অন্যরকম ভালোবাসা
অন্যরকম ভালোবাসা
অন্যরকম ভালোবাসা
পর্ব-৩১
অদৃত ফ্রেশ হয়ে বিছানায় বসে আর্যকে বলল,'আর্য তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।'
আর্য গম্ভীর ভাবে বলল,' তার আগে আমারও তোমার সাথে কিছু কথা আছে ।'
অদৃত বলল,' হ্যাঁ, বলো না।'
আর্য বলল,' আজ তোমাকে ওতোবার ফোন করলাম তুমি ফোন ধরলে না কেন?'
অদৃত বলল,' বিশ্বাস করো আমি জানতাম না যে, তুমি ফোন করেছিলে। আসলে আজকে অফিসে কাজের খুব চাপ ছিল। তার মধ্যে ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার ফলে ফোন বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। বাড়িতে এসে চার্জ দেওয়ার পর ঠিক হয়েছে। তাই বুঝতে পারিনি। আমি এক্ষুনি দেখছি।'
আর্য বলল,'এখন দেখে আর কি হবে । বাদ দাও।'
অদৃত নিজের ফোন চেক করে দেখলো, আর্য তাকে সাতবার ফোন করেছিলো।
অদৃত কান ধরে মিষ্টি গলায় বলল,' সরি! আর হবে না। এই দ্যাখো আমি কান ধরছি।'
আর্য বলল,'ঠিক আছে।
তুমি কি বলবে বলছিলে?'
অদৃত বলল,' হ্যাঁ ।'
অদৃত আর্যর একটু কাছে গিয়ে বলল, 'তুমি তোমার কেরিয়ার নিয়ে কিছু ভেবেছো?'
আর্য বলল,' কেরিয়ার নিয়ে?'
অদৃত বলল,' হ্যাঁ।'
আর্য বলল,' মমমম্.... না সেইভাবে তো কিছু ভাবিনি, হ্যাঁ তবে এটা ভেবেছি আমি আঁকা নিয়েই কাজ করতে চাই, আমি তো তোমাকে এর আগে বলেছিলাম।'
অদৃত বলল,'হ্যাঁ বলেছিলে। বলছিলাম আমার একটা আইডিয়া আছে মানে তুমি যদি চাও আমি তোমার সাথে শেয়ার করতে পারি।'
আর্য বলল ,'আইডিয়া?
অবশ্যই তুমি কিছু আইডিয়া দেবে আমি নেব না এটা হতেই পারে না বলো কি আইডিয়া?'
অদৃত বলল,' দ্যাখো আর্য আমাদের দেশে আর্ট কালচারের খুব একটা দাম নেই। তুমি বুঝতে পারছো ;তুমি তো জানোই।'
আর্য বলল,' হ্যাঁ ।'
অদৃত বলল,'দ্যাখো আমরা কাজটা করি রোজগার করার জন্য তাই না? এই যে তুমি এই কাজগুলো করছো তুমি যদি ঠিকঠাক মূল্য না পাও তোমার কাজ করতে ইচ্ছা হবে বলো ?'
আর্য বলল,' হ্যাঁ সে তো ঠিক কথা। কিন্তু আমি তো আজকাল টাকা পাই।'
অদৃত বলল,'হ্যাঁ পাও। কিন্তু এটাতে তো তোমার সেইভাবে রোজগার হচ্ছে না,অনেক কম রোজগার হচ্ছে। তোমার আরো রোজগার করার দরকার আছে তাই না? মানে তোমার বাবার কাছে তো তোমার নিজেকে প্রমাণ করতে হবে । তুমি তো যেমন তেমনভাবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবে না, তাই না?'
