STORYMIRROR

Kashfiya Jahan

Children Stories

3  

Kashfiya Jahan

Children Stories

অপূর্ণ জীবনের গল্প

অপূর্ণ জীবনের গল্প

4 mins
2

আমার  জীবনটা একসময় খুব সাধারণ ছিল। পরিবারের ছোট ছোট হাসি, আর নিজের ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়ে দিন কেটে যেত। কিন্তু আমি জানতাম না, একদিন এই সাধারণ জীবনটাই বদলে যাবে… ভালোবাসা, কষ্ট আর পরিবারের মাঝখানে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলবো।”

 আমি নীলা।
আমার জন্ম মোহনপুর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে। আমি ছিলাম সবার খুব আদরের… কারণ আমাদের পরিবারে আমার আগে কোনো কন্যা সন্তান ছিল না। আমার জন্ম যেন সবার জীবনে এক নতুন আনন্দ নিয়ে এসেছিল। বাড়ির প্রতিটি মানুষ আমাকে ঘিরেই হাসতো, আমাকে নিয়েই স্বপ্ন দেখতো। ছোটবেলায় আমি বুঝতাম না, কেন আমাকে এত ভালোবাসা হয়… কিন্তু এখন বুঝি, আমি ছিলাম তাদের অনেক অপেক্ষার পর পাওয়া সুখ।”

 ছোট থেকেই সবাই আমাকে অনেক যত্ন করতো। তবে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আদর করতেন আমার দাদি। দাদির কাছে আমি যেন আলাদা কিছু ছিলাম… তার ভালোবাসা, যত্ন—সবকিছুই ছিল একটু বেশি। কোথাও বেড়াতে গেলে তিনি আমাকে ছাড়া যেতেন না, সবসময় নিজের কাছেই রাখতেন। আমার ছোটবেলাটা দাদির সাথেই কেটেছে— তার গল্প, তার স্নেহ আর তার ছায়ায়। সেই দিনগুলো ছিল খুবই সুন্দর… নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় ভরা, কোনো দুঃখ ছিল না তখন।” কিন্তু আমার দাদির এই ভালোবাসার মাঝেও একটা কষ্ট লুকিয়ে ছিল… তিনি আমাকে যতটা আদর করতেন, আমার আম্মাকে ততটাই যেন অপছন্দ করতেন। আমার আম্মার সাথে তার সম্পর্ক ছিল খুবই খারাপ। প্রায়ই তাদের মধ্যে ঝগড়া হতো— ছোট ছোট কথা থেকে শুরু করে বড় বড় অভিমান। আমি ছোট ছিলাম, কিছুই বুঝতাম না… শুধু দেখতাম, দুইজন মানুষের মাঝে এক অদ্ভুত দূরত্ব। যত বড় হতে লাগলাম, ততই সেই ঝগড়াগুলো স্পষ্ট হতে লাগলো আমার চোখে। কিন্তু আজও আমি জানি না— কেন আমার দাদি আমার আম্মাকে সহ্য করতে পারেন না… কোন কষ্ট, কোন অভিমান এত গভীরে লুকিয়ে আছে।”

 একদিনের একটা ঘটনা আমার জীবনে আলাদা করে দাগ কেটে গেছে… আম্মা আমাকে একটা কাজ করতে বলেছিলেন, কিন্তু আমি সেটা করিনি। তখন দাদি আমার হয়ে কথা বলেছিলেন— আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই ছোট্ট ঘটনাটা বড় হয়ে গেল খুব দ্রুত… আম্মা রাগে আমাকে অনেক মেরেছিলেন। সেদিন আমি শুধু শারীরিক কষ্ট পাইনি, মনের ভেতরেও কিছু একটা ভেঙে গিয়েছিল। আমি ছোট ছিলাম, কিন্তু তখন থেকেই আম্মার প্রতি একটা অভিমান, একটা দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করলো… ভালোবাসা আর কষ্টের মাঝে আমি যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে লাগলাম।”

