STORYMIRROR

pallab kumar dey

Drama Action

4  

pallab kumar dey

Drama Action

ব্রহ্মপুত্র যায় বয়ে-26-বিপন্ন সময়

ব্রহ্মপুত্র যায় বয়ে-26-বিপন্ন সময়

6 mins
7


 সকাল এগারোটার দিকে মৈরাবাড়ির দিক থেকে আসা চাপরমুখ যাওয়ার একটা ট্রেন আছে। উদ্দেশ্য সেই ট্রেন ধরেই এই নব্য উদ্বাস্তুরা চাপরমুখ যাবে। তারপর চাপরমুখ থেকে উত্তরবঙ্গের দিকে পাড়ি জমাবে। অসম উত্তরবঙ্গ সীমান্তে নাকি শরণার্থী শিবিরও খোলা হয়েছে। অনেকেই নাকি শরণার্থী হয়ে সেই শিবিরে গিয়েও আশ্রয় নেবে।

 আমাদের পিতৃদেবও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমরাও পাড়ি জমাব। তবে উত্তরবঙ্গের দিকে পাড়ি দিতে নয়। আমাদের সিদ্ধান্ত, আমি আর ছোড়দি গুয়াহাটির কালাপাহাড়ে কাহালিপাড়ায় কিছুদিনের জন্যে ছোড়দার ওখানে চলে যাব। পিতৃদেব আমাদের দুজনকে গুয়াহাটি নিয়ে গিয়ে ছোড়দার ওখানে রেখে দিয়ে আসবেন। আমাদের শিলঙের খুড়া মশায়ের একটা বাড়ি আছে কালাপাহাড়ে। সেটা তিনি ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। ভাড়া দেওয়ার পরেও খালি থাকা একটা ঘরে থেকেই ছোড়দা গুয়াহাটিতে পড়াশোনা করে।  

 ট্রেন কখন আসে, সেই উৎকন্ঠায় দাঁড়িয়ে আছি আমরা সবাই। এরমধ্যেই দেখতে দেখতে কয়েক হাজার যাত্রী জড়ো হয়ে গেল প্ল্যাটফর্মে। নিজেদের মধ্যে ঠেলা-ধাক্কাধাক্কির মাঝেই ঝমঝম করে চলে এল বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালিত বহু বছরের পুরোনো মিটারগেজের একটা রেলগাড়ি। শুরু হয়ে গেল কুকুরদলের মারামারির মতো এর ওপরে ওর ঝাঁপিয়ে পড়া। কে কার আগে সেই রেলগাড়িতে চড়বে। আমি তো ঠেলা ধাক্কা মেরে কোনওরকমে উঠতে পারলাম একটা কামরায়। পিতৃদেব আর ছোড়দি আর পারলই না উঠতে।

 এই সময় পিতৃদেবের চোখ পড়ল প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো বণিকবাড়ির সুভাষের দিকে। ছোড়দিকে দেখিয়ে তিনি সুভাষকে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন, সুভাষ..সুভাষ তুমি এ’রে জানালা দিয়া ঢুকাইয়া দিতে পারবা?

 সঙ্গে সঙ্গে সুভাষদা ছোড়দিকে যেন চ্যাংদোলা করে তুলে ঢুকিয়ে দিল গারদহীন জানালার ফোকর দিয়ে।

 এমন সময়েই ট্রেন ছেড়ে দেবার মতো একটা ঝাঁকুনি দিল।

 অনেক যাত্রী তখনও প্ল্যাটফর্মের ওপর দাঁড়িয়ে। উঠতে না পারা যাত্রীদের আর্তনাদ আর হাহাকারের পরোয়া না করেই ট্রেন ছেড়ে দিল। হতভম্ব পিতৃদেব আর্তনাদের মতো চিৎকার দিয়ে জানালার ফোকরে কয়েকটা টাকা ছুঁড়ে দিয়ে বলার চেষ্টা করলেন, গুয়াহাটি পৌঁছাইয়াই একটা চিঠি দিয়া দিস!

 ধীরে হলেও ট্রেন বেরিয়ে পড়ল প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে। গতি তার এমন কিছু ছিল না। তবুও কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেল পাঁচ কিলোমিটার দূরের সেঞ্চোয়া নামের পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম একটা রেলজংশনে। জংশনের গা ঘেঁসেই সাঁইত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক। জানালার ফোকর দিয়ে দেখা যাচ্ছিল জাতীয় সড়কের ওপরে পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ দাঁড়িয়ে রয়েছে স্টেশনের খোলা প্ল্যাটফর্মের ওপরেও।

 চারদিক থেকে ঘিরে ধরল তারা রেলগাড়িটিকে। সেঞ্চোয়া ছাড়িয়ে আগে আর যেতে দেওয়া হবে না ট্রেনটিকে। জেলাশাসক নিজে এসেছেন রেলগাড়িটাকে পুনরায় হয়বরগাঁও রেলস্টশনে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। মাইকে সেই কথা তিনি নিজেই বার বার ঘোষণাও করছেন । 