আর্য ভুরুকুঁচকে বলল,'যেমন তেমনভাবে মানে? ঠিক বুঝলাম না।'
অদৃত বলল,'মানে এখন তোমাকে কারোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, আর এখানে সেইভাবে তোমার আঁকা ছবিগুলো যথাযথ মূল্যে বিক্রিও হচ্ছে না। কিন্তু তোমার যদি নিজস্ব আর্ট গ্যালারি থাকে তাহলে তোমাকে আর কারোর ওপর নির্ভর করতে হবে না।'
আর্য ঘাড় নেড়ে বলল,'হুম্।'
অদৃত বলল,' তাই ভাবছিলাম যদি তুমি অন্য জায়গায় গিয়ে কাজটা করো দেখবে অনেক রোজগারও হবে,আর সেই টাকায় তুমি নিজের একটা আর্ট গ্যালারিও খুলতে পারবে,আর তখন যেমন খুশি দামে তুমি বিক্রিও করতে পারবে ।'
আর্য অদৃতের দিকে তাকিয়ে বলল,' অন্য জায়গায় মানে? মানে ইন্ডিয়ার অন্য কোথাও তাই তো ?'
অদৃত বলল,'ঠিক সেরকম নয় । মানে......'
আর্য বলল,' কি বলতে চাইছো ঠিক করে বলো?' অদৃত বলল,' এই যদি ধরো তোমার আঁকা দেখে বিদেশের কোনো চিত্রশিল্পীর যদি পছন্দ হয়, তখন যদি সেখানে তোমাকে যেতে বলে তুমি যাবে?'
আর্য বলল,' কি হয়েছে ?'
অদৃত বলল,'আসলে পত্রলেখা বলছিল, যে বিদেশে আর্ট আর কালচারের দাম আমাদের দেশের থেকে অনেকটাই বেশি তাই যদি ওখানে গিয়ে.......'
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আর্য রাগে জ্বলে উঠে বলল,' পত্রলেখা বলছিল মানে? তুমি পত্রলেখার কথায় আমাকে বিদেশে যাওয়ার কথা বলতে চাইছো? আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি,আমি কোনোভাবেই বিদেশ যাবো না । সে যদি কোনো চিত্রশিল্পী বা কোনো সেলিব্রিটি যেই ডাকুক না কেন আমি কিছুতেই যাবো না। '
অদৃত বলল,' আমার কথাটা তো একটু শোনো। দেখো পত্রলেখার একজন ভালো বন্ধু আছে যে আমস্টারডামের একজন খুব বড় চিত্রশিল্পী ওনাকে তোমার আঁকার বেশ কয়েকটা ফটো পাঠানো হয়েছে। মানে আমি আমার কাছে যেগুলো ছিল সেগুলোই আমি পত্রলেখাকে পাঠিয়েছি। পত্রলেখা তাকে পাঠিয়েছে। এবার ওনার যদি পছন্দ হয় , তখন তোমাকে হয়তো ওখানে ডাকবে।'
আর্য রেগে গিয়ে অদৃতের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলো,' তোমার এত সাহস হলো কি করে, তুমি আমাকে না জানিয়ে আমার আঁকা ফটো অন্য কাউকে পাঠিয়েছো?'
অদৃত বলল,'আর্য, এতে সাহসের কি আছে ? আমি তো তোমার ভালোর জন্যই পাঠিয়েছি। তুমি আমার সাথে এরকম ব্যবহার করছো কেন?'
আর্য বলল,'তুমি জানোনা কাউকে না বলে কারুর জিনিস অন্য কাউকে দেওয়া তো দূরের কথা হাত দেওয়াও অন্যায়।
আর তাছাড়া আমি তো বলিনি আমার ভালো খারাপ নিয়ে তোমাকে ভাবতে। বলেছি তোমাকে? আমার তো মনে পড়ছে না।'
অদৃত বলল,'আমি সত্যিই জানতাম না তোমার আর আমার মধ্যে সেইরকম সম্পর্ক। আমি ভেবেছিলাম তোমার যেমন আমার সব বিষয়ে অধিকার আছে আমারও তেমন তোমার সব বিষয়ে অধিকার আছে । আমি আসলে বুঝতে পারিনি ,আমার সেই অধিকার এখনও তৈরী হয়নি, যেখানে তোমার কোনো জিনিস ধরতে গেলেও আমার তোমার থেকে অনুমতি নিতে হবে। যেখানে তোমার কোনটায় ভালো হয়, কোনটায় খারাপ হয় সেগুলো দেখার বা সেগুলো নিয়ে ভাবার অধিকারও পর্যন্ত আমার নেই। আসলে আমারও মনে হয়েছে, এই দেশে আর্ট কালচারের খুব একটা দাম নেই । তোমার বিদেশ যাওয়া উচিত সেখানে গেলে তুমি অনেক সম্মান পাবে , অনেক টাকা পাবে।'
আর্য বলল ,'আমি কি বলেছি আমার টাকার প্রয়োজন আছে? তাছাড়া এখন কি পত্রলেখা আমার জীবনের সিদ্ধান্ত নেবে ? ওকে আমার জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কে দিয়েছে?'
