছিলো সিংহের দুই কান। ব্রেক মারার চোটে সে দুটো তখন উপড়ে যাওয়ার অবস্থা।

ফেউ চেঁচিয়ে ওঠে,

— অমার্জনীয় ভুল হয়ে গেছে মামা। শেষরক্ষা হবে কিনা জানিনা, চলো এক্ষুনি পালাই। যা ভেবেছিলুম তা সে নয়। মনে হচ্ছে সাংঘাতিক কিছু!

সঙ্গে সঙ্গে ডাবলডেকারের উল্টো মুখে দৌড় শুরু হলো। খালিপেটে এতটা পথ দৌড়ে এসেও একফোঁটা খাবার জুটলো না বলে সিংহ গেলো ভীষণ ক্ষেপে, তার ওপর ঘাড়ে চেপে বসা ফেউকে নিয়ে ঘানি টানার মতো এক অবস্থা। সিংহ হাঁফাতে হাঁফাতে দৌড়তে থাকে আর হম্বিতম্বি করে,

— তুই এখনই আমার ঘাড় থেকে নেমে যা, এক্ষুনি নেমে যা বলছি! নইলে আছাড় দিয়ে ফেলে দেবো আর তারপর তোকে দিয়ে আজকের ক্ষিদে মেটাবো, যতসব পাজি!

— মামা, তুমি থামলে তবে না আমি নামতে পারবো। নতুবা পড়ে গিয়ে আমার ঠ্যাংথোবড়া ভেঙে তালগোল হয়ে যাবো যে।

— ওরে ছাগল, এখনই থামা যাবে নাকি, তাহলে দুই জনের প্রাণটা বেঘোরে যাবে। কি আর করি, এখন দেখছি ঘরের প্রায় কাছাকাছি এসে গেছি, থামার পর ওখান থেকে এক লাফে নেমে একেবারে সোজা নজরের বাইরে চলে যাবি। ত্রিসীমানায় আর যেন কোনোদিন তোর টিকি পর্যন্ত না দেখি, তাহলে সেদিন আলুর মতো ভর্তা করে ছাড়বো।...

হরিণের উপস্থিত বুদ্ধি তাকে সেদিন নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলো।

       কিছু মানুষ গিয়ে নতুন করে বাসা বেঁধেছে। জঙ্গলের ঠিক গা ঘেঁষে। বোঝা যায়, এরা কোনোকিছুকে ভয় পায় না। না সাপখোপ না জীবজন্তু। নয়তো ধরে নিতে হবে একধরনের অ্যাডভেঞ্চারের নেশা মাথায় ঢুকে পড়েছে।

এমনই একটি বাড়ির দরজার সামনে এক সিংহ শুয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছিলো। আড়মোড়া ভাঙার জন্য যে গড়াগড়ি তারা খায় এটা ঠিক তেমনি কিছু ছিলো না। রীতিমতো হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছিলো। এমন সময় এক হরিণ ঐ পথে চলেছিলো লতাপাতার খোঁজে। সিংহকে এমন খোশমেজাজে দেখতে পেয়ে সে প্রথমটা ভড়কে গেলো। তিড়িং করে একটা লাফ দিয়ে তিরিশ হাত দূরে গিয়ে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থেকে ব্যাপারখানা বোঝার চেষ্টা করলো। সিংহের হাসি আর থামছে না দেখে নিজে নিজেই সাহসে ভর করে সন্তর্পণে তার নিকটবর্তী হলো। কোনো একটি বিটকেল ব্যাপার ছাড়া এমন ঘটনা হারগিজ ঘটতে পারেনা, এ বিষয়ে তার আর সন্দেহ রইলো না। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থেকে হরিণ বললো,

— মহারাজকে আজকে অনেক খোশমেজাজে দেখতে পাচ্ছি, ঘটনা কী? কেউ কি তোমায় কাতুকুতু দিয়ে গেছে নাকি?

চোখ বন্ধ করে হো হো করে হাসতে হাসতে সিংহ জবাব দেয়,

— আজকে আমায় ভয় পেয়ো না হে, আরও কাছে এসে দাঁড়াও, বলছি।.. 