 ক্ষোভ উগরে দিচ্ছিল যাত্রীরা। থাকবে না আর তারা এ দেশে। যেতে তাদের দিতেই হবে।

 কিন্তু প্রশাসন অনড়। ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন তারা ট্রেনটিকে। অবস্থা বেগতিক দেখে হালকা লাঠি চালনাও বোধহয় করতে হল পুলিশকে। বিক্ষুব্ধ যাত্রীরা বাধ্য হল শান্ত আর থিতু হতে। ট্রেনটিকে ধীরে ধীরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল হয়বরগাঁও রেলস্টেশনে।  

 রেলস্টেশনে নেমে যে যার মতো ফিরে গেল। বাড়ি ফিরে এলাম আমরাও।

 বাড়ি ফিরেই বুঝতে পারছিলাম গভীর উৎকন্ঠার সঙ্গে এতক্ষণ সময় অতিভাহিত করছিলেন আমাদের বাবা-মা দুজনই। দুশ্চিন্তায় ডুবে গেছিলেন আমরা দুই অল্পবয়সি ভাইবোন বিরাট গুয়াহাটি শহরে গিয়ে ছোড়দার ঠিকানা খুঁজে বের করব কীভাবে? আর এই সময়েই আমাদের ফিরতে দেখে আনন্দের আতিশয্যে কথা বলতেও যেন ভুলে গেলেন। স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মা বলে উঠলেন, মাগো মা কি যে চিন্তা করতাছিলাম! ইস!.. ইন্দিরা গান্ধীর কথায় এতদিনে গিয়া বোধহয় টনক নড়ছে আসামের!

 প্রায় কুড়িএকুশদিন পর শহর থেকে স্বান্ধ্যআইন পুরোপুরি তুলে নেওয়া হল। বিপন্ন সময়কে পরাস্ত করে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে চলে এল নগাঁও শহর। ঘৃণা আর বিদ্বেষের বাতাবরণ কমে আসছিল ধীরে ধীরে। সাধারণ মানুষ আবার আগের মতোই এক অপরের বিশ্বাস ভাজন হয়ে উঠছিল। তবুও আমার যেন কোনও ইচ্ছেই হচ্ছিল না বাড়ি থেকে বের হই। কিন্তু বেরোতে তো আমাকে হবেই। কলেজে যেতে হবে। গিয়ে জেনে আসতে হবে, স্থগিত হয়ে যাওয়া সেই ফিজিক্স প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষাটি আবার কবে নাগাদ হবে তার দিন তারিখ। 

 আজ যাই কাল যাই করে করেও তবুও যেন যাচ্ছিলাম না। এক বিষাক্ত বিতৃষ্ণা আর অজানা অনীহা যেন পেয়ে বসেছে আমায়। যেন পাথরের মতো স্থবির অলস হয়ে গেছি আমি। তাছাড়া আমায় বার বার তাগাদা দেওয়ার মতোও যেন কেউ নেই। পিতৃদেব তো গম্ভীর মুখে শুধু উন্নাসিকের মতো হয়েই থাকেন। হঠাৎ কখনও পরামর্শ দেওয়া ছাড়া কখনই কোনও প্রশ্ন করেন না তিনি। শুধু একমাত্র মা কখনও সখনও প্রশ্নগুলো তোলেন। 

 মা উৎকন্ঠিত মুখে প্রশ্ন করলেন, কীরে তর যে একটা পরীক্ষা বাকি আছিল সেইটা কবে হইব? কলেজেও গিয়া তো খবর নিতাছস না কিছু? সেই যে গন্ডগোল লাগনের দিন পুলিশের ডান্ডা খাইয়া আইয়া ঘরে ঢুকসছ আর তো বাইরসও না?

 বিরক্তির সুরে মাকে জবাব দিলাম, আরে যাবো যাবো। অযথা আমার মাথা খেয়ো না তো। সময় হোক ঠিক গিয়ে খবর নিয়ে আসব।

 ‘তর পরীক্ষার কথাই তো জিজ্ঞাসা করছি। আর তো কিছু জিজ্ঞাসা করি নাই।’ মা যেন রাগান্বিত হয়ে উঠলেন, এত বিরক্তি ক্যান তর? কী কইলাম, খেঁক খেঁক কইরা উঠলি যে? নবেন্দুর মেয়েডার পিছনে দৌড়ানোর সময় তো তর কোনও বিরক্তি নাই, আলস্য নাই!

 ‘উহ্‌ একটু শান্তিও দেও না তো আমাকে!’