অদৃত বলল,' আর্য ও তোমার ভালোর জন্যই বলেছে কথাটা। ও চায় তোমার ভালো হোক । আর ও সম্মানে তোমার থেকে তিন বছরের বড়ো হয়, তাই সম্মান দিয়ে কথা বলো।'
আর্য বলল,'বুঝেছি আমাকে এখানে থাকতে দেখে পত্রলেখার অসুবিধা হচ্ছে। '
অদৃত বলল ,'তুমি এইসব কি কথা বলছো? তোমার কি মাথার ঠিক আছে?'
আর্য কঠোর গলায় বলল,' আমার মাথা যথেষ্ট ভালো আছে আমি সবটাই বুঝতে পারছি।'
অদৃত রূঢ় দৃষ্টিতে আর্যর দিকে তাকিয়ে বলল,' কি বুঝতে পারছো তুমি?'
আর্য বলল,' আমি জানি পত্রলেখা আমাকে পছন্দ করে না । কিন্তু ওর এত কষ্ট করার কোনো দরকার ছিল না , তুমি যদি বলতে আমি এখান থেকে এমনিই চলে যেতাম।'
এবার অদৃতের ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙলো, সে বলল ,'আর্য আমি অনেকক্ষণ ধরে তোমার বাজে কথা শুনছি। প্রথমতঃ, আমার মনে হয় পত্রলেখা তোমাকে পছন্দ করে না নয় , আমার মনে হয় তুমি পত্রলেখাকে পছন্দ করো না । আমি প্রথম দিন থেকেই লক্ষ্য করেছি যে তুমি পত্রলেখাকে সহ্য করতে পারো না।
আর দ্বিতীয়তঃ, আমি বা পত্রলেখা আমরা কেউ-ই চাই না তুমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাও। আমি নিজে তোমাকে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছি । আমার যদি তোমাকে এই বাড়ি থেকে তাড়ানোরই হত তবে আমি তা অনেক আগেই করতে পারতাম; আমার এক্ষেত্রে পত্রলেখার কোনো দরকার হত না।
শোনো ও যা বলেছে তোমার ভালোর জন্য বলেছে;তোমার ভালোর কথা ভেবেই বলেছে। পত্রলেখাও চায় যে তুমি ভালো মতন সবকিছু শেখো, তোমার নাম হোক। তুমিও আমাদের মতোন একজন পারফেক্ট মানুষ তৈরী হও।'
তখন আর্য বলল,'যদি আমার ভালোই চাইতো তাহলে সেদিন ও আমাকে মূল্যবোধের কথা বলছিল কেন? '
অদৃত বলল,' পরে ও বুঝেছে সেদিন ও ভুল করেছিল, তাই আজকে ক্ষমা চেয়েছে আমার কাছে।
ও তোমার ভালোর জন্যই বলেছে। ও ওর বন্ধুকে সমস্ত কিছু পাঠিয়েছে সিলেক্ট হলে সমস্ত কিছু আমি তোমাকে ওখানে দিয়ে আসবো । আর তাছাড়া তোমাকেও তো একটা পারফেক্ট লাইফ লিড করতে হবে নাকি।'
আর্য বলল,' তার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি তো বলেছি আমি যাবো না মানে আমি যাবো নাই হবে।