 আম্মা আমাকে কিছু বললেই, সেটা যেন দাদির মনেও আঘাত লাগতো। দাদি সবসময় আমার হয়ে কথা বলতেন— যদিও আমি কখনো তাকে বলতে বলিনি। এই ছোট ছোট ঘটনাগুলোই ধীরে ধীরে বড় ঝগড়ায় রূপ নিতো। আমি মাঝখানে পড়ে যেতাম… কাকে বুঝাবো, কাকে থামাবো—কিছুই বুঝতাম না। একসময় মনে হলো, আমি যেন দু’জনের কাছ থেকেই দূরে সরে যাচ্ছি। আম্মার উপর যেমন অভিমান জমে উঠলো, তেমনি দাদির প্রতিও একটা অদ্ভুত কষ্ট তৈরি হলো। কারণ, মাঝে মাঝে দাদিও ভুল করতেন… আর যখন আমি আম্মার পক্ষ নিয়ে কথা বলতাম, তখন দাদির সাথে আমার সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হতে লাগলো। ধীরে ধীরে… আমি একা হয়ে যেতে লাগলাম— ভালোবাসার মাঝেই।”

 "শুনেছি,, সন্তানদের নাকি বাবা-মায়ের সাথে খুব গভীর সম্পর্ক থাকে… কিন্তু আমার জীবনে যেন সবকিছুই ছিল একটু উল্টো। আমার বাবা ছোট থেকেই বিদেশে থাকতেন। মাঝে মাঝে ছুটিতে বাড়ি আসতেন, কিন্তু ততদিনে তিনি যেন আমার জন্য একজন অপরিচিত মানুষ হয়ে যেতেন। বাবার ভালোবাসা পাওয়ার সুযোগটা আমার জীবনে খুব কমই এসেছে। আর আম্মা… তিনি সবসময় আমার পাশে থাকতেন, কিন্তু তবুও আমাদের সম্পর্কটা ছিল অন্যরকম। একই ছাদের নিচে থেকেও, কোথাও যেন একটা দূরত্ব রয়ে যেত। আমি বুঝতে পারতাম না— এটা কি শুধু পরিস্থিতির জন্য, নাকি আমাদের মাঝে কোনো অদৃশ্য দেয়াল ছিল… যেটা আমি যতই ভাঙতে চেয়েছি, ততই যেন আরও শক্ত হয়ে গেছে।”

 আম্মা সবসময় কিছু না কিছু কারণে আমাকে বকা দিতেন… আর কখনো কখনো গায়ে হাতও উঠত। ছোটবেলা থেকেই সেই সব কষ্ট আমার মনে গভীর দাগ কেটেছিল।

ধীরে ধীরে, আম্মার সাথে আমার দূরত্ব আরও বেড়ে গেল।

 স্কুলে বন্ধুদের কাছে শুনতাম— তাদের মা আজকে টিফিনে এটা বানিয়েছেন, আজকে এটা করেছেন, আর কত কি… আর আমি? আমি অনেক সময় খালি পেটে চলে যেতাম। কিছু না পেলে নিজের খাবার নিজেই তৈরি করে নিয়ে যেতাম। এই সব ছোট ছোট অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে— ভালোবাসা সবসময় পাওয়া যায় না, কিছু কিছু কষ্ট নিজে কাটাতে হয়। আমার ছোটবেলার একাকীত্ব, দূরত্ব আর অভিমান—সব মিলেই আমাকে আজকের আমি তৈরি করেছে।”

 "সব খারাপের মাঝেও স্কুলের জীবনটা ছিল আমার জন্য সবচেয়ে সুন্দর। সেখানে আমি ভিন্নভাবে হাসতাম, শিখতাম, আর নতুন বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতাম।

 আমার জন্য সবচেয়ে মজার একটা ঘটনা হলো— আমি যখন ৫ম শ্রেনিতে পড়ি, তখন আমার বাসার কাছে একজন স্যার ছিলেন, যাঁর কাছে আমি পড়তে যেতাম। ওই সময় আমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড নিঝুম এর সঙ্গে পরিচিত হয়। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো নিঝুম মনে করত আমি অনেক খারাপ, বদমেজাজি মেয়ে,, আর নীলা_ এইদিকে আমি মনে করতাম নিঝুম অনেক হিংসুটে একটা মেয়ে কিন্তু ক্লাস ৬-এ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সব বদলে গেল… যে ধোঁয়াশাপূর্ণ,খারাপ,বদমেজাজি নীলা আর হিংসুটে নিঝুম একে অপরের সাথে মিশেছে, দুটোই এখন স্কুলের মধুর স্মৃতিতে মিশে গেছে। স্কুলের এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো, বন্ধুত্ব আর হাসি— এগুলো আমার জীবনের অমূল্য খনি হয়ে আছে।


Rate this content
Log in