 বলেই আলনা থেকে ছোঁ মেরে প্যান্ট-সার্ট হাতে নিয়ে কোমরে গলিয়ে গায়ে চড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম ঘর থেকে। আজ আর হেঁটে যাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছিল না বলে সাইকেল নিয়ে নিলাম। থানার সামনে দিয়ে হেঁটে অথবা সাইকেল চালিয়ে যেতে এখনও আমার মনে প্রচণ্ড ভয়। তার জন্যেই থানার সামনে দিয়ে না গিয়ে তেলিয়াপট্টি হয়ে পৌঁছলাম কলেজে।

 গিয়ে দেখলাম কলেজ নীরব নিস্তব্ধ। একজন ছাত্রকেও চোখে পড়ছিল না কলেজ ক্যাম্পাসে। শুধু অফিসঘরটি খোলা, কাজ করছেন হেডক্লার্ক আর অন্যান্য কর্মচারীরা। ডিপার্টমেন্টের দিকেও সব দরজায় তালা। নোটিশ বোর্ডেও বার বার চোখ বুলিয়েও কোনও নোটিশ খুঁজে পেলাম না।

 তাহলে কার কাছ থেকে পরীক্ষার ব্যাপারে শেষ খবরটা জানা যেতে পারে? কাকে আর জিজ্ঞেস করব? হাঁ, বিশ্বজিতের কাছ থেকেই সব জানা যেতে পারে। ছুটলাম বিশ্বজিতের খোঁজে। কলেজের পেছনেই বিশ্বজিতের হোস্টেল। গিয়ে দেখালাম হোস্টেলও বন্ধ। বড় একটা তালা ঝুলছে গেটের হ্যাজবোল্টে। অগত্যা কি করি, সাইকেল নিয়ে সোজা ছুট দিলাম সৌম্যর খোঁজে। পানিগাঁও চারআলি থেকে ডানদিকে গিয়ে একটা গলির ভেতরে ওদের বাড়ি। 

 কৃষ্ণা সিনেমাহল পার হয়ে বাঙালি পূজাবাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎই দেখা হয়ে গেল সৌম্যর সঙ্গে। স্কুল জীবনের আরও অন্যান্য সহপাঠীদের সঙ্গে আড্ডা জমিয়েছে সে। 

 আমাকে দেখেই অবাক বিস্ময়ে সে জিজ্ঞেস করল, আরে খোকন তুই? তোর শরীর ভালো আছে তো? কী ব্যাপার, ফিজিক্স প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার দিন কেন এলি না?

 ‘পরীক্ষার দিন এলাম না মানে?’ বলে বিমূঢ় বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। অজান্তেই আবার সুধিয়ে উঠলাম, পরীক্ষা কি হয়ে গেছে?

 অবাক বিস্ময়ে সৌম্য বলল, হাঁ পরীক্ষা তো হয়ে গেছে! 

 মনে হচ্ছিল ভয়ংকর শব্দে গোটা পাঁচ বজ্রপাত বুঝি ভেঙে পছেছে আমার মাথার ওপরে। 

 ‘পরীক্ষার দিন তো তোকে দেখতে পেলাম না, তাই তো জিজ্ঞেস করছি কেন এলি না?’ অবাক হয়ে সুধাল সৌম্য।

 ‘পরীক্ষা কি হয়ে গেছে? কবে হল?’ জিজ্ঞেস করতে গিয়ে কাতর গলা যেন বুজে আমার।

 ‘সে কি! তুই কি সত্যিই কিছু জানিস না? আরে দিনের কারফিউ যেদিন তুলে নেওয়া হল সেদিনই তো নোটিশ টাঙিয়ে দিয়েছিল কলেজে। পরীক্ষা তো হয়ে গেছে!’

 যেন ফাঁসির রজ্জুতে ঝুলিয়ে নয়তো বা হাড়িকাঠে গলা দিয়ে দেওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তের অবস্থা এখন আমার। স্কুল জীবনের অন্যান্য সহপাঠীরা কেউ কেউ তখন মুখ টিপেটিপে হাসছিল। ঠাট্টা তামাশাও করছিল কেউ। যেন বেশ একটা মজার বস্তু এখন আমি। কমার্সের সুদীপ তো তার নিজের মুখের ভেতরে আরও একটা জরদা পান পুরে নিয়ে বলেই ফেলল, ফুকন যা এবার প্রিন্সিপ্যালকে গিয়ে বল। ইউনিভারসিটিকে বলে ফুকনের জন্যে একটা স্পেশাল পরীক্ষার ব্যবস্থা করে দেন যেন ওনারা।

 সুদীপের কথা শুনে হো হো করে হাসছিল সবাই। হাসির যেন ফোয়ারা উঠছিল। হাসির পাত্রই তো বটে আমি ‘ফুকন’। ওদের হাসি মশকরার সামনে লজ্জা তো দূর, তার থেকেও অনেক বেশি মজবুত আর ধারালো একটা ছুরি আমার বুকের ভেতরে মোচড় দিয়ে দিয়ে যেন ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছিল। আর কোনও উপায় নেই আমার! মৃত্যুকেই যেন বরণ করে নিতে হবে! অভিশপ্ত এই প্রাণ বিসর্জন দিয়ে দিতে হবে আজ কলংসুতির নদীর জলে ঝাঁপ দিয়ে! 

  

next episode-পরাজয়ের গ্লানি


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Drama