আর রইলো বাকি পারফেক্ট হওয়ার কথা। আচ্ছা অদৃত একটু ভেবে বলোতো আমরা আমাদের লাইফে সকলে কি পারফেক্ট? এই পৃথিবী কি পারফেক্ট?সেও তো পুরোপুরি গোলাকৃতি নয়। আমাদের নিজেদেরই দেখো না অদৃত, আমাদের এই হাতের পাঁচটা আঙুল কি সমান? তারাও তো পাঁচ রকমের । এইগুলোও তো পারফেক্ট নয় অদৃত। চাঁদ তো কতো সুন্দর সবাই চাঁদকে কতো পছন্দ করে, কিন্তু সেও কি পারফেক্ট? না,তার গায়েও তো কতো কলঙ্ক।'
আর্য বলল,'আর টাকা-পয়সা,নামডাক,খ্যাতি হলেই কি সে পারফেক্ট হয়?তাহলেই কি সে পারফেক্ট লাইফ লিড করে? আমার মতে না। তুমিই বলো না তুমি এই পৃথিবীতে সমস্তকিছু কাজ করতে পারো?'
অদৃত বলল,'না।'
আর্য বলল,'কিন্তু তাও তুমি নিজেকে পারফেক্ট ভাবো, কারণ তোমার কাছে তুমি সেরা,তোমার কাছে তোমার করা প্রতিটা কাজ সেরা,তাই তোমার কাছে তুমি পারফেক্ট। ঠিক তেমনভাবে আমিও আমার নিজের কাছে সেরা,আমার কাছে আমার করা সমস্ত কাজ সেরা, তাই আমিও আমার নিজের কাছে পারফেক্ট। এবার হয়তো তোমরা আমার আঁকাকে সেরা ভাবো না, তাই হয়তো আমি তোমাদের কাছে পারফেক্ট নই। কিন্তু আমার কাছে আমি পারফেক্ট।
তাই আমি এখানেই ঠিক আছি,আমি কিছুতেই যাবো না।'
অদৃত বলল,'আমি জানিনা পত্রলেখা তোমার সাথে কি করেছে ? কেনই বা তুমি ওকে দেখলে রেগে যাও?তোমার কাছে একটাই অনুরোধ করবো দয়া করে পত্রলেখাকে ভুল বুঝো না,
ও তোমার ভালোর জন্যই বলেছিলো, এবার বাকিটা তোমার সিদ্ধান্ত তুমি কি করবে। যাইহোক অনেক রাত হয়ে গেছে এবার শুয়ে পড়ো আমায় কাল ভোরে উঠতে হবে।'
আর্য বলল,' কেন?'
অদৃত বলল,' কালকে আমি,পত্রলেখা এবং আমাদের টিম গোয়া যাবো ।ওখানে পত্রলেখার কিছু ফটোশ্যুট করার আছে। '
আর্য বলল ,'তার জন্য তোমাকে কেন যেতে হবে ?'
অদৃত বলল ,'নিশ্চই কোনো প্রয়োজন আছে তাইজন্য । আমি পরশু ফিরবো। কোনোকিছু অসুবিধা হলে আমাকে ফোন করে জানিও।'
আর্য এবার একটু অদৃতের দিকে সরে এসে বলল,' আমাকেও নিয়ে যাবে? '
অদৃত উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল ,'না আমি কাজের জন্য যাচ্ছি । পরে কখনো তোমাকে নিয়ে যাবো। এখন কাজের খুব প্রেসার আছে।'
আর্য উল্টো দিকে ফিরে শুয়ে ভাবলো,'তুমি আজ আমার ওপর এইভাবে রাগ করলে অদৃত! শুধুমাত্র পত্রলেখার জন্য তুমি এইভাবে কথা শোনালে?