হরিণ সত্যি সত্যি কাছে সরে এলো। তাদের উভয়ের মধ্যে যা সম্পর্ক, তাতে করে জীবিত অবস্থায় এতো কাছাকাছি কেউ কোনোদিন আসেনি। হরিণ শুধায়,

— রাজামশাই, সূর্য আজকে কোনদিকে উঠেছে বলুন তো_

শুনে সিংহ বলে,

— খাসা বলেছো হে, আজ হয়তো সূর্যই ওঠেনি, নাকি উঠেছে, কে জানে! হাঃ হাঃ হাঃ...শোনো, কেউ আমাকে কাতুকুতু দেয়নি। আবার আমার বগলে কোনো পিঁপড়েও ওঠেনি। এক মজার ঘটনা ঘটে গেছে।... খুব ক্ষুধার্ত ছিলাম আমি। শিকারের খোঁজে এই পথে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ ঐ নেমপ্লেটে আমার চোখ পড়লো। ঐ দ্যাখো, ওতে লেখা আছে “হংসরাজ ব্যাপারী”। তার মানে কী?_একজন হাঁসের কারবারি এসে এখানে বাড়ি বেঁধেছে, তাই তো। ভাবলুম, এতো জিনিস থাকতে হাঁস নিয়ে একজন কারবারি জঙ্গলের গায়ে এলো কেন! প্রথমে উঁকি দিলুম, কি ভাগ্য! দেখি দরজা বন্ধ করা হয়নি, ভেজানো আছে। চুপিচুপি ঢুকলুম, কোথাও হাঁসের খোঁড় দেখা পেলুম না কিংবা হাঁসের প্যাঁক প্যাঁক আওয়াজ কানে এলো না। এ কেমন রাজহংস ব্যাপারী রে বাবা! এবার বারান্দার ওপারের শেষ প্রান্তে চোখ পড়তে দেখলুম একজন ফতুয়া পরা মাঝবয়সী লোক চশমা পরে একটা আরাম কেদারায় বসে ঢুলছে। সামনে একটা টেবিলে রাখা কলম, খাতা আর মোবাইল। তার পাশে একগাদা বইপত্তর।

একলাফে পড়লুম গিয়ে তার ঘাড়ের কাছে। আচমকা আমাকে সামনে পেয়ে তার ঢুলুনি পুরোপুরি উড়ে গেলো। হাঁউমাঁউ করে বলে উঠলো, 

— তু-তুই কে? এখানে এলি কীভাবে, অ্যাঁ?

— আমি হলুম সিংহরাজ, তোর রাজহংসগুলো কই?

— রাজহাঁস? রাজহাঁস কোথায় পাবো? আমি তো হাস্যরসের কারবারি। হাসির লেখা লিখে পেট চালাই।

— মিথ্যা কথা মোটেও শোনাবি না আমাকে, তোর দরজায় লেখা আছে, “রাজহংস ব্যাপারী”।

এবার লোকটি অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। বললো,

— আরে দূ—র, ওটা তো আমার নাম লেখা আছে। হাঁস ফাঁস কিছু নেই আমার।

তখন আমার থাবা দিয়ে তার ঘাড় চেপে ধরলুম। বললুম,

— তুই যদি সত্য কথা বলে থাকিস তবে কয়েকটা গল্প শোনা আমাকে। 

সে একটা একটা করে গল্প বলে আর আমি হেসে গড়িয়ে পড়ি।

এবার হরিণ বলে ওঠে,

— ও আচ্ছা, তাতেই তোমার এই অবস্থা! বেশ বেশ, আমি তাহলে এবার চলি।

সিংহ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,

—আরে শেষটা তো শুনে যাও....তখন আমি ভাবলুম, যার কথায় এতো হাসাহাসি করছি, না জানি তার গোটা শরীরে কতখানি হাসির ফোয়ারা থাকতে পারে। এই বলে ঝাঁপিয়ে পড়লুম হংসরাজ ব্যাপারীর ওপর। এরপর তার কলম, খাতা, মোবাইল, বইপত্তর সব খেয়ে ফেললুম।... তারপর থেকে আমার এই বর্তমান অবস্থা। হাসি থামাতে পারছি না। কেবলই শরীরের এখানে ওখানে সুড়সুড়ি লাগছে। আদৌ এটা থামবে কিনা কে জানে! মনে হচ্ছে আমার গোটা শরীরে আর হিংসা বলে কিছু নেই, আগেও কিছু ছিলো না। না, একদমই নেই_ হোঃ হোঃ হোঃ_হিঃ হিঃ হিঃ_ হাঃ হাঃ হাঃ_আ-হ্ হাঃ হাঃ হাঃ......

       “সিংহ মামা সিংহ মামা

        মাংস খেতে চাও?

        রাজহংস এনে দেবো

        হিংসা ভুলে যাও।”

       (একটি শিশুছড়া বই থেকে)

© পরবর্তী পর্বে আবারও সাক্ষাৎ ঘটবে, আশা রাখি।


Rate this content
Log in

More bengali story from গুলাল আবু বকর ‹›

Similar bengali story from Comedy