আমাকে নিয়ে যাওয়ার সময় তোমার কাজের প্রেসার চলে এলো না।'
পরদিন সকালে অদৃত গোয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হল। গতরাতে ঘটনার পর আর্যর মনটা একদম ভালো নেই। বেলার দিকে অদৃত তাকে ফোন করলেও অদৃত সেইভাবে তার সাথে খুব একটা কথা বলল না।
আর্ট গ্যালারিতে যাওয়ার পথে আর্য ইনস্টাগ্রাম চেক করার সময় দেখলো, পত্রলেখা তার এবং অদৃতের ছবি পোস্ট করেছে। আর্যর ফটোটা দেখে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। আর্য ভাবলো,'তুমি খুব আনন্দ করছো বলো? ওখানে গিয়ে তোমার আমার কথা মনে পড়ছে অদৃত?'
অন্যদিকে ফটোশ্যুট শেষ হয়ে গেলে তারা সকলে হোটেলে ফিরে আসে । অদৃতের পাশের রুমটি পত্রলেখার। অদৃত হোটেলে ফিরে ফোন চেক করে দেখলো আর্যর একটাও ফোন আসেনি।
অদৃত আর্যকে দু-তিনবার ফোনে চেষ্টা করলো কিন্তু আর্য ফোন ধরলো না ।
অদৃত ভাবলো,'তোমার এতো রাগ। তখন ফোনে সেইভাবে কথা বলিনি বলে তুমি ফোন ধরছো না। আমিও আর করবো না।
উফ্ মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি হচ্ছে কাল রাতের পর থেকে। আর একবার ফোন করে দেখি।
কিন্তু না ওর বোঝাটা একটু দরকার। আমি তো কিছু ভুল করিনি। আমি সবসময় চাই ও নাম করুক। কোনো দরকার নেই আমি আর ফোন করবো না ।'
এরই মধ্যে পত্রলেখা অদৃতের রুমের সামনে এসে দরজা ধাক্কালো।
অদৃত দরজা খুলে বলল,'ওহ তুমি!'
পত্রলেখা বলল,'হ্যাঁ। ভিতরে আসতে পারি?'
অদৃত বলল,'হ্যাঁ এসো।'
পত্রলেখা বলল,'আর্যকে বলেছো ?'
অদৃত বলল,'হুম্ ।কিন্তু ও রাজী নয়।'
পত্রলেখা বলল,'কেন?'
অদৃত বলল,'আমি নিজেও জানি না । ও শুধু একটাই বলছে ও বিদেশ যাবে না ।'
আর্য বাড়ি ফিরে দেখলো শ্রেয়সী ড্রইং রুমের সোফায় বসে অ্যালবাম দেখছে। আর্য বলল,'অদৃতের ছোটবেলার সেই অ্যালবামটা দেখছো?'
শ্রেয়সী বলল,'না, এটা অন্য অ্যালবাম। এই দেখো।'
আর্য দেখলো একটা ছবিতে একটা বাচ্চা ছেলে বরফ হাতে নিয়ে বসে আছে।
শ্রেয়সী বলল,'চিনতে পারছো, এটা কে?'
আর্য বলল,'অদৃত ।'
শ্রেয়সী বলল,'ঠিক ধরেছো। সেবার আমরা সিকিম গিয়েছিলাম তখন অদৃত অনেকটাই ছোট।'
পরের পেজ ওল্টাতেই আর্যর চোখে পড়ল কম বয়সী অদৃত গালভর্তি হাসি নিয়ে বরফঘেরা পাহাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছে ।
আর্য বলল,'এটা কোথায় আন্টি?'
শ্রেয়সী বলল,'এইবারটা আমরা কাশ্মীরে গিয়েছিলাম। অদৃত তখন ক্লাস টেনের পরীক্ষা দিয়েছে সবে। খুব মজা হয়েছিল সেবার।'
পরের পেজ ওল্টাতেই আর্যর চোখে পড়ল একটা বাগান বাড়ির সামনে বসে থাকা অদৃতের সাথে একটি মিষ্টি মেয়ের ছবির ওপর ।
আর্য বলল ,'এই মেয়েটা পত্রলেখা না?'
শ্রেয়সী বলল,' ঠিক চিনতে পেরেছো। ওটা পত্রলেখা। আমরা একবার গেট টুগেদার করেছিলাম তখনকারই তোলা ফটো এটা।'
আর্যর গেট টুগেদার শব্দটি শুনতেই মনে পড়ল, অদৃত কলকাতায় থাকাকালীন তাকে বলেছিল সে একবার তার পরিবার ও তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু এবং সেই বন্ধুর পরিবারের সাথে গেট টুগেদারে গিয়েছিল।
অদৃতের সাথে পত্রলেখার ছবিটি দেখে কোথাও গিয়ে আর্যর মনের মধ্যে একটা চাপা কষ্ট হল।
পরদিন সকালে অদৃত ফিরে এলেও সেভাবে আর্যর সাথে কথা হল না তার।
কিছুদিন ধরেই অদৃত নানান কাজে ভীষণ ব্যস্ত , এখন মাঝেমধ্যে ব্যবসার খাতিরে এক-দু'দিনের জন্য বিদেশেও যেতে হয় তাকে। সেই দিনগুলো আর্যর বড্ড একা লাগে, শ্রেয়সী এবং ইন্দ্রনীল বাড়িতে থাকলেও সে অদৃতের অভাব অনুভব করে। আজকাল অদৃত কখন বাড়ি ঢোকে আর কখন বেরোয় তা বলাটা আর্যর পক্ষে কঠিন। খুব কম কথা হয় এখন তার অদৃতের সাথে, অদৃতও আগের মতোন আর্যকে সময় দিতে পারে না কাজের চাপে । আর্য আজ সকালে উঠে চা খাচ্ছিলো যখন, সেই সময় তার চোখে পড়লো টেবিলের উপর পড়ে থাকা ম্যাগাজিনের ওপর। যে ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ পাতার ছবি ছিল অদৃত এবং পত্রলেখার একসাথে। পত্রলেখা এবং অদৃত দু'জনকেই খুব সুন্দর লাগছে সেখানে। অদৃতের সাথে পত্রলেখাকে সে একেবারেই সহ্য করতে পারে না, তাই সকাল সকাল তাদের দুজনের ফটো দেখে তার মনটা একটু খারাপই হল।
আর্য যখন ত্রিদিবের স্টুডিওতে ছবি আঁকতে ব্যস্ত সেই সময় আর্যর ফোনে অদৃতের ফোন এলো। আর্য ফোন ধরলে অদৃত বলল,' আর্য আজ আমি তোমাকে স্টুডিও থেকে নিতে যাবো।'
আর্য বলল ,'ঠিক আছে।'
ফেরার পথে গাড়িতে সেই ভাবে তাদের কথা হলো না। গাড়িতে অদৃতকে বেশ কয়েকটি অফিসের ফোন ধরতে হল।
রাতে শোয়ার সময় অদৃত ল্যাপটপে কাজ করছিল ।
আর্য বলল ,'একটা কথা বলবো?'
অদৃত চোখের চশমাটা খুলে আড়মোরা ভেঙে বলল,' হ্যাঁ বলো।'
আর্য বলল ,'আসলে সেদিন আমার ওইভাবে রিয়েক্ট করাটা ঠিক হয়নি।'
অদৃত বলল,' কোন দিন রাতের কথা বলছো ?যেদিন আমি বিদেশ যাওয়া নিয়ে......'
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আর্য বলল,'হ্যাঁ । '
অদৃত বলল,'ও আচ্ছা। দ্যাখো তোমার জীবন তুমি ভালো বুঝবে।'
আর্য বলল,' তুমি আমার উপর রেগে আছো এখনো?'
অদৃত বলল,' না আমি রাগ করবো কেন? আমার তোমার ওপর রাগ করার অধিকার আছে নাকি?আমি রাগ করিনি।'
আর্য অদৃতের কাঁধে মাথা রেখে বলল,'তুমি সত্যি করে বলো?'
To be continued